Barta24

শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

English

অথঃ ভাঁড় সমাচার!

অথঃ ভাঁড় সমাচার!
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

গোপাল ভাঁড়, বীরবল, মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জা কিংবা দোঁ-পেয়াজির নাম শুনলেই সবার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসির দেখা পাওয়া যায়। বুদ্ধিদীপ্ত কথা ও কৌশল দিয়ে ভাঁড়েরা কর্তা ও কর্তৃপক্ষের মনোরঞ্জন করতেন। রস-রসিকতা, নির্মল হাসি ও উপদেশমূলক কাহিনীর মধ্যে তারা ইতিহাসের পরম্পরায় এখনও অব্দি জীবন্ত রয়েছেন। হাসি-ঠাট্টা-কৌতুকের ভেতর দিয়ে ভাঁড়গণ ব্যক্তিগত দক্ষতা ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটিয়ে ছিলেন; তৈল মর্দন করে চাটুকারিতা করেন নি।

বিশেষ করে মধ্যযুগের ইতিহাসে সমাজ ও রাজদরবারে ভাঁড়দের আনাগোনার কথা উল্লেখযোগ্যভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্রাচীন আমলে ভাঁড় ছিল না, এমন নয়। হয়ত ছিল। অন্য নামে। যেমন, আজকের অতি আধুনিক ও অগ্রসর কালেও ভাঁড়ের দেখা পাওয়া যায়। যদিও একালের ভাঁড়গণ নিজেদের আজকাল ভাঁড় বলতে নারাজ। কিংবা তারা ভাঁড়ের আসল পরিচয় অন্য পরিচয়ের আলখাল্লা দিয়ে আড়াল করে চলতে অভ্যস্ত। তথাপি ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়’-এর মতো বর্তমান সমাজে ক্রিয়াশীল ও বিদ্যমান ভাঁড়-পদবাচ্যদের কাজ-কারবার দেখে ও কথা-বার্তা শুনে দিব্যি চিনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে নামে-বেনামে-পদে-পদবিতে ঘুরে বেড়ালেও মানুষ যথারীতি তাকে শনাক্ত করে বলে দিচ্ছে, ‘আরে! ও তো আস্ত একটি ভাঁড়’।

হাল-আমলে অবশ্য আরেকটি সমস্যা হয়েছে। সমাজ ও মানুষের ধারাবাহিক অগ্রগতি ও উৎকর্ষতার সুবাদে প্রাচীন ভাঁড়ের বিশুদ্ধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নির্মম আনন্দদানকারীর সংখ্যা কমে গিয়ে বাড়ছে ধান্ধাবাজ তৈলমর্দনকারীর। ক্ষমতার পদপৃষ্ঠে সাষ্টাঙ্গে লেপ্টে থেকে এই শ্রেণি আকছার তেল দিয়ে নিজের সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে। চারিত্রিক দিক দিয়ে প্রাচীন ভাঁড়গণ কিন্তু এতটা নিম্নস্তরের ছিলেন না।

সে যাই হোক, মধ্যযুগে ভাঁড়দের উত্থানকালের ইতিহাসের নিরিখে জানা যায় যে, শুধু রাজসভায় নয়, রাণী এবং রাজকন্যারাও নিজস্ব বিনোদনের জন্য মহিলা ভাঁড় পুষতেন। গবেষকরা এ-ও জানাচ্ছেন যে, ইতিহাসের নানা সময়ে রকমফের অনুযায়ী ভাঁড়দের দশটি ভাগ ছিল। কাজের তারতম্যের ভিত্তিতে এমন ভাগ করা হলেও সকল ভাঁড়ের প্রধান ও একমাত্র কাজ ছিল হাসি-আনন্দের সঞ্চার করা। বলাই বাহুল্য, সে আমলে বিনোদনের যান্ত্রিক ও অত্যাধুনিক মাধ্যমের উদ্ভব না হওয়ায় রাজা-বাদশাহরা শিকার, মল্লযুদ্ধ, ভাঁড়ের কৌতুকের মাধ্যমে বিনোদিত হতেন।

ভাঁড় প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংস্কৃত সাহিত্যে একটি চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়, যার নাম ‘বিদূষক’। ভাঁড়দের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যই এদের মধ্যে দেখা যায়। নাট্যশাস্ত্রেও বিদূষকদের কথা আছে। তাতে চার রকমের বিদূষকের উল্লেখ রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েকজন ভাঁড় ঐতিহাসিক চরিত্রের গুরুত্ব পেয়েছেন। এদের একজন বীরবল। বীরবল কেবল ভাঁড় বা রসিকই ছিলেন না, ছিলেন সম্রাট আকবরের বিশ্বস্ত সেনাপতিও। ছিলেন আকবরের পরামর্শদাতা ও বন্ধু। অনেকগুলো মুঘল চিত্রকলায় আকবরের পাশেই বীরবলের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি রাজদরবারে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। তদুপরি আবুল ফজল এবং আবদুল কাদির বাদাউনির লেখা থেকেও বীরবল সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে, ভাঁড় বা বিদূষক হলেও বীরবল মোটেও উপেক্ষিত বা হাস্যস্পদ ছিলেন না।

কম আলোচিত হলেও দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা কৃষ্ণদেবরায়ের দরবারে ভেঙ্কটরাও তেনালিরাম নামের একজন ভাঁড়ের কথা ইতিহাসে রয়েছে, যিনি তেলেগু ভাষার বিখ্যাত কবি ছিলেন। সমাজ ও ইতিহাসে রসিকতার মধ্যে দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা ও শিক্ষণীয় বিষয় তিনি উপহার দিয়েছেন। সস্তা কৌতুল বা তেল-মারা দিয়ে তিনি ইতিহাসের স্থান পান নি; পেয়েছেন গঠনমূলক কাজ ও বক্তব্যের মাধ্যমে।

একই কথা পৃথিবীর নামজাদা ভাঁড়দের সম্পর্কে বলা যায়। যারা তাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে হাসির খোরাক যেমন দিয়েছেন, সঠিক পথ ও নীতির দিশাও দিয়েছেন। তুর্কিস্থানের মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জা কিংবা অখণ্ড বাংলার গোপাল ভাঁড়ের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

বিশেষ করে বাংলার কৃষ্ণনগর রাজদরবারের গোপাল ছোট-বড় সকলের প্রিয় ছিলেন। রাজা থেকে প্রজা, সবাইকেই হাসাতে পারঙ্গম ছিলেন তিনি। তার বুদ্ধির দীপ্তি ও আচরণের চমৎকারিত্বে মোহিত হয়েছিল সবাই।

কিন্তু এই গোপাল আসলে ছিলেন নাকি কাল্পনিক চরিত্র তা নিয়ে ধন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, গোপাল আসলে নাপিত বা নরসুন্দর জাতির মানুষ। নিজের বুদ্ধিমত্তায় রাজাকে আমোদিত করে তিনি রাজদরবারে ঠাঁই পেয়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণনগর রাজদরবারের রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তার রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘অন্নদামঙ্গল'-এ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সকল বিদগ্ধজনের কথা লিখেছেন। কিন্তু গোপাল বলে কোনও ভাঁড়ের উল্লেখ সেখানে নেই। তথাপি লোকমুখে প্রচলিত রস-উদ্দীপক গল্পকথায় গোপাল ভাঁড় আজও জীবন্ত চরিত্র হয়ে আছেন।

গোপাল ভাঁড়, বীরবল, মোল্লা দোঁ-পিয়াজি, মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জা, গণু ঝা, খত্তর কাকা, তেনালিরাম, শেখ চিল্লি, বব্বন হাজ্জাম ইত্যাদি অনেক নামজাদা ভাঁড়ের নাম ইতিহাসের বইপত্রে এবং লোককথায় ছড়িয়ে রয়েছে, যারা তাদের হাস্যরস, কৌতুক, চাতুর্য্য দিয়ে তাদের সমকালের মানুষদের মাতিয়ে ছিলেন। বিশ্বখ্যাত বহু রাজা-বাদশাহ ও রাজবংশের ইতিহাসের পাশাপাশি স্বীয় কর্ম, মেধা ও যোগ্যতায় এইসব ভাঁড় বা বিদূষকরাও ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়েছেন। নিজেদের নাম ও কীর্তি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন ইতিহাসের পাতায় এবং লোকশ্রুতিতে।

ভাঁড় সম্পর্কে এই সামান্য তথ্যই যথেষ্ট নয়। আরও বিষদে যারা জানতে চান, তারা সাম্পান চক্রবর্তী নামক এক গবেষকের ‘লোকজীবন ও অবসরের ভাঁড়’ নামক গ্রন্থটি পড়তে পারেন, যেটি প্রকাশ করেছে কলকাতার অভিযান পাবলিশার্স।

এই তো গেলো প্রাচীন ও সমৃদ্ধ এতিহ্যের অধিকারী অভিজাত ভাঁড়দের কথা। কিন্তু একালের ভাঁড় বা বিদূষকদের কথা কে জানবে বা মনে রাখবে? আত্মস্বার্থে প্রভুর শরীরে তৈলমর্দন ও পদলেহন করে করে তারা যে বিলীন হয়ে গেছেন। ভাঁড় নামক লোকপ্রিয় একটি পেশার ঐতিহ্য ধরে রাখার যোগ্যতাও একালের ভাঁড়গণ দেখাতে পারেন নি। আজকের এহেন চাটুকার ও অযোগ্যরা হয়ে আছেন ভাঁড় নামধারী রসময় ঐতিহাসিক শ্রেণিটির কলঙ্কস্বরূপ।

আপনার মতামত লিখুন :

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশের রাজনীতির দুটি ধারা- আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার আগে এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব ছিল মুসলিম লীগের হাতে, স্বাধীনতার পর এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব হাতে তুলে নেয় জাসদ। আর ৭৫এর পর থেকে এই ধারাটির নেতৃত্ব বিএনপির হাতে। রাজনীতিতে দুটি ধারা থাকা অস্বাভাবিক বা অভূতপূর্ব নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজনীতির একাধিক ধারা রয়েছে। তবে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও সব দেশেই দুই ধারার রাজনীতির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, স্বাভাবিক সৌজন্য, ক্ষমতার পালাবদল ইত্যাদি থাকে। আমাদের দেশেও ছিল, এখন আর নেই। নেই কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই আজকের লেখা।

বাংলাদেশের রাজনীতির সকল বিভক্তি আগস্টে। বিভক্তি রেখা দুটি- ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট। আগস্ট মানেই যেন শোক আর বেদনা। ৭৫এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকরা তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মিশনে নেমেছিল। নেতারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পেরেছেন। তবে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মারা গেছেন নির্মম এই গ্রেনেড হামলায়। আগস্টের এই দুই নির্মম তারিখ আমাদের রাজনীতিতে স্থায়ী বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে। যদিও ১৫ আগস্টের দায় চাইলে বিএনপি এড়াতে পারতো। কারণ ৭৫এর ১৫ আগস্ট বিএনপির জন্ম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের মূল বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমানই বটে, তবুও বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। কর্নেল ফারুক ৭৫এ একবার উপসেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথা বলেছিলেন। জিয়া তাকে, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা কিছু করো, জাতীয় হালকা উস্তানি দিয়ে বিদায় করেছিলেন এবং সতর্ক জিয়া পরে আর ফারুক গংকে অ্যালাউ করেননি। জিয়াউর রহমান চাইলে জুনিয়র অফিসারদের অসন্তোষের কথা সিনিয়রদের জানাতে পারতেন। তা না করে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। সুযোগটা তিনি পেয়েও গেলেন। নানা ঘটনার পর ৭৫এর ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান।

১৫ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর শুনে শেভ করতে করতে নির্বিকার কণ্ঠে জিয়া বলোছিলেন, 'সো হোয়াট। ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। আপহোল্ড দ্যা কনস্টিটিউশন।' জিয়ার প্রতিপক্ষের লোকজন বলেন, রাষ্ট্রপতির হত্যার খবর শুনে উপসেনা প্রধান হিসেবে তার যা দায়িত্ব ছিল তা পালন করেননি। অন্য সবাই যখন খবর শুনে রাতের পোশাকে সেনা সদরে গেছেন। জিয়াউর রহমান তখন শেভ করে, চালক নিয়ে ইউনিফর্ম পড়ে গেছেন। তার মানে তিনি ঘটনা জানতেন এবং অপেক্ষা করছিলেন। আর জিয়ার পক্ষের লোকজনের যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন; ক্যু বা বিশৃঙ্খলা নয়। আর সেনা প্রধান থেকে শুরু করে সবাই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন উপসেনা প্রধান কী করবেন। আর পেশাদার সৈনিক হিসেবে দ্রুত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে তৈরি করে ফেলাটা তো কৃতিত্বের। ১৫ আগস্টে জিয়াউর রহমানের যেটুকু ভূমিকা বা অবস্থান; চাইলে তিনি সেটা এড়াতে পারতেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের খুনীদের পুনর্বাসন করে, চাকরি দিয়ে, খন্দকার মোশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে জিয়াউর রহমান বুঝিয়ে দিলেন; পরিস্থিতি যাই হোক, ১৫ আগস্টই বিএনপির রাজনৈতিক জন্ম। জিয়াউর রহমান যাই হোক, চাইলে বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টের দায় এড়াতে পারতেন, রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গা ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা তো করেনইনি, উল্টো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৫ আগস্ট জন্মদিন আবিষ্কার ও ঘটা করে পালন করে বুঝিয়ে দিলেন ১৫ আগস্টই তার এবং তার দলের রাজনৈতিক জন্ম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার পুরো বিচার প্রক্রিয়া ডিপ ফ্রিজে পাঠিয়ে দেয়। ১৫ আগস্টের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকলেও জিয়া, খালেদা, বিএনপি বারবার নানাভাবে সে দায় নিজেদের কাঁধে টেনে নিয়েছে, যা আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক দূরত্ব আরো বাড়িয়েছে শুধু। তারপরও ১৫ আগস্টের বিভক্তি রেখাটা অলঙ্ঘনীয় ছিল না।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্থায়ী ও অলঙ্ঘনীয় বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে ২১ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সবকিছুরই একটা নিয়ম থাকে। কিন্তু ২১ আগস্ট রাজনীতির সকল নিয়ম কানুন ভুলুণ্ঠিত করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্টের নির্মমতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকে বারবার তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। ১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে অন্য সব হত্যাচেষ্টার সাথে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার একটা পার্থক্য রয়েছে। ২১ আগস্টের চেষ্টাটি ছিল বেপরোয়া, মরিয়া, নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরোধী দলীয় হত্যার চেষ্টা নজিরবিহীন। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো হত্যা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ২১ আগস্ট হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল তখনকার বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হাওয়া ভবনে এবং মূল পরিকল্পনাটা ছিল তখনকার প্রধানমন্ত্রীপুত্র তারেক রহমানের। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও, এসব এখন আদালতে প্রমাণিত সত্য।

আমরা রাজনীতিতে সমঝোতার কথা বলি, আলোচনার কথা বলি। কিন্তু যখন জানি, শেখ হাসিনাকে মারতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন তারেক রহমানও, তখন বুঝি কাজটা কত কঠিন। ১৫ আগস্ট যে বিভক্তির শুরু, ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির সেই বিভক্তিকে যেন স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এই গত ১১ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, তার উৎসও কিন্তু ২১ আগস্ট। আপনি যথন রাজনীতির নিয়ম ভাঙবেন, তখন আপনিও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিয়ম আশা করতে পারবেন না। জানি প্রায় অসম্ভব, তবু চাই রাজনীতিটা আবার নিয়মে ফিরুক। প্রতিহিংসার জবাব প্রতিহিংসায় না হোক। রাজনীতির লড়াইটা, বিভেদটা হোক আদর্শের।

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় তারা ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনারকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত তাদের সকল কূটনীতিককে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর বাইরে তারা ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোকে স্থগিত করেছে।

আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় তারা বিষয়টিকে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এখানে সঙ্গত কারণেই বলে রাখা ভাল যে, পাকিস্তানের তরফ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে জেনেই কিন্তু ভারত অনেক ভেবেচিন্তে কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি এখন একদিকে যেমন ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে বড় বাধা বিবেচনায় একটি আন্তর্জাতিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার বিবেচনায় এমনটা আশা করার সুযোগ নেই যে ভারতের ওপর কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হতে পারে।

আইনগতভাবে কাশ্মীর এখন আর রাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি বিশেষ অঞ্চল। ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র- এই তিনটি বিষয় বাদে বাদবাকি সকল বিষয়ে কাশ্মীরের সরকারকে দেওয়া সকল ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেল গত ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের এক স্বাক্ষরে। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানের একটি বিশেষ ধারা কীভাবে কেবল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে বাতিল হয়ে গেল। এর উত্তর হচ্ছে যখন এই বিশেষ ধারাটি সংযোজন করা হয় তখনই এর সঙ্গে এটিকে একটি অস্থায়ী প্রভিশন হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রপতি যখনই চাইবেন তখনই তা বিলুপ্ত করতে পারবেন বলে শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ৬৯ বছর পর রাষ্ট্রপতি তা বাতিল করলেন মাত্র। তবে বিষয়টিকে যেভাবে সরল অংকের মতো করে বর্ণনা করা হল, বাস্তবে এটি এমন সরল ছিল না কখনো। বিগত প্রায় ৭০ বছর এমনকি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ভারতের কোনো সরকার কখনো কাশ্মীরকে একীভূত করাতো দূরে থাক সেখানকার স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল জনদাবি সামাল দিতেই সবসময় ব্যস্ত সময় অতিক্রম করেছে।

বিজেপি তথা ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং এর পরবর্তী দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়টি অনুমান করা কঠিন নয় যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। সেই সঙ্গে বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আগের চাইতেও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের বিষয়টি এখন অনেকটা স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিল যে জয়লাভ করে আবার সরকার গঠন করতে পারলে তারা বিতর্কিত ৩৭০ ধারা অবলুপ্তি করবে। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ৩৭০ ধারাটি এখানে ভারতে রাজনীতিবিদদের অনেকের কাছেই ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত। এর সঙ্গে ৩৫ উপধারার সন্নিবেশের মধ্য দিয়ে অপরাপর রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে যা নেই কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এসবের সন্নিবেশন, যেমন আলাদা পতাকা, নিজস্ব আইন, অপরাপর অঞ্চলের অধিবাসীদের সেখানে স্থায়ী বাসিন্দা হবার ক্ষেত্রে বাধা, চাকরির ক্ষেত্রে অন্যান্যদের প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাকার সকল বিষয় আসলে কাশ্মীরকে সকলের কাছেই চক্ষুশূল করে রেখেছিল। তবে দিন দিন ধরে বিষয়টি এভাবে চলতে থাকা এবং কাশ্মীর নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিদ্ধান্তহীনতা বিষয়টিকে এমন এক জটিলতার আবর্তে বন্দি করে রেখেছে যে এটা নিয়ে সহজে কোন যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান পাওয়া দুরূহ।

এ কথা ঠিক যে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কাশ্মীরের মুক্তিকামী মানুষের জন্য বুমেরাং হবে এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে, একই সঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে অর্থাৎ এই বিশেষ মর্যাদার সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে কাশ্মীর, সেটাকেও কি একেবারে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। আবার এই প্রশ্নও এসে যায়, এই ব্যর্থতার আসল কারণগুলো কি? এসব কিছুর মূলে ভারত সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ, মহারাজা হরি সিং এর সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন না করা ইত্যাকার বিষয় এবং পরবর্তীতে এসবের মধ্যে পাকিস্তানের ঢুকে পড়া, কাশ্মীর নিয়ে ভরত এবং পাকিস্তানের মধ্যে দুবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এর বাইরেও বিভিন্ন সময় ছোটখাট সংঘাত- এই সব কিছু মিলে জল এতটা ঘোলা হয়েছে যে দিন যতই গেছে, পরিস্থিতি ততই জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি হতে পারত সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান? এক্ষেত্রে এতসব ঘটনার ব্যাপকতায় এমন কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান কেউ দিতে পারেননি।

ইতিহাসবিদ ড: কিংশুক চ্যাটার্জি বলছেন, 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ঠিকই,কিন্তু যে শর্তে হয়েছিল কালক্রমে ভারত তা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও কতকটা জোর করেই এই অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে সাতচল্লিশে এই সমস্যার শুরু হলেও এখন সেই সমস্যা অনেক বেশি জটিল আকার নিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'এখন কাশ্মীর সমস্যার এমন কোনো পর্ব নেই যেখানে ফিরে গিয়ে আমরা বলতে পারি এখান থেকে সমস্যাটা আবার 'রিসেট' করা যাক! আজ যদি কাশ্মীরে গণভোট হয় কিংবা পাকিস্তান তাদের দিকের কাশ্মীর থেকে সরে যায় - তাতে কোনও সমস্যার আদৌ সমাধান হবে বলে মনে হয় না।'

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার জন্য কাশ্মীরের শেষ যুবরাজ করণ সিং অনেকটাই দোষ চাপিয়েছেন ভারত সরকারের ওপর। তার মতে, 'যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ২৭ অক্টোবর তারিখে সেদিন আমি নিজেও ওই ঘরে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মহারাজা হরি সিং কিন্তু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্ক - শুধু এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন,নিজের রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে দেননি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।'

সঙ্গত কারণেই ভারতের এই হঠাৎ আচরণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতাশ করলেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে লক্ষ্য করলে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে কি খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক বলার সুযোগ রয়েছে? বিশেষ মর্যাদার নামে কাশ্মীরে যে ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং এর থেকে প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে এই সবকিছুই কিন্তু দিনে দিনে ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কাশ্মীরের এই অচলাবস্থার পথ ধরে ভারতের অপরাপর অঞ্চলগুলোতেও অস্থিরতার বিস্তার যেন রোধ করা যায় সেসব বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির এই পদক্ষেপ। এখানে এটাও সত্য হিসেবে মানতে হবে যে এই পদক্ষেপ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে সত্যিকার অর্থে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যদি জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে যথার্থভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হন তবে যেমন ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, আবার অন্যদিকে কাশ্মীরের জনরোষ এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি যদি নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয় তবে তা একপর্যায়ে বড় ধরণের সংঘাত এমনকি পাক ভারত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। শুরু হয়ে যেতে পারে আরেকটি বড় যুদ্ধ, যার ভয়াবহতা অতীতের যে কোন সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে। আর এমনটা হলে এর সকল দায়ভারও কিন্তু মোদির ঘাড়েই পড়বে।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র