Barta24

শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

English

নির্বাচনের পর কে থাকবে, কে পালাবে!

নির্বাচনের পর কে থাকবে, কে পালাবে!
ড. মাহফুজ পারভেজ/ ছবি: বার্তা২৪.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

কথাগুলো খুব উচ্চস্বরে বলা হচ্ছে। হুমকির ভাষায় ঘোষণা করা হচ্ছে, 'নির্বাচনের পর পালানোর পথ পাবেন না'। শক্তি যার যতই থাকুক না কেন, ধমক দিয়ে কথা বলতে কোনো পক্ষই কসুর করছে না। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন হুমকি, পাল্টা হুমকি নতুন নয়। শক্তির রণ হুঙ্কার এ দেশের রাজনীতির মাঠ-ময়দানের অংশ। শুধু কথার শক্তিই নয়, যেখানে যার দাপট বেশি, সেখানে তা বাস্তবে দেখানোও হয়। প্রতিপক্ষকে রক্তাক্ত করতে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না।

এবারও তেমন কথা-বার্তা শোনা যাচ্ছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, নেতাদের কথার ধরন বদলে যাচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে একই ধরনের শক্তির ভাষায় কথা বলছে। এসব উগ্র কথায় পক্ষসমূহের কিছু না হলেও তাতে সাধারণ মানুষের মনে নিশ্চিতভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। 

নির্বাচন বা রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে কারো থাকার বা পালানোর সম্পর্ক থাকতে পারে না। বিষয়টি এমন নয় যে, জনগণ জয়ীকে থাকার আর পরাজিতকে পালিয়ে যাবার ম্যান্ডেট দিচ্ছে। জনগণ শাসনের জন্য কিছু লোককে বেছে নেওয়ার জন্য ভোট দেন। কাউকে থাকার ইজারা বা কাউকে পালিয়ে যাওয়ার ভিসা দেন না।

গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার এই মৌলিক সত্যকে অবজ্ঞা করে কোনো কোনো পক্ষ যখন শক্তির ভাষায় কথা বলে এবং দেশে কে থাকবে আর কে থাকবে না, তার নীতি নির্ধারণ করে, তখন তা শুধু শ্রবণ অশোভনই নয়, নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। 

শক্তি বা হিংসা যে শেষ পর্যন্ত শক্তি ও হিংসার পথই প্রশস্ত করে, তা কারো অজানা নয়। তা জেনেও যারা শক্তি ও হিংসার পথ অনুসরণ করে, তারা প্রকারান্তরে নিজেরই সর্বনাশের কবর রচনা করে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার মাধ্যমে যে অর্জন সম্ভব, তা শক্তি ও হিংসার পথে সম্ভব নয়। শক্তি ও হিংসার পথে কিছু পাওয়া গেলেও তা সম্মানজনক বা স্থায়ী হয় না।

বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের সম্মুখীন। শত সমস্যার পরেও আশার কথা এটাই যে, এবারের নির্বাচনে সকল দলই অংশ নিচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিস্থিতি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যেমন সহায়ক, তেমনিভাবে গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্যেও উপযোগী।

প্রসঙ্গত যে বাস্তবতা মনে রাখা দরকার, তা হলো, উন্নয়নশীল দেশসমূহে নানা রকমের সীমাবদ্ধতার মধ্যে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে চলতে হয়। গণতন্ত্র এসব দেশে ভেতরের ও বাইরের নানা আঘাত ও ষড়যন্ত্রের মুখে থাকে সব সময়ই। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যে দলেরই হোন না কেন, তাদেরকে অতীব সতর্কতার সঙ্গে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার স্থিতির কাজে ব্যাপৃত থাকতে হয়। অরাজনৈতিক, হিংসাত্মক বা শক্তিকলার অনুসরণ তাদের মানায় না। তাদের অপরিণামদর্শী কথা ও আচরণের ফলে তারা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি ডেকে আনেন।

রাজনীতিতে বা নির্বাচনে এমন কথা ও আচরণই কাম্য, যাতে কাউকে থাকতে আর কাউকে পালাতে না হয়। রাজনীতিবিদদেরও উচিত এমনই কথা বলা ও আচরণ করা। সকলে মিলেমিশে থাকার মানসিকতা নিয়ে কাজ করলেই সকলের জন্য মঙ্গল। নচেৎ অপরের ক্ষতির চিন্তা নিজের বিপদ ডেকে আনতে পারে। 

অতএব, সাধু সাবধান!

আপনার মতামত লিখুন :

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গবন্ধুর যে আওয়াজ গণমাধ্যমের কানে আজও পৌঁছেনি

বঙ্গবন্ধুর যে আওয়াজ গণমাধ্যমের কানে আজও পৌঁছেনি
রংপুর জিলা স্কুল মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালের সামনে লেখক

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ১৪ বছর ১৭ দিনের মাথায় আমার জন্ম। আমি এক হতভাগা বাংলাদেশি। জন্মের পর দেখতে পাইনি আমার মাতৃভূমির জনককে। যার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। স্বাধীনতার সেই স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। শুধু শুনেছি মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অপশক্তির তোষামতকারী  ক্ষমতালোভী  ঘাতকরা  তাঁকে বাঁচতে দেয় নি। সেই ঘাতকরা সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা তথা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন বিশ্বাস করতেন না।

বাংলাদেশ নামক শিশু রাষ্ট্রের ৪ বছর পূর্ণ না হতেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সিড়ি বেয়ে পিতার বুক ছিঁড়ে নেমে আসা রক্তের ললাটে ভিজেছে লাল-সবুজ পতাকা। আমি সেই পতাকা দেখেছি। যেখানে জাতির পিতার মুখবয় দেখতে পাই। শুনতে পাই ৭ মার্চ এর সেই ঐতিহাসিক শব্দ উচ্চারণের আওয়াজ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রামের আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

প্রাইমারির গণ্ডি পেরুনোর আগ থেকেই বঙ্গবন্ধুর নাম আর ভাষণ শুনেছি। আমার বাবা ছোট্ট বেলা থেকেই অবসর সময়ে আমাদের পরিবারের সবাইকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের তার স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলোর কথা শোনাতেন। এখনও সময় হলেই বাবার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে জানার চেষ্টা করি। সঙ্গে অবসর পেলেই বইয়ের পাতায় খুঁজি ইতিহাসের মহানায়ককে। তাকে নিয়ে জানার শেষ নেই।

আমি তো জানতাম, বঙ্গবন্ধু মানে মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে জেনেছি পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীসহ তাদের হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মমতা, নির্যাতন, নিপীড়ন আর শোষণের ইতিহাস। শুনেছি স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে উচ্চারিত ৭ মার্চ এর বিশ্বজয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের গীতিবাক্য। আসলে শৈশব বয়স থেকে বঙ্গবন্ধু বলতে শুধুই ৭ মার্চের ভাষণটাই আমার কানে বেজেছে। তার অন্য কোন বক্তব্য বা উচ্চারণ সেভাবে শোনা হয়নি।

সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়ার পর থেকে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সংগ্রাম আর বিপ্লবী উচ্চারণ নিয়ে কিছুটা জানার সুযোগ হয়েছে । বঙ্গবন্ধুর সাথে গণমাধ্যম কর্মীদের যে সখ্যতা ছিলো তাও জেনেছি বই পড়ে।

বই থেকে জানলাম, আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আপনারা সাংবাদিক। আপনাদের স্বার্থরক্ষা করতে হলে আপনারা নিজেরাও আত্মসমালোচনা করুন। আপনারা শিক্ষিত, আপনারা লেখক, আপনারা ভালো মানুষ। আপনারাই বলুন, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। গণতন্ত্রের একটা নীতিমালা আছে। সাংবাদিকতারও একটা নীতিমালা আছে। এ দুটো মনে রাখলে আমরা অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারব।’

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতির জনকের দেয়া দীর্ঘ বক্তৃতার শেষাংশের কথাগুলো আমার খুব বেশি স্মরণ হয়। আমরা গণতন্ত্রের নীতিমালা, সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়ে কথা বলি, অথচ নিজেরাই মানতে চাই না। আর এজন্যই সমস্যা আমাদের পিছু হটছে না।

৪৭ বছর আগে দালাল সাংবাদিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সাংবাদিক সমাজকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। অথচ আজও দালাল সাংবাদিকতা বন্ধ হয়নি। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র চাই, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা চাই না, কারও বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করতেও চাই না। অথচ কোন কাগজে লেখা হয়েছে-‘‘মুসলমানকে রক্ষা করার জন্য সংঘবদ্ধ হও’’। যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আমার দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, এখানে বসে কেউ যদি তার বীজ বপন করতে চান, তাহলে তা কী আপনারা সহ্য করবেন? আপনাদের যে কোন কথা বলবার অধিকার আছে। কিন্তু আপনাদের একটা নীতিমালাও রয়েছে।’

নীতিমালার বাস্তবায়ন ও চর্চা না থাকায় আমাদের সাংবাদিকতার আদর্শ কি হবে তা নিয়েও দ্বি-মতের দ্বন্দ্ব লেগে আছে। যা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভায় এসে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা (সাংবাদিকরা) খবরের কাগজের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি এবং এইসব আদর্শের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, এটাও আপনারা (সাংবাদিকরা) বিশ্বাস করেন।’

আজ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা গণতন্ত্র আর সাংবাদিকতায় নীতিমালার প্রতিফলন বা চর্চা কোনটাই আশানুরূপ দেখতে পাওয়া যায়নি। মনে হয়, জাতির জনকের ৭২’র সেই আওয়াজ আজও পুরোপুরি গণমাধ্যমের কানে পৌঁছেনি। যে কারণে ধর্ম নিরপেক্ষতার বিপরীতে বারবার সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করে। এই অপশক্তির বিনাসে আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে হবে । যেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সাথে মিলে যাবে আমাদের সবার স্বপ্ন। তবেই গণমাধ্যম কর্মীদের আলোর প্রজ্জ্বলন থেকে বইতে শুরু হবে সুবাতাস। আসবে সোলানী দিন। হাসবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

লেখক: স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, রংপুর।

 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র