নির্বাচনে বিএনপির আসা-না আসা ও আমাদের ভোটাধিকার

চিররঞ্জন সরকার
চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামী ২৩ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচন। ইতিমধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক ময়দান ব্যাপক সরগরম হয়ে উঠেছে। মুখে গাই-গুঁই করলেও দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্তের কথা এখনও প্রকাশ্যে বলেনি।

এবার অবশ্য বিএনপির নির্বাচন বর্জনের সুযোগ খুব একটা নেই। বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়। বিএনপিকে নির্বাচন করেই ক্ষমতায় যাওয়ার কথা ভাবতে হবে। নির্বাচনে না গেলে বিএনপির যেসব প্রার্থী নির্বাচনে যেতে চান, তারা মনঃক্ষুণ্ন হবেন। দলত্যাগ করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। টানা ১২ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দলের নেতাকর্মীরা এমন অবস্থা চায় না। তারাও ক্ষমতায় যেতে চায়, কাবাব-পরোটার ভাগ চায়। হুলিয়া-মামলা-হয়রানি থেকে রেহাই চায়। এবার যদি বিএনপি নির্বাচনে না যায়, তাহলে কর্মীদের ধরে রাখা যাবে না। কেননা এই দলের কর্মীরা কোনো বিশেষ আদর্শ নিয়ে দল করে না। তারা সুযোগ-সুবিধা চায়, আওয়ামী লীগের বাইরে আরেকটা শক্ত দাঁড়াবার জায়গা চায়। কাজেই দল বাঁচাতে হলে নির্বাচন ছাড়া বিএনপির আর কোনো পথ খোলা নেই।

এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়ে দলটি নির্বাচন বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নেয়। ওই নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ বিষয়টিও সরকার মেনে নেয়নি। বর্তমানে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তিসহ আরও কিছু বিষয়ে তারা জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপির এই দাবি পূরণ হচ্ছে না, বেগম জিয়াও আপাতত মুক্তি পাচ্ছেন না।

এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য বিএনপি জোটগতভাবে আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনকে সফল করতে হলেও নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

দলের নেতাকর্মীরাও চান বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। যদি সরকার কারচুপি করে এবং এই যুগে তা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই বললেই চলে। তখন সাধারণ মানুষকে তারা বোঝাতে পারবে। মানুষ তা গ্রহণও করবে। আর নির্বাচনে না গেলে বলার কিছুই নেই। আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে হঠানো যাবে না বা খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়-এটা বিএনপি এতদিনে ভালোভাবেই বুঝে গেছে। বিএনপি গত নির্বাচনে অংশ নিলে আজ পরিস্থিতি এতটা প্রতিকূল হতো না। তারা এখন পর্যন্ত সরকারের ভাবনার কারণ হতে পারেনি। বড় বড় বুলি আর লম্ফঝম্পে কাজ হবে না। গ্রেপ্তার এড়াতে বিএনপি নেতৃবৃন্দ যেভাবে গা-বাঁচিয়ে রাজনীতি করেছেন, তা দলটির জন্য অত্যন্ত লজ্জার। তারা রাজপথ বাদ দিয়ে ঘরে বসে আন্দোলন চালাতে চেয়েছেন। এতে করে তারা নিজেরা জনবিচ্ছিন্ন এবং কর্মী-সমর্থকদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। দাবি আদায়ে রাজপথের বিকল্প নেই-এটা বিএনপি নেতাদের কে বোঝাবে?

কাজেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তই বিএনপির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তটা আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল। তাহলে ভোটের মাঠে তারা আরও অনেক শক্ত চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত। দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে তারা আবারও ভুল করেছে। মনে রাখা দরকার যে, রাজনীতিতে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না, কেউ কাউকে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় না। ক্ষমতা আদায় করে নিতে হয়।

যাহোক, এবারের নির্বাচনে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কিনা এ মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বিষয়টি নিয়ে অনেক নাগরিকই চিন্তিত। নির্বাচন কমিশন অভয় দিলেও সাধারণ মানুষ বড় বেশি আস্থাশীল হতে পারছেন না। ভোটের অধিকার হলো প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিতকৃত একটি মৌলিক অধিকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই অধিকার হলো এক অমূল্য সম্পদ। আমাদের দেশের মানুষকে এই অধিকার অর্জন করতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

দেশে শাসক হিসেবে কারা ভূমিকা পালন করবে, ভবিষ্যত কোন পথে যাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা তা নির্ধারণ করেন। প্রতি পাঁচ বছর পর পর দেশবাসীর কাছে এই সুযোগ আসে। এই সুযোগ তাই ভোটারদের কাছে একটি বিশাল আত্মমর্যাদা, সম্মান ও আনন্দের বিষয়। তাই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য আশাবাদী ও উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু একইসঙ্গে শঙ্কাও জন্ম নেয়। কারণ আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই ভোটাধিকার ছিনতাই হয়ে যায়। ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

সাধারণ মানুষের মনে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় ভাবনা, শেষ পর্যন্ত মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হবে তো? নির্বাচনে নিজ পছন্দ অনুসারে ও সংগোপনে নিজের ভোট তারা নিজে দিতে পারবে তো? ভোট দিতে পারলেও সে ভোট নির্বাচনের ফলাফলে সঠিকভবে প্রতিফলিত হবে তো?

এই সন্দেহ ও সংশয় নিয়ে সাধারণ মানুষ ভোটের দিনগণনা শুরু করে দিয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা এক বিরাট জটিলতায় ভোগেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে হেরে যাওয়ার ভয় থাকে। আর হারলে হামলা, মামলা, প্রতিপক্ষের প্যাঁদানিসহ নানা রকম ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। আবার নির্বাচন করাটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতারও ব্যাপার। ক্ষমতাসীনদের জ্বালা হচ্ছে, তাদের নির্বাচনও দিতে হবে এবং একই সঙ্গে ক্ষমতায়ও থাকতে হবে। ফলে তাদের জেতার জন্য নানা ছল-চাতুরির আশ্রয় নিতে হয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচনের নামে প্রহসনের পথ গ্রহণই ক্ষমতা ধরে রাখার একমাত্র পথ হয়ে ওঠে।

আমাদের সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে বলা আছে যে,... প্রজাতন্ত্রের মালিক হলো জনগণ। জনগণের সেই মালিকানা নিরন্তর বজায় রাখার শর্তেই জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের সেই মালিকানা কার্যকর করে। একেই বলা হয় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র। অথচ সেই প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থাকে প্রহসনমূলক ও তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। নানা কৌশলে গোড়াতেই প্রজাতন্ত্রের ওপর জনগণের ‘মালিকানার প্রাথমিক ভিত্তিই কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

রাজার ঘরে সম্পদের অভাব নাই। ক্ষমতাই সম্পদের উৎস। টুনির একটিই ধন তার ভোট। তাও যখন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সন্দেহ হয়, রাজা কি তবে ভয় পেল? হ্যাঁ, গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য মোটেও শুভ নয়।

আমাদের সরকারগুলো আইনের শাসন কায়েম, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সাধারণ মানুষের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়ে দেশ শাসন-ইত্যাদি বিষয়গুলোকে পুরোপুরিই প্রায় বিসর্জন দিয়েছে। সম্ভব হলে ভোটটাও বাতিল করে দিত। কিন্তু তা এখনও পর্যন্ত করেনি।

মানুষ ভূতকে ভয় পেলে তা রোমহর্ষক কাহিনী হতে পারে। কিন্তু ভূত ভূতের ভয় পেলে তা প্রহসন। গণতন্ত্রে তেমনই তামাশা নিয়ত ঘটছে। যাদের নাগরিকের ভোটে জিতে ক্ষমতা দখল করার কথা, তারা নিজেরাই নির্বাচন এলে ভূত দেখছে। কী করে ভোট এড়ানো যায়, তারই বিবিধ উপায় খুঁজছে।

নির্বাচন হলেও ভোট দেয়া যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির ভোট বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত গত নির্বাচন ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীহীন। এরপর অনেকগুলো স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়া হয় নাই। অনেকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেছে যে তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে!

এরশাদকে হটিয়ে আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন এবং সরকার বদলের ধারা প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আজ আবার সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি শঙ্কার মুখে পড়েছে। গণতন্ত্রের লতানো গাছটিতে আঘাত করার জন্য কুঠার হাতে দাঁড়িয়েছেন নেতারা। আমরা উদ্বিগ্ন হলেও আশায় বুক বেঁধেছি। ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব শঙ্কা যেন দূর হয়। আমরা যেন আমাদের পছন্দের প্রর্থীকে ভোট দিতে পারি- তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও।

এ ব্যাপারে বড় কোনো অনিয়ম হলে দেশের মানুষ ছেড়ে কথা কইবে না। মনে রাখতে হবে যে, টুনির কিন্তু একটিই ধন তার ভোট। সেটা কেড়ে নিলে সে মুখ বুজে নাও সইতে পারে!