অরিত্রীর চলে যাওয়া এবং অনেক কিছু বলে যাওয়া

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪.কম

মেয়েটি নবম শ্রেণীতে পড়ত। বয়স কতই বা হবে, তের কিংবা চৌদ্দ। কেবলই শৈশব পেরোনো কৈশোরোদ্দীপ্ত অরিত্রীর জীবনে স্বপ্নগুলো উঁকি দিতে শুরু করেছে। জীবনটাকে কীভাবে সাজাবে, কীভাবে অগ্রসর হলে স্বপ্নগুলো তার ঠিকানা খুঁজে পাবে – এই বয়সে এই নিয়েই বেশি মাতামাতি চলে। একটু একটু করে পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি নিজের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গাটাও পোক্ত হতে শুরু করে। বলা যায় নরম কোমল মাটির মত করে ভবিষ্যতের সোনালী ফসলের প্রত্যাশায় নিজের মনোজগতকে তৈরি করতে থাকে এই বয়সের সন্তানরা।

এর মধ্যে অনেক প্রতিযোগিতার দেয়াল টপকে একটি ভাল স্কুলে ভর্তি হতে পারা চাট্টেখানি কথা নয়। এমন একটি স্কুলে ভর্তি হতে পারলে স্বপ্নের সিঁড়িগুলো টপকানো অনেক সহজ হয়ে যায় বলেই আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অরিত্রীকে সেই দুঃসাধ্য পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। পথ চলছিল, কিন্তু থেমে গেল, থামতে হল, তার চেয়েও বড় কথা তাঁকে থামিয়ে দেয়া হল।

অরিত্রী চলে গেল মহাকালের মহাযাত্রায়। আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল একটি দুর্গন্ধমাখা, ঘুনেধরা এই সমাজ একটি কৈশরের স্বপ্নকে লালন করতে পারে না। অভিমানী অরিত্রীর ঘৃণা ভরে এমন চলে যাওয়া আমাদের অনেক কিছু বলে দিয়ে গেল। সে ভাষা বুঝার আজ সময় এসেছে, কারণ আমাদের এমন আরও অনেক অনেক অরিত্রী রয়েছে।

বলা হচ্ছে তার প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ কর্তৃক পিতাকে অপমানের কষ্ট থেকে অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। অরিত্রীর বয়সের একজন সন্তান যখন এই বয়সে পিতামাতার মান অপমান বোধ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে তখন তারই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং উপ প্রধান নিজেদের এই পদের জন্য কতটুকু যোগ্য করতে পেরেছেন সেটি একটি গুরুতর প্রশ্ন।

ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষক যারা তারাও তো কোনু না কোনো সন্তানের পিতামাতা। একজন ছাত্রীকে মোবাইল রাখা এবং সেই মোবাইলে নকল রয়েছে – এমন কথিত অভিযোগে বিদ্যালয় ছাড়া করার মত সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে এবং কোনো ছাত্রীর পিতাকে ছাত্রীর সামনে অপমান করার আগে কখনও কি একটিবার নিজেদের সেই জায়গায় দেখার চেষ্টা করেছেন? করেননি, কারণ অর্থ, প্রতিপত্তি আর তথাকথিত প্রভাবে তারা এতটাই বুদ হয়ে আছেন যেখানে তারা এখন আর শিক্ষক নন, কসাই হয়ে গেছেন। সন্তানের সামনে পিতার এমন অপমান হওয়া, তাও আবার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্তৃক! অরিত্রী হয়ত সহসাই অনুধাবন করেছে কী লাভ এই শিক্ষা দিয়ে। যে শিক্ষা নিজের জন্মদাতাকে সম্মান দিতে জানেনা সেই শিক্ষা কিভাবে তার স্বপ্নান্বেষণে সাহায্য করবে।

এখানে আরও একটি কথা থাকে। যুক্তি কিংবা তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই একজন ছাত্রী নকল করছে তাহলে কি এর সব দায় কেবল সেই ছাত্রীর কাধেই গিয়ে পড়বে? বিদ্যালয়ের কি কোনো দায় নেই এখানে? নকলের অভিযোগ উঠলে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিষ্ঠান থেকে বহিস্কার করা হয় সমাজে এমন চাউর করে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারনা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা করা হয়, আমি বলব এটা একটা অসুস্থতা। এমন অসুস্থ প্রতিষ্ঠানের পরিণতি কি হতে পারে অরিত্রী তার কিছুটা দেখিয়ে দিল। এমন বয়সে বিদ্যালয় ছাড়া হয়ে সারাজীবনের জন্য একটি মানসিক ট্রমা নিয়ে তার চলতে হবে? এ কেমন বিচার? সবাই এমন একজন ছাত্রীর দিকে আঙুল তাক করে তামাসা করবে, তার পিতামাতাকে দেখিয়ে অন্য অভিভাবকরা হয়ত সমালোচনা করবেন। এমন একটি অবস্থা যে আসলে কতটা অপমান এবং অসম্মানজনক তা কি আমাদের বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনও ভেবেছেন?

কেবল পাঠ্যপুস্তক নির্ভর শিক্ষা প্রদানই যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে ঘরে বসেও পাঠ্যপুস্তক অধ্যয়ন করে সেই শিক্ষা নেয়া সম্ভব। আমি মনে করি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের সন্তানদের শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নিশ্চিত করা, যার অন্যতম হচ্ছে নৈতিকতা। পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতি-নৈতিকতা, যেখানে সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয় রয়েছে এবং সেই সাথে পুস্তক নির্ভর শিক্ষা এই সব কিছু মিলেই একটি শিক্ষা সম্পন্ন হয়। সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিকতা বিচ্যুতির দায় বহন করতে হবে অবশ্যই। কেন এর দায় কেবলই শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবক বহন করবে। এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।

ভিকারুন্নিসা সম্পর্কে এমন অনেক অভিযোগ রয়েছে যে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে কোচিং করতে হয়। এটা কোন ধরণের নৈতিকতা? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে প্রকাশ্যে কোচিং নামক দোকানদারী করেও এমন প্রতিষ্ঠান বহাল তবিয়তে চলতে থাকার অর্থ হচ্ছে আমাদের জন্য ব্যাপকভাবে আদর্শের নামে আদর্শবিচ্যুতির গর্ত খোঁড়া। আর তাই আমরা হয়ত বারবার চলতে গিয়ে অজান্তে সেই গর্তে পড়ছি।

মনে আছে সরকার ২০১০ সালে শিক্ষানীতি করেছে, যেখানে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। আজ ৮ বছর সময়েও আমরা দেখতে পাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সরকারী বিধান অনুযায়ী বেতনভাতা পেলেও তাদের নিজেদের মত করে বছর বছর করে ভর্তি এবং মাসিক বেতন বাবদ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছে এই টাকা এর কোনো জবাব নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নামে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ অথবা এলাকার প্রভাবশালী নেতৃবর্গ এমন পদে আসীন হবার প্রতিযোগিতায় মত্ত থাকেন যাদের বিদ্যালয় পরিচালনা অথবা সমাজ সেবার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন।

একটি স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ হিসেবে রাজধানীর ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ সকলের কাছেই পরিচিত এবং পিতামাতাদের তাদের সন্তান ভর্তি করাতে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে একটি আরাধনার জায়গা। এই সুযোগে প্রতিষ্ঠানটিসহ এধরণের আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ভর্তি পরীক্ষা কিংবা লটারীতে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির নামে অনেকটা হাকডাক ভর্তিবাণিজ্য চালিয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। ভাল প্রতিষ্ঠান বলতে আমরা যেখানে তাত্ত্বিকভাবে বুঝি সেইসব প্রতিষ্ঠানকে যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কিছু ক্যারিসমা থাকবে, যার মধ্য দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটবে।

বাস্তবে আমরা দেখি এই সকল প্রতিষ্ঠানের ভর্তির ক্ষেত্রে মূল শর্ত হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাবী এবং তাদের চাহিদানুযায়ী গুণাবলী সম্পন্ন হতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের কাজ হচ্ছে সব সেরাগুলোকে এক করে একটি সাইনবোর্ডের নীচে কেবল সমাবেত করা। আর এই নিয়েই ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের মধ্যে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তি করা হলেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে নেয়া হচ্ছে অনেকটা প্রকাশ্যে আর্থিক লেনদেন এবং ডোনেশনের মাধ্যমে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের ইকোনমিক এন্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া এন্ড প্যাসিফিকের (এসকাপ) ৩৬টি দেশের শিক্ষাখাতের সরকারি ব্যয় নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। একমাত্র কম্বোডিয়া আমাদের চেয়ে কম ব্যয় করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশুগলোর সবকটির এই খাতে ব্যয় আমাদের চেয়ে বেশি।

বর্তমান অর্থ বছরের বাজেটে এই শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বাড়ানো হলেও বাজেটের মোট আকারের তুলনায় তা অনেক কম, আমাদের জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা খাতে। এভাবে বছরের পর বছর এই খাতটি এমন অবহেলিত থাকায় ভাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না, ফলতঃ কিছু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের। অরিত্রীর বিদায়ের নেপথ্যের অনেক কারণের এটিও একটি।

সবশেষে, আমরা জানতে পেরেছি যে অরিত্রীর ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যে কোনো ঘটনায় এধরণের তদন্ত কমিটি গঠন একটি নিয়মিত বিষয় হলেও এর প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা এর ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গৃহীত হবার নিয়ম অতটা নিয়মিত নয়। আমি নিঃশঙ্কভাবে বলতে চাই অরিত্রীকে হত্যা করা হয়েছে, আর এর দায় থেকে তার হত্যাকারীদের অব্যাহতির সুযোগ নাই। যদি কেবল প্রতিষ্ঠান প্রধান বা এর সাথে সম্পর্কিতদের চাকুরিচ্যুতির মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, তাহলেও তা যথার্থ হবে না। প্রয়োজন দৃষ্টান্ত স্থাপনের, কারণ ক্ষত বিক্ষত আমাদের এই সমাজ গঠনে অরিত্রীদের আজ ভীষণ দরকার।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

//election count down