প্রসঙ্গ ২১ আগস্ট:  একটি সরকারি জঙ্গি হামলা ও আইনের শাসন

ছবি: বার্তা২৪

 

অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে নিত্য শহরে আসা ব্যক্তিদের একজন তিনি। নানা পেশায় যুক্ত হওয়া অনেকের মত তিনিও ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাতে হকার হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। অনেকটা ছন্নছাড়া জীবন। এদিকে অসুস্থ মা। কিছুদিন ঢাকা তো কিছুদিন গ্রাম। অবশ্য এসব কিছু সত্ত্বেও পরিবারের প্রতি ছিল তার অসীম দায়িত্ববোধ। আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই গ্রামে অসুস্থ মা এবং ছোট বোনের দেখভালের দায়িত্বটাও পালন করে যাচ্ছিলেন যথাসম্ভব।

এর মধ্যে অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে তার সাজা হয়ে যায়। অনেকটা পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। কখনও ঢাকা কখনও গ্রামের বাড়ি। দেশে তখন সরকার ও বিরোধী দলের চরম পাল্টাপাল্টি চলছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানের সমর্থক এবং তাদের আদর্শের অনুসারী দল এবং সেই সাথে কিছু জঙ্গী সংগঠন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তিরা সরকার এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। এই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সরকার এবং সরকার সমর্থিত সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং দেশের সর্বস্তরে ক্রমাগতভাবে সংগঠিত হতে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিবৃদ্ধি শাসকশ্রেণীর জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এই শক্তিকে নির্মূল করতে না পারলে বিপদ অবধারিত। একাত্তরের চেতনার মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় বিনাশ ঘটবে সব কীট পতঙ্গদের। এটা হতে দেয়া যায় না কোনোভাবেই।

এমন সময় ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে যখন ব্যাপক জনসমাগম – অতর্কিতে সেখানে মুর্হূমুর্হূ গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। কিছু বুঝে উঠার আগেই সমাবেশস্থলে লাশ আর লাশ। আবার অনেকেরই কারও হাত আবার কারও পা উড়ে গেছে। ছটইফট করছেন ব্যথা আর মৃত্যু যন্ত্রণায়। যারা বেঁচে আছেন কেউ জীবন নিয়ে পালাচ্ছেন আবার এদের অনেকেই নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে ছুটে গেছেন মানবতার সেবায়, দ্রুত আহতদের টেনে নিয়ে চিকিৎসা দিতে। নেতৃস্থানীয়দের অনেকেই তৎক্ষণাৎ মানবঢাল তৈরী করে ঘিরে রাখলেন তাদের নেত্রীকে, যিনি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্তি, শান্তি আর সোনার বাংলার প্রতিচ্ছবি, যার বিনাশে নবজাগরণ ঘটে কীট পতঙ্গদের।

বিনাশী সেই উন্মত্ততা থেকে সেদিন তিনি রেহাই পেয়েছিলেন ঐশ্বরিক কৃপায়। সরকার বাহাদূরের মাথায় হাত। সারা দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন এটা নিয়ে তুমূল প্রতিবাদ বিক্ষোভ, সেই অবস্থায় অনেকদিন ধরে তিল তিল করে চর্চিত নাটকের যথাযথ মঞ্চায়ন না হওয়ার খরগ গিয়ে পড়ল গ্রাম্য অভাবতাড়িত সেই ব্যক্তির ঘাড়ে, যার নাম জজ মিয়া।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পর এটিকেই সবচেয়ে ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞ, যেখানে দিনের আলোতে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের ছত্রছায়ায় পালিত সন্ত্রাসী দিয়ে সুপরিকল্পিত উপায়ে ঘটানো হয় নৃসংস এই ঘটনা।

দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটেছে আজকের এই রায়ের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে আরেকটি কলঙ্ক মোচনের দিন হিসেবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কুশীলবের ভূমিকায় থাকা তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দীনসহ ১৯ জনের প্রাণদণ্ডের রায় এসেছে।

তৎকালীন সরকারের নেপথ্য চালক এবং হাওয়া ভবনে বসে সরকার ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা তারেক রহমান এবং সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে। এই মামলার মোট আসামি ছিল ৫২ জন। এদের মধ্যে অন্য মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কর্যকর হওয়াতে আসামীর সংখ্যা ৪৯। মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে ৩৮ জনের। বাকী ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

আমরা এই মামলার রায় থেকে যে বিষয়টি প্রশংসা করতে পারি তা হচ্ছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দক্ষতা এবং বিচক্ষণতা। এর আগে যখন ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয় তখন ২২ জনকে আসামী করে চার্জশীট দেয়া হয়। পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাসীন হলে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ আরও অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরলে আদালতের সম্মতি পান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গভীরভাবে অনুসন্ধানের মাধ্যমে সুন্দরভাবে এই ঘটনার নেপথ্যের চালকদের খুজে বের করতে সক্ষম হন। ২০১১ সালে সম্পুরক চার্জশীটেতে অন্তর্ভূক্ত হওয়া ৩০ জনের সবাই এই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে বাবর, পিন্টু, তারেক, হারিছসহ অনেকের মৃত্যুদন্ড এবং যাবজ্জীবন সাজার মত রায় এসেছে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এই মামলা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। যদি এমনটা না করা হত তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামী এই মামলা থেকে ছিটকে পড়ত এবং আইনের শাসনেও ছেদ পড়ত।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনার মূল পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার পর তৎকালীন সরকার যখন এর বিচার নিয়ে চাপের সম্মুখীন হয়, পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৈরি হয় আরেকটি নাটকের, যার মূল চরিত্র জজ মিয়া। জানা যায়, সরকারের উপর মহলের নির্দেশে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক কোনো ব্যক্তিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করে দায়সারাভাবে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এমতাবস্থায় নোয়াখালীতে নিজ গ্রামে অবস্থানকারী জজ মিয়াকে ধরে আনা হয়। পুরো ঘটনায় নিজের দায় স্বীকারের জন্য চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করা হয় পরবর্তীতে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার এবং সেই সাথে গ্রামে তার সংসার চালানোর জন্য নিয়মিত মাসোহারার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। তাকে হুমকী দিয়ে বলা হয় এর ব্যত্যয় হলে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে তাকে। অগত্যা উপায়ান্তর নে দেখে ভাগ্যের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে সব কিছু মেনে নেয় জজ মিয়া।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে পুরো ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়। বেঁকে বসেন জজ মিয়া। ফাঁস করে দেন আসল ঘটনা। নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। সেসময় তদন্তে হুজি নেতা মুফতি হান্নান এবং তার সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ২২জনকে আসামী করে চার্জশীট দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে আদালতের সম্মতিতে সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ এর দায়িত্ব পান। অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে কীভাবে তৎকালীন সরকার এই নৃসংশ ঘটনা ঘটাতে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ব্যবহার করেছিলেন।

এখানে একটি বিষয় সকলের কাছেই খটকা লাগতে থাকে যে কেবলমাত্র মুফতি হান্নানসহ তার সংগঠনকে আড়াল করাই তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল হোতাদের আড়াল করা।

এই রায়ের আগের দিন রাজধানীতে দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এবং বিরোধী বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এবং মহাসচিব এই হত্যা মামলা নিয়ে কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের তার প্রতিক্রিয়ায় এই রায়ে ন্যায়বিচার আশা করে বলেন, তারেক রহমান এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। তৎকালীন সরকারের সময় হাওয়া ভবনে বসে সরকারি সুবিধাভোগীদের ছত্রছায়ায় এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, তিনি হলফ করতে বলতে পারবেন এই ঘটনায় তারেক রহমান এবং আব্দুস সালাম পিন্টুসহ বিএনপি নেতারা সম্পৃক্ত নন। তিনি আরও জানান আওয়ামী লীগ এই ঘটনার বেনেফিসিয়ারি এবং আওয়ামীলীগ এটিকে ইস্যু করে বিএনপিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

তৎকালীন সরকার দেশি-বিদেশি চাপের মুখে দায়সারাভাবে একজন বিচারপ্রতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার প্রতিবেদনে বলা হয় এই হামলা একটি বিদেশি চক্রান্তের ফসল। এর পর থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার সাথে ভারতের সম্পৃক্ততার কথা প্রচার করে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্কের ফাটল ধরানোর পায়তারা করা হয়। এধরণের কোনো কিছুতেই যখন কোনো সুবিধা হচ্ছিল না, তারা এটাও বলতে ছাড়ল না যে আওয়ামী লীগ নিজেরাই এই ঘটনা ঘটিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফায়দা নিতে চাইছে।

সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই কথা পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করেননি যে শেখ হাসিনা নিজেই তার ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড বহন করে তার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে যখন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান ছিল সেই সময়ও বিএনপির পক্ষ থেকে ক্রমাগতভাবে বলতে শোনা গেছে তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের এই মামলায় জড়ানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। সেই সময় এমন ঘটনা ঘটানো থেকে শুরু করে একের পর এক ধামাচাপা দেয়ার ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বনের জন্য লজ্জিত না হয়ে তাইতো রায়ের আগের দিনও মির্জা সাহেবের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে, “আওয়ামী লীগ এই ঘটনার বেনেফিসিয়ারি।”

মির্জা সাহেব রাজনীতি করছেন দীর্ঘদিন ধরে, তবে তিনি বোধ হয় একটি কথা বেমালুম ভুলে বসে আছেন যে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে বড় দেশ। সবকিছু বাদ দিয়ে বারংবার ব্যক্তিকেই সর্বাগ্রে নিয়ে আসার চাটুকারিতায় এধরণের ব্যক্তি দলকেতো ডুবাচ্ছেনই, সাথে সাথে তাদের দেশপ্রেমের বুলি জনগণের কাছে তামাসার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

সবশেষে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার এই রায় আমাদের দেশ এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের শাসনের পথে এক উজ্জ্বল পথনির্দেশক হয়ে থাকুক সবসময় এটাই প্রত্যাশা করি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বেইজিং এর ইউআইবিই-তে উচ্চশিক্ষারত।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

নির্বাচনের অর্থনীতি

দীর্ঘ বিরতির পর আবার নির্বাচনী আমেজে সরগরম হয়েছে সারাদেশ। কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল বর্জন করায় ভোট...

//election count down