রাজনীতিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট ও সম্ভাবনা

ড. সুলতান মাহমুদ রানা
ড. সুলতান মাহমুদ রানা, ছবি: বার্তা২৪

ড. সুলতান মাহমুদ রানা, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা- এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট উৎকণ্ঠা রয়েছে। সাধারণ মানুষের একটাই লক্ষ্য- সেটি হলো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। কে ক্ষমতায় আসবে আর কে ক্ষমতায় আসবে না, সেই চিন্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করা। ইতিমধ্যেই সকল দল ও জোট নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা ও প্রস্তুতি শুরু করলেও বিরোধী জোটের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার প্রশ্নটি থেকেই গেছে। কারণ তারা সবসময়ই হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে যেকোনো সময় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর।

নির্বাচনের পরিবেশ যথাযথ না হলে তাদের নির্বাচনে না আসার বিষয়ে আলটিমেটাম রয়েছে। আর এই আলটিমেটাম মূলত নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি। কারণ এবারের নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য মানের হবে তা মূলত নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপরই। অবশ্য এক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাদের মনে যদি যেকোনোভাবে নির্বাচন বানচালের মনোবাসনা থাকে তাহলে সেটি ‘ঘুমিয়ে জেগে থাকার মতো’ হবে।

ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ৩০০ আসনে তাদের মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে। উভয় দলেরই চার হাজারের বেশি মনোনায়নপত্র বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের হৈচৈ বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রত্যাশার মাত্রা একটু বেশি। দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে অনেক নেতাই এখন নিজেদেরকে বিতর্কিত করে তুলেছে, আবার অনেকেই নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। দলের পদ-পদবির দিক থেকে প্রায় সকলেরই এমপি হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। যারা মনোনয়ন পাবেন না সেই নেতাদেরও অনেক অনুসারী আছে দলে। সেই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ রেখে মাঠে থাকার বিষয়ে স্বয়ং দলের সভাপতি সতর্ক করে যাচ্ছে। আবার ক্ষমতার দুই মেয়াদে দলের অনেক নেতাকর্মী উপেক্ষিত ও বঞ্চিত হয়েছে বলে দলের বিভিন্ন ফোরামে অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের মধ্যে যে টানাপড়েনের সুর লক্ষ করা যাচ্ছে তা সরকারি দলের আগামী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা সরাসরি মনোয়ন প্রদানে ভূমিকা রাখতে পারছে না বিধায় এ বিষয়ে তাদের সংকটও কম নেই। এমনিতেই দলের ভঙ্গুর অবস্থা, এরপর জোটের আসন ভাগাভিাগি নিয়েও তারা একটি সংকটময় অবস্থায় পড়তে পারে।

তবে মনোনয়ন যেই পাক, তারা যেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়- এই প্রত্যাশাটি এখন সবার। অবশ্য আমরা সকলেই বিশ্বাস করতে চাই যে, আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি নজির সৃষ্টি হবে। আর যদি আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য কিংবা অবাধ না হয়, তাহলে দেশের নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থার কোনা স্তর থাকবে না। এক কথায় বলা যায়, নির্বাচনী রাজনীতিতে আস্থার মৃত্যু হবে চিরতরে।

আগামী নির্বাচনই হবে ভবিষ্যতে সাধারণ জনগণের ভোটে অংশ নেয়ার আগ্রহ কিংবা অনাগ্রহের কারণ। নির্বাচন যদি ভালো হয়, তাহলে নির্বাচনী রাজনীতিতে জনগণের আস্থা তৈরি হবে নিশ্চিতভাবে। দলীয় সরকারের অধীনেই ভবিষ্যতে অন্যান্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো আপত্তি থাকবে না। আর যদি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিটি সামনে থেকেই যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ভোট দেয়ার মানসিকতা কিংবা আাগ্রহ কোনোটিই ফিরে আসবে না। কমপক্ষে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে আস্থার পরিবেশ তৈরির ভিত্তি হিসেবেও হলে এই নির্বাচনটির গুরুত্ব আলাদা।

বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নটি শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও আলোচনার খোরাক হিসেব বিবেচিত হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনটি সকল দলের অংশগ্রহণে হবে কিনা, সেই আলোচনাটি এখন বিশ^ব্যাপী। আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থতির প্রতি দেশের মানুষের যেমন আস্থার সংকট রয়েছে তেমনি বহির্বিশ্বের্ও এক ধরনের আনাস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত ১৫ নভেম্বরের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিতর্ক থেকে সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিতর্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আসন্ন সংসদ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনায় উঠে এসেছে, এ নির্বাচনই শেষ সুযোগ, যেখানে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে, নাকি পরিস্থিতি অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হবে।

দেশে কোন ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে- বিশৃঙ্খল হবে কিনা, ক্ষমতার পালা বদলে কোনোপ্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি হবে কিনা, আবার কোনো ১/১১ সৃষ্টি হবে কিনা, এসবের সবকিছুই নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের পরিবশের ওপর। আর এই পরিবেশ তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যতটা না ইতিবাচক হতে হবে, তার চেয়ে বেশি ইতিবাচক হতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। দল মতের উর্ধ্বে উঠে নির্বাচন কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য সেজন্য সরকারি দলের বিশেষ ছাড় দেয়ার মানসিকতার উন্নয়ন ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিরোধী জোটেরও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে নির্বাচনমুখী থাকতে হবে। শুধুমাত্র হুমকি-ধমকি, জ¦ালাও পোড়াও ষড়যন্ত্রভিত্তিক রাজনীতিতে থাকলে চলবে না। ওইসব নেতিবাচক চিন্তা থেকে বের হয়ে এসে দলীয় সরকারের অধীনেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির অন্যতম ধারক হতে হবে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে একটি অভীন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। সেটি হলো রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় এবং যেকোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে রাজনীতিবিদরা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে দ্বিধা করে না।

এদেশের রাজনৈতিক কৃষ্টিতে আরো একটি বিষয় গেঁথে আছে সেটি হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিশোধমূলক রাজনৈতিক প্রবণতা। এই প্রবণতা থাকার ফলেই ক্ষমতাসীনরা যেমন ক্ষমতা ছাড়তে ভয় পায় তেমনি যারা নতুন করে ক্ষমতায় আসে তারাও ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে যায়।

কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোকে এই মানসিকতা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে।মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের প্রশ্নটি প্রতিশোধের নয় জনগণের কল্যাণের, সর্বোপরি গণতন্ত্র রক্ষার। রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান এবং প্রতিশোধ যাই বলি না কেন, কোনোটিই জনগণের কিংবা রাজনীতিবিদদের কল্যাণ বয়ে আনবে না। সবকিছুই রাজনৈতিক বুমেরাং হিসেবে দেশকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি করবে।

আমরা চাই, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিযোগিতামূলক আচরণ থেমে যাক। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার প্রশ্নে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা শীঘ্রই বন্ধ হওয়া দরকার। কারণ এমন প্রতিযোগতার মাধ্যমে দেশে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির পুনরাবৃত্তি ঘটুক, সেটি আমরা কেউই চাই না। প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঐক্যজোটের সংলাপ, তফসিল ঘোষণা, ঐক্যজোটের নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন আর কোনো নেতিবাচক চিন্তা আমরা ধারণ করতে চাই না। দেশে একটি নির্বাচনী উৎসবমুখী পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নির্বাচনব্যস্থার প্রতি জনগণের স্থায়ী আস্থার জন্ম নিক।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।