ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই; ছোট সে নৌকা...

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আওয়ামী লীগের চারপাশে এখন মাওলানা আর মৌ-লোভীদের ভিড়। বাংলাদেশের মাওলানাদের অনেকেই এখন রাজনীতির সাথে জড়িত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেন অনেকেই। বাংলাদেশে ইসলামিক রাজনৈতিক দলের সংখ্যা কত, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ১২। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নেই। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। নেতা হারিয়ে, নিবন্ধন হারিয়ে দলটি এখন কোনঠাসা।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ইসলামী ভোট যেতো বিএনপির বাক্সে। বিএনপির সাথে জামায়াতের জোট তাই ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে আছে। বিএনপি-জামায়াত জোট ভাঙ্গার অনেক চেষ্টা করেও পারেনি আওয়ামী লীগ। সেটা না পেরে আওয়ামী লীগ ইসলামী ভোট ব্যাংকে ভাগ বসানোর কৌশল নেয়। ২০১৩ সালে যে হেফাজত সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা দখল করতে এসেছিল, তারাই এখন আওয়ামী লীগের পোষ মানা। শুধু হেফাজত নয়, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত বেশির ভাগ ইসলামী দল এখন আওয়ামী লীগের সাথে। তাতে আওয়ামী লীগের লাভ যেটা হয়েছে, আওয়ামী লীগ মানেই ইসলাম বিরোধী, এই ধারণায় বড় ধাক্কা লেগেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি হবে, এই অভিযোগ করার সুযোগও আর থাকছে না।

আবার সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কাছে টানতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। তবে কি ভোটের জন্য আদর্শের সাথে আপস করলো আওয়ামী লীগ? তবে আওয়ামী লীগাররা বলছে, এটা আপস নয়, কৌশল। বিষে বিষ ক্ষয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে 'ইসলাম বিরোধী' তকমা গায়ে লাগিয়ে রাজনীতি করা কঠিন। তবে আওয়ামী লীগের এ কৌশলকে আমার কাছে অপকৌশল মনে হয়।

সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আওয়ামী লীগের এ আপস মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার পথে বড় বাধা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। তবে ইসলামের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো বিরোধ নেই। ইসলাম বরং যার যার ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সমস্যা হলো ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে, মৌলবাদী মতবাদে। সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

এবার আসি ভিড় করা মৌ-লোভীদের কথায়। মৌ-লোভী মানে যারা ক্ষমতার মধুর স্বাদ পেতে আওয়ামী লীগের চারপাশে ভিড় করেছে। এই মৌ-লোভীদের সংখ্যাই বরং বেশি। আওয়ামী লীগের মহাজোটে থাকা দলের সংখ্যা গুনলে ১৫০ ছাড়িয়ে যাবে মনে হয়। ১৪ দল তো আছেই, জাতীয় পার্টির একটা জোট আছে যাতে দলের সংখ্যা ৫৯, যুক্তফ্রন্টেও নামকাওয়াস্তে দল আছে কয়েকটা, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার জোট বিএনএ-তেও অনেকগুলো প্যাডসর্বস্ব দল আছে বলে শোনা যায়, কয়েকদিন আগে একটি ইসলামী জোট হয়েছে। ওবায়দুল কাদের দুদিন আগে জানিয়েছেন, ৩৯ দলের আরো একটি জোট তাদের সঙ্গে থাকতে চায়। যদিও সে জোটের নামটিও মনে করতে পারেননি তিনি। সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন, 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই; ছোট সে তরী...'।

সাথে থাকা সবগুলো দলকে একটি করে আসন দিলেও আওয়ামী লীগের ভাগে কম পড়ে যাবে। আর সবার চাহিদা পূরণ করতে গেলে তো ৬০০ আসনের পার্লামেন্ট বানাতে হবে।

আওয়ামী লীগ মোটামুটি ৭০টি আসন শরিকদের জন্য ছাড়তে রাজি। কিন্তু জাতীয় পার্টি একাই তো চায় ১০০টি। ১৪ দলের শরিকরা গতবার পেয়েছিল ১৫টি আসন। এবার তারা আরো বেশি চায়। তবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং কমার আশঙ্কা আছে। অন্তত নড়াইল-২ আসনে মাশরাফিকে দিলে কপাল পুড়বে ওয়ার্কার্স পার্টির রানিং এমপি শেখ হাফিজুর রহমানের। আমার ধারণা আসন কমলেও ১৪ দলের শরিকদের বুঝিয়ে শান্ত রাখা যাবে। বিকল্পধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকেও হয়তো গোটা পাঁচেক আসন দিয়ে পোষ মানানো যাবে। ইসলামী দলগুলোর জন্যও কয়েকটি আসন রাখতে হবে। কিন্তু সমস্যা হবে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে। চাইলেও ১০০ আসন পাবে না, সেটা তারাও ভালো জানে। কিন্তু তারা অন্তত ৬০টি আসনের জন্য জোর লড়াই করবে। কিন্তু গতবারের চেয়ে আসন বাড়ার সম্ভাবনা খুব কম। বড় জোর ৪০ আসন পেতে পারে জাতীয় পার্টি।

আবার জাতীয় পার্টির মধ্যেও এরশাদ আর রওশন এরশাদের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই আছে। এসব সামাল দেয়া সহজ নয়। গতবার বিএনপি আসেনি বলে আওয়ামী লীগ অনেক উদার হতে পেরেছিল। এবার সে সুযোগ নেই। ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ায় এবার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

আমার ধারণা আওয়ামী লীগের মূল ঝামেলাটা হবে জাতীয় পার্টিকে নিয়েই। এরশাদের মতিগতি বোঝা ভার। গত নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত এরশাদকে সিএমএইচে আটকে রেখে নির্বাচন করতে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে। এবারও যে সুযোগ পেলে পল্টি মারবেন না, তার গ্যারান্টি নেই। আবার ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টিকে দরকার আওয়ামী লীগের। বিএনপি যেমন শত নিন্দা সয়েও রাজাকার জামায়াতকে ছাড়বে না, আওয়ামী লীগ তেমনি স্বৈরাচার জাতীয় পার্টিকে ছাড়বে না। ১৪ দলের শরিকদের ভাবমূর্তি আছে, ভোট নেই। আর জাতীয় পার্টির ভাবমূর্তি নেই, ভোট আছে। বিএনপি+জামায়াতকে মোকাবেলা করতে আওয়ামী লীগ+জাতীয় পার্টি লাগবে। দুই পক্ষের বাকি দলগুলো হলো দুধভাত।

শরিকদের আসন ছাড়তে গিয়ে নিজ দলের ত্যাগী ও সম্ভাবনাময় অনেককে বাদ দিতে হতে পারে। এ নিয়ে দলে নানা অসন্তোষ আছে। কুষ্টিয়ায় মাহবুব-উল আলম হানিফের সাথে জাসদের হাসানুল হক ইনুর যে লড়াই, এমন ছোট ছোট লড়াই আরো অনেক এলাকাতেই আছে। সব ঝামেলা সামাল দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সাথে ভোটের লড়াইয়ে নামা সহজ কাজ নয়। বিএনপির মত আওয়ামী লীগকেও তাই খেলতে হচ্ছে ভারসাম্যের খেলা। এই খেলা কতটা দক্ষতার সাথে খেলতে পারবে, তাতেই লুকিয়ে আছে সাফল্যের সম্ভাবনা।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আরও পড়ুন: বিএনপির ভারসাম্যের রাজনীতি