বিএনপির হাতে লাঠি কেন?

এরশাদুল আলম প্রিন্স, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪.কম

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। ঐক্যফ্রন্ট ও বিশ দলীয় জোটও নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ও আইনি এখতিয়ার প্রয়োগ করে তফসিল ঘোষণা করার দুই দিনের মাথায় বিরোধী জোট নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিল।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রধান নিয়ামক নির্বাচন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করে যা সারা বছর এমনকি পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্তও দেখা যায় না। রাজনীতিতে জনগণের ভোটের মূল্য যে এখনও শেষ হয়ে যায়নি এটাই তার প্রমাণ।

সুষ্ঠু ভোটাভুটির জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড জরুরি। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন কেতাবে স্বাধীন। বাস্তবে আজ পর্যন্ত কোনো কমিশনের কাজেই তাদের স্বাধীন সত্তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দুটোই জরুরি। পরাধীন কমিশনের নিরপক্ষতা স্বাধীন কমিশনের অ-নিরপেক্ষতা থেকে উত্তম। কিন্তু স্বাধীন বাঙালি জাতির ভাগ্যে নিরপেক্ষ কমিশন দু’একবার জুটলেও স্বাধীন কমিশন জোটেনি।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এ প্রশ্নটি আবার নতুন করে এসেছে। এটি তাদের জন্য পরীক্ষা। সরকারের জন্যও পরীক্ষা। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বিরোধী জোটকে এ ব্যাপারে তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। বিরোধী জোট তার ওপর আস্থা রাখবে কিনা সেটি তাদের ব্যাপার। কিন্তু, জনগণ তার ওপর আস্থা রাখতে চায়। এছাড়া জনগণের আর কিই-বা করার আছে। রাজনীতিবিদদের ওপরতো আস্থা রাখতেই হবে। মাননীয় প্রধনামন্ত্রীর আস্থা অর্জনের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি কমিশনের নিরপেক্ষক ও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা। সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায়। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কয়েকবারই বলেছেন। কমিশনকেও এখন তা চাইতে হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা জরুরি তা কমিশনকে সরকারের কাছে চাইতে হবে। সরকারের সহায়তা ছাড়া নির্বাচনই সম্ভব না সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সরকারের সহায়তা ছাড়া কীভাবে হবে? সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার গ্রীন সিগনাল দিয়ে দিয়েছে। সরকারের সুষ্ঠু নির্বাচন চাওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে। এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য। তারা মূলত একটি সাংবিধানিক দায় মেটাতে চায়। এটি ভবিষ্যতেও একটি নজির হয়ে থাকবে। আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু হয় তবে তা অনেক রাজনৈতিক সমস্যারই সমাধান নিয়ে আসবে। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তা ভোটাভুটি নিয়ে আমাদের চিরস্থায়ী রাজনৈতিক বালা-মুছিবত দূর করতে সাহায্য করবে। বারবার সংবিধান কাটা-ছেড়া করা লাগবে না, জ্বালাও-পোড়াওও করতে হবে না।

সরকারের সদিচ্ছাপূরণে এখন কমিশনকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার চায় সুষ্ঠু নির্বাচন করতে। এই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ রচনা করা এখন কমিশনের কাজ। কমিশন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে। নির্বাচনে সবার জন্য সহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখবে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির একটি বড় নিয়ামক ছিল সংসদ ভেঙে দেয়া। এটি সরকার ও সরকার বিরোধী দুই পক্ষের জন্যই জরুরি ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। এখন বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই যতোটুকু সম্ভব লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা যায় তা করতে কমিশনকে এগিয় আসতে হবে। সরকার সংসদ ভেঙে না দিলেও কিছু কাজ করেছে যা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ইঙ্গিতবাহী। সরকারের টেকনোক্রেট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলেছেন। যদিও আবার তাদের পদত্যাগপত্র এখনও গ্রহণ করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমপিদের বিশেষাধিকার বা প্রটোকল ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। মন্ত্রীদেরও রুটিন কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর মাধ্যমে সরকার নির্বাচন কমিশনের কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। এখন কমিশনকে এর সুযোগটি গ্রহণ করতে হবে। বাকি কাজটুকু তাকে করতে হবে। সরকার সব কাজ করে দেবে না। কারণ, সরকারতো একটু বেশি সুবিধা নিতেই চাইবে। এখানেই নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনচেতার বিষয়টি জড়িত।

নির্বাচন নিয়ে যখন দেশে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল তখনই আজ নয়াপল্টনে বিএনপি কর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। নির্বাচনের এমন মুহুর্তে এটি এক অশনিসংকেত। আমরা জনগণ এতে আবার হতাশ হয়ে পড়ি। জনগণ একদশক ধরে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটটি দেয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে। জনগণ জানে যে তারা কোনোদিন ক্ষমতায় যেতে পারবে না। রাজনীতিকরাই ক্ষমতায় যাবেন।

রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলে সে জন্য কমিশন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের ভূমিকা পালন করতে বলেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। সে ভূমিকা পালন করতে গিয়েই নয়াপল্টনে আজকের সংঘর্ষ। বিএনপি কর্মীরা যেভাবে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভোটের মাঠে এধরনের সংঘর্ষ বিএনপির জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে। সেই সাথে পুলিশও যদি আচরণবিধি প্রতিষ্ঠার জন্য মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেটিও কাম্য নয়। কারণ, কোনো একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে যদি সামগ্রিক নির্বাচনে প্রভাব পড়ে তবে তা কোনো পক্ষের জন্যই শুভ হবে না। সরকারের জন্যও আগামী নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে করা একটি বড় এজেন্ডা ও চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিরোধী জোটের স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরার জন্যও আগামী নির্বাচনটি জরুরি। ক্ষমতায় কে আসবে সেটি বড় কথা নয়। কাজেই পুলিশ তাদের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বা নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সামগ্রিক নির্বাচন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অবশ্যই কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ অবশ্যই সেখানে ব্যবস্থা নেবে। প্রশ্ন শুধু একটু কৌশলী হবার ও চেক এন্ড ব্যালেন্সের। বিএনপির এমন সংঘর্ষের ফলাফল কী হতে পারে তা গত একদশকে তাদের বোঝার কথা। বিএনপি প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার আগেই তাদের উচিত সব ধরনের সহিংসতা ও সংঘর্ষের পথ পরিহার করা। জনগণ সবকিছুই দেখে, বোঝে। লাঠি দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায়না, থাকাও যায়না। তাই সরকারি ও বেসরকারি লাঠির অপপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। লাঠির বদলে যদি বাঁশি দিয়ে কাজ হয় তবে তাই ভালো নয় কি?

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর বার্তা২৪, আইনজীবী কলামিস্ট