ঐ নতুনের কেতন ওড়ে...

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪

প্রভাষ আমিন

টানা তৃতীয় ও মোট চতুর্থ মেয়াদের সরকার গঠনের শুরুটা করলেন শেখ হাসিনা নতুনের ঝান্ডা উড়িয়ে। ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ৩১ জনই যদি নতুন হয়, তাদের মধ্যে ২৭ জন যদি হয় আনকোড়া; তাহলে সে সরকারকে নতুনের ঝান্ডাবাহী বলাই যায়। নতুন মানে শুধু মন্ত্রিসভায় নতুন নয়, বয়সের বিবেচনায়ও অনেককেই আওয়ামী লীগের নতুন প্রজন্ম বলা যায়। তাই নতুন বছরে, নতুন সরকারে, নতুনের আবাহনে, নতুন আশায় বুক বাধাই যায়। তবে স্রেফ বয়স কম হলেই বা নতুন মুখ হলেই সম্ভাবনা বেশি বা আশাবাদী হওয়া যাবে, এমন কোনো কথা নেই। আশার উৎস নিছক নতুনত্ব নয়।

প্রথম কথা হলো, গত ১০ বছরের সরকারে যারা বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত, সমালোচিত; তারা কেউ এবার নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় বারবার জনআবেগের বিপরীতে অবস্থান নেয়া শাজাহান খান সবাইকে খুশি করে বিদায় নিয়েছেন। গম কেলেঙ্কারীর হোতা এডভোকেট কামরুল, প্রশ্নপত্র ফাঁসে প্রশ্নের মুখে পড়া নুরুল ইসলাম নাহিদরা এবার থাকছেন না। এমনকি কথায় কথায় এ এম এ মুহিতের রাবিশ গালিও আর জাতিকে শুনতে হবে না। অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে মুহিতের অবসরে যিনি এসেছেন, তিনি নতুন কিন্তু নতুন নন। ১০ বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের যমজ ভাই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সামলে আসা আ হ ম মুস্তফা কামাল এবার সামলাবেন অর্থ। অসাধারণ মেধার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই লোটাস কামাল নামে পরিচিত এই ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠকের স্বপ্ন ছিল অর্থমন্ত্রী হওয়া।

লোটাস কামালের স্বপ্নের পথে একটাই বাধা ছিল, তার বাড়ি সিলেটে নয়। ৯০এর পর থেকে সাইফুর রহমান, কিবরিয়া, মুহিত- অর্থমন্ত্রীর পদটি যেন সিলেটের লিজ নেয়া। সেই লিজপ্রথা ভেঙ্গে এবার কুমিল্লার লোটাস প্রস্ফুটিত হলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। শপথ নেয়ার আগেই তিনি কঠোর, 'অর্থ মন্ত্রণালয় এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে আর চলবে না। নতুন পরিসরে অর্থ মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করবে। সেখানে আপনার অনেক নতুনত্ব দেখবেন।' সবাইকে আশ্বস্ত করে নয়া অর্থমন্ত্রী বলেছেন, 'আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। আপনারা ঠকবেন না। আমি ব্যর্থও হবো না। মিথ্যা আশ্বাসও দেবো না।' তার এই আত্মবিশ্বাস নিশ্চয়ই নতুন গতি আনবে অর্থনীতিতে। তাই নতুন অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে আশা করাই যায়।

সমালোচিতরা যেমন বাদ পড়েছেন, তেমনি পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন হয়েছে। সম্ভবত আসাদুজ্জামান খান কামাল একমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি বড় কোনো বিতর্ক ছাড়াই মেয়াদ পূরণ করেছেন। মতিন চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী, বাবর, নাসিম, সাহারা, মখা- দল নির্বিশেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানেই বিতর্ক। তাই মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামালকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াই যায়।

প্রথম দফায় শিক্ষা নিয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদের নানান ভাবনা আশাবাদী করেছিল সবাইকে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য ঠেকাতে ব্যর্থতা, পিইসি-জেএসসি নিয়ে সমালোচনায় কপাল পুড়েছে নাহিদের।

আগের মেয়াদে সাফল্যের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলানো ডাঃ দীপু মনি শিক্ষায় নতুন আলো আনবেন, এমন আশা করাই যায়। এই লড়াইয়ে তার যোগ্য সঙ্গী হতে পারেন তরুণ ও মেধাবী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

মতিয়া চৌধুরীর সাফল্য নিয়ে কারো কোনো সংশয় বা প্রশ্ন নেই। হয়তো মতিয়া চৌধুরী তার সামর্থ্যের চূড়াটা ছুঁয়ে ফেলেছেন। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়ে নতুন চিন্তা। ড. আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য পরীক্ষিত সৈনিক। আগের দফায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সাফল্যর ছাপ রাখা ড. রাজ্জাক মাঝের ৫ বছর দলে সক্রিয় ছিলেন, আওয়ামী লীগের এবারের চমৎকার নির্বাচনী ইশতেহারটি প্রণীত হয়েছিল তার নেতৃত্বেই।

চুপচাপ কাজ করে বহাল আছেন আ ক ম মোজাম্মেল ও আনিসুল হক। কোনো ছাপ রাখতে না পারা মুজিবুল হক, শাহজাহান কামালরা যেমন নীরবে বিদায় নিয়েছেন, তেমনি নিরবে কাজ করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে প্রমোশন পেয়েছেন এম এ মান্নান, জাহিদ মালেক স্বপন, নুরুজ্জামান আহমেদ, বীর বাহাদুররা।

আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল সুর ছিল তারুণ্যের শক্তি। আর সেই আকাঙ্খার বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভায় তারুণ্যের জয়গান। সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, নসরুল হামিদ বিপু, শাহরিয়ার আলম, জুনাইদ আহমেদ পলকরা বয়সে এখনও নবীন, কিন্তু তাদের ঝুলিতে পাঁচ বছরের সাফল্য ও অভিজ্ঞতা। এবার তারা দায়িত্বপালনে আরো আত্মবিশ্বাসী হবেন।

তাদের সাথে এবার যুক্ত হচ্ছেন জাহিদ আহসান রাসেল, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ফরহাদ হোসেন, ডাঃ মুরাদ হাসান, ডাঃ এনামুর রহমান, এনামুল হক শামীম, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলরা। তার মানে মন্ত্রিসভায় আমরা বেশি করে শুনবো নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ। অনেকে আড়ালে আবডালে কচিকাচার আসর বলে টিকা-টিপ্পনী কাটছেন, কিন্তু মেধাবী তারুণ্যেই তো আমাদের আশা, আমাদের স্বপ্ন। সমাজের সব ক্ষেত্রে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, রাজনীতিতে কেন নয়?

বয়সে নবীন না হলেও শ ম রেজাউল, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, নুরুল মজিদ হুমায়ুন, এ কে আব্দুল মোমেন, শাহাবউদ্দিনদের ভাবনায় নিশ্চয়ই ফ্রেশনেস থাকবে। আর নবীন ও নতুনদের অভিভাবক হিসেবে ফিরে এসেছেন ড. রাজ্জাক, ডাঃ দীপুমনি, ড. হাছান মাহমুদরা।

এবারের মন্ত্রিসভায় এত বেশি চমক যে সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সবচেয়ে কম। ৯০এর পর থেকে দলের মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদকরাই হন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে এই মন্ত্রণালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট; মানে গ্রামীণ অবকাঠামোর চাবিকাঠি স্খানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের হাতে। সংগঠনকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেয়ার বড় আশ্রয় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়। তাই তো ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার, মান্নান ভুইয়া, জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফরাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হন। কিন্তু সৈয়দ আশরাফের নিভৃতচারিতায় এই রেওয়াজে ছেদ পড়ে। সৈয়দ আশরাফকে সরানো হলেও স্খানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থাকে সিনিয়র মন্ত্রী খন্দকার মোমাররফের হাতে। কিন্তু এবার দারুণ চমক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হয়েছেন কুমিল্লার লাকসাম থেকে নির্বাচিত তাজুল ইসলাম। চারবারের এমপি তাজুল ইসলাম গত সংসদে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপরও তাজুল ইসলামের মত একজন স্থানীয় নেতার হাতে স্থানীয় সরকারের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ছেড়ে ধরনের ঝুকি বটে।

তারুণ্যের জয়গান, নতুনদের ফ্রেশনেস আর নানা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেখ হাসিনার চতুর্থ মেয়াদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। শেখ হাসিনা জিতলে বাংলাদেশের লাভ।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

বায়ুদূষণ রোধ করতে হবে

পরিবেশের অন্যতম ও প্রধান উপাদান হলো বায়ু বা বাতাস। যা ছাড়া প্রাণীজগত এক মুহূর্তও বাঁচতে পারে না। সে বাতাস আজ শুধু ...