নীতি-আদর্শ ও নির্বাচনী রাজনীতি

চিররঞ্জন সরকার
চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, দল ও জোটের মধ্যে নীতিহীনতা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য, নীতি-আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে ইতিমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা এখন ধানের শীষ মার্কার লোক। ধানের শীষ নিয়ে জামায়াত লড়বে, লড়বে যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে, লড়বেন ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, সুলতান মোহাম্মদ মনসুররাও। কি চমৎকার জোট, ভোট, আর ভোটের রাজনীতি!

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে বিচারিক আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত। একজন জেলে আছেন, আরেকজন ফেরার হিসেবে লন্ডনে। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত এখনও বিএনপির ঘনিষ্ঠ শরিক। এই বিএনপিকে নিয়েই ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ক্ষমতায় যাবার স্বপ্ন দেখছেন, গণতন্ত্র উদ্ধারের রণনীতি প্রণয়ন করছেন। এর মধ্য দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে বলেও কেউ মানছেন না। বরং ড. কামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতারা ঐক্যফ্রন্টের নামে কীভাবে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও খুনিদের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারলেন তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, যারা প্রতিনিয়ত গণতন্ত্রের কথা বলেন, সুশাসনের কথা বলেন, মানবাধিকার রক্ষার কথা বলেন, তারা যদি আদালতের রায়ে খুনি সাব্যস্ত একজনের নেতৃত্ব মেনে নেন, তাহলে তাদের দ্বারা জনগণের কোনো কল্যাণের আশা করা যায় কি? রাজনৈতিক কৌশলের নামে নৈতিক অধঃপতন কীভাবে মেনে নেয়া যায়?

২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণফোরাম আয়োজিত এক মানববন্ধনে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, 'অতীত ভুলে গেলে জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয়। হাওয়া ভবনের কথা ভুলে গেলে চলবে না। এ ভবন থেকে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে ভবিষ্যতে আর সে সুযোগ দেওয়া যাবে না। সেই হাওয়া ভবনের নিয়ন্ত্রক তারেক রহমান এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। শুধু তাই নয়- তারেক রহমান ভয়ঙ্কর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার দলের সঙ্গে ঐক্য করে তিনি কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন?

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে সব রকম নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কেবল দল-ভারী করার চেষ্টা করছেন। যারা মৌলবাদী গোষ্ঠীর কট্টর সমালোচক, তারাও মৌলবাদীদের সঙ্গে আপোষ-রফা করছেন। যারা আইনের শাসন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মানবাধিকারের ধ্বজাধারী হিসেবে পরিচিত, তারাও এখন কুখ্যাত, আদালতের রায়ে দণ্ডিত, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী শক্তির সঙ্গে আঁতাত করছেন। হাতে হাতে হাত মিলিয়ে মঞ্চে দাঁড়াচ্ছেন। এতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। রাজনীতিতে চরম সুবিধাবাদ আবারও গেড়ে বসছে। এমনিতেই আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন ক্ষণস্থায়ী বিষয়। নীতি-আদর্শহীন রাজনৈতিক কর্মীরা সময় সুযোগ বুঝে দল বদলায়, বোল ও ভোল পালটায়, সেখানে সুবিধা সেখানেই জিন্দাবাদ বলে। এটা খুবই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীতিহীনতা আর সুবিধাবাদের যে চিত্রটা এবার উপহার দিলেন, এরপর রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাশীল হওয়া কঠিন।

নিজেদের আচরণের কারণে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখন যারা বিএনপিকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচাতে অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নাম লিখিয়ে নেতা হয়েছেন তাদের নিয়ে সচেতন মহলে নানা সমালোচনা চলছে। এর আগে ডা. বি. চৌধুরীর সঙ্গে কামাল-মান্না-রবদের বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেননি। ডা. বি. চৌধুরীকে ড. কামাল হোসের ল্যাং মেরেছেন-এমন কথা রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত আছে। এটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। এক চেয়ারে দুজন বসার যখন জায়গা নেই তখন একে অন্যকে ল্যাং মারবেন এটাই নিয়ম। সে নিয়মে বি. চৌধুরী ল্যাং খেয়ে ঐক্যফ্রন্টের বাইরে চলে গেছেন। এখন ড. কামাল হোসেন তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিজে রাষ্ট্রপতি হতে চাইছেন। গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি নিজেই এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন। আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতেও লজ্জিত বা কুণ্ঠিত হচ্ছেন না ড. কামাল হোসেন । প্রশ্ন হলো, শেষ বয়সে এসে রাষ্ট্রপতি হওয়ার লোভে এতটা নিচে নামতে হবে?

এমনিতেই রাজনৈতিক দলগুলোতে ব্যক্তি বিশেষের একনায়কতন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চাকে বাদ দিয়ে এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ তৃণমুলকে কেন্দ্র থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এর সঙ্গে যদি নীতিহীনতাও প্রবলভাবে সামনে চলে আসে, তাহলে দল চলবেই বা কীভাবে, নেতারা কথা বলবেনই বা কি কোন মুখে? শুধু ক্ষমতার জন্য, লোভ ও লাভের জন্য, পাবার জন্য, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, প্রতিপক্ষকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য যদি ন্যায়, আদর্শ, রাজনৈতিক বিশ্বাস সব কিছু বিসর্জন দেয়া হয়, তাহলে সেই রাজনীতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? আজ যারা ক্ষমতায় যাবার এবং ক্ষমতা ধরে রাখার নেশায় যে দল খুশি সেই দলের সঙ্গে জোট করছেন, যে প্রতীক খুশি সেই প্রতীক নিচ্ছেন, অতীত কিংবা ভবিষ্যত বিবেচনায় নয়, কেবলই তাৎক্ষণিক লাভের মোহে মত্ত হচ্ছেন, তাদের কাছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যাণ কী করে আশা করা যায়? আর যে রাজনীতিতে জনকল্যাণের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, সেই রাজনীতিকে আমরা সম্মান ও সমর্থন করব কোন যুক্তিতে?

তার মানে এই নয়, আমরা রাজনীতি বিরোধী। আমরা রাজনীতির বাইরের কোনো শক্তিকে মনে মনে সমর্থন করছি। আমরা রাজনীতি-ই চাই তবে রাজনীতি হোক নীতি-আদর্শ-জনকল্যাণ দ্বারা পরিচালিত। সে রাজনীতি হবে কাজের ভিত্তিতে, সুস্থ প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক বিধান মেনে। তর্ক চাই, প্রতিবাদ চাই, বিরোধিতাও চাই, কিন্তু সেটা হবে শালীন, নিয়মতান্ত্রিক, সুস্থ চর্চা। ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে গায়ের জোরে, কূটকৌশল প্রয়োগ করে সবকিছু দখল করে নেওয়া, নীতিহীন ষড়যন্ত্রের পথকে আদর্শ মেনে সেই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর চর্চা চালিয়ে যাওয়া আর যাই হোক রাজনীতি হতে পারে না। এই রাজনীতি কেউ চায়ও না।

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।