উপেক্ষার মাধ্যমেও উচিত শিক্ষা দেয়া যায়

চিররঞ্জন সরকার
চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪.কম

চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাত্মা গান্ধী সমাজে অহিংসার বাণী প্রচার করেছেন। তিনি ভালোবাসা দিয়ে সব কিছু জয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। গান্ধীজীর মত মানলে, কেউ যদি ডান গালে চড় মারে তাহলে ডান গাল পেতে দেবে। এর ফলে এক সময় তার ক্রোধ কমে আসবে। সে আর মারমুখী হবে না। পক্ষান্তরে কেউ যদি মারের বদলে মার দিতে চায়, তাহলে মারামারি চলতেই থাকবে। উভয়ের মধ্যে হিংসা সঞ্চারিত হবে। এই হিংসা প্রতিশোধস্পৃহা বাড়িয়ে দেবে। মারামারি-খুনোখুনির মাধ্যমে এর পরিণতি নির্ধারণ হবে। তবে তাতেও মারামারি-খুনোখুনি শেষ হবে না। যে মার খাবে, পরাজিত হবে, সে আবার শক্তিসঞ্চয় করে প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটা চলতেই থাকবে।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে গান্ধীজী খুব একটা পছন্দ করেননি। কারণ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিপ্লব করতে হয়। বিপ্লবে রক্তপাতের প্রয়োজন হয়। শ্রেণিশত্রু ‘খতম’ করে মেহনতি মানুষের শাসন কায়েম করতে হয়। এখানেই গান্ধীজীর প্রবল আপত্তি। তিনি বিপ্লব, রক্তপাত, খুন, খতম—এসব ভীষণ অপছন্দ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে কখনও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।


হিংসা কেবলই হিংসার জন্ম দেয়। পুঁজিপতি বা বড়লোক বা শোষকদের প্রতি হিংসাপ্রবণ হয়ে মেহনতি মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা কখনও সফল হতে পারে না। কারণ বড়লোকরাও মানুষ। তাদের খতম করার অভিপ্রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে স্থায়ী হিংসার বীজ বপন করা হয়। বড়লোকের আত্মীয়-স্বজন বংশধররা প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে থাকে। সুযোগ পেলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবে সমাজে হানাহানি-মারামারি ক্রনিক চলতেই থাকে। এর বদলে গান্ধীজী চেয়েছেন অহিংস নীতি প্রতিষ্ঠা করতে। অহিংসা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সাম্যের সমাজ গড়তে!


গান্ধীজী ভারতবর্ষসহ দুনিয়াজুড়ে পূজনীয় হলেও তার মত তেমন কেউ গ্রহণ করেননি। সারাজীবন অহিংসার বাণী প্রচার করলেও তিনি নিজে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। অর্থাৎ হিংসার বলি হয়েছেন!

দুনিয়ার মানুষগুলো বড়ই বিচিত্র। কে যে কার বাণী গ্রহণ করবেন, আর কী আচরণ করবেন তা আগেভাগে ঠাহর করা যায় না। তবে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ গান্ধীজীর মতের বিপরীতটাকেই পছন্দ করেছেন বেশি। অহিংসা নয়, হিংসাকেই বেছে নিয়েছেন জীবনের আদর্শ হিসেবে। প্রেম-ভালোবাসা নয়, হিংসা, হানাহানি-মারামারি, গালাগাল প্রতিশোধ—এগুলোই হচ্ছে এখন মানবজাতির একমাত্র সাধনা।

একজন যদি একটা গালি দেয়, অপরজন কমপক্ষে তিনটে গালি দিয়ে তার প্রতিশোধ নিতে চায়। কাউকে আপনি থাপ্পড় দিলে সে কয়েক ঘা থাপ্পড় কিল-ঘুষিসহ ফিরিয়ে দেয়ার আন্তরিক চেষ্টা করে। আমরা সবাই যেন গোলের খেলায় মেতেছি। গোল হলে যেকোনো মূল্যে তা পরিশোধ করতে হবে। এক গোল খেলে পাঁচ গোল দিয়ে প্রতিশোধ নিতে হবে।

কিন্তু ইটের জবাব সবসময় পাটকেলে দিতে নেই, উপেক্ষা করতেও জানতে হয়। উপক্ষো করতে না জানলে দীর্ঘদিন নিরুদ্বেগে কাটানো যায় না। কেবলই খেয়োখেয়ি মারামারি করে কতক্ষণ আর টিকে থাকে যায়?

ব্রিটিশরা কিন্তু অনেক কিছু উপক্ষো করে থাকতে পারতেন। তাতে করে দুইশ বছর শান্তিতে শাসন করে গেছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে আমাদের শাসকদের সবথেকে বড় সমস্যা হল, তাদের অভিধানে ‘উপেক্ষা’ শব্দটি একেবারেই নেই। আর এরই ফায়দা নিচ্ছে সুচতুর ষড়যন্ত্রকারী শক্তি।

আমাদের শাসকরা ভয়ানক প্রতিক্রিয়াশীল। তারা কেবলই শিক্ষা দিতে চায়। কেউ যদি সামান্য মুখ ভেংচি কাটে অমনি তারা ইট-পাটকেল হাতে তেড়ে যায়। এই ‘টিট ফর ট্যাট’ নীতি কখনও কখনও খুব কার্যকরী হয়; কিন্তু কখনও কখনও অকারণ বিপত্তিও ডেকে আনে।


অপরিণামদর্শী আচরণ দিয়ে এমন সব ব্যক্তি ও দলকে খুঁচিয়ে-ক্ষেপিয়ে প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে যে, তারা এখন রীতিমতো একটা পরাশক্তি। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক নীতি অবলম্বনের ফলে আদতে যেটা হচ্ছে তা হল, যে ব্যক্তি বা দলটিকে কাল দেশের কেউ চিনত না, কেউ নামও জানত জানত না, সে আজ খুব অল্পেই পেয়ে যাচ্ছে অপ্রাপ্য ফুটেজ। উপেক্ষা করলে যে ইঁদুর হয়ে থাকত, ঝগড়া-তর্ক করে কোমরে দড়ি বেঁধে আদালতে নিয়ে তাকেই দেয়া হচ্ছে বাঘের মর্যাদা।


তুমি এক গোল দিলে আমি দেবো পালটা আর এক গোল । মুশকিল হল, এই খেলাটার কোনো শেষ নেই । আর মজা হল, প্রতিপক্ষরা নিজের লাইন অব অ্যাকশন থেকে এতটুকু বিচ্যূত হচ্ছে না; কিন্তু সুকৌশলে ক্ষমতাসীনদের ক্ষেপিয়ে শামিল করে নিচ্ছে এই খেলায় । অনেক সময় প্রতিপক্ষ যেমন ডুগডুগি বাজাচ্ছেন, ক্ষমতাসীনরা ঠিক তেমনই বাঁদরনাচ নাচছেন!

তাদের কে বোঝাবে সব সময় কথার হুল ফুটিয়ে, মেরে-কেটেই কেবল নয়, উপেক্ষার মাধ্যমেও উচিত শিক্ষা দেয়া যায়!

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :