পর্নোগ্রাফি, ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমাদের করণীয়

আলম শাইন
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা প্রতিনিয়তই খবরের কাগজে পড়ছি শিশু ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ ও হত্যার সংবাদ। এসবের বিচারাদিও যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়; তারপরও এ অবক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাধির মতো।

ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণহত্যার কথা বলতে গেলেই প্রথমে আসে পর্নোগ্রাফির কথা। যার করালগ্রাসে পড়ে কতিপয় কিশোর-যুবক বেহায়ার মতো আচরণ করছে। হায়েনার মতো ক্ষিপ্রগতিতে অনাচারে জড়িয়ে পড়ছে। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ভালোমন্দ বাছ-বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে অশোভন আচরণ করছে মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা পাড়ার ময়মুরুব্বিদের সঙ্গে। ফেইসবুক এবং ইউটিউবের মতো যুগের মোড়লগুলোর কল্যাণে ‘রিভেঞ্জ পর্নো বা প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি ছড়িয়ে পড়ছে। যেন এটিই এখন ধ্যানজ্ঞান কিশোরদের কাছে। এসব দেখে দেখে আবার আরেক দল শিখে নিচ্ছে কীভাবে ঘায়েল করতে হবে নারীদেরকে। বশে না এলে কীভাবে প্রতিশোধ নিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি রপ্ত করছে। শেষ পরিণামে ধর্ষণকারী কিংবা ধর্ষণহত্যাকারী হিসাবে পরিচিতি মিলে।

কিশোর বয়স আমাদেরকেও পাড়ি দিতে হয়েছে। আমরা বুক উঁচিয়ে বলতে পারি, এ ধরনের অনাচারে লিপ্ত হইনি আমরা। তখনকার সময়ের যুব সমাজ কিংবা কিশোর-যুবারা এত বেহায়াপনায় লিপ্ত ছিল না। কালেভদ্রে কেউ পর্নোছবি দেখলেও সেটি আড়ালে-আবডালে বসেই দেখতে হতো।

অবশ্য তখন হাতের কাছে এ ধরণের পর্নোগ্রাফি পাওয়াও যেত না। দেখতে হলে আয়োজন করেই দেখতে হতো। আর সে আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়াতো পাড়ার ময়মুরুব্বিরা। ফলে অনেক সময় বিপথগামী যুবকদের আয়োজন ভেস্তে যেত। সেই ক্ষেত্রে কিশোর বয়সীদের তো প্রশ্নই আসত না। আর হালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুবকদের চেয়ে কিশোররা এগিয়ে আছে বেশি। ইন্টারনেটের অপব্যবহার এর অন্যতম কারণ।

বলতে দ্বিধা নেই খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ আগেও ছিল কিন্তু সেটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েনি। এখন খুন কিংবা ধর্ষণের কৌশল পাল্টেছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা, গণধর্ষণ হচ্ছে।

বছর খানেক আগে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ নজর কেড়েছে আমাদের। আমরা ব্যথিতও হয়েছি সেই সংবাদ পাঠে। রাজধানীর ৭৭ শতাংশ স্কুল পড়ুয়া শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। একটি বেসরকারি সংস্থা ৫০০ শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি শুধু রাজধানীতেই এই জরিপটি চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের জানা মতে রাজধানীর চেয়ে এ ব্যাপারে গ্রামের শিশুরা বেশি এগিয়ে। রাস্তাঘাটে কিংবা ঘরের কোনায় অথবা খোলা মাঠ প্রান্তরে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এ কাজটি-ই করে থাকে সর্বক্ষণ অনেক তরুণ-যুবক। সুযোগটা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ বাবা বা বড়ভাই বাড়ি নেই। তারা বিদেশে থাকেন। ছেলে অথবা ছোট ভাইয়ের জন্য একটি ট্যাব অথবা দামি ফোনসেট পাঠিয়ে দিয়েছেন যেন তার সঙ্গে ইমু বা স্কাইপি’র মাধ্যমে কথা বলতে পারেন। সেটি চিন্তা করেই তারা ভালো দামি সেট পাঠিয়েছেন। আর ছেলে বা ভাই উপযুক্ত কাজটি করছে দামি ফোনসেট ব্যবহার করে যা প্রবাসী মানুষটি ঘুণাক্ষরেও জানেন না।

প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি আমরা যুগের হাওয়া গায়ে না লাগিয়ে পিছিয়ে থাকবো? আমরা ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক ব্যবহার করবো না? কেন নয়। ব্যবহার করবো তবে অবশ্যই ১৮ বছরের নিচে কারো হাতে ফোনসেট দেব না। শিশুর হাতে ফোনসেট দেখলে কৈফিয়ত চাইব।

সেই ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজ সচেতনতা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। শুধু সিম নয়, ১৮ বছরের নিচে কেউ ফোনসেট ব্যবহার করতে পারবে না এমন আইন করা জরুরি। গণমাধ্যমের আশ্রয় নিতে হবে। বিজ্ঞাপন ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করে শিশুদেরকে সতর্ক করতে হবে। মাঝে মধ্যে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি চালাতে পারেন। যেমনটি করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য তল্লাশির ক্ষেত্রে। তাতে করে নৈতিক শৃঙ্খলার কিছুটা হলেও উন্নতি হবে বলে মনে হয়। ঘুণে খাওয়া সমাজটাকে স্বরূপে ফিরিয়ে আনতে না পারলেও অনেকটাই কাজে দিবে শিশুদেরকে ইন্টারনেট তথা ফোনসেট থেকে দূরে রাখতে পারলে।

এখানে যা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করবে বা শিখবে তাতে আপত্তি নেই । আপত্তি হচ্ছে ইন্টারনেটের ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি নজর রাখা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মা-বাবা এবং স্কুল শিক্ষকদের সতর্ক কিংবা সচেতন হতে হবে। শিশুদেরকে বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে হয়তো এ ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

সম্প্রতি দেশের আনাচে কানাচে ধর্ষণ যেন এক মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে ধর্ষণজনিত হত্যা। বিচার চাইলে কিংবা বিচার চাইতে পারে অমন আশঙ্কা হলে ভিকটিমের বিপদ আরো বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তাই পর্নোগ্রাফি, ধর্ষণ তথা সামাজিক অনাচার রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।