নড়াইল-২ আসনে উভয় পক্ষের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা

আহমেদ শরীফ শুভ
আহমেদ শরীফ শুভ, ছবি: বার্তা২৪.কম

আহমেদ শরীফ শুভ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নড়াইল-২ আসনে ক্রিকেটার মাশরাফির নির্বাচন করার বিষয়টি এবারের সংসদ নির্বাচনে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা ও বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সরকারি শিবির স্বাভাবিকভাবেই এটা নিয়ে উচ্ছ্বসিত আর বিরোধী শিবির নিরুত্তাপ। যারা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি দেখছেন তারা দলীয় লাইন অনুযায়ী মাশরাফির নির্বাচন করা নিয়ে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সে ধরণের অভিমত প্রত্যাশিত। তবে যারা সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এবং সবকিছু দলীয় লাভ-ক্ষতির মাপকাঠিতে দেখেন না তাদেরও অনেকেই মাশরাফির এমন সিদ্ধান্তে স্বস্তি পাননি। এই অস্বস্তির পেছনে রাজনৈতিক কারণের চেয়ে মাশরাফির ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কার বিষয়টিই মূখ্য বলে মনে হয়।

নির্বাচনে গেলে মাশরাফির অবিসংবাদিত ভাবমূর্তি কতটুকু অক্ষুন্ন থাকে, নির্বাচনের প্রচারণা ও সংসদীয় কার্যক্রমের ব্যস্ততায় আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড সিরিজ এবং সর্বোপরি বিশ্বকাপে তার কর্তব্যনিষ্ঠা, অনুশীলন ও মনোসংযোগে নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়ে কি-না এসব নিয়ে তার ভক্তকুল অনেকটাই চিন্তিত। আমাদের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে মাশরাফির মতো সজ্জন, কর্তব্যনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক মানুষের প্রয়োজন অপরিসীম এটা যেমন সত্য, এ দেশের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির ঘুণ অনেক সজ্জন ও দেশপ্রেমিক মানুষকেই উল্টো অধপতিত করে ফেলেছে কিংবা স্বেচ্ছা নির্বাচনে পাঠিয়েছে এটাও সত্য। এই প্রতিকূলতায় মাশরাফির মতো নির্বিবাদ আদর্শবাদী ও নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ কিভাবে অভিযোজন করবেন সেই প্রশ্নও থেকে যায়। মাশরাফির ভক্তকূল তথা দেশবাসীর একটি বিরাট অংশ তাই অনেকটাই দ্বিধান্বিত।

তারা মনে করেন, বিশ্বকাপের পর অবসর নিয়ে রাজনীতিতে এলেই মাশরাফি সবচেয়ে ভালো করতেন। তাতে তার ওপর অযাচিত চাপ অনেকটাই কমতো। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ এই মেয়াদে হাতছাড়া হয়ে গেলেও তিনি অন্য কোনো পদে থাকতেই পারতেন। এমনকি টেকনোক্র্যাট কোটায় তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তো থেকেই যেত।

তবে এই বিতর্ক এখন অনেকটাই অর্থহীন। বাস্তবতা হলো, মাশরাফি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। তিনি একজন সার্বভৌম মানুষ হিসেবে তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেছেন নির্বাচনের ডামাডোল, দলীয় আনুগত্য এবং সংসদীয় কার্যক্রম তার ক্যারিয়ারের বাকি দিনগুলোতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। হয়তো তিনি আদর্শিক আনুগত্যের জন্য তার সর্বজনপ্রিয়তা নিয়েও আপোস করতে প্রস্তুত। তিনি যেহেতু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাই ভক্ত ও দেশবাসী হিসেবে তার সিদ্ধান্তের প্রতি আমাদের এখন আস্থা রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এখন একমাত্র প্রশ্ন, এই নিয়ে বিরোধী দল, জোট কিংবা তৃতীয় পক্ষের কোনো করণীয় আছে কিনা? বৃত্তের বাইরে এসে চিন্তা করলে দেখা যাবে, মাশরাফি আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করলেও এক্ষেত্রে বিরোধী দল ও জোটগুলোর একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এ কথা বলাই বাহুল্য, আসন্ন নির্বাচনে মাশরাফির বিজয় সুনিশ্চিত। সরকারি দলের আনুকূল্য না পেলেও তিনি বিজয়ী হবেন। আর যদি তিনি পরাজিতও হন (যা প্রায় অসম্ভব) তাতেও নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করবে না। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে অন্তত এক আসনে সরকারের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে না। এই বাস্তবতার বিবেচনায় মাশরাফির আসনে (নড়াইল-২) বিরোধী দল ও জোটগুলো কোনো প্রার্থী না দিয়ে একটি চমক দিতে পারেন। এমনিতেই মাশরাফির বিজয় অবধারিত, এই আসনে প্রার্থী না দিলে বিরোধী দল ও জোটগুলোর তেমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাতে বরং সেই দল ও জোটগুলোর এবং সামগ্রিক রাজনীতি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

মাশরাফির যদিও একটি নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে এবং তিনি একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচন করছেন, তাতে তিনি যে একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক, কর্তব্যনিষ্ঠ, সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলীতে ভাস্বর এবং আপাদমস্তুক সজ্জন- এই সত্যটির ব্যত্যয় ঘটেনি। একটি দলের ব্যানারে নির্বাচন করলেও তিনি আসলে আমাদের সবার মাশরাফি। তার বিরুদ্ধে প্রার্থী না দিলে এবং তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে তাকে আমরা সবাই ক্লেইম করতে পারবো। তিনি আওয়ামী লীগের ব্যানারে থাকলেও আমাদের সবার মাশরাফি হয়েই থাকতে পারবেন। আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে কাদা ছোড়াছুড়ির বাইরে থাকতে পারা এক রকম অসম্ভবই বলা চলে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে অন্ততঃ মাশরাফিকে নিয়ে তেমন কাদা ছোড়াছুড়ির সম্ভাবনা থাকবে না। তাকে নির্বাচনী প্রচারণায় মনোনিবেশ করতে না হলে তাহলে তিনি অখণ্ড মনোযোগ নিয়ে আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড সিরিজ এবং সর্বোপরি বিশ্বকাপের অনুশীলন ও অধিনায়কত্বের দিকে নজর দিতে পারবেন। গত ১৭ বছরে মাশরাফি নিজের শরীরের ওপর নজিরবিহীন ঝুঁকি নিয়ে আমাদের অনেক আনন্দের মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। আমাদের কাছে এতটুকু সম্মান ও ভালোবাসা তার প্রাপ্য হতেই পারে।

কেউ কেউ ভাবতে পারেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন একটি আসন ছেড়ে দেওয়া বিরোধী দলের কাছে অনেক বেশি চাওয়া হয়ে যাবে। বিষয়টি মোটেও তা নয়। এই ছাড় দেওয়া থেকে বিরোধী দল ও জোটগুলোর অনেক কিছু পাওয়ার আছে। মাশরাফির বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থী না দিয়ে বিরোধী দল ও জোটগুলো নিজেদের সদ্ভাব ও শুভেচ্ছার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে যা ভবিষ্যতে ইতিবাচক রাজনীতির একটি মাইলফলক হবে। তা ছাড়া তাতে বিরোধী দলের অন্তত একটি আসনের প্রচারণার জন্য অর্থ ও লোকবলের সাশ্রয় হবে। যেহেতু এই আসনটি এমনিতেও তাদের পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, এই সাশ্রয়টুকুও কম কিছু নয়।

মাশরাফিকে মনোনয়ন দেওয়া নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগের একটি বড়সড় পয়েন্ট স্কোরিং। আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনের আগেই নড়াইল-২ আসনে ১০ পয়েন্ট স্কোর করে তবে বিরোধী দল ও জোটগুলোর সেখানে কোনো প্রার্থী না দিয়ে অন্তত ২ পয়েন্ট হলেও স্কোর করার সুযোগ এসেছে। একদল যেহেতু রংয়ের টেক্কা দিয়ে ট্রাম্প করেই ফেলেছে অন্য পক্ষের তখন আর সেখানে ওভার ট্রাম্পের সুযোগ নেই। তারা বরং সেখানে একটা কার্ড ফাঁসিয়ে দিয়ে পরবর্তী ট্রাম্পের অপেক্ষা করতে পারে। নড়াইল-২ আসনে মাশরাফি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই বিজয়ী হবে। বিজয়ী হবে ইতিবাচক রাজনীতি। বিরোধী দল তাকে এই সম্মানটুকু দিলে তারা নিজেরাই সম্মানিত হবে আর মাশরাফিরও নিশ্চয়ই তা মনে থাকবে। আগামী দিনে দুই শিবিরের দূতিয়ালীতেও তা একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। নিতান্ত দলান্ধ ছাড়া অন্য সবাই বিরোধী দল ও জোটগুলোর এই সিদ্ধান্তকে শুভেচ্ছা আর সদ্ভাবের স্মারক হিসেবেই দেখবে।

আহমেদ শরীফ শুভ: মেলবোর্ণ প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, সমাজকর্মী ও ফ্রিল্যান্স কলাম লেখক