Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

ঐ নতুনের কেতন ওড়ে...

ঐ নতুনের কেতন ওড়ে...
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

টানা তৃতীয় ও মোট চতুর্থ মেয়াদের সরকার গঠনের শুরুটা করলেন শেখ হাসিনা নতুনের ঝান্ডা উড়িয়ে। ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ৩১ জনই যদি নতুন হয়, তাদের মধ্যে ২৭ জন যদি হয় আনকোড়া; তাহলে সে সরকারকে নতুনের ঝান্ডাবাহী বলাই যায়। নতুন মানে শুধু মন্ত্রিসভায় নতুন নয়, বয়সের বিবেচনায়ও অনেককেই আওয়ামী লীগের নতুন প্রজন্ম বলা যায়। তাই নতুন বছরে, নতুন সরকারে, নতুনের আবাহনে, নতুন আশায় বুক বাধাই যায়। তবে স্রেফ বয়স কম হলেই বা নতুন মুখ হলেই সম্ভাবনা বেশি বা আশাবাদী হওয়া যাবে, এমন কোনো কথা নেই। আশার উৎস নিছক নতুনত্ব নয়।

প্রথম কথা হলো, গত ১০ বছরের সরকারে যারা বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত, সমালোচিত; তারা কেউ এবার নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় বারবার জনআবেগের বিপরীতে অবস্থান নেয়া শাজাহান খান সবাইকে খুশি করে বিদায় নিয়েছেন। গম কেলেঙ্কারীর হোতা এডভোকেট কামরুল, প্রশ্নপত্র ফাঁসে প্রশ্নের মুখে পড়া নুরুল ইসলাম নাহিদরা এবার থাকছেন না। এমনকি কথায় কথায় এ এম এ মুহিতের রাবিশ গালিও আর জাতিকে শুনতে হবে না। অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে মুহিতের অবসরে যিনি এসেছেন, তিনি নতুন কিন্তু নতুন নন। ১০ বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের যমজ ভাই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সামলে আসা আ হ ম মুস্তফা কামাল এবার সামলাবেন অর্থ। অসাধারণ মেধার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই লোটাস কামাল নামে পরিচিত এই ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠকের স্বপ্ন ছিল অর্থমন্ত্রী হওয়া।

লোটাস কামালের স্বপ্নের পথে একটাই বাধা ছিল, তার বাড়ি সিলেটে নয়। ৯০এর পর থেকে সাইফুর রহমান, কিবরিয়া, মুহিত- অর্থমন্ত্রীর পদটি যেন সিলেটের লিজ নেয়া। সেই লিজপ্রথা ভেঙ্গে এবার কুমিল্লার লোটাস প্রস্ফুটিত হলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। শপথ নেয়ার আগেই তিনি কঠোর, 'অর্থ মন্ত্রণালয় এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে আর চলবে না। নতুন পরিসরে অর্থ মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করবে। সেখানে আপনার অনেক নতুনত্ব দেখবেন।' সবাইকে আশ্বস্ত করে নয়া অর্থমন্ত্রী বলেছেন, 'আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। আপনারা ঠকবেন না। আমি ব্যর্থও হবো না। মিথ্যা আশ্বাসও দেবো না।' তার এই আত্মবিশ্বাস নিশ্চয়ই নতুন গতি আনবে অর্থনীতিতে। তাই নতুন অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে আশা করাই যায়।

সমালোচিতরা যেমন বাদ পড়েছেন, তেমনি পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন হয়েছে। সম্ভবত আসাদুজ্জামান খান কামাল একমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি বড় কোনো বিতর্ক ছাড়াই মেয়াদ পূরণ করেছেন। মতিন চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী, বাবর, নাসিম, সাহারা, মখা- দল নির্বিশেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানেই বিতর্ক। তাই মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামালকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াই যায়।

প্রথম দফায় শিক্ষা নিয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদের নানান ভাবনা আশাবাদী করেছিল সবাইকে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য ঠেকাতে ব্যর্থতা, পিইসি-জেএসসি নিয়ে সমালোচনায় কপাল পুড়েছে নাহিদের।

আগের মেয়াদে সাফল্যের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলানো ডাঃ দীপু মনি শিক্ষায় নতুন আলো আনবেন, এমন আশা করাই যায়। এই লড়াইয়ে তার যোগ্য সঙ্গী হতে পারেন তরুণ ও মেধাবী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

মতিয়া চৌধুরীর সাফল্য নিয়ে কারো কোনো সংশয় বা প্রশ্ন নেই। হয়তো মতিয়া চৌধুরী তার সামর্থ্যের চূড়াটা ছুঁয়ে ফেলেছেন। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়ে নতুন চিন্তা। ড. আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য পরীক্ষিত সৈনিক। আগের দফায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সাফল্যর ছাপ রাখা ড. রাজ্জাক মাঝের ৫ বছর দলে সক্রিয় ছিলেন, আওয়ামী লীগের এবারের চমৎকার নির্বাচনী ইশতেহারটি প্রণীত হয়েছিল তার নেতৃত্বেই।

চুপচাপ কাজ করে বহাল আছেন আ ক ম মোজাম্মেল ও আনিসুল হক। কোনো ছাপ রাখতে না পারা মুজিবুল হক, শাহজাহান কামালরা যেমন নীরবে বিদায় নিয়েছেন, তেমনি নিরবে কাজ করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে প্রমোশন পেয়েছেন এম এ মান্নান, জাহিদ মালেক স্বপন, নুরুজ্জামান আহমেদ, বীর বাহাদুররা।

আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল সুর ছিল তারুণ্যের শক্তি। আর সেই আকাঙ্খার বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভায় তারুণ্যের জয়গান। সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, নসরুল হামিদ বিপু, শাহরিয়ার আলম, জুনাইদ আহমেদ পলকরা বয়সে এখনও নবীন, কিন্তু তাদের ঝুলিতে পাঁচ বছরের সাফল্য ও অভিজ্ঞতা। এবার তারা দায়িত্বপালনে আরো আত্মবিশ্বাসী হবেন।

তাদের সাথে এবার যুক্ত হচ্ছেন জাহিদ আহসান রাসেল, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ফরহাদ হোসেন, ডাঃ মুরাদ হাসান, ডাঃ এনামুর রহমান, এনামুল হক শামীম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলরা। তার মানে মন্ত্রিসভায় আমরা বেশি করে শুনবো নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ। অনেকে আড়ালে আবডালে কচিকাচার আসর বলে টিকা-টিপ্পনী কাটছেন, কিন্তু মেধাবী তারুণ্যেই তো আমাদের আশা, আমাদের স্বপ্ন। সমাজের সব ক্ষেত্রে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, রাজনীতিতে কেন নয়?

বয়সে নবীন না হলেও শ ম রেজাউল, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, নুরুল মজিদ হুমায়ুন, এ কে আব্দুল মোমেন, শাহাবউদ্দিনদের ভাবনায় নিশ্চয়ই ফ্রেশনেস থাকবে। আর নবীন ও নতুনদের অভিভাবক হিসেবে ফিরে এসেছেন ড. রাজ্জাক, ডাঃ দীপুমনি, ড. হাছান মাহমুদরা।

এবারের মন্ত্রিসভায় এত বেশি চমক যে সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সবচেয়ে কম। ৯০এর পর থেকে দলের মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদকরাই হন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে এই মন্ত্রণালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট; মানে গ্রামীণ অবকাঠামোর চাবিকাঠি স্খানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের হাতে। সংগঠনকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেয়ার বড় আশ্রয় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়। তাই তো ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার, মান্নান ভুইয়া, জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফরাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হন। কিন্তু সৈয়দ আশরাফের নিভৃতচারিতায় এই রেওয়াজে ছেদ পড়ে। সৈয়দ আশরাফকে সরানো হলেও স্খানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থাকে সিনিয়র মন্ত্রী খন্দকার মোমাররফের হাতে। কিন্তু এবার দারুণ চমক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হয়েছেন কুমিল্লার লাকসাম থেকে নির্বাচিত তাজুল ইসলাম। চারবারের এমপি তাজুল ইসলাম গত সংসদে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপরও তাজুল ইসলামের মত একজন স্থানীয় নেতার হাতে স্থানীয় সরকারের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ছেড়ে ধরনের ঝুকি বটে।

তারুণ্যের জয়গান, নতুনদের ফ্রেশনেস আর নানা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেখ হাসিনার চতুর্থ মেয়াদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। শেখ হাসিনা জিতলে বাংলাদেশের লাভ।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র