ফাও এমপি হওয়ার দিন শেষ



প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশের রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সে ক্ষতি শুধু রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থারই নয়; ক্ষতি হয়েছে অংশ নেয়া এবং না নেয়া দুই দলেরই। সে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি সময়ের হিসেবে পাঁচ বছর, কিন্তু বাস্তবে আরো অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তাদের অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, সেটা তারা এখন আড়ালে-আবডালে স্বীকারও করেন। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। আর নির্বাচন ঠেকাতে দেশজুড়ে সন্ত্রাস চালিয়ে নিজেদের একাউন্টে আরো অনেক বদনাম জমা করেছে।

বিএনপির সে নির্বাচন বর্জন আরো বেশি কস্টলি হয়ে গেছে, কারণ এখনকার চেয়ে পাঁচ বছর আগে তাদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপুল বিজয় বিএনপির নেতাকর্মীদের দারুণ উজ্জীবিত করেছিল। কিন্তু সিটি নির্বাচনের সেই জোয়ার তারা জাতীয় নির্বাচনের টেনে নেয়ার সুযোগ হেলায় হাতছাড়া করে। ফলে গত পাঁচবছর তারা সংসদে ছিল না, রাজপথেও দাঁড়াতে দেয়নি সরকার। মামলা-মোকদ্দমায় কোনঠাসা হতে হতে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের খেসারত দিচ্ছে পাঁচ বছর ধরেই। ৯ মাস ধরে কারাগারে আছেন দলের চেয়ারপারসন।

৫ জানুয়ারির প্রার্থীবিহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ৫ বছর দেশ চালিয়েছে। এটা একটা বড় লাভ বটে। কিন্তু বাকি সবই লস। আওয়ামী লীগের মত একটি ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক দলের কপালে ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের কলঙ্কতিলক বড্ড বেমানান। বিএনপির আছে ১৫ ফেব্রুয়ারি, আওয়ামী লীগের আছে ৫ জানুয়ারি; সমানে সমান। আইনগতভাবে বৈধ হলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। ভোটের আগেই সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন জিতে গেলে, সেই নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন থাকেই।

তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আওয়ামী লীগের নেতাদের, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তাদের মনে অতি আত্মবিশ্বাসের ফাঁপা বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছে। গত ৫ বছরে এমপিদের অনেকেই জনগণের সাথে ছিলেন না। মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেকেও যেন হেঁটেছেন বাতাসে। তারা অনেকেই মনে করছেন যে কোনো ভাবে শেখ হাসিনা তাদের জিতিয়ে দেবেন এবং দল আবার ক্ষমতায় আসবে। মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত, এই ভাবনা থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা দলে দলে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই ভাবনা অমূলক নয়। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে ১৫৩ জন তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেনই, যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারাও তা জিতেছেন বিনা আয়াসে। দশম সংসদে এমন অনেক সদস্য আছেন, যারা স্বপ্নেও কখনো এমপি হওয়ার কথা ভাবেননি। অনেকে লটারি জেতার মত এমপি হয়ে গেছেন। এবারও তেমন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের সে বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের এমপি এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মনে মনে যত পোলাওই খান শেখ হাসিনা কিন্তু বারবার তাদের সতর্ক হরে দিয়েছেন, আগামী নির্বাচন আগের নির্বাচনের মতো হবে না। অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। ওবায়দুল কাদের সোমবারও অতি আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। অনেকদিনের কথাবার্তায় আমার মনে হয়েছে, শেখ হাসিনা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আন্তরিক। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এটা তিনি প্রমাণ করতে চান। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের যে গ্লানি তা মুছে ফেলে নিজের ও দলের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিটাই আরো উজ্জ্বল করতে চাইবেন তিনি।

এটা ঠিক ১০ বছরের উন্নয়ন, অর্জন নিয়ে তিনি জনগণের কাছে যাবেন, তাদের কাছে ভোট চাইবেন। কিন্তু শেখ হাসিনা জাদু দিয়ে জিতিয়ে দেবেন, এই ভাবনাটা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে না পারলে বিপদ আছে। যে ৪ হাজার ২৩ জন মনোনয়ন চাইছেন, তাদের সবাইকে জনগণের কাছে যেতে হবে। ফাও এমপি হওয়ার দিন শেষ, এটা যত তাড়াতাড়ি তারা বুঝবেন; ততই আওয়ামী লীগের জন্য মঙ্গল।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ