রাস্তা অবরোধেই কি সমস্যার সমাধান?

রাস্তা অবরোধই শেষ কথা নয়, ছবি: বার্তা২৪.কম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

বছরের প্রথম দিন ‘মালিবাগে বাস চাপায় দুই গার্মেন্টস কর্মী নিহত: রাস্তা অবরোধ-ভাঙচুর-গাড়িতে আগুন’ শিরোনামে সংবাদ লিখতে হয়েছে সংবাদকর্মীদের। সপ্তাহ না পেরুতেই রোববার (৬ জানুয়ারি) সংবাদ লিখতে হয়েছে, ‘উত্তরায় রাস্তা অবরোধ করে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পাঁচ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ।’ আশা করা হয়েছিল, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু না, সোমবারের (৭ জানুয়ারি) সংবাদ, ‘ফের উত্তরায় শ্রমিক-পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, যান চলাচল বন্ধ।’

এভাবে নানা সময়ে দাবি আদায়ের লক্ষে রাস্তা অবরোধ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, এমনকি তাবলিগের সাথীরাও। বিভিন্ন সংগঠনের কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে রাস্তা অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিকভাবে এখন আর হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় না। তবে রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও শক্তির মহড়া দেখানোর রেশ রয়ে গেছে।

ধরা যাক চলমান বিক্ষোভ ও অবরোধের কথা। রোববার (৬ জানুয়ারি) ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করে পোশাক শ্রমিকরা। সকাল থেকে উত্তরা আজমপুর থেকে জসিমউদ্দিন সড়ক পর্যন্ত অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করায় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ উত্তরার পথে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে প্রায় ৬ ঘণ্টা।

বিমান বন্দরগামী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় দুই দিকে সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজট। বিদেশগামী অনেককে মাথায় লাগেজ নিয়ে হেঁটে বিমান বন্দরের দিকে যেতে দেখা গেছে। এমন বিক্ষোভের কারণে ইতোপূর্বে অনেকে ফ্লাইট ধরতে পারেননি। অসুস্থ অনেককে চিকিৎসার জন্য যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি।

রাস্তা অবরোধ মানে অন্তহীন দুর্ভোগ। অতিপ্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া মানুষের ভোগান্তি, সীমাহীন ধকল চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। কিছু হলেই এভাবে রাস্তা অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ। তাদের একটাই প্রশ্ন, এই দুর্ভোগ আর কতকাল পোহাতে হবে?


দেশের প্রধান এই বিমান বন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো প্রবাসী শ্রমিক আসা-যাওয়া করেন। তাদের একটি বড় অংশ আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতই বাধা-ধরা কাজ করেন বিদেশে। তাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের চেয়ে বিদেশে নিয়মকানুন আরও কড়া। এ রকমও হয়েছে ঘরবাড়ি-জমি বন্ধক অথবা বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু সময় মতো কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারায় কাজে যোগ দিতে পারেননি, মানবেতর জীবনযাপন করে অবশেষে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।


বলছিলাম চলমান সড়ক অবরোধ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোর অধিকাংশই বড় বড় রাস্তার পাশে অবস্থিত। কিছু হলেই একযোগে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এর অধিকাংশই হলো বেতন-বোনাস সংক্রান্ত। এখন প্রশ্ন হলো- যে গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের সাথে এমন ছল-চাতুরি করেন, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেন এর কি কোনো সুরাহা হবে না? তারা কি কোনো আইনগত সমাধান নেই? যথাযথ কর্তৃপক্ষ তথা সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি বেশ পুরনো। এটা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। শ্রমিকদের দাবি- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ, মাথাপিছু জাতীয় আয়, দারিদ্রসীমা, পার্শ্ববর্তী দেশের শ্রমিকদের মজুরি, দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং সর্বোপরি তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের কথা বিবেচনা করে ১৬ হাজার টাকা মজুরি।

অপরদিকে গার্মেন্টস মালিকদের যুক্তি- প্রতিনিয়ত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সে তুলনায় বাড়ছে না উৎপাদিত তৈরি পোশাকের দাম। সেই সঙ্গে কমছে তৈরি পোশাকের চাহিদা। এই তিন কারণে কমছে আয়। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেটাতে না পেরে ক্রমশ বন্ধ হচ্ছে দেশের ছোট ও মাঝারি তৈরি পোশাক কারখানা। এমতাবস্থায় মজুরি বৃদ্ধি বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত।

কোনো পক্ষের দাবিই অযৌক্তিক নয়। এ সমস্যা আলোচনার টেবিলে সমাধান করতে হবে। এটাকে রাজপথে টেনে আনলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে, মানুষ বিক্ষুব্ধ হবে। প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের কষ্টার্জিত পোশাক শিল্প।

দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন, কিছু হলেই রাস্তা অবরোধ করতে হবে কেন? কেন ভাঙচুর করতে হবে গাড়ি? বেতন দিচ্ছে না গার্মেন্টস মালিক, কিন্তু দায় নিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ দাবি ও দাবি মানতে হবে, যে দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের অনেকেরই সংশ্লিষ্টতা নেই; তবুও মূল্য দিতে হচ্ছে রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষকে।


সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এভাবে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোন স্বার্থে, কার স্বার্থে? গার্মেন্টেসের বেতন-বোনাস বন্ধ। এ ঘটনায় আমরা অবশ্যই দোষীদের শাস্তি কামনা করি। কিন্তু জনগণকে কোন কারণে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে, এটা বোধগম্য নয়। যাদের কারণে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ, যাদের হেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন- সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি না করে প্রতিবাদ জানানো যেত না? প্রতিবাদ তো শান্তিপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু এভাবে রাস্তা বন্ধ করে কী লাভ? এতে তারা নিজেরাই বা কী পেলেন?


বহু বছর ধরে কিছু হলেই রাস্তা বন্ধ করে গাড়ি-দোকানপাট ভাঙার ঘটনা ঘটছে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্যান্য দেশেও হয়। তাই বলে এই অনিয়ম চলতেই থাকবে এটা হতে পারে না। এটা রীতিমতো ফৌজদারি অপরাধ।

সুতরাং কিছু হলেই রাস্তায় বেরিয়ে আসার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে এবং মালিক পক্ষকেও শ্রমিকদের কথা শুনতে হবে। দাবি আদায়ের জন্য আলোচনার টেবিলকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে, যানবাহন ভেঙে, আগুন জ্বেলে, মারপিট করে কখনও কোনো দাবি আদায়ে সাফল্য আসে না। কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কখনও দাবি আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না।


রাস্তায় বের হওয়া শিক্ষার্থী, কর্মজীবি, অসুস্থ বৃদ্ধ, ছোট বাচ্চা, বিদেশগামী যুবক কিংবা চাকরি পেয়ে প্রথম কর্মস্থলে যাওয়া কোনো ব্যক্তি কোনো আন্দোলনের প্রতিপক্ষ নয়। রাস্তা, গাড়ি কিংবা দোকানপাট দায়ী নয়।


আমরা মনে করি, এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংগঠনকে সক্রিয় হতে হবে। শ্রমিক তথা সাধারণ নাগরিকদের এথেকে বিরত থাকতে হবে। সেই সাথে এর বিরুদ্ধে সচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। একটু সচেতনতা ও সক্রিয়তাই পারে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’

সাধারণত কোনো মানুষের মাতৃভাষাকেই ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ‘প্রথম বা প্রধান ভাষা’ বলা হয়। বিশেষত, যারা একাধিক ভা...

মাতৃভাষা

প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃভাষা ও মনের ভাব প্রকাশের মধ্যে রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। মনের ভাব সবচেয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে প্...