রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও একটি রাজসিক বিবাহবার্তা

টুটুল রহমান, এডিটর বিজনেস অ্যান্ড ফাইন্যান্স, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বেশ কিছু দিন আগে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। পত্রিকার লেখনিতে তাঁর বর্ণনায় পাই ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন চার হাজারের ওপরে অতিথি। বলে নেয়া ভালো বিয়েটি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের সিবিএ সভাপতির কনিষ্ঠ কন্যার। ওই সিবিএ সভাপতির বাড়ি যে উপজেলায় সেখানকার গণ্যমান্য কেউই বাদ ছিলেন না বিয়ের এই আসরে। মেয়ের  গায়ে জড়ানো গহনা, অতিথি আপ্যায়ন অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বিয়ে এটা। ওই সিবিএ সভাপতিকে দীর্ঘদিন থেকে চিনতাম। কয়েক বছর আগে ওই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকে কার্যালয়ে বসতে দেখতাম, ধুপধাপ পায়ে তিনি আসতেন। অসৌজন্যমূলক ভাবে এমডির সামনে বসতেন। একে-ওকে বদলির নানা নির্দেশ দিতেন। আরো কত ধরনের বায়না-বাহানা ছিল তার। এমডিও মাথা-ঝাঁকিয়ে কাজ গুলো করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেন। পড়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছি মুক্তিযোদ্ধা ওই সিবিএ নেতা ব্যাংকের কেরানি পদে জয়েন করেছিলেন। এখনো সেখাই পড়ে আছেন। তবে রাজনৈতিক হাওয়া বাতাসে তার পাখনাগুলো খুব দোল খায়। আঙ্গুলের ইশারায় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তিটিও কুপোকাত হয়ে যান কখনো সখনো।

‘কেরানি‘র মেয়ে ‘রানী‘ হয়ে শ্বশুলায়ে যাচ্ছেন চার  হাজার মানুষের আর্শীবাদে, হীরে আর জহরতে মুড়িয়ে এতে  সমাজের কারো কোনো আপত্তি নেই। কাদের সিদ্দিকী ওই বিবাহ অনুষ্ঠানে গিয়ে স্মৃতি চারণ করে নিবন্ধ লিখেছেন তাতেও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একজন ‘কেরানি‘ কিভাবে এমন ধন দৌলত-শান শওকাতের মালিক হন সেটা নিয়ে কৌতুহল রয়েছে ব্যাপক। এই কৌতুহল মেটাতে পারে রাষ্ট্রই। কাকতালীয় ভাবে ওই নেতার বাড়ি আমার উপজেলায়। খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম তার পূর্বপুরুষ জমিদার বংশীয় কিনা। না, সে ধরনের কোনো তথ্য নেই।

রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলো নিয়ে ব্যাপক কথা বার্তা উঠেছে। বিশেষ করে হল-মার্কের ঘটনার পর রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থার জায়গা নষ্ট হয় যায়। ওই সময়ের পরিচালক যারা ছিলেন তাদের নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

সম্প্রতি আরেকটি রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকের বড় বড় ঋণ কেলেংকারী  বেরিয়ে আসছে। বেরিয়ে আসছে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমানের তথ্য। এতে খুব সহজেই বোঝা যায় ব্যাংকগুলো ঠিকঠাক চলছে না। কেন চলছে না তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষন খুবই জরুরী।

আমি একজন সিবিএ নেতার উদারহণ দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। আপনাদের নিশ্চয়ই সোনালী ব্যাংকের জাতীয়তাবাদী সিবিএ নেতা বিএম বাকেরের কথা মনে আছে। ব্যাংকের যে কোনো প্রোগ্রামে মান্নান ভুইয়ার পেছনে তিনি খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন। অবাক বিস্ময় সবাই তাকিয়ে দেখতো আর ভাবতো কে এই ব্যক্তি সরকারের দ্বিতীয় শক্তিধর ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে। তত্ত্বাবধবায়ক সরকার অবশ্য তার পরিচয় উদ্ঘাটন করেছিল। অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে ১৩ বছরের জেল হয়। তার স্ত্রীর হয়েছিল ৩ বছরের। সাজা খাটার আগেই বেচারা জেলের মধ্যে মারা যান। একজন কেরানি‘র এত সম্পদ থাকার কথা নয় বলেই তার সাজা হয়েছিল।

এই সিবিএ নেতারা মূলত কি করে ব্যাংকে। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে। কার্যালয়ে বসে ব্যাংকের নানা দলীয় প্রোগ্রামের আয়োজন করে। ব্যস। এর  আড়ালে তারা কি না করে। অভিযোগ শোনা যায় বড় বড় লোন পাশের কারিগর এরা। চাকরির পাইয়ে দেয়া, বদলির তদবিরসহ নানা কাজে এরা সারাদিন ব্যস্ত থাকে। ব্যাংকের কাজ না করলেও চলে এদের। আমার এক বন্ধু সাংবাদিক এদের  কীর্তি নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল ব্যাংকের মধ্যে। অনেককে তো এরা প্রকাশ্যেই হুমকি দেয়।

সিবিএ  নেতাদের কর্মকান্ড নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যাংকের  ভেতরে। বিশেষ করে কর্মকর্তাদের মধ্যে। প্রতিনিয়ত এদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। কথা মতো ঋণ দিতে হয়। কেউ এর ব্যতিক্রম করার চেষ্টা করলে তার ভাগ্যে জোটে ভিন্ন কিছু। কোনো একটি প্রোগ্রামে অর্থ ছাড়  কম করায় এক ডিএমডিকে সারাদিন অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে। বছরান্তে  তাদের চাহিদা মাফিক কেলেন্ডার প্রয়োজন সরবরাহ না করা হলে কি একে বারে  হৈচৈ ফেলে দেয়।

তাদের দুবির্নীতি দাপটে অনেক কর্মকর্তা তটস্থ থাকেন এ কথা  আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এই মুহূর্তে এদের প্রসঙ্গ আসছে কেন? রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই। ব্যাংকিংখাতের খেলাপি ঋণের ৫৬ শতাংশই রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া  বেশির ভাগ ঋণ পাশে এদের তদবির থাকে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বড় বড় ঋণ কেলেংকারীর সাথে এদের নামও মুখে আনছেন কেউ কেউ। 

শুরুতেই কাদের সিদ্দিকী ও রাজসিক বিবাহবার্তা দিয়েছিলাম এ কারণে যে, কাদের সিদ্দিকী আমাদের শ্রদ্ধাভাজন একজন রাজনীতিবিদ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে তার নাম জড়িত। বঙ্গবন্ধুর ডাকে নিজের  জীবনের মায়া ত্যাগ করে তারা যুদ্ধ করেছিলেন বৈষম্যহীন-দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য। আমরা রাজনীতিবিদদের দিকে তাকিয়ে থাকি। যে প্রশ্নটি  সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার মনে উদয় হয়েছে সেই প্রশ্ন তিনি তুলতে পারতেন। স্বাধীনতার এত বছর পরে তার আদরের মুক্তিযোদ্ধাটি কিভাবে এই তার কনিষ্ট কন্যার এই রাজসিক বিবাহের আয়োজন করলেন?

যদি শ্রম আর মেধা দিয়ে ওই সিবিএ নেতা সম্পদ গড়ে  তোলেন তাহলে তিনি তো পুরস্কারের যোগ্য। আর যদি নয়-ছয়ের কেরামতি করেন তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এ ধরনের ঘটনা উদ্ঘাটন করা এবং ‘জন্ম‘ বন্ধ করা।

আপনার মতামত লিখুন :