রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও প্রাসঙ্গিক কথা

আবদুল মোনেম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের মূল আইনে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের কোনো বিধান না থাকলেও রাজনীতির প্রতি বিতশ্রদ্ধ ১/১১ সরকার ১৯৭২ সালের Representation of People Order (RPO) পরিবর্তন করে সংশোধন আকারে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের Representation of People (Amendment) Ordinance, 2008 নামক একটি আইন করে। এই আইনে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি অতিরিক্ত অধ্যায় সংযোজন করা হয় । উক্ত অধ্যায়ে ৯টি ধারা (৯০এ থেকে ৯০আই) রয়েছে । ৯০এ অনুসারে নির্বাচনে অংশগ্রণেচ্ছু দলসমূহকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হবে ।  উপরোক্ত আদেশের ৯০বি(১)এ ধারার বিধি অনুসারে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন পেতে হলে:

(i) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিলের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যে কোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভ করে থাকতে হবে অথবা

(ii)উক্তরূপ নির্বাচনের যেকোন একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত আসনসমূহে প্রদত্ত মোট ভোট সংখ্যার ৫% ভোট লাভ করে থাকতে হবে অথবা 

(iii) কেন্দ্রীয় কমিটি ও অফিস, অফিসসহ কমপক্ষে ১০টি জেলা কমিটি এবং অফিসসহ কমপক্ষে ৫০টি উপজেলা/থানা কমিটি থাকতে হবে ।

৯০বি(১)বি(ii) অনুসারে ২০২০ সাল নাগাদ সর্বস্তরের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩% নারী সদস্য অন্তর্ভূক্তির শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে ।

এছাড়া ৯০এইচ(১)ই অনুসারে পর পর দুইটি জাতীয় নির্বাচনে কোনো নিবন্ধিত দল অংশগ্রহণ না করলে দলটির নিবন্ধন বাতিল বলে গণ্য হবে ।

উক্তরূপ আইন অনুসারেই ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগসহ চল্লিশটি দল নিবন্ধন লাভ করে এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের শুরুতে সরকার গঠন করে । এ সরকার ৯০বি(১)এ (iii) নং উপ ধারায় ১০টি জেলা কমিটি ও অফিসের স্থলে ২২টি জেলা কমিট; ৫০টি উপজেলা/ থানা কমিটির স্থলে ১০০টি উপজেলা/ থানা কমিটি; প্রতিটি কমিটিভূক্ত উপজেলা/ থানায় কমপক্ষে ২০০ জন নিবন্ধিত ভোটার সদস্য এবং এসবের প্রামাণ্য দলিল-পত্রাদির বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে Representation of People Order (Amendment) Act, 2009 (Act No. XIII of 2009) নামে ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ সালে আইনটিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস করিয়ে নেয় ।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং আমাদের দেশের রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী মহল কর্তৃক সর্বাধিক আলোচিত দেশসমূহে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে কীরূপ আইন প্রচলিত আছে সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।

দেশের খ্যাতিমান রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবি মহলের কাছে গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসাবে পরিচিত যুক্তরাজ্যের Registration of Political Party Act-1998 অনুসারে কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় অফিস ও দলীয় গঠণতন্ত্র থাকলে যে কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যোগ্য হয় । বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতাত্রিক দেশ ভারতে Representation of People Act-1951 অনুসারে কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় অফিস এবং গঠণতন্ত্র থাকলেই যেকোন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে পারে । রাজনীতিক মহলে সর্বাধিক পরিচিত ও বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক আলোচিত গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের The Political Parties (Registration And Regulation) Act অনুসারে কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় অফিস, দলীয় গঠণতন্ত্র এবং ১০০ জন নিবন্ধিত ভোটার সদস্য থাকলে যেকোন  রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যোগ্যতা লাভ করে । গণতন্ত্রপন্থী অন্য সকল রাষ্ট্রসমূহেও রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে একই রূপ আইন চালু রয়েছে ।

এবার আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিদ্যমান আইনটি নিয়ে একটু পর্যালোচনা করা দরকার । আইনটির ৯০বি(১)এ(i) নং উপধারা অনুসারে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে ৮টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এর যে কোনো একটিতে দলীয় প্রতীকে অংশ নিয়ে একটি আসন লাভ করলেই যেকোন একটি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যোগ্যতা লাভ করবে। অথচ ৮টি নির্বাচনের মধ্যে অধিকাংশ নির্বাচনই সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে কিংবা গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ আইনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিনা ভোটে কিংবা বিশেষ কিছু নেতা-নেত্রীর অনুকম্পায় নির্বাচিত হিসাবে ঘোষিত ব্যক্তিদের দলকে নিবন্ধনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে । অর্থাৎ যেসব দলের পূর্বসূরীগণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ও অনুকম্পায় পূর্ব থেকেই অধিকতর সুবিধা ভোগ করে এসেছেন এই আইনে তাঁদের উত্তরসূরীদের জন্যও সুযোগ সুবিধাসমূহের স্থায়ী বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে ।

৯০বি (১)এ(ii) নং উপধারা অনুসারে কোনো একটি দল ৮টি নির্বাচনের যে কোনো একটিতে অন্তত একটি আসনে নির্বাচন করেও যদি ৫% ভোট লাভে সমর্থ হয়ে থাকে তাহলে এটি নিবন্ধন লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে এবং তাতে মাত্র ১/২ হাজার ভোট প্রাপ্তিও নিবন্ধনের যোগ্যতা লাভের জন্য যথেষ্ট হতে পারে । উল্লেখ থাকে যে, নতুন গড়ে উঠা দলগুলোর ক্ষেত্রে ৯০বি(১)এ(i) ও (ii) নং উপধারার সুবিধা প্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই।

৯০বি(১)এ(iii) নং উপধারার শর্ত পূরণ করতে হলে অফিস সহ ২২টি জেলা কমিটি এবং ১০০টি থানা কমিটি পরিচালনা করতে যে পরিমাণ ( মাসে কমপক্ষে ১৫/২০ লক্ষ টাকা )অর্থের প্রয়োজন হয় নতুন দলগুলো তা মেটাতে গেলে দল পরিচালনাকারী নেতৃবৃন্দকে অঢেল ধন সম্পদের মালিক হতে হবে যা বৈধ উপায়ে অর্জিত না হওয়াটাই স্বাভাবিক । অতীতে কোনো এক নির্বাচনে কোনো এক দলকে ১/২ হাজার মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে (অপ্রকাশ্যে) সমর্থন দিয়েছিল, বর্তমানে দলটির সারাদেশে দু’চারশ সদস্য/সমর্থক (প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্য) থাকুক বা না থাকুক, সারাদেশে অফিস দু’চারটা থাকুক বা না থাকুক দলটি নিবন্ধন লাভের যোগ্য হয়ে গেল । অথচ নতুন করে দল নিবন্ধন পেতে গেলে অফিস ও কমিটি চালাতে হবে কমপক্ষে ১২৩টি এবং লিখিত/ প্রকাশ্য সম্মতিসহ নিবন্ধিত ভোটার সদস্য লাগবে কমপক্ষে ২০,০০০ (১০০ থানা/উপজেলা X২০০ সদস্য) জন ।

রাজনৈতিক দলের সকল স্তরের কমিটিতে ৩৩% নারী সদস্য অন্তর্ভূক্তির বাধ্যবাধকতা প্রয়োগের দুঃসাহস যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ গণতান্ত্রিক বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র কিংবা উন্নত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রও আজ পর্যন্ত দেখাতে পেরেছে বলে আমাদের জানা নেই । এমনকি এই শর্ত পূরণের মুচলেকা দিয়ে নিবন্ধন পাওয়া আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ কোনো দলই আজ অবধি (প্রায় ১০ বছরে) টার্গেট পূরণের ধারে কাছে পৌঁছূতে পারেনি । কাজেই এ আইন ধরে রাখা কার স্বার্থে ?

প্রিয় পাঠক, আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, কোনো নিবন্ধন ছাড়াই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, বিএনপিও একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে, জাতীয় পার্টিও দেশ চালিয়েছে।  সরকার কর্তৃক এ আইনটিকে বাতিল করে দেবে এটাই ছিল রাজনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক জনগণের প্রত্যাশা ।

এ আইনের শর্ত মেনে ও পূরণ করে যেসব দল ডিসেম্বর, ২০১৭ সালে নিবন্ধন লাভের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এদের অনেকের মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ । নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এমনভাবেই তদন্ত কাজ চালাচ্ছে যাতে করে সংশ্লিষ্ট দলের কর্মীরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে নিজের অবস্থান অস্বীকার করতে বাধ্য হয়।অতএব, দারিদ্রপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত গণমানুষের কোনো সংগঠন গড়ে উঠতে পারবে না ।

এবার রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা নিয়েও একটু আলোচনা করা দরকার বলে মনে করি । দেশের মালিক হিসাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। কাজেই কোনো রাজনৈতিক দল  গঠন ও পরিচালনা করতে নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে না । কিন্তু রাষ্ট্র শাসনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে চাইলে অর্থাৎ নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণ করতে চাইলে দলের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী প্রতীক সংরক্ষণ করা, একই নামে একাধিক রাজনৈতিক দল যাতে গড়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা এবং কোনো দল যাতে কোনোরূপ বেআইনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে তা নিশ্চিত করা  প্রভৃতি লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমরা মনে করি । আবার যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায় পর্যন্ত দল বা দলীয় প্রতীক ভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং সারা বছর ব্যাপী বিভিন্ন নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হতে থাকে সেহেতু ৫ বছর পর পর কিংবা শুধুমাত্র নির্বাচনের প্রাক্কালে দল নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকার কোন যুক্তি নেই ।

কাজেই সংসদের চলতি অধিবেশনেই ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের কিছু ধারাসমূহ বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানের নিবন্ধন আইনের অনুরূপ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় অফিস এবং দলীয় গঠণতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে দলসমূহের নিবন্ধনের বিধান চালু করা হোক এবং নিবন্ধন ব্যবস্থা শুধুমাত্র জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নয় বরং সারা বছর চালু রাখা হোক ।

আবদুল মোনেম: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি।

 

আপনার মতামত লিখুন :