Alexa

উৎসব ও উৎসবমুখর ভোট

উৎসব ও উৎসবমুখর ভোট

ছবি: বার্তা২৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা একাধিকবার বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে সারাদেশে সরকারি কর্মকর্তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন, রাজনীতিবিদরা প্রস্তুতি নিয়েছেন, ভোটাররাও তাদের প্রস্তুতি নিয়েছেন। দেশের মানুষ উৎসবমুখর নির্বাচন চায়। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতির প্রত্যাশা।’

আমার মতো সাধারণ ভোটাররা বেশ উচ্ছ্বসিত একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আনন্দমুখর পরিবেশে, উৎসবের আমেজে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এমনিতে জাতি হিসেবে আমরা উৎসবপ্রিয়। কথায় আছে, ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ।’ যদিও আমাদের উৎসবগুলোর বেশিরভাগ ধর্মীয়, পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত। সব বাঙালি মিলে পালন করতে পারেন এমন উৎসব বলতে ভোট উৎসবকেই বুঝি।

সময়ের হিসেবে আর মাত্র ৩ দিন। ৩ দিন পর পুরো বাংলাদেশ উৎসবে মাতবে। এটা ভোটের উৎসব। যদিও এখন পর্যন্ত অভিযোগ, ভোটের মাঠ একচেটিয়া আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে। প্রচার-প্রচারণায়ও  তাদের ধারেকাছে নেই বিরোধীরা। এ পরিস্থিতি থেকে কিছু আশঙ্কা ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে ভোটারদের মাঝে, যা ভোট উৎসবে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবে, এখনও যেহেতু সময় আছে, আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি- এ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হবে। ভোটাররা উৎসবের আমেজেই ভোটকেন্দ্রে যাবে।

যেকোনো নির্বাচন আনন্দ ও উৎসবমুখর হবার কথা। অতীতে আমরা এমনটাই দেখেছি। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনতো আরও আনন্দ এবং উৎসবময় হবে এমন প্রত্যাশা থাকে ভোটার ও প্রার্থীদের। একসঙ্গে ২৯৯ আসনে নির্বাচন। বিরাট এক কর্মযজ্ঞ বটে। সারাদেশের মানুষ অধীর আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনায় মেতে আছে। কেননা, এ নির্বাচন প্রতিদিন হয় না। সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে এ নির্বাচন ৫ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। এ দিন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে প্রেরণ করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশপরিচালনার জন্য সংসদে আইন প্রণয়ন করেন। ওই আইন মোতাবেক দেশ পরিচালিত হয়।

সংসদের আইনপ্রণেতারা আজকাল যদিও তাদের এলাকার সবধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করেন। বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দাপটে আজকাল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চুপসে থাকেন। এমপিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কিছু করার থাকে না। অপ্রিয় হলেও সত্য, এমন অলিখিত নিয়মে আমাদের দেশ চলে। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

আসন্ন সংসদ নির্বাচন একটি নতুন কাঠামোর ভেতরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সংঘাতময়। বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, ‘নির্বাচন পরিস্থিতি নৈরাশ্যজনক। তাদের প্রতি হামলা-মামলা হচ্ছে। তারা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।’ গণতন্ত্রের সংজ্ঞানুসারে এমন কিছু হওয়ার কথা নয়। আমরা চাই ভোটের উৎসব, নির্বাচনী আমেজ। এ উৎসবে মেতে উঠবে নতুন ভোটাররা। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর ব্যালট হাতে নিয়ে গোপন কক্ষে সিল মেরে, হাতের আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগিয়ে সদর্পে বের হয়ে এসে বলবে, আমি নতুন ভোটার; আমি আমার নাগরিক অধিকার শান্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করেছি। প্রথম ভোটার হিসেবে আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগানোর স্মৃতি তার মানসপটে দীর্ঘদিন থাকবে। এই আনন্দের শিহরণ ও উপলক্ষ্য যেন কোনোভাবেই বিষাদে পর্যবেসিত না হয়- সেদিকে নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে।

নির্বাচনের আনন্দ-উৎসব শুধু আমাদের দেশে নয়, পুরো বিশ্বেই দেখা যায়। উৎসব তো নির্বাচনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সে হিসেবে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দ ও উৎসবমুখর হবে বলে আমরা আশা করতে পারি। দেশের মানুষ এমনটাই প্রত্যাশা করেন। এটা অবশ্যই বড় কোনো চাওয়া নয়।

যেহেতু নির্বাচন, সেহেতু এখানে জয়-পরাজয় রয়েছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক ভোটাররা। ভোটারদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ কাম্য নয়। সেই সঙ্গে ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন কিংবা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ, মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ দেওয়া অনুচিত। এগুলো বিধিসম্মত নয়। তাহলে ভোট উৎসব হবে না, ভোট আতঙ্ক বয়ে আনবে, ভোটাররা আতঙ্কিত হবে। আর আতঙ্ক মনে রেখে কোনো উৎসব হয় না।

আগেই বলেছি, জাতি হিসেবে আমরা উৎসবপ্রিয়। নানা উপলক্ষে আমরা উৎসব করতে ভালোবাসি, উৎসব খুঁজে বেড়াই; উৎসবের উপলক্ষ্য তৈরি করি। ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক উৎসব ছাপিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যেও আমরা উৎসব খুঁজি। নানা ধরনের মেলা এর প্রমাণবহন করে।

দুই ঈদ, নবান্ন উৎসব, একুশের বইমেলা, বিয়ে, ফ্যামিলি ডে, শীতের পিকনিক ও আনন্দ ভ্রমণের মতো উৎসবগুলোর সঙ্গে প্রায় বাঙালিই একাত্ম। এই উৎসবের সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে- ভোট উৎসব। স্কুলের অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন, বিভিন্ন সংস্থা ও সমিতির নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের নানা পর্যায়ের নির্বাচনে আমরা যে পরিমাণ উৎসবের আমেজ দেখি- তাতে সহজেই এটা বুঝা যায়, বাঙালির নতুন উৎসবের নাম- ভোট উৎসব।

এ উৎসব সকল ধর্মাবলম্বীর, সব বয়সীর, সব গোষ্ঠীর। এখানে কোনো বৈষম্য নেই। কোনো গণ্ডি নেই। দেশবাসীর উৎসবে মেতে উঠার এ এক আশ্চর্য উপলক্ষ্য। এ উৎসবে যেন সবাই সম্মিলিতভাবে অংশ নিতে পারেন- সেটা নিশ্চিত করা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাজ। আমরা আশা করি, এ কাজে তারা তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।

মনে রাখতে হবে, দুর্ভাগ্যক্রমে সম্মিলিত উৎসবের উপলক্ষ্য বাঙালির জীবনে বলতে গেলে একেবারেই অনুপস্থিত। উৎসব অনেক আসে, কিন্তু সেগুলো একেকদিন একেক ধর্মের, ভিন্ন ভিন্ন সমাজের ও নানা গোষ্ঠীর। বিধি-নিষেধ আর নিয়মের বেড়াজালে সেসব উৎসবে সবার অংশগ্রহণ করা হয়ে উঠে না। সেখানে ভোট উৎসবকে একটি সার্বজনীন উৎসব হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। ভোটের দিন, ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া, মারামারি ও রক্তপাত যেন এ উৎসবেকে ম্লান না করে সেদিকে দায়িত্বশীল নাগরিকদের ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

ভোট প্রদানে ধর্মীয় কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তাই ভোট উৎসবে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সাড়ম্বর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠবে বলে বিশ্বাস করি। আমরা চাই, ভোট উৎসব হোক সম্প্রীতির মেলা। এ মেলায় রাজনৈতিক ক্লৈশ মুছে যাবে, পরস্পরে শ্রদ্ধাবোধ অটুট রেখে সমাজ ও দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। মনের উদার্য নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন প্রার্থীরা। তাদের ভালোবাসা ও মহানুভবতায় সমাজে আনন্দ সঞ্চারিত হবে। দেশের উন্নয়নে তাদের আত্মনিবেদন মুগ্ধতা ছড়াবে।

পরিবর্তনের ধারায় মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে নির্বাচনী লড়াইয়ের অবতীর্ণ দল ও প্রার্থীদের ব্যাপক প্রস্তুতি, প্রতিশ্রুতি এবং আয়োজন চোখে পড়ার মতো। ভোটের মাঠের এই বিপুল আয়োজন যেনো কোনোভাবেই কলুষিত না হয় সেটা প্রতিটি নাগরিকের একান্ত চাওয়া।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :