কিমের সুমতি, যৌন পুতুল ও ‘#মি টু’

মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১ নভেম্বর ২০১৮ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উত্তর কোরিয়ার নারীদের ওপর চালানো এক গবেষণার ফল প্রকাশ করেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে উত্তর কোরিয়ায় নারীদের ওপর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আটানব্বই পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট বের হয়েছে।

প্রতিনিয়ত সেখানে হাজারো নারীদের ওপর অনেক যৌন নির্যাতন চালানো হয় কিন্তু দেশটির নেতা কিম জং উনের প্রশাসনের ভয়ে কেউ কিছু বলে না। একক ক্ষমতার এই হচ্ছে মারাত্মক নেগেটিভ দিক। উত্তর কোরিয়ার ভুক্তভোগীরা জানান তাদের দেশের পুলিশ ও প্রশাসনকে তারা বিশ্বাস করে না। ভুক্তভোগী এক নারী বলেন, ‘তারা আমাদের যৌন পুতুল হিসেবে ব্যবহার করে। যখন ইচ্ছা যেভাবে খুশি সেভাবেই তারা করে, নিজেদের নিয়ে ভাববার কিংবা করার কিছু নেই। আমরা পুরুষদের দয়ার পাত্র হিসেবে বেঁচে আছি।’ অন্য এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, উত্তর কোরিয়ার নব্বই শতাংশ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার। বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো পুলিশের কাছে নিগ্রহের শিকার হতে হয়। তিনি বলেন, ১৭ বছর বয়সে যৌন হেনস্থার শিকার হওয়া তার এক বান্ধবী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া এক নারী বলেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় নারীরা।

এজন্যই মানুষ স্বাধনীতা চায়, আর শাসকেরা চায় তারা যা ইচ্ছা তাই করবে, কেউ যাতে কোনো ধরনের বাঁধা দিতে না পারে সেজন্য তারা সব ধরনের ব্যবস্থা করে রাখে। তাই, টেকেনি রাশিয়ার সমাজতন্ত্র। চীনের সমাজতন্ত্রে আনতে হয়েছে পরিবর্তন। অন্য যেসব দেশে এর চেষ্টা করা হয়েছিল সেসব দেশে সফল হয়নি। কারণ এই তন্ত্রে মনে করা হয় মানুষ পশুর মতো শুধু খাবে দাবে আর কাজ করবে। তাদের অন্য কোনো চাহিদার কথা স্বীকার করা হয় না।

গবেষণায় দেখা যায়, পুলিশ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তা কারারক্ষী এমনকি মার্কেটের তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমেও নির্যাতনে শিকার হয় নারীরা। সেখানে বিচার নেই, মানুষের কথা বলার অধিকার নেই, আছে শুধু ভয় আর নির্যাতন। সাধারণ নারী থেকে শুরু করে কর্মজীবী সবাই হেনস্তার শিকার। দেশটিতে যৌন সহিংসতা একটি উন্মুক্ত, বিবেচনাহীন এবং প্রচণ্ড গোপনীয় সহনশীল একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

দেশটির নারীরা ‘মি-টু’আন্দোলনে যুক্ত হতেন যদি তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো। কিন্তু উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের একনায়কতন্ত্রের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ে, বিশ্বনন্দিত নেতা নেলসন ম্যন্ডেলাকে সাধারণ কয়েদির মতো আটাশটি বছর আটকে রেখেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা চামড়ার সরকার। কারণ তিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কোথায় সেই বর্ণবাদী সরকার, কোথায় আজ নেলসন ম্যান্ডেলা? পৃথিবীতে কেউই নেই। এখন যারা এ ধরনের আচরণ করছেন তারাও কেউই পৃথিবীতে থাকবেন না। থাকবে তাদের নিষ্ঠুরতার ইতিহাস, বিপরীতে ত্যাগের ইতিহাস।

উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী নিয়ে ‘নর্থ কোরিয়াস হিডেন রেভুল্যুশন’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন জিউন বায়েক। তার লেখার সঙ্গে লি সো ইয়নের বক্তব্যের মিল রয়েছে। লি বলেন, সেনাবাহিনীতে তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চাকরি করেছেন। তার ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। তার অন্যান্য নারী কমান্ডরা এর শিকার হয়েছেন। সেনাবাহিনীর নিয়ম হলে, কোনো পুরুষ সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে যদি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তার সাত বছরের কারাদণ্ড হবে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই এসব ঘটনার তদন্তই হয় না। তাই পুরুষ সদস্যদের শাস্তি হয় না এবং তারা একই ঘটনা ঘটতেই থাকে।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনীর দেশ উত্তর কোরিয়া। অথচ তাদের নিজস্ব ফৌজি উর্দি রাখার জন্য ছোট একটা ড্রয়ার দেওয়া হতো। ড্রয়ারের ওপরে রাখতে হতো ফ্রেমে বাঁধানো দুটে করে ফটোগ্রাফ। একটি কিম ইল সংয়ের, দ্বিতয়িটি তার উত্তরসূরী প্রয়াত কিম জং-ইলের। নিজেরই যেন নিজেদের ’গড’বানিয়ে ফেলেছেন।

২০১৫ সালে উত্তর কোরিয়া নিয়ম করেছে যে, ১৮ বছর বয়সের পর দেশের সব মেয়েকেই বাধ্যতামূলকভাবে সাত বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় নারী সেনাদের জন্য আলাদা শৌচাগার নেই। অনেক সময় পুরুষ সহকর্মীদের সামনেই তাদের প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে হয়। এর ফলে তাদের ওপর যৌন হামলার ঝুঁকিও বাড়ে, কিন্তু তাদের কিছু করার থাকে না।

উত্তর কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ভিন্ন মতাবলম্বীদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কেঁদে দিলেন জাতিসংঘ মানবাধিকার তদন্ত প্রধান। তিনি জানান, কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রটির শ্রমশিবির এবং নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে চরমভাবে মানবাধিকার লংঘিত হচেছ। তাদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হয়। নারী বন্দীদের ওপর এমন সব পৈশাচিক আচরণ করা হয় যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেশটির সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রন থাকার কারণে খুব কম সংখ্যক নাগরিকই নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। দুএকজন যারাই পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ চীনে আশ্রয় নেন, সেখানেও তারা নির্যাতিত ও অবমাননার শিকার হন। চীনে সীমান্ত রক্ষীরা পুরুষ বন্দীদের আবার উত্তর কোরিয়ায় ফেরত পাঠায় আর নারী বন্দীদেরকে নারী পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে জোরপূর্বক বিয়ে করে যৌনক্ষুধা মেটানোর জন্য। নারীরা যেন একেবারেই পণ্য সেখানে!

জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্ত কমিশন নির্যাতিত মানুষের কাছ থেকে তাদের দুর্দশার বর্ণনা শোনার জন্য লন্ডন, টোকিও এবং সিউলে অফিস খুলেছে। নির্যাতিতদের জাপানি আত্মীয়-স্বজনরাও তাদের স্বজনদের দুদর্শার কথা বর্ণনা করেছেন। কোরিয়ান যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) দেশভাগের সময় অনেক পরিবারও বিভক্তির শিকার হয়ে উত্তর কোরিয়ার অন্তুর্ভুক্ত হয়, যারা উত্তর কোরিয়া কর্তৃপক্ষের কোপানলে পরে।

অনেকে আবার উত্তর কোরিয় গোয়েন্দাদের হাতে অপহরণের শিকার হয়। তদন্ত থেকে জানা যায় যে এবছরই (২০১৮) প্রথম নয় মাসে উত্তর কোরিয়া থেকে ১০৪১ জন নাগরিক পালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেয়। তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৫০৯ জন। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার কারণে এই সংখ্যা কমে আসছে তার মানে ভেতরকার অবস্থা ভয়াবহ।

দুনিয়াব্যাপী এসব শাসকদের কে লাইসেন্স দিয়েছে দেশের মানুষের ওপর এ ধরনের অকথ্য নির্যাতন করতে? স্রষ্টার দেওয়া এই পৃথিবীর আকাশ-বাতাস তারা উপভোগ করবে, স্রষ্টার দেওয়া সম্পদ ভোগ করবে স্বাধীনভাবে কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কেউ বা গণতন্ত্রের নামে কেউবা সমাজতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র কায়েম করে বসে। তারা রাস্তাঘাট বানায়, সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করে কিন্তু কাদের জন্য? মানুষের তো মানসিক খাবারেরও প্রয়োজন আছে। সেই খাবার থেকে সেই চাহিদা থেকে এসব শাসকেরা কোনো এক অজানা অজুহাতে দেশের লক্ষ কোটি মানুষকে বঞ্চিত করে রাখে। স্রষ্টা কি এদের ক্ষমা করবেন? কিমের মতো শাসকদের কি সুমতি হবে?

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ, বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।