Barta24

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

English

রাস্তা অবরোধেই কি সমস্যার সমাধান?

রাস্তা অবরোধেই কি সমস্যার সমাধান?
রাস্তা অবরোধই শেষ কথা নয়, ছবি: বার্তা২৪.কম
মুফতি এনায়েতুল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

বছরের প্রথম দিন ‘মালিবাগে বাস চাপায় দুই গার্মেন্টস কর্মী নিহত: রাস্তা অবরোধ-ভাঙচুর-গাড়িতে আগুন’ শিরোনামে সংবাদ লিখতে হয়েছে সংবাদকর্মীদের। সপ্তাহ না পেরুতেই রোববার (৬ জানুয়ারি) সংবাদ লিখতে হয়েছে, ‘উত্তরায় রাস্তা অবরোধ করে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পাঁচ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ।’ আশা করা হয়েছিল, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু না, সোমবারের (৭ জানুয়ারি) সংবাদ, ‘ফের উত্তরায় শ্রমিক-পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, যান চলাচল বন্ধ।’

এভাবে নানা সময়ে দাবি আদায়ের লক্ষে রাস্তা অবরোধ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, এমনকি তাবলিগের সাথীরাও। বিভিন্ন সংগঠনের কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে রাস্তা অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিকভাবে এখন আর হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় না। তবে রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও শক্তির মহড়া দেখানোর রেশ রয়ে গেছে।

ধরা যাক চলমান বিক্ষোভ ও অবরোধের কথা। রোববার (৬ জানুয়ারি) ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করে পোশাক শ্রমিকরা। সকাল থেকে উত্তরা আজমপুর থেকে জসিমউদ্দিন সড়ক পর্যন্ত অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করায় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ উত্তরার পথে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে প্রায় ৬ ঘণ্টা।

বিমান বন্দরগামী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় দুই দিকে সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজট। বিদেশগামী অনেককে মাথায় লাগেজ নিয়ে হেঁটে বিমান বন্দরের দিকে যেতে দেখা গেছে। এমন বিক্ষোভের কারণে ইতোপূর্বে অনেকে ফ্লাইট ধরতে পারেননি। অসুস্থ অনেককে চিকিৎসার জন্য যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি।

রাস্তা অবরোধ মানে অন্তহীন দুর্ভোগ। অতিপ্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া মানুষের ভোগান্তি, সীমাহীন ধকল চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। কিছু হলেই এভাবে রাস্তা অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ। তাদের একটাই প্রশ্ন, এই দুর্ভোগ আর কতকাল পোহাতে হবে?


দেশের প্রধান এই বিমান বন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো প্রবাসী শ্রমিক আসা-যাওয়া করেন। তাদের একটি বড় অংশ আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতই বাধা-ধরা কাজ করেন বিদেশে। তাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের চেয়ে বিদেশে নিয়মকানুন আরও কড়া। এ রকমও হয়েছে ঘরবাড়ি-জমি বন্ধক অথবা বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু সময় মতো কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারায় কাজে যোগ দিতে পারেননি, মানবেতর জীবনযাপন করে অবশেষে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।


বলছিলাম চলমান সড়ক অবরোধ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোর অধিকাংশই বড় বড় রাস্তার পাশে অবস্থিত। কিছু হলেই একযোগে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এর অধিকাংশই হলো বেতন-বোনাস সংক্রান্ত। এখন প্রশ্ন হলো- যে গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের সাথে এমন ছল-চাতুরি করেন, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেন এর কি কোনো সুরাহা হবে না? তারা কি কোনো আইনগত সমাধান নেই? যথাযথ কর্তৃপক্ষ তথা সরকার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি বেশ পুরনো। এটা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। শ্রমিকদের দাবি- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ, মাথাপিছু জাতীয় আয়, দারিদ্রসীমা, পার্শ্ববর্তী দেশের শ্রমিকদের মজুরি, দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং সর্বোপরি তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের কথা বিবেচনা করে ১৬ হাজার টাকা মজুরি।

অপরদিকে গার্মেন্টস মালিকদের যুক্তি- প্রতিনিয়ত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সে তুলনায় বাড়ছে না উৎপাদিত তৈরি পোশাকের দাম। সেই সঙ্গে কমছে তৈরি পোশাকের চাহিদা। এই তিন কারণে কমছে আয়। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেটাতে না পেরে ক্রমশ বন্ধ হচ্ছে দেশের ছোট ও মাঝারি তৈরি পোশাক কারখানা। এমতাবস্থায় মজুরি বৃদ্ধি বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত।

কোনো পক্ষের দাবিই অযৌক্তিক নয়। এ সমস্যা আলোচনার টেবিলে সমাধান করতে হবে। এটাকে রাজপথে টেনে আনলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে, মানুষ বিক্ষুব্ধ হবে। প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের কষ্টার্জিত পোশাক শিল্প।

দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন, কিছু হলেই রাস্তা অবরোধ করতে হবে কেন? কেন ভাঙচুর করতে হবে গাড়ি? বেতন দিচ্ছে না গার্মেন্টস মালিক, কিন্তু দায় নিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ দাবি ও দাবি মানতে হবে, যে দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের অনেকেরই সংশ্লিষ্টতা নেই; তবুও মূল্য দিতে হচ্ছে রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষকে।


সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এভাবে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোন স্বার্থে, কার স্বার্থে? গার্মেন্টেসের বেতন-বোনাস বন্ধ। এ ঘটনায় আমরা অবশ্যই দোষীদের শাস্তি কামনা করি। কিন্তু জনগণকে কোন কারণে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে, এটা বোধগম্য নয়। যাদের কারণে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ, যাদের হেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন- সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি না করে প্রতিবাদ জানানো যেত না? প্রতিবাদ তো শান্তিপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু এভাবে রাস্তা বন্ধ করে কী লাভ? এতে তারা নিজেরাই বা কী পেলেন?


বহু বছর ধরে কিছু হলেই রাস্তা বন্ধ করে গাড়ি-দোকানপাট ভাঙার ঘটনা ঘটছে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অন্যান্য দেশেও হয়। তাই বলে এই অনিয়ম চলতেই থাকবে এটা হতে পারে না। এটা রীতিমতো ফৌজদারি অপরাধ।

সুতরাং কিছু হলেই রাস্তায় বেরিয়ে আসার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে এবং মালিক পক্ষকেও শ্রমিকদের কথা শুনতে হবে। দাবি আদায়ের জন্য আলোচনার টেবিলকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে, যানবাহন ভেঙে, আগুন জ্বেলে, মারপিট করে কখনও কোনো দাবি আদায়ে সাফল্য আসে না। কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কখনও দাবি আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না।


রাস্তায় বের হওয়া শিক্ষার্থী, কর্মজীবি, অসুস্থ বৃদ্ধ, ছোট বাচ্চা, বিদেশগামী যুবক কিংবা চাকরি পেয়ে প্রথম কর্মস্থলে যাওয়া কোনো ব্যক্তি কোনো আন্দোলনের প্রতিপক্ষ নয়। রাস্তা, গাড়ি কিংবা দোকানপাট দায়ী নয়।


আমরা মনে করি, এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংগঠনকে সক্রিয় হতে হবে। শ্রমিক তথা সাধারণ নাগরিকদের এথেকে বিরত থাকতে হবে। সেই সাথে এর বিরুদ্ধে সচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। একটু সচেতনতা ও সক্রিয়তাই পারে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

টানা দ্বিতীয়িবারের মত হোঁচট খেল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। গত বছর ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মত প্রত্যাবাসনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রত্যাবাসনের দিন বেঁকে বসেন রোহিঙ্গারা। সে দফায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে গেলে আবার মিয়ানমার সরকারের সম্মতিতে ২২ আগস্ট ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ফলাফল একই, কারণ প্রত্যাবাসনের এই প্রক্রিয়াটি নেওয়া হয় অনেকটা বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারেরে মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন মোতাবেক শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়া কাউকে যে তার সম্মতি ব্যতিরেকে প্রত্যাবাসন করা যায় না সে কথা বোধ হয় আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছি। আরেকটি কথা, শরণার্থী জীবন অভিশাপের শামিল জানা সত্ত্বেও এদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেন নিজ দেশে ফিরতে চান না সেটা রহস্যে ঘেরা। এখানে একটি যৌক্তিক বিষয় হচ্ছে, নিজ দেশে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ফেরত যাবার ব্যাপারে আগ্রহী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর আমরা এটাও জানি যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নাগরিকত্ব বাতিল করলেও বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার বিষয়েই আশ্বস্ত করে এসেছে। কিন্তু এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি, বসতভিটে এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবার বিষয়টি।

তাদের বরাবরের আশ্বাসের পর দুবার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাবার পেছনে আরেকটি বড় কারণ এদেশে কর্মরত বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো। গত ২২ জুন দ্বিতিয়বারের মত এই প্রক্রিয়া ভন্ডুল হবার পর জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সব সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম মনিটর করার সুপারিশ জানানো হয়।

কথিত রয়েছে যে এদেশে কর্মরত এনজিওগুলো বারবার এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এর আগেরবারও যখন এই প্রত্যাবাসন বাঁধাগ্রস্ত হয়েছিল সেদিনও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও এসব এনজিওর কার্যক্রমের যথাযথ মনিটরিং সম্ভব হয়নি। কিছুদিন আগে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, এনজিওগুলো ‘ইল মোটিভ’ নিয়ে কাজ করছে।

পরপর দ্বিতীয়বারের মত এই প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হবার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবারও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আশাবাদ জানানো হলেও পরিস্থিতি এখন কিন্তু আসলে জটিল আকার ধারণ করছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে। আর এই ষড়যন্ত্রের মূল হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এক্ষেত্রে যতটুকু না আন্তর্জাতিক মহল যুক্ত তার চেয়ে বেশি যুক্ত আভ্যন্তরীণ কর্মকগুলো। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এক সমূহ দুর্যোগের সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ।

কিছুদিন আগে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে মিয়ানমার সরকার যদি প্রতিদিন ৩০০ জন করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়, তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে ৭ বছর, আর এই সময়ে খরচ হবে ৪৪৩ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করতে ৬ হাজার একর বনভূমি উজার করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে বনভূমি এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েই চলছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সাময়িকভাবে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশি এবং বিদেশি এনজিওগুলো কর্তৃক রোহিঙ্গাদের এ বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার কারণে। এক কথায় সরকারের বর্তমান তৎপরতায় এক ধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে, যা আমাদেরও দারুণভাবে চিন্তিত করে তুলছে।

অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে তা থেকে মনে হচ্ছে, এই সমস্যা সহজে মেটার নয়। আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ত্রাণ সহায়তা দিলেও এই সহায়তা দীর্ঘকালীন সময় ধরে চলবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতোমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের কাজটি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা করে থাকে এবং এই খাতে তাদের প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার।

এই অবস্থায় আমরা যদি নিকট ভবিষ্যতে এসব দাতাগোষ্ঠীকে পিছু হটে যেতে দেখি তবে অবাক হবার কিছু থাকবে না। তাই দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। এখানে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলেও মনে হচ্ছে না, কারণ মিয়ানমার নামমাত্র সংখ্যক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। দরকার তাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘সেইফ হোম’ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে যৌথ নজরদারী এবং সেই সঙ্গে এনজিওগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে প্রত্যাবাসনের স্বার্থে জাতিসংঘ ব্যতীত অপরাপর এনজিওগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাব বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র