সভ্যতা, অসভ্যতা, উন্নতি

ছবি: সংগৃহীত

আর্থ-সামাজিক- রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং সুসভ্য হওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অর্থনৈতিক উন্নতিই শুধু সভ্যতার মাপকাঠি নয়। বিশ্বের বহু ধনী দেশের উন্নতি দেখেও কেউ তাদেরকে সভ্য বলে না। এরা পরনির্ভরশীল ও অসভ্য। ধনী হলেও মানবিক মানদণ্ডে দেশগুলো কুখ্যাত।

একটা জাতি কতোটা সৎ, কতোটা বিনম্র, অন্যের প্রতি কতোটা শ্রদ্ধাশীল, কতোটা সহিষ্ণু, কতোটা ভদ্র, পরহিতকারী, অহিংস ইত্যাদি গুণাবলির নিরিখে কোনও জাতির সভ্যতা পরিমাপক করা হয় । টাকা-পয়সা, দালান দিয়ে নয়, সাংস্কৃতিক মান, শিষ্টাচার ও শোভন আচরণ দিয়ে একটি জাতির উচ্চতর অবস্থান নিরূপণ করা হয়ে থাকে।

আমাদের চেনা-জানা অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি। কথা-বার্তা, আচার-আচরণ দিয়ে কোনও দেশের মানুষের মান কেমন তা বোঝা যায়। দেশটি উন্নত না বর্বর, সেটাও জানা যায়। এই পদ্ধতিতে আমরা আমাদেরকেও পরিমাপ করতে পারি। আমরা মানুষ হিসাবে কতটুকু  উন্নত বা অবনত সেটাও টের পেতে পারি।

একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে। আমার এক পরিচিত জন ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি লন্ডনে নতুন চাকরি পেয়েছেন। কোম্পানির হেড অফিসে জয়েন করতে যাবেন তিনি। কিন্তু ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছেন না । কিছুক্ষণ নিজে নিজে চেষ্টা করেও অফিস খুঁজে পেলেন না তিনি।

অবশেষে নিরুপায় হয়ে এক হোটেলের ফ্রন্ট ডোর সিকিউরিটিকে ঠিকানাটা কোথায় জিজ্ঞেস করলেন । একহারা গড়ন দশাসই চেহারার সিকিউরিটি বললেন, 'তুমি উলটো চলে এসেছো। পেছন ঘুরে সোজা হাঁটতে থাকবে, বাঁদিকে দুটো গলির পরের গলিতে ঠিকানা পেয়ে যাবে।'

আমার পরিচিত জন সিকিউরিটির হাত থেকে ঠিকানা লিখা চিঠিটা নিয়ে উলটো ঘুরে হন হন করে হাঁটতে লাগলেন। কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে চিৎকার শুনলেন তিনি, 'এই যে শুনছো, দয়া করে দাঁড়াও।'

পেছন ফিরে তিনি দেখতে পেলেন, ওই সিকিউরিটি তার পেছন পেছন ছুটে আসছেন। অতএব তিনিও দাঁড়িয়ে গেলেন। সিকিউরিটি বিস্মিত চেহারায় তার সামনে এসে বলল, 'তোমাকে সাহায্য করার জন্যে তুমি তো আমাকে "ধন্যবাদ" জানালে না, দয়া করে "ধন্যবাদ" জানাও। আর শোন,  "ধন্যবাদ"  জানানোটা অভ্যাসে আনো।'

বিলাত প্রবাসী আমার পরিচিত ভদ্রলোক এ ঘটনার উল্লেখ করে নিজেই স্বীকার করেন, 'আমার মনে হচ্ছিলো, আমি ভুলে উলঙ্গ অবস্থায় বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে গেছি আর হঠাৎ করেই একঝাক মানুষ আমার সামনে এসে পড়েছে।  আমি এতোটা লজ্জা বোধহয় আর কখনো পাইনি।'

সাধারণ ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের মধ্যে "ধন্যবাদ"  জানানো একটি অপরিহার্য বিষয়। বিষয়টি অতি সাধারণ ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশের মানুষ "ধন্যবাদ" জানানো অভ্যাসে পরিণত করতে পারে নি।

বাংলাদেশে এ অভ্যাসটি মানুষের মধ্যে নেই বললেই চলে। বরং এখানে "ধন্যবাদ" না বলাটা এক ধরণের বাহাদুরি। "ধন্যবাদ" না বলার উন্নাসিকতার মাধ্যমে নিজের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্বরভাবে জাহির করতেই লোকজন পারঙ্গম। 

আমার আরেক বন্ধু মাসুম নোমান জার্মানি প্রবাসী একজন ব্যবসায়ী। সেদেশে ব্যবসা শুরুর দিকের একটি ঘটনা আমাকে বলেছিল। ঘটনাটি তার অফিস কাম ওয়্যারহাউসের। সেখানে এক কালো নাইজিরিয়ান লোডার হিসেবে যোগ দেয়, নাম স্যাম ।

ডেলিভারি বা কাস্টমার সার্ভিস-এর সময়টা ছাড়া বাকী সময়টাতে সে টয়লেট পরিষ্কার করে,  কার্পেট হুবার করে, মাঝে সাঝে চা চাইলেও দেয় । একদিন সকালে বৃষ্টি হচ্ছিলো। মাসুম গাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে দৌড়ে অফিসে ঢুকে পড়ে। অফিসে ঢুকেই টের পায়, তাড়াহুড়োতে সে গাড়িতেই মোবাইল ফেলে এসেছে।

সে সময় স্যাম ওয়্যারহাউসে একটি ডেলিভারি রেডি করছিলো। মাসুম ওকে বললো,  'স্যাম, গাড়ি থেকে আমার মোবাইলটা নিয়ে এসো তো।'

স্যাম কিছুটা বিরক্তি চাহনিতে বলল, 'তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো আমি ব্যস্ত। তুমি নিজেই গাড়ি থেকে মোবাইলটা নিয়ে এসো না কেন। আর অনুগ্রহ করে "প্লিজ" বলাটা শেখো। এটা সাধারণ শিষ্টাচার। এমনকি তোমার স্ত্রী-সন্তানদের সাথেও তাই বলবে।'

মাসুম বাঙালি মালিক। বাঙালিদের অহমের মাত্রা একটু বেশিই। , স্যামের কথাটা তার অহমে ভীষণ লাগলো। কিন্তু সে দেশের বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক নিয়মের কথা ভেবে সে থমকে গিয়ে বরল লজ্জা পেলো। তার মনে হলো, নিজের জন্মসমাজে "প্লিজ" বা "দয়া করে" বলাটা কখনো নিজে বলে নি, অন্য কাউকে বলতেও শুনে নি।

আসলে বাস্তবতা হলো, স্যামতো তার চাকরি সংশ্লিষ্ট কাজই করছে। এজন্যেই সে পারিশ্রমিক পায়। তাকে ব্যক্তিগত কাজে লিপ্ত করা যায় না। আর বিশেষ প্রয়োজনে তা করাতে চাইলেও বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো উচিত। মালিক বা প্রভুসুলভ ব্যবহার করে হুকুম করার সুযোগ নেওয়া চরম বর্বরতা ও ভদ্রতা-শিষ্টাচারের মারাত্মক খেলাফ।

ছোটবেলায় পড়া "কাজের মর্যাদা" শীর্ষক রচনার মূলকথা আমরা কতটুকু মমনে রাখি! পরীক্ষা পাসের জন্য আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি বটে। কিন্তু শিক্ষাটাকে বাস্তব ব্যবহারিক জীবনে শিক্ষণে পরিণত করি না।  শিক্ষাকে শিক্ষণে উন্নীত করতে চর্চার প্রয়োজন। এ চর্চাটারই প্রচণ্ড অভাব আমাদের মধ্যে রয়েছে । স্যাম কিন্তু সাদা ইউরোপীয় নয়,  নাইজেরিয়ান। কিন্তু শিক্ষাটাকে শিক্ষণে পরিণত করেছে বলে আত্মমর্যাদা নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

আমেরিকার আরেকটি ঘটনা। বরফ শীতল বৃষ্টির জলে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে একদিন আমার সে দেশে প্রবাসী বন্ধু আজহারের প্রচণ্ড কাশি হচ্ছিলো। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরারর পথে সে ভাবলো, এক বোতল কফ সিরাপ কিনে বাড়ি ফিরি। সে হাইস্ট্রিটে পার্কিং পাচ্ছিলো না। এক ফার্মেসির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে সোজা কাউন্টারে গিয়ে টিলের মেয়েটিকে বললো,  'আমায় এক বোতল কফ সিরাপ দাও তো।'

টিলের মেয়েটি মহা বিরক্তিতে আজহারের দিকে তাকালো। একই সাথে  আজহারের পাশ থেকে এক বৃদ্ধা বললেন, 'মাফ করবে, মেয়েটি আমাকে সার্ভ করছে, আর আমাকে সার্ভ করা শেষ না হওয়া অবধি তুমি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পারো।'

আজহার ভীষণ ভাবে বিব্রত ও লজ্জিত হলো। দ্রুততার কারণে সে নিয়ম ভেঙেছে ও শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ করেছে, তা টের পেলো। সুরসুর করে সে বৃদ্ধার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে সার্ভ করা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলো।

আজহার দেখলো, টিলের মেয়েটি তখনো তার দিকে বিরক্তি ভরে তাকিয়ে আছে। ফ্রি হওয়ার পর মেয়েটি তাকে  বললো, 'দেখো, একে তো তুমি খুব রুক্ষভাবে আমার কাছে কফ সিরাপ চেয়েছো, সামান্য "প্লিজ"  বলার সৌজন্যটুকু তুমি দেখাও নি, সেটা না হয় আমি ভুলে গেলাম। দ্বিতীয়ত তুমি অভদ্রোচিতভাবে বৃদ্ধাকে ঠেলে সামনে এসে তোমাকে সার্ভ করতে বলেছো, আর এ জন্যে তুমি এখনো ওনাকে "দুঃখিত"  বলোনি, এ খুবই অন্যায়।'

পুরো ঘটনার জন্যে আজহার দুঃখবোধ করছিল। তার মনে হলো, "প্লিজ", "সরি" ইত্যাদি ভদ্রতাসূচক শব্দ ও আচরণ রপ্ত না করলে ভদ্র সমাজে বসবাস করা যায় না। এ গল্পটি দেশে এলে প্রায়ই সে বলে। দোকানে, ব্যাঙ্কে ঠেলাঠেলি করে একজনকে গুঁতিয়ে আরেক জনের সামনের যাওয়ার প্রবণতা দেখে বিস্মিত হয়ে ঘটনাটি জানায় সে পরিচিতদের।

বছর দশেক আগের ঘটনা। ইস্ট লন্ডনে বসবাসকারী আমার বন্ধু ব্যাংক থেকে তেরো হাজার পাউন্ড ক্যাশ তুলে গাড়িতে করে বাড়ি আসার সময় তার গাড়ির ড্যাশ বোর্ড থেকে পুরো টাকাটা খোয়া যায়। এক পূর্ব ইউরোপিয়ান টাকার এনভেলপটি  নিয়ে পালিয়ে যায়। লন্ডন পুলিশকে ব্যাপারটা জানানো হয়। ওরা দীর্ঘদিন ইনভেস্টিগেশন চালায়। লন্ডন পুলিশ মাঝে সাঝে তাকে ফোন করে এটা সেটা জেনে নিত।

পূর্ব ইউরোপের বাসিন্দাদের লন্ডনে ধরা কিছুটা দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ, চুরি শেষে সামান্য চল্লিশ-পঞ্চাশ পাউন্ডের টিকেট কিনে প্লেনে চেপে সোজা নিজের দেশে গিয়ে কিছুদিনের জন্যে ঘাপটি মারে তারা। উপরন্তু,  যে রোডে চুরি হয়েছিলো, সে রোডে সিসি ক্যামেরা ছিল না। ফলে বিশেষ ফল পাওয়া গেলো না।

বছর খানে ইনভেস্টিগেশন চালানোর পর একদিন লন্ডন পুলিশ থেকে জনা চারেক অফিসার আমার ভোক্তভোগী বন্ধুটির বাসায় এলেন।  চা পানে আপ্যায়িত করার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই তারা বললেন, 'এটা পুলিশ বাহিনীর নীতি বিবর্জিত। অফিসিয়াল কাজে এসেছেন তারা। চা খেতে আসেন নি।'

পরের ঘটনাটি ছিল আরও আশ্চর্যের ও অনভিপ্রেত। একজন অফিসার আমার বন্ধুর হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিলেন। তাতে লিখা ছিল, 'লন্ডন পুলিশ টাকা উদ্ধারে সাহায্য করতে না পারা জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী।' পুলিশ অফিসার নিজেও বিনীতভাবে অক্ষমতার জন্যে "ক্ষমা" চাইলেন ।

টাকা ফিরে না পেলেও রীতিমত বিস্মিত ও হতবাক হয়েছিল আমার বন্ধু। এ ধরণের "ক্ষমা" চাওয়ার সংস্কৃতি ও আচরণের কথা সে কল্পনাও করতে পারে নি! সে ভেবেছে, কবে আমরা আমাদের ব্যর্থতা, গর্হিত কাজ, অপরাধ বা অক্ষমতার জন্যে আন্তরিকভাবে "ক্ষমা" চাইতে শিখবো? 

আসলেই তো আমরা এখনো "দয়া করে", "ধন্যবাদ" আর "দুঃখিত"  বলতে শিখলাম না। যাদিও বা বলি, বাধ্য হয়ে বলি। যেদিন মন  ও মনন থেকে "দয়া করে", "ধন্যবাদ" বা " দুঃখিত"  বলতে শিখবো, সেদিন আমাদের দুরবস্থা অনেক বদলে যাবে। আমাদের ব্যর্থতা, গর্হিত কাজ বা অক্ষমতার জন্যে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে শিখলে মানুষ হিসাবে আমরাই উন্নত হবো। সত্যিকার অর্থে ভেতর থেকে এমন আচরণ করতে পারলে আমরা সভ্য হওয়ার দিকে অনেকটাই এগিয়ে যাবো।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

//election count down