Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

প্রসঙ্গ ২১ আগস্ট:  একটি সরকারি জঙ্গি হামলা ও আইনের শাসন

প্রসঙ্গ ২১ আগস্ট:  একটি সরকারি জঙ্গি হামলা ও আইনের শাসন
ছবি: বার্তা২৪
ফরিদুল আলম  


  • Font increase
  • Font Decrease

 

অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে নিত্য শহরে আসা ব্যক্তিদের একজন তিনি। নানা পেশায় যুক্ত হওয়া অনেকের মত তিনিও ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাতে হকার হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। অনেকটা ছন্নছাড়া জীবন। এদিকে অসুস্থ মা। কিছুদিন ঢাকা তো কিছুদিন গ্রাম। অবশ্য এসব কিছু সত্ত্বেও পরিবারের প্রতি ছিল তার অসীম দায়িত্ববোধ। আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই গ্রামে অসুস্থ মা এবং ছোট বোনের দেখভালের দায়িত্বটাও পালন করে যাচ্ছিলেন যথাসম্ভব।

এর মধ্যে অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে তার সাজা হয়ে যায়। অনেকটা পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। কখনও ঢাকা কখনও গ্রামের বাড়ি। দেশে তখন সরকার ও বিরোধী দলের চরম পাল্টাপাল্টি চলছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানের সমর্থক এবং তাদের আদর্শের অনুসারী দল এবং সেই সাথে কিছু জঙ্গী সংগঠন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তিরা সরকার এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। এই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সরকার এবং সরকার সমর্থিত সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং দেশের সর্বস্তরে ক্রমাগতভাবে সংগঠিত হতে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিবৃদ্ধি শাসকশ্রেণীর জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এই শক্তিকে নির্মূল করতে না পারলে বিপদ অবধারিত। একাত্তরের চেতনার মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় বিনাশ ঘটবে সব কীট পতঙ্গদের। এটা হতে দেয়া যায় না কোনোভাবেই।

এমন সময় ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে যখন ব্যাপক জনসমাগম – অতর্কিতে সেখানে মুর্হূমুর্হূ গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। কিছু বুঝে উঠার আগেই সমাবেশস্থলে লাশ আর লাশ। আবার অনেকেরই কারও হাত আবার কারও পা উড়ে গেছে। ছটইফট করছেন ব্যথা আর মৃত্যু যন্ত্রণায়। যারা বেঁচে আছেন কেউ জীবন নিয়ে পালাচ্ছেন আবার এদের অনেকেই নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে ছুটে গেছেন মানবতার সেবায়, দ্রুত আহতদের টেনে নিয়ে চিকিৎসা দিতে। নেতৃস্থানীয়দের অনেকেই তৎক্ষণাৎ মানবঢাল তৈরী করে ঘিরে রাখলেন তাদের নেত্রীকে, যিনি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্তি, শান্তি আর সোনার বাংলার প্রতিচ্ছবি, যার বিনাশে নবজাগরণ ঘটে কীট পতঙ্গদের।

বিনাশী সেই উন্মত্ততা থেকে সেদিন তিনি রেহাই পেয়েছিলেন ঐশ্বরিক কৃপায়। সরকার বাহাদূরের মাথায় হাত। সারা দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন এটা নিয়ে তুমূল প্রতিবাদ বিক্ষোভ, সেই অবস্থায় অনেকদিন ধরে তিল তিল করে চর্চিত নাটকের যথাযথ মঞ্চায়ন না হওয়ার খরগ গিয়ে পড়ল গ্রাম্য অভাবতাড়িত সেই ব্যক্তির ঘাড়ে, যার নাম জজ মিয়া।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পর এটিকেই সবচেয়ে ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞ, যেখানে দিনের আলোতে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের ছত্রছায়ায় পালিত সন্ত্রাসী দিয়ে সুপরিকল্পিত উপায়ে ঘটানো হয় নৃসংস এই ঘটনা।

দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটেছে আজকের এই রায়ের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে আরেকটি কলঙ্ক মোচনের দিন হিসেবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কুশীলবের ভূমিকায় থাকা তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দীনসহ ১৯ জনের প্রাণদণ্ডের রায় এসেছে।

তৎকালীন সরকারের নেপথ্য চালক এবং হাওয়া ভবনে বসে সরকার ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা তারেক রহমান এবং সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে। এই মামলার মোট আসামি ছিল ৫২ জন। এদের মধ্যে অন্য মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কর্যকর হওয়াতে আসামীর সংখ্যা ৪৯। মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে ৩৮ জনের। বাকী ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

আমরা এই মামলার রায় থেকে যে বিষয়টি প্রশংসা করতে পারি তা হচ্ছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দক্ষতা এবং বিচক্ষণতা। এর আগে যখন ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয় তখন ২২ জনকে আসামী করে চার্জশীট দেয়া হয়। পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাসীন হলে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ আরও অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরলে আদালতের সম্মতি পান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গভীরভাবে অনুসন্ধানের মাধ্যমে সুন্দরভাবে এই ঘটনার নেপথ্যের চালকদের খুজে বের করতে সক্ষম হন। ২০১১ সালে সম্পুরক চার্জশীটেতে অন্তর্ভূক্ত হওয়া ৩০ জনের সবাই এই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে বাবর, পিন্টু, তারেক, হারিছসহ অনেকের মৃত্যুদন্ড এবং যাবজ্জীবন সাজার মত রায় এসেছে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এই মামলা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। যদি এমনটা না করা হত তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামী এই মামলা থেকে ছিটকে পড়ত এবং আইনের শাসনেও ছেদ পড়ত।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনার মূল পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার পর তৎকালীন সরকার যখন এর বিচার নিয়ে চাপের সম্মুখীন হয়, পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৈরি হয় আরেকটি নাটকের, যার মূল চরিত্র জজ মিয়া। জানা যায়, সরকারের উপর মহলের নির্দেশে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক কোনো ব্যক্তিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করে দায়সারাভাবে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এমতাবস্থায় নোয়াখালীতে নিজ গ্রামে অবস্থানকারী জজ মিয়াকে ধরে আনা হয়। পুরো ঘটনায় নিজের দায় স্বীকারের জন্য চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করা হয় পরবর্তীতে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার এবং সেই সাথে গ্রামে তার সংসার চালানোর জন্য নিয়মিত মাসোহারার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। তাকে হুমকী দিয়ে বলা হয় এর ব্যত্যয় হলে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে তাকে। অগত্যা উপায়ান্তর নে দেখে ভাগ্যের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে সব কিছু মেনে নেয় জজ মিয়া।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে পুরো ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়। বেঁকে বসেন জজ মিয়া। ফাঁস করে দেন আসল ঘটনা। নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। সেসময় তদন্তে হুজি নেতা মুফতি হান্নান এবং তার সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ২২জনকে আসামী করে চার্জশীট দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে আদালতের সম্মতিতে সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ এর দায়িত্ব পান। অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে কীভাবে তৎকালীন সরকার এই নৃসংশ ঘটনা ঘটাতে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ব্যবহার করেছিলেন।

এখানে একটি বিষয় সকলের কাছেই খটকা লাগতে থাকে যে কেবলমাত্র মুফতি হান্নানসহ তার সংগঠনকে আড়াল করাই তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল হোতাদের আড়াল করা।

এই রায়ের আগের দিন রাজধানীতে দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এবং বিরোধী বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এবং মহাসচিব এই হত্যা মামলা নিয়ে কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের তার প্রতিক্রিয়ায় এই রায়ে ন্যায়বিচার আশা করে বলেন, তারেক রহমান এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। তৎকালীন সরকারের সময় হাওয়া ভবনে বসে সরকারি সুবিধাভোগীদের ছত্রছায়ায় এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, তিনি হলফ করতে বলতে পারবেন এই ঘটনায় তারেক রহমান এবং আব্দুস সালাম পিন্টুসহ বিএনপি নেতারা সম্পৃক্ত নন। তিনি আরও জানান আওয়ামী লীগ এই ঘটনার বেনেফিসিয়ারি এবং আওয়ামীলীগ এটিকে ইস্যু করে বিএনপিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

তৎকালীন সরকার দেশি-বিদেশি চাপের মুখে দায়সারাভাবে একজন বিচারপ্রতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার প্রতিবেদনে বলা হয় এই হামলা একটি বিদেশি চক্রান্তের ফসল। এর পর থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার সাথে ভারতের সম্পৃক্ততার কথা প্রচার করে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্কের ফাটল ধরানোর পায়তারা করা হয়। এধরণের কোনো কিছুতেই যখন কোনো সুবিধা হচ্ছিল না, তারা এটাও বলতে ছাড়ল না যে আওয়ামী লীগ নিজেরাই এই ঘটনা ঘটিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফায়দা নিতে চাইছে।

সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই কথা পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করেননি যে শেখ হাসিনা নিজেই তার ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড বহন করে তার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে যখন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান ছিল সেই সময়ও বিএনপির পক্ষ থেকে ক্রমাগতভাবে বলতে শোনা গেছে তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের এই মামলায় জড়ানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। সেই সময় এমন ঘটনা ঘটানো থেকে শুরু করে একের পর এক ধামাচাপা দেয়ার ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বনের জন্য লজ্জিত না হয়ে তাইতো রায়ের আগের দিনও মির্জা সাহেবের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে, “আওয়ামী লীগ এই ঘটনার বেনেফিসিয়ারি।”

মির্জা সাহেব রাজনীতি করছেন দীর্ঘদিন ধরে, তবে তিনি বোধ হয় একটি কথা বেমালুম ভুলে বসে আছেন যে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে বড় দেশ। সবকিছু বাদ দিয়ে বারংবার ব্যক্তিকেই সর্বাগ্রে নিয়ে আসার চাটুকারিতায় এধরণের ব্যক্তি দলকেতো ডুবাচ্ছেনই, সাথে সাথে তাদের দেশপ্রেমের বুলি জনগণের কাছে তামাসার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

সবশেষে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার এই রায় আমাদের দেশ এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের শাসনের পথে এক উজ্জ্বল পথনির্দেশক হয়ে থাকুক সবসময় এটাই প্রত্যাশা করি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বেইজিং এর ইউআইবিই-তে উচ্চশিক্ষারত।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র