শিশুদের ওপর স্কুলব্যাগের নিপীড়ন বন্ধ হবে কবে?

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

শিশুকে মানবিকতা ও নৈতিকতার পূর্ণ শিক্ষা না দিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে লেখাপড়ার নামে আদেশের বোঝা। তারা হয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক। বর্তমানে প্রথমসারির স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দেখে মনে হয়, যেন তারা বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে। শহুরে শিশুদের কাছে বৃষ্টির দিনে ফুটবল খেলা, উন্মুক্ত আকাশে ঘুড়ি ওড়ানো-এখন রপকথার গল্পই মনে হয়। আজকাল শিশুদের জীবন কোচিং সেন্টার, হাউস টিউটর ও কম্পিউটার গেমের বৃত্তে বন্দি।

কিন্তু বেশিদিন আগের কথা নয়, খেলাঘর, কঁচিকাঁচার আসরের মতো সংগঠনগুলো শিশুদের কাকলিতে মুখরিত থাকত। পাড়া-মহল্লায় বিজয়-দিবস, স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে হতো নানা ধরনের শিশুতোষ প্রতিযোগিতার আয়োজন। যার মাধ্যমে একটি শিশু অর্জন করতো সামাজিক ও মানবিক দক্ষতা।

তাই শিশুদের বইয়ের বোঝা থেকে মুক্তি দিয়ে আনন্দপূর্ণ শিক্ষা জীবন দিতে হবে। এ জন্য সর্বপ্রথম অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। অভিভাবকরা যেন তাদের সন্তানকে গ্রন্থকীট হিসেবে গড়ে না তোলেন, মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে, এটিও ঠিক যে, অভিভাবকরা সমাজেরই অংশ। সমাজ যা চায়, অভিভাবকরা তাই করেন। সমাজ চায় কোন ছেলের সার্টিফিকেট কত বড়, কোন শিক্ষার্থী কোন গ্রেড পেয়েছে। কোথাও ভর্তি হতে যাবেন সেখানে দেখা হয় আগের ক্লাসে কিংবা আগের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কী ফল লাভ করেছে। সেই অনুযায়ী ভর্তি। তাইতো অভিভাবকরা ছুটছেন সেই ভালো ফল করা নামক জাদুর পেছনে। আর সেটি করতে গিয়ে তার শিশুর শৈশবকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে। শিশুর আনন্দকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও যেন হুশ হচ্ছে না। সবাই সেই অস্বাভাবিকতার পেছনেই ছুটছে।

অনেক স্কুলে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। ফলে শিশুদের পানি বহন করতে হয়। এসব কারণেও তাদের ব্যাগ ভারী হয়। আমরা অনেকেই ছোটবেলায় স্কুলে এবং বড় হয়ে কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও বই বহন করতাম না। শিক্ষাব্যবস্থা এখন বহুমাত্রিক। প্রাইমারী শিক্ষায় বেহালের কারণে কিন্ডারগার্টেন, ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা কিন্ডারগার্টেন চালু হয়েছে। এখানকার শিক্ষকদের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিদ্যমান এই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলব্যাগের নিপীড়ন চলছে। আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুরা পড়ে মাত্র তিনটি বিষয়, পঞ্চম শ্রেণিতে ছয়টি। সেই শিশু ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে ১৩টি বিষয়। এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত সাতটি বিষয় পড়ানোর যৌক্তিকতা আছে কি? কোনো কোনো বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতেই দ্বিগুণ-তিনগন বই পড়ানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কমিশন পাওয়ার আশায় নতুন বই পাঠ্য করে। সেগুলো যদি শিশুবান্ধব হতো তাহলে কথা ছিল না। কিন্তু শুধু মুখস্থ করা আর কঠিন কঠিন এক্সারসাইজে ঠাসা এ বইগুলো আত্মস্থ করতে যথেষ্ট শারীরিক ও মানসিক চাপ সহ্য করতে হয় শিশুদের।

শিশুদের মন আমরা পরীক্ষা ভীতি দিয়ে আক্রান্ত করে ফেলেছি। বাসায় টিউটরের কাছে পরীক্ষা, টিউটরের বাসায় পরীক্ষা, কোচিংএ পরীক্ষা, স্কুলের ক্লাসে পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা। পরীক্ষাময় তাদের জীবন। এই পরীক্ষা যেন তাদের জীবনের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। কি হয় এই পরীক্ষা দিয়ে? আমরা কি তাদের যোগ্যতা যাচাই করছি? শিশুদের যোগ্যতা যাচাই কি এই ট্রাডিশনাল পরীক্ষার মাধ্যমে হয়?

আমরা অনেক গবেষণা করি, গবেষণার ফল ফলাও করে প্রচার করি, মহাসমারোহে এগুলো উপস্থাপন করি কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে কি গবেষণা করা দরকার নয় য়ে, শিশুদের ট্রাডিশনাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা না নিয়েও তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যে হচ্ছে তার পরিমাপ করা যায়। সেটি করতে হবে অনেকটাই সহজভাবে যাতে তারা টেরও না পায়। এই পদ্ধতিকে জনপ্রিয় এবং সবার জন্য, অভিভাবকদের জন্য, সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন গবেষণার।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বহর বিশাল কিন্তু এগুলো নিয়ে আদৌ কোনো চিন্তা আছে কিনা তা টের পাই না। সরকার একটি কারণ দেখিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা চালু করেছে, যুক্তি আছে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যেভাবে বলেছেন। কিন্তু গবেষকদের দেখাতে হবে যে, এই পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।

পরীক্ষাভীতি থেকে শিশুদের দূরে রেখে প্রাথমিক শিক্ষাকে পরীক্ষামুক্ত রাখতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার দরকার।এইসব পরীক্ষার জন্য তাদের পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হয় বই খাতার-বোঝা যা অযৌক্তিক ও আমানবিক। শুধু শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়নই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের পড়াশুনা শ্রেণিকক্ষেই থাকবে, বাকী সময়টা তারা আনন্দে কাটাবে, সামাজিক দক্ষতাগুলো অর্জন করবে।

আমরা জানি ডেনমার্কের স্কুলে বই দিয়ে লেখাপড়া করানো হয় না। সিঙ্গাপুরের ছেলেমেয়েরা আইপ্যাড দিয়ে পড়াশুনা করে। মালয়েশিয়ার স্মার্ট স্কুলগুলোতে কাগজের কোনো বই নেই। ব্রিটেনের ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ট্যাব দিয়ে পড়াশুনা করে। মালয়েশিয়ার স্কুলগুলোর নামই হয়ে গেছে স্মার্টস্কুল। এগুলো আমাদের সামনে উদাহরণ। তবে, অন্য একটি দেশে কি হচ্ছে সেটি যে হুবহু আমাদের দেশে চালু করতে হবে আমি সেটির পক্ষে নই। আমার সাথে নিশ্চয়ই অনেক শিক্ষাবিদও একমত হবেন।

আমাদের অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক অবস্থানের কথা বিবেচনায় রেখে শিশুদের জন্য বই-পুস্তক তৈরি করা প্রয়োজন। সেটি যে একেবারে হচ্ছে না তাও নয়। তবে, এক্ষেত্রে নিরন্তর গবেষণার প্রয়োজন। প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত বাসা হবে শিশুর খেলার স্থান। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হালকা থেকে মাঝারি বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করে শ্রেণিকক্ষেই পাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। এ সময় শিশু যাতে ভাবতে পারে সেই ভাবার সময় তাকে দিতে হবে। শিশুর চিন্তাশক্তি যাতে বৃদ্ধি পায়, তার কল্পনার জগত যাতে আরও বিস্তৃত হয় সে ধরনের শিখন-শেখানো ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের সব বিষয়ে না পড়িয়ে মৌলিক বিষয়ে পড়ানোর কথা ভাবতে হবে।

শিক্ষার নামে কোমলমতি শিশুদের অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা যেমন অমানবিক তেমনি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পড়ার চাপে তারা সব সময় পেরেশান। শৈশবের সুন্দর সময় থেকে তারা বঞ্চিত। শিশুদের আনন্দময় শৈশব, নির্মল পরিবেশে প্রকৃত শিক্ষা বিস্তারে আন্তরিক হতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী ব্যাগ বহন করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন আদালত কয়েক বছর আগেই। রায়ের কপি পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আইন করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।শুধু বইয়ে মুখ গুজে নয়, হাসি-আনন্দ খেলার ভেতর দিয়ে বিকশিত হবে শিশুরা। বাড়তি বই, ক্লাসে বাড়তি সময় উপস্থিতি ও বাড়িতে কিংবা ব্যাচে টিউশন করতে গিয়ে কত শিশু যে শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই।

শিশুকে যেন বাড়িতে বইয়ের বোঝা বইতে না হয় এর আগে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে একটি পরিপত্রও জারি করা হয় ২০১৪ সালে। যেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, শিশুরা যে ব্যাগ বহন করে তার ওজন শিক্ষার্থীর ওজনের এক দশমাংশের বেশি যাতে না হয়।

‘যত বই তত ভাল লেখাপড়া’- এই ধারণ থেকে আমাদের বেড়িয়ে আসতে হবে। এই ভয়ংকর প্রবণতা শিশুদের ভবিষ্যত ধবংস করে দিচ্ছে। যে বয়সে খেলার ভেতর দিয়ে শিক্ষার আনন্দদায়ক পাঠ নেয়ার কথা, সে বয়সে একটি শিশুকে টানতে হয় বই-খাতার বোঝা। চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে, এতে তারা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়। লেখাপড়ার চাপ শৈশবের প্রারম্ভেই তার মনোজগতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তাতে তার ভবিষ্যতের শিক্ষাও বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা থাকে। বিষয়টি নিয়ে অনেক লেখালেখি, অনেক কথাবার্ত হচ্ছে কিন্তু পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বড় দায়িত্বটি সরকারকেই নিতে হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এসব বিষয়ে নতুন নতুন সেল বা ইউনিট গঠন করতে হবে। পরিচিত অনেকে আমাকে প্রশ্ন করতেন আপনার বাচ্চা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন কেন।আমার বাচ্চা যখন প্রাইমারিতে ভর্তি হবে তখন দেখতাম পরিচিতজনেরা তাদের বাচ্চাদের ভর্তি করানোর জন্য বিভিন্ন কোচিংএ, টিচারের বাসায় ছুটাছুটি করছেন। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে প্রশ্নগুলো এমন থাকত- ‘উগান্ডার মুদ্রার নাম কি? ব্রাজিলের রাজধানীর নাম কি ইত্যাদি। বাচ্চারা এগুলো জেনে শিশুশ্রেণিতে ভর্তি হবে তা আমার পছন্দ ছিল না। দ্বিতীয়ত এগুলো জেনেও যে বাচ্চারা তথাকথিত নামকরা স্কুলে ভর্তি হতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। কারণ কমিটিকে নাকি মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়, তবে ভর্তি অনেকটা নিশ্চিত। এই ভয়ংকর ঘটনা শোনার পর আমি বাচ্চাকে নিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গেলাম। অধ্যক্ষ মহোদয়া শুধু মুখে দুএকটা প্রশ্ন করে বাচ্চাকে ভর্তি করলেন। আমার বাচ্চা এভাবে ভর্তি পরীক্ষা নামক দানবের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল। কেন বাচ্চাকে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করেছিলাম তার উত্তর এটাই। বাচ্চা বাসার কাছে যে বিদ্যালয় তার ভাল লাগবে সেখানে সে ভর্তি হবে। এটিই হোক নিয়ম। আর বইয়ের বোঝার পরিবর্তে সে যেন তার বয়স অনুপাতে হালকা শিখন-সামগ্রী বহন করে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

ভালো নেই সবুজ পৃথিবী!

আমেরিকার নামজাদা স্ট্যানফোর্ড স্কলার ইয়োশিহিরো ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা নানা কারণে বিখ্যাত। সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞা...