Barta24

শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

English

দুই প্রধান দলের নির্বাচনী ইশতেহারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

দুই প্রধান দলের নির্বাচনী ইশতেহারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: বার্তা২৪
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

একটি বিষয় গত কিছুদিন ধরে অবাক হয়ে লক্ষ করছিলাম। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার কী হবে সেটা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে কিছুটা ভাবনা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। নির্বাচনের দিন ক্রমেই সন্নিকটে – এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ১৮ ডিসেম্বর তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে।

নবম, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্বালে ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক যে ইশতেহার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছিল, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপিসহ অপরাপর কিছু রাজনৈতিক দলের দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জনের প্রেক্ষাপটে বিগত ১০ বছরে ক্ষমতাসীন দল তাদের ইশতেহার উল্লেখযোগ্য হারে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। আর তাই বর্তমান পরিস্থিতে উন্নয়নের সকল সুচকে বাংলাদেশ ঈর্শ্বনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

বিগত একযুগ সময়ে দেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭শ ৫১ ডলার, বাজেটের আকার বেড়েছে সাড়ে ৭ গুণের বেশি, দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২১ শতাংশে, নিজ অর্থে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে এবছর বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলেছে। এমন পরিস্থিতিতে এবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হল সেটা বর্তমান সরকারের সময়ের উন্নয়নের ধারাবাহিকতারই অংশ বলা যেতে পারে।

এই ইশতেহারের মূলে রয়েছে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়কে আরও বেগবান করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করা, এবং এই লক্ষ্যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য নিয়ে ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ এমন প্রত্যয়কে ধারণ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে আগামী দিনের জন্য তাদের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চায়।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারের বিপরীতে আমরা যদি বিএনপির ইশতেহারের তুলনা করতে যাই তাহলে দেখতে পাব যে তাদের ইশতেহারের পুরোটাই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার একধরণের দুর্বার আকাঙক্ষা থেকে তৈরি করা, যা কার্যত বাস্তবায়ন করা তাদের জন্য খুব কঠিন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক ঘোষিত পুরো ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে তারা এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোটারদের মধ্যে একধরণের বিভ্রান্তি তৈরি করা এবং বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের মুক্তির বিষয়কেই এর মাধ্যমে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন। ইতোমধ্যে দুর্নীতি এবং গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানের সম্মান রক্ষায় ভোট চেয়ে দেয়া ইশতেহার জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবার সম্ভাবনাই বেশি। তারা যদি এক্ষেত্রে বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানের নামটি উহ্য রেখে তাদের আগামী দিনে জনগণের জন্য করণীয়গুলো স্পষ্ট করে মানুষের সামনে তুলে ধরতেন, যা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হয়নি তাহলে জনগণের কাছে এটা মনে হতে পারত যে ব্যক্তি বিশেষের মঙ্গলের চেয়ে বিএনপি জনগণের উন্নয়নের জন্য অধিক মনযোগী।

নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হলে তারা আগামী দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাসহ নির্বাচনকালীন সরকারের অঙ্গীকার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে বর্তমান সময়ের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার ক্ষমতার যে বিভাজন রয়েছে সেটা ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে তখন করা। আর নির্বাচনকালীন সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছেন সেটাও অস্পষ্ট, যা বর্তমান সরকারের সময় তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে নেয়া হলেও এর সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, তাদের ইশতেহার ঘোষণার আগের ফিন ঐক্যফ্রন্টের যে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে তার আলোকে ঐক্যফ্রন্টের অংশ হিসেবে তারা এটিকে তাদের ইশতেহারের অংশ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের সম্মানী ভাতা বৃদ্ধিসহ অপরাপর সুবিধা বৃদ্ধির কথা বললেও চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করেননি। তাদের জোট ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধের কার্যক্রম চলমান থাকবে বলা হলেও তারা সম্ভবত ২০ দলীয় জোটে জামায়াতের শক্ত অবস্থা এবং চাপের কারণে এই বিষয়কে ইশতেহারের আনেননি।

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুটি দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে পথ চললেও সময়ের পরিক্রমায় ৯০ পরবর্তী সময়ে বিএনপি ১০ বছর এবং আওয়ামী লীগ ১৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। তাদের সময়কার রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিসমূহ কতটুকু তারা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল- আমার ধারণা এবারের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভোটাররা সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে দেখবেন। অতীতে নির্বাচনের আগে জনগণের ভোট আকর্ষণে অনেক ধরণের প্রতিশ্রুতই উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগের বিগত ১০ বছর সময় বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই তারা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির পথে হেঁটেছে।

এক্ষেত্রে একটি কথা থেকে যায়, তা হল প্রতিশ্রুতির অনেক কিছুই ক্ষমতার নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদে পূরণ করা সম্ভব হয় না, কিন্তু এখানে জনগণ দেখতে চাইবে নির্বাচিত সরকার তাদের প্রতিশ্রুতিগুলোতে হাত দিয়েছে কি না। এইসব ক্ষেত্রে জনগণ যদি অতীতের সময়ের সরকারের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করতে চান তাহলেও দেখবেন যে এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে অগ্রগামী।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারের দিকে মনযোগ দিলে দেখা যাবে যে তারা বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং তাদের কিছু দলীয় নেতা কর্মীদের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়কে সংযোজন করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চলমান কার্যক্রমকে বাদ দিয়ে বাদবাকি অংশটুকু ঐক্যফ্রন্ট প্রদত্ত ইশতেহারের অনুলিপি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের এধরণের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হতে পারে যে তারা উপরের নির্দেশে কেবল একটি নির্বাচনে দায়সারাভাবে অংশগ্রহণের লক্ষ হিসেবে একটি ইশতেহার দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের এবারের নির্বাচনে আসতে ঐক্যফ্রন্টের যে ছাতিমতলাকে তারা ব্যবহার করেছে, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেখানে ঐক্যফ্রন্টের সাথে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক জায়গায় প্রবল ঘাটতি দেখা গেছে।

এখানে ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল হোসেন কর্তৃক নির্বাচনী ইশতেহারের কোনো প্রয়োজন ছিল কি না সেটা নিয়ে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন থেকে যায়। ঐক্যফ্রন্টের দলগুলো বিএনপির পক্ষ থেকে ছাড় পাওয়া সাকুল্যে ১৯টি আসনে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএনপিকে বাদ দিলে এই ১৯টি আসনে নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে তারা কীভাবে সরকার গঠন করবে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন। আর ঐক্যফ্রন্টের অপরাপর দলগুলো যদি একসাথে ইশতেহার প্রণয়ন এবং ঘোষণা করতে পারে তবে বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপি কেন ঐক্যফ্রন্টের বাইরে আলাদাভাবে তাদের নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করবে?

এর মধ্য দিয়ে যে হিসেবটি সকলের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় তা হচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট আসলে একটি নির্বাচনী ফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের ক্ষমতাসীন হওয়া বা না হওয়া বড় কথা নয়। তাদের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে একট ষরযন্ত্র তত্ত্বের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান ঘটানো। এই লক্ষ্যে পরবর্তী সময়ে বিএনপির হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি তুলে দেবার বিনিময়ে ভাগ বাটোয়ারার বিষয়টিও নিশ্চয়ই রাতের অন্ধকারে নিষ্পত্তি হয়ে রয়েছে।

একটি নির্বাচনী ইশতেহার যে নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কতটা প্রয়োজন সেটা নিশ্চয়ই বিএনপি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে ঐক্যফ্রন্টের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে এই ভেবে যে আগামীতে তাদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ছক অনুযায়ী তারা ক্ষমতাসীন হবে। বারবার আন্দোলন কৌশল পরিবর্তন করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার ব্যতীত নির্বাচনে বিজয়ী হবার যে সংক্ষিপ্ত পথ অন্বেষণ করছেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা আবারও অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে।

এবারও যদি তেমনটা হয় এবং দুদিনের এই ঐক্যফ্রন্টের খেলাও সাঙ্গ হয় তাহলে কি তাদের আত্মরক্ষার আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকবে?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

#ও বন্ধু আমার 🌷 জনাব আবদুল মোনেম। দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট অবকাঠামো, যা আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি, এসবের সিংহভাগেরই নির্মাতা আবদুল মোনেম লিমিটেড তথা জনাব মোনেম। যৌবনের স্বর্ণালী সময়সহ তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন প্রিয় মাতৃভূমির বৃহৎ সব নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে। দেশি বিদেশি সব কন্ট্রাক্টররা যে প্রকল্প তাদের পক্ষে করা অসম্ভব বলেছে, আবদুল মোনেম সাহেব সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন হাসি মুখে। প্রাণান্ত চেষ্টা আর অধ্যাবসায় দিয়ে অসম্ভব সেসব প্রকল্পকে দেখিয়েছেন সাফল্যের মুখ। সমাজ সংসার আত্মীয় পরিজন সব ছেড়ে ছুঁড়ে প্রকল্প এলাকায় কাটিয়েছেন মাসের পর মাস। গলা পর্যন্ত কাদা পানিতে নেমে শ্রমিকদের দেখিয়েছেন কাজের দিশা! তাঁর কোম্পানির প্রকৌশলীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন কিভাবে একজন কর্মবীর আবদুল মোনেম বাস্তবায়ন করে চলেছেন উন্নয়নের পথরেখা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051707738.gif
গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আবদুল মোনেমের (ডানে) সঙ্গে লেখক/ সংগৃহীত


ব্যবসায়ের লাভ লোকসানকে কখনোই গুরুত্ব দেননি জনাব মোনেম। দেশমাতৃকার উন্নতি সবসময় তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে থেকেছে। যে কারণে মুনাফাখোর ব্যবসাদাররা যেখানে মানুষের অশ্রদ্ধার পাত্র হন, জনাব মোনেম সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের আসনে। দিন গেছে, ব্যবসা ডাইভার্সিফাই হয়েছে। বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকাকোলা বা ইগলু’র মতো দুনিয়া জোড়া সুনামের আইসক্রিম ব্র্যান্ড সমৃদ্ধ আবদুল মোনেম লি. এখন পরিণত হয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপে। কয়েক কোটি টাকার টার্নওভারের সেদিনের কোম্পানি এখন হাজার কোটি টাকার কনগ্লোমারেট! কোক ইগলু ছাড়াও বিশ্বের বেশকিছু নামকরা ব্র্যান্ড এখন মোনেম গ্রুপের সঙ্গে পার্টনার। তাই বলে মোনেম ভাই পরিবর্তিত হননি এতটুকু। সেই শুরুতে যেমন নিরহংকারী, দানশীল ও ডাউন টু আর্থ ছিলেন, আজও তেমনই আছেন!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051780819.gif

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে জনাব মোনেমের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক। দেশ বিদেশের অনেক স্টেশন আমরা একসঙ্গে সফর করেছি, একত্রে থেকেছি। সুযোগ হয়েছে পরস্পরকে জানার ও কাছে আসার। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন জনাব আবদুল মোনেম। আমাদের স্বার্থহীন মানবিক সম্পর্ক আজও দ্যুতিময় প্রথম দিনের ঔজ্জ্বল্যেই! এতটা পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি, কিন্তু স্বার্থের কোনো সংঘাত না থাকায় আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে মালিন্য সামান্য মরিচা ধরাতে পারেনি, আলহামদুলিল্লাহ!
পবিত্র ঈদ আল-আদহা’র সালাত আদায়ে গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আমাদের এই হিরণ্ময় সাক্ষাৎ। আল্লাহ সুবহানআহু ওয়াতা’আলা উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় মোনেম ভাইকে সুস্থ ও নেক আমলময় হায়াতে তাইয়েবা দান করুন, আমীন...

লেখক: জাতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র