Barta24

বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৯ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

খালেদা-তারেকের ভুলেই বিএনপির এই করুণ পরিণতি

খালেদা-তারেকের ভুলেই বিএনপির এই করুণ পরিণতি
চিররঞ্জন সরকার। ছবি: বার্তা২৪.কম
চিররঞ্জন সরকার


  • Font increase
  • Font Decrease

না, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলে তেমন কোনো ‘চমক’নেই। আওয়ামী লীগসহ মিত্ররা যেমনটি আশা করেছিল, তার চেয়ে ‘ভালো’ ফল তারা পেয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অনেক ‘খারাপ’ফল পেয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বগুড়ায় বেগম খালেদা জিয়ার আসনে জয়ী হয়েছেন বটে। এর বাইরে ঐক্যফ্রন্টের কোনো উল্লেখযোগ্য নেতাই জিততে পারেননি। ‘অনিয়ম ও কারচুপি’র অভিযোগে জামায়াতসহ অনেকেই নির্বাচন থেকে আগেভাগেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

এদিকে আওয়ামী ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ‘ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ’ভাবে হয়েছে বলে দাবি করা হলেও নির্বাচনী সহিংসতায় সারা দেশে অন্তত ১৭ জনের নিহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। এতে বোঝা যায় বিএনপিসহ বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকরা একেবারে নিষ্ক্রীয় ছিলেন না। যেখানে সুযোগ পেয়েছে, সেখানে তারা ঠিকই শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। যদিও সেই ‘শক্তি প্রদর্শন’ কোনো কাজে আসেনি। দলের বিপর্যয় ঠেকাতে সেটা কোনো রকম ভূমিকাই পালন করতে পারেনি।

নির্বাচন শেষে রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃভোটের দাবি তুলেছেন। তিনি নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

ঐক্যফ্রন্টের এই দাবি ধোপে টিকবে বলে মনে হয় না। কারণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু ও অবাধ’ বলেই মনে করছে। দেশের গণমাধ্যমগুলোও এই নির্বাচন নিয়ে তেমন বড় কোনো অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেনি। কোনো কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষকও নির্বাচনকে ‘ভালো’বলেই রায় দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন ‘কিছু অনিয়মসহ’মোটামুটি ভালো নির্বাচন হিসেবেই পরিচিতি পাবে বলে ধরে নেয়া যায়।

এই নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ছিল না, ক্ষমতাসীনরা জেতার জন্য নানা ‘কারসাজি’করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটকে ‘হারিয়ে দিয়েছেন’- একথা যেমন ঠিক, একই সঙ্গে এই ভরাডুবির জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও কম দায়ী নয়। তারা এবারের নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাবই সৃষ্টি করতে পারেনি। ভোটকেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে-একথা যেমন ঠিক, পাশাপাশি তারা অনেক ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারেনি-একথাও তো মিথ্যে নয়। একশ ত্রিশটি আসনে ঐক্যফ্রন্ট বা ধানের শীষের প্রার্থীর কোনো তৎপরতাই ছিল না। আওয়ামী লীগের মতো একটি সুসংগটিত একটি দলের বিপরীতে এভাবে নির্বাচন জেতার আশা বাতুলতা মাত্র!

নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করার পাশাপাশি নিজেদের ত্রুটি-দুর্বলতাগুলোও খুঁজে বের করা দরকার। ঐক্যফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দল বিএনপিকেই নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করা দরকার। দল হিসেবে বিএনপির উপযোগিতা শেষ হয়ে গেছে কি-না-সেটাও মূল্যায়ন করে দেখতে হবে।

বিএনপি দেশের বড় দলগুলোর একটি। সামরিক শাসনের মধ্যে সামরিক শক্তির জোরে ক্ষমতায় এসে সেনাশাসক জিয়া যে দল করেছিলেন, সেই দল ৪০ বছরের জীবনে প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। ১০ বছর ছিল সংসদে প্রধান বিরোধী দলে। কয়েকদিন আগে তারা ঘোষণা দিয়েছিল, বিএনপি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ার জন্য ৪০ হাজার কমিটি করবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি।

একটা পলায়নপর মানসিকতা লক্ষ করা গেছে শুরু থেকেই। পুলিশ-প্রশাসন বিএনপির প্রতি নির্দয় এবং অন্যায় আচরণ করেছে। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এর প্রতিবাদে কখনই সোচ্চার হতে পারেনি। সরকার একতরফা এবং বাধা-বিঘ্ন-প্রতিবাদহীনভাবে বিএনপি দলনের কাজটি করে গেছে। যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিএনপি নেতা তারেক রহমান গ্রেনেড মেরে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছেন, যে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ তিন মাস পেট্রোল-বোমা হামলা করে গোটা দেশকে নরক বানিয়ে ফেলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন, সেই বিএনপিকে বাগে পেয়ে তারা যে চেপে ধরবে-এটা সঙ্গত না হলেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীরা কখনও মাঠে নামেনি। নেতারাও মাঠে নামার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি।

সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, প্রচলিত বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের উচিত, তাদের বাদ দিয়ে দল পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিন্তু বিএনপি সে পথে হাঁটেনি। তারা চেষ্টা করেছে বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে আগলে রাখতে। বহু বিতর্কের নায়ক তারেক রহমান দলের মনোনয়প্রত্যাশীদের বিভিন্ন ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইনে সাক্ষাৎকার পর্যন্ত নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। এটা বিএনপির পক্ষে সমর্থন জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে একটা নৈতিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধা। যে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন হারিয়েছে, দলের শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছে, সেই দলের নেতাদের ধানের শীষে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা করেছে। মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিকারী ব্যক্তি ও দলকে জোটে রেখে, নিজেদের দলীয় প্রতীক তুলে দিয়ে বিএনপি সর্বশেষ আস্থার আসনটি ফেলেছে।

এবারের নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি ছিল উদভ্রান্ত। ভালো প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া, সঠিক সময়ে নির্বাচনের প্রচার শুরু করা, জামায়াত প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা কর্মী-সমর্থকরা পর্যন্ত দলটির আস্থাভাজন ছিল না।

একটু ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে যায় শুধুমাত্র একটি ভুল পদক্ষেপ। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বার বার তেমন ভুলই করেছেন। একটু যদি পেছনে ফিরে তাকালে এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির কারণ বুঝতে সুবিধে হবে। এবারে বিএনপির ভরাডুবির মূলে রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারস বেগম খালেদা জিয়ার অতীত কর্মকাণ্ড।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনি প্রথম যে ভুলটা করলেন তা হল ১৯৯৬ সালে বিরোধীদের (আওয়ামী লীগ ও জামায়াত জোট) দাবিকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রথমে অপছন্দ করে। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে ১৫ই ফেব্রুয়ারি একটি তথাকথিত (৫ই জানুয়ারির অনুরুপ) নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন। শেষপর্যন্ত আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেন। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ হাসিনা ক্ষমতা আসেন।

শেখ হাসিনা তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতাসীন অবস্থায় (১৯৯৬-২০০১) অত্যন্ত সুন্দরভাবে নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তিনি কোনো ধরনের দুরভিসন্ধির আশ্রয় নেননি (২/১ টা ভুল ছাড়া), সুন্দরভাবে কোনো চতুরতা ছাড়াই ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং নির্বাচনে পরাজিত হন।

খালেদা জিয়ার ভুলটা ছিল ২০০৬ সাথে ক্ষমতা ছাড়তে না চাওয়াটা; বিভিন্নভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরবর্তী প্রধানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা (বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো), অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের মতো ‘একজন মেরুদণ্ডহীন’কে নীতিবিরুদ্ধ পন্থায় প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া এবং আজিজের মতো আরেকজন ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করা ইত্যাদি। ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা এবং ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে একটি নীল-নকসার নির্বাচনের চেষ্টা করা।

বেগম খালেদা জিয়ার এটা ছিল একটা মস্ত ভুল। টানা ৫ বছর দেশটাকে লুটেপুটে খেয়ে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান বুঝতে পেরেছিলেন- তারা নিরপেক্ষ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না; এবং এজন্যই চতুরতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় ভুল করেছিলেন গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেয়ার ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করে। এই হামলা খালেদা-তারেক ও বিএনপির প্রতি শেখ হাসিনাকে কঠোর হতে বাধ্য করে।
যা হোক, মোটামুটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হল ২০০৯ সালে অধিকাংশ ভোটারই বিএনপি-জামায়াতের উপর বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নৌকায় ভোট প্রদান করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়। ঘটনাটা এখানে শেষ হতে পারতো। কিন্তু ততদিনে বিষয়টা সত্যি সত্যিই বেগম খালেদা জিয়ার ভুলে তিক্ততায় রূপ নেয়। এবং শেখ হাসিনা তার প্রথম দফা ক্ষমতাসীন থাকাকালে একটা চমৎকার সরকার উপহার দিলেও এই দফায় খালেদা জিয়ার নেতিবাচক উদ্যোগগুলো তাঁর মাথায় ঢুকে যায়। তিনি সতর্ক হয়ে যান। সেনাপ্রভাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে দেশে আসতে বাধা দেয়, তাকে আটক করে জেলে রাখে। কিন্তু শেখ হাসিনা জেল খাটার মতো কোনো অপরাধ করেননি। প্রথম দফা ক্ষমতায় থাকা কালেও না, বিরোধী দল হিসেবে তো নয়ই। তাই তাঁর জেদ চেপে বসে। বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথে হাঁটা শুরু করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বুঝতে পারে- ১৯৯৬-২০০১ টার্মে ভালো থেকে তো কোনো লাভ হলো না; কাজেই আর ভালো থেকে লাভ কি? তিনি ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নেন। এদেশের কিছু মানুষ তাঁর পিতার মৃত্যুতে আনন্দ-উল্লাস করেছিল; সেই ক্ষোভ তো ছিলই, সঙ্গে যোগ হয় ২১ আগস্ট তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও। তাই তিনি ‘বুলডোজার’চালিয়ে দেশ শাসনের নীতি গ্রহণ করেন। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। আইন এবং আদালতকে ব্যবহার করেই তিনি তা করেছেন।

শেখ হাসিনা স্পষ্টই বুঝেছেন, তিনি ভদ্রভাবে দেশ চালালে ক্ষমতায় আসতে পারবেন না; এখন যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়- আবার মন্দের ভালো হিসাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। আর তাহলে ২০০১ সালের মতো আবারও আওয়ামী লীগকে কচুকাটা করা হবে। কাজেই কেন তিনি সেই ‘ভুল’করবেন?

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা তেমন ‘ভুল’আর করেননি। করেননি বলেই এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এমন ত্রিশঙ্কু দশা! কাজেই নির্বাচনের এই হতাশাব্যঞ্জক ফলে কেবল শেখ হাসিনাকে দায়ী করলেই হবে না। বিএনপিকে নিজেদের অতীতকেও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য প্রয়োজনে ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে দোষারোপের পালাতেই কেটে যাবে অনন্ত কাল!

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা ছড়াচ্ছে কারা?

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা ছড়াচ্ছে কারা?
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন। কিন্ত একসঙ্গে মেলালে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ছবি দেখা যায়। মনে হয়, অদৃশ্য কে বা কারা সঙ্গোপনে পুরো সমাজ ও মানুষকে টার্গেট করেছে। সুযোগ পেলেই নানা ছুতায় বা গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করছে।

এমন অরাজকতা ও নৈরাজ্যের সিরিজ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আতঙ্কিত হতে হয়। নিজের জন্য, স্ত্রী, সন্তান, পরিজনের জন্য চিন্তিত হতে হয়। কখন প্রকৃত ছেলে ধরা মুণ্ডু কেটে নিয়ে যাবে, কিংবা ছেলে ধরা বানিয়ে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হবে, কেউ জানে না।

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা দেখা যায় বিপ্লব ও সংঘাতের সময়। চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী 'অ্যা টেল অব টু সিটিজ' যারা পড়েছেন, তারা সেই বিবরণ জানেন।

কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলকভাবেও আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। প্রতিবিপ্লবী, নাশকতাকামী, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কখনো কখনো সুপরিকল্পিত উপায়ে সমাজে ভীতি, আতঙ্ক ছড়িয়ে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে চায় এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে।

নব্য-স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বার্থবাদী মহল অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার পর পর তেমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। মতিঝিলে গণপিটুনিতে যুবক নিহত। শাহবাগে লাশ। আলফাডাঙ্গায় ব্যাংকে হামলা। চাঁদপুরে পাটের গুদামে আগুন। এমন বহু ঘটনা সে সময় ঘটানো হয়েছিল।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশ্য ও গোপন শত্রুদের সেই হামলা ও নাশকতা রুখে দেশ ও জাতি অকুতোভয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে। তবুও শত্রুর আঘাত ও চক্রান্ত মনে হয় থামেনি। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তেমনই ধারণা হচ্ছে।

কারণ, গত কিছুদিন ধরে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ও মৃত্যু সমাজে আতঙ্কের কারণ হয়েছে। প্রথমে ব্যাগে তাজা কর্তিত মস্তকসহ লোক ধরা পড়ল। তারপর ছেলে ধরা সন্দেহে মারা হলো একাধিক নারী ও পুরুষকে। সব ঘটনাকে একসঙ্গে করলে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উদ্দেশ্য ধরা পড়ে। মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বদ মতলব শনাক্ত হয়।

কে বা কারা এসব করছে? কেউ না কেউ অবশ্যই নেপথ্যে রয়েছে। কারণ সমাজে কোনও কিছুই আপনা-আপনি হয় না। এরা কারা? কী তাদের উদ্দেশ্য, যারা এসব হীন কাজ করছে?

উদ্দেশ্য যে ভয়ঙ্কর তা অনুমেয়। একজন মানুষও এগিয়ে এসে যুক্তি দিয়ে দেখছে না, নারী বা পুরুষটি আসলে কে। উন্মত্তদের সামনে কেউ হয়ত দাঁড়ানোর সুযোগও পায়নি। ছেলে ধরা বলে রায় দিয়ে সেখানে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এক জায়গায় নয়, একাধিক স্থানে এমন নৃশংস ও বর্বর ঘটনা ঘটল!

এই প্রবণতা যদি সামাজিক হিংসা ও অসহিষ্ণুতা থেকে হয়, তবে অবশ্যই তা প্রতিরোধ করতে হবে। সমাজে এমন তাণ্ডব ছড়িয়ে গেলে তা মনুষ্য বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। আইন-কানুন, যুক্তি, বিশ্বাস, রীতি-নীতি নির্বাসিত হবে।

আর এই প্রবণতা যদি রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক কারণে হয়, তবে তা মারাত্মক। নৈরাজ্য, অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতার মহামারি শুরু হবে তাহলে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন বিপন্ন হয়ে পড়বে।

কিংবা এই প্রবণতা যদি আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা ও ক্রিমিনাল কার্যক্রম হয়, তবে এর মাধ্যমে সমাজ অপরাধ প্রবণ হবে। ক্রিমিনালাইজেশনের মাধ্যমে অপরাধীরা ক্রমেই সব কিছু তছনছ করে দেবে।

ছেলে ধরা গুজব ও গণপিটুনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র

ঘটনার নেপথ্যে কারণ যা-ই হোক, তাকে চিহ্নিত করতে হবে। সঠিকভাবে খুঁজে বের করতে হবে অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত কার্যকারণ। তারপর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি এ ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও গাফিলতি দেখানো হয়, তাহলে আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতার রাহু সবাইকে গ্রাস করবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

তাজউদ্দীন আহমদ: রাজনীতির সহিষ্ণু আলোয়

তাজউদ্দীন আহমদ: রাজনীতির সহিষ্ণু আলোয়
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ এক ভীন্নধারার মানুষ ছিলেন। তাঁর নীতিবোধ যেমন প্রখর ছিল, জীবনাচরণেও ছিল ঠিক তেমনি পরিমিতিবোধ। রাজনীতিকে তিনি নিয়েছিলেন জনমানুষের কল্যাণ করার পথ হিসেবে। এটা কেবল কথার কথা ছিল না। এর জন্য ছিল তাঁর জীবনভর অনুশীলন।

সেই অনুশীলন কেমন ছিল তার খোঁজ মেলে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির পাতা দেখলে। তাঁর ডায়েরি লেখার একটা বিশেষ স্টাইল ছিল। সকালে কখন ঘুম থেকে উঠছেন, কখন রাতে ঘুমাতে যাচ্ছেন, সেদিনের আবহাওয়া কেমন ছিল এসব থাকত তাঁর ডায়েরিতে নিয়মিত। এর বাইরে প্রতিদিন কার সাথে দেখা হচ্ছে, কী কাজ করছেন তার বয়ানও থাকত। থাকত দেশ বিদেশের উল্লেখযোগ্য রাজনীতির খবর। আর থাকত তেমনতর সব ঘটনা বা বিষয়, যার প্রভাব সাধারণ জনমানুষের জীবনকে প্রভাবিত করত।

তাজউদ্দীন আহমদ খুব অল্প বয়সেই রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন, আবার খুব অল্প বয়সেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক, হেভিওয়েট প্রার্থী ফকির আবদুল মান্নানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেই ঢাকার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখনও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাজউদ্দীন আহমদের রাজনীতি ও জনকল্যাণ ভাবনা কেমন ছিল তাঁর একটা নমুনা হিসেবে ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ডায়েরির তিনদিনের বয়ান এখানে উল্লেখ করা হলো। বলা বাহুল্য তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজিতে ডায়েরি লিখতেন। পরে তাঁর কন্যা সিমিন হোসেন রিমির ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব ডায়েরির বাংলা ভাষান্তর বই হিসেবে বের হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860107428.jpg
তাজউদ্দীন আহমদ

 

১৯৫৪ সালের ডায়েরির সেপ্টেম্বর মাসের ২, ৩ ও ৪ তারিখে তাজউদ্দীন আহমদ ডায়েরিতে লিখছেন-

ক.

২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ বৃহস্পতিবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল ১০টার দিকে ডেপুটি রেঞ্জার সেকান্দার আলী চৌধুরী ডিস্ট্রিক্ট ফরেস্ট অফিসারকে লেখা একটি দরখাস্তের খসড়া নিয়ে এলেন। আমি সেটি পড়ে কিছু সংযোজন এবং সংশোধনীসহ ঠিক করে দিলাম। তিনি ১১টার দিকে চলে গেলেন।

এর মাঝে ঢাকা হোমিওপ্যাথ কলেজে পড়ে সিংহস্রীর একটি ছেলে বন্যার জন্য সাহায্যের পরিচিতিপত্র নিল। সকালে কাপাসিয়ার জনাব আব্দুল জব্বারের ভাই আব্দুস সাহিদ একটি পরিচিতিপত্র নিয়ে গেছে। সে ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। বিকেল সোয়া ৪টায় বের হলাম।

ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটে অল্প কিছুক্ষণের জন্য শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করলাম। ওয়াহেদ এবং শামসুর দাদা সেখানে ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি ক্লাসেই উপস্থিত ছিলাম। রাত ৮টায় হেঁটে বাসায় ফিরলাম। রাত সাড়ে ৯টায় ঘুমাতে গেলাম। গত রাতের মতো আজ রাতেও এখানে কোনো ঝঞ্ঝাটে বহিরাগত নেই। বিরল উদাহরণ।

আবহাওয়া: সারাদিন রোদ ঝলমলে। গত কয়েক দিনের তুলনায় গরম কম। হালকা বাতাসসহ পরিমিত রাত। রাতে হালকা বৃষ্টি।

বি. দ্র. বুড়িগঙ্গা নদীতে এখনও ভালোমাত্রায় জলোস্ফীতি। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ২ থেকে আড়াই ইঞ্চি পানি বাড়ছে। এই বৃদ্ধি সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ রেকর্ডকে বেশ আগেই অতিক্রম করেছে। আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড থেকে প্রায় ১ ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীতেও পানির উচ্চতা বেড়ে চলেছে। তবে আমি এখনও জানি না সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ উচ্চতার রেকর্ড ছাড়িয়েছে কিনা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860202722.jpeg
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ

 

খ.

৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ শুক্রবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল ৮টার দিকে শামসুল হক এলেন। তার সঙ্গে বের হয়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ১ম সাব জজের আদালতে ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলাম।

মফিজউদ্দীন মাস্টার সাহেব ১ম অতিরিক্ত ফৌজদারি জজের আদালতে অন্যতম জুরি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত বার লাইব্রেরি হলে ছিলাম। এরপর বাসায় ফিরে আসি।

বার লাইব্রেরিতে ২৬/১ মদনমোহন বসাক রোডের জলিল, শামসুল হক এবং আমার সঙ্গে প্রথমে কথা বললেন তারপর নাস্তা খাওয়ালেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে আতাউর রহমান খান সাহেব এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। এছাড়াও কামরুদ্দীন সাহেব, আফতাবুদ্দীন ভূইয়া, এস এ রহিম প্রমুখ আমাদের সঙ্গে বসলেন এবং কথা বললেন।

গভর্নর জেনারেল জনাব গোলাম মোহাম্মদের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন জনাব আতাউর রহমান খান। কামরুদ্দীন সাহেব রিলিফের বিষয়ে আলোচনার জন্য সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমাকে ‘ইত্তেফাক’ অফিসে যেতে বললেন।

জনাব কফিলউদ্দীন চৌধুরী সাহেব টেবিলের কিনারে বসেছিলেন। তার সঙ্গে আমার অল্প কথা হয়েছে। এর মধ্যে কফিলউদ্দীন চৌধুরী সাহেবের ক্লার্ক মমতাজউদ্দীন আহমদ জানালেন আমার ডিক্রির বিরুদ্ধে আসিমুদ্দিন আজ মিসকেস করেছে। জলিল গত নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে কামরুদ্দীন সাহেবের সততার বিরুদ্ধে উদাহরণ টেনে অত্যন্ত জোরালোভাবে একজন লোকের উপস্থিতিতে শামসুল হক এবং আমাকে তার বক্তব্য শোনালেন। তার বেশিরভাগ বক্তব্যই মনে হলো অসন্তুষ্ট মনোভাব থেকে তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগকারী হিসেবে সে মোসলেম আলী এমএলএ’র নাম উল্লেখ করলো। ফেরার পথে আমি শামসুল হককে ৪০০ টাকা দেয়ার জন্য বললাম। এই বিষয়ে সন্ধ্যায় ইত্তেফাক অফিসে জানাবে বলে সে কথা দিল।

দুপুর ৩টার দিকে খাবারের পর একটু ঘুমাতে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি প্রহ্লাদপুরের সলিমুল্লাহ একজন রোগীসহ আমাদের বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। এছাড়াও গোসিংগার গনি ফকিরের ছেলেও একজন রোগীসহ বসে আছে। সোনারুয়ার আব্দুল কুদ্দুস এবং অন্য একজনও এসেছেন।

এরা সবাই রাতে আমার এখানে থাকলেন। আব্দুল মোড়লও রাতে এখানে থেকে গেল।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বের হলাম। পূর্ব নির্ধারিত প্রোগ্রাম থাকায় পায়ে হেঁটে রাত ৮টায় ‘ইত্তেফাক’ অফিসে গেলাম। অফিসে একমাত্র মুকুল উপস্থিত ছিল। রাত ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত জনাব আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমেদ সাহেব প্রমুখ কেউ এলেন না।

মোহন মিয়া, নাসিরুদ্দীন সাহেব, লাল মিয়া, সৈয়দ আব্দুর রহিম সেখানে এসেছিলেন। আমি রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ‘ইত্তেফাক’ অফিস থেকে চলে আসি। নবাবপুর রেলওয়ে ক্রসিং পর্যন্ত মুকুল আমার সঙ্গে আসে। রাত সোয়া ১০টায় বাসায় ফিরে আসি।

রাত ১২টায় ঘুমাতে গেলাম।

আবহাওয়া: সারাদিন প্রখর রোদ। গরম দিন। রাতে বাতাস থাকায় খুব বেশি গরম নয়। রাতের শেষ ভাগে বেশ অনেকক্ষণ ভালো বৃষ্টি হয়েছে। সূর্য ওঠার আগে বৃষ্টি থেমে যায়। গতকাল বন্যার পানি এক ইঞ্চি বৃদ্ধি পেয়েছে।

গ.

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ শনিবার

ভোর ৫টায় উঠেছি।

সকাল সাড়ে ৭টায় ফকির সাহাবুদ্দীন এসেছিল ফজলুর কাছ থেকে একটি বইয়ের টাকা নিতে। সকাল সাড়ে ৮টায় সাইকেলে করে বের হলাম। গোসিংগার রহিমুদ্দিন নামের একজনকে ভর্তি করানোর জন্য সোজা মেডিকেল কলেজে গেলাম।

অনেক খোঁজাখুজির পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ডাক্তার আবু সিদ্দিককে পেলাম। তিনি এই রোগীকে প্রফেসর আসিরুদ্দিনের কাছে পাঠালেন। সকাল সাড়ে ১০টায় অ্যাসেম্বলি হাউসে গেলাম। দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত স্টাফদের সঙ্গে কথা বললাম। ডিও নোট পেপার ও খাম কিনলাম। এরপর চলে এলাম।

ডাক্তার আবু সিদ্দিকের সঙ্গে দেখা করলাম। জানলাম প্রফেসর আসিরুদ্দিন রোগীকে ভর্তি হওয়ার জন্য নির্দেশপত্র দিয়েছেন কিন্তু কোনো সিট খালি পাওয়া যাচ্ছে না।

রহিমুদ্দিনকে পরামর্শ দিলাম কিছু দিন পর এসে খোঁজ করতে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলে এলাম। হল ইউনিয়নের সহসভাপতি ইমাজুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করলাম। সে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে। ৯২-ক ধারার আওতায় নিরাপত্তা আইনে তাকে এক মাস আগে বন্দী করা হয়েছিল। ফজলুল হক মুসলিম হলের ১২ নর্থ রুমে আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি। এরপর ইমাজ চলে যায়। আজিজ রুমে ছিল। আমি সোয়া ১টায় বের হয়ে সরাসরি বাসায় ফিরে আসি।

বিকেল ৪টায় বের হলাম।

ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটে শামসুল হকের সঙ্গে দেখা করলাম। সে জানালো আমাকে কথা দেয়া সত্ত্বেও সে আমার জন্য টাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে কিশোর মেডিকেল হলে ডাক্তার করিমের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে মাইক বিক্রির ব্যবস্থা করতে বললাম।

বিকেল সোয়া ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ক্লাস করলাম।

বন্যার কারণে ছাত্রদের ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরতে অসুবিধার কথা বিবেচনা করে সাময়িক একটি ক্লাস কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/23/1563860434524.jpg
বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ

 

বাসে করে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাসায় ফিরলাম। রাত সাড়ে ৮টায় আওয়ামী লীগ অফিসে গেলাম। রাত ৯টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু বৃথা, কেউ-ই এলেন না। বন্যা ত্রাণ কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। গতকাল রাতের মতো আজ রাতেও আমি বৃথাই এখানে সময় কাটালাম। পরে বাসায় ফিরে এলাম। রাত ১১টায় ঘুমাতে গেলাম।

আবহাওয়া: আলোকিত দিন। রাত এবং দিন গরম। রাতের প্রথম ভাগে বাতাস ছিল। কিন্তু তারপর বাতাস থেমে যায়। বাকি রাত ঘাম ঝরানো গরম। গতকাল বুড়িগঙ্গার পানি সামান্য বেড়েছে। ময়মনসিংহ এবং উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহ থেকে পানি সরে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

জনকল্যাণ ভাবনায় রাজনীতি করলে কী রকম প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় তার একটা নমুনা এই ডায়েরিতে আছে। বোঝা যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর সরকার গঠনের মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যে তিনি নিতে পেরেছিলেন সেটা তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনা নয়, এটা তাজউদ্দীন আহমদের পুরো জীবনের রাজনৈতিক অনুশীলনের ফল। তাঁর রাজনৈতিক অধ্যবসায় ও অনুশীলন ছিল বিষ্ময়কর রকম লক্ষ্যভেদি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার সাফল্যজনক নেতৃত্বই সেটা প্রমাণ করেছে।

১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই জন্ম নেয়া তাজউদ্দীন আহমদের ৯৪তম জন্মবার্ষিকীর দিনে তাই মনে হয়, বাংলাদেশকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বড় দেখতে চাই, জনগণের জীবনমানের গুণগত উন্নতি দেখতে চাই, তবে তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত গুণের একটা সামষ্টিক অনুশীলনের চেষ্টা আমাদের চালাতেই হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তার কর্ম ও জীবনকে আরও শক্তিমত্তা এবং সততার সাথে তুলে ধরতে হবে।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক এবং সদস্য, তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র পরিচালনা পর্ষদ

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র