Alexa
independent day 2019

শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা

শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা

মন্ত্রীদের বাসে করে টুঙ্গিপাড়ায় যাত্রা, ছবি: সংগৃহীত

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম

বাংলাদেশে তো বটেই, উপমহাদেশে এমন ঘটনা বিরল। উপমহাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক তারকা-সম মন্ত্রীরা কখনোই সাধারণ গণপরিবহণ তথা বাসে চড়েন না। তারা যাওয়া-আসা করেন ব্যক্তিগত দামি গাড়িতে। বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরায়। পুলিশ প্রটোকল ও প্রটেকশনে বিরাট লটবহর পেছনে নিয়ে তারা চলেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। লাল বাতি জ্বালিয়ে হুইসেল বাজাতে বাজাতে মন্ত্রীদের চলাচল বাংলাদেশের মানুষ দেখে এসেছে।

সেই গতানুগতিক ধারায় বিরাট ব্যত্যয় ঘটলো এবার। চতুর্থ বার নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছিলেন মাটি ও মানুষের সঙ্গে থাকতে। নেত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মন্ত্রীরাও গণমানুষের কাছে এবং এলাকা ও মাটির পাশে থাকার অঙ্গীকার জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রার মাধ্যমে নেতাদের জনসম্পৃক্ত থাকার নগদ প্রমাণ পাওয়া গেল।

বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করলো শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ঐতিহাসিক বাসযাত্রার মাধ্যমে শপথ গ্রহণের পরদিন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের গমনের ঘটনাটি চিহ্নিত হয়েছে অভিনব ও উদ্দীপক প্রসঙ্গ রূপে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) সকালে ধানমন্ডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তারা সাভারে গিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য বরাদ্দ পতাকাওয়ালা গাড়ি সোমবার (৭ জানুয়ারি) শপথের আগেই তাদের ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছিল। তবে সাভারে যাওয়ার সময় সেই গাড়ি সঙ্গে নেননি তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া মন্ত্রিসভার বাকি ৪৬ সদস্যকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে সাভারে নিয়ে যাওয়া হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চারটি মিনিবাসে করে। স্মৃতিসৌধ থেকে বাসে করেই তারা ঢাকায় ফিরে সংসদ ভবনে নামেন। আসন সঙ্কুলান না হওয়ায় বাসের দুই সারি আসনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় বাড়তি আসন জুড়েও বসতে হয় কয়েকজনকে।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা মিডিয়াকে জানান, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই আমরা বাসে করে গিয়ে আবার বাসে করে ফিরেছি। আগামীকালও আমরা বাসে করেই টুঙ্গীপাড়া যাব বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে।’

বাংলাদেশের মন্ত্রীরা প্রটোকলের সুবিধা পেয়ে বিভিন্ন সময়ে উল্টোপথে গাড়ি নিয়ে গিয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। মন্ত্রীর গাড়ি চলাচলের জন্য ছাত্র-ছাত্রী ও রোগীদের ভোগান্তির খবরও কখনো কখনো সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। মন্ত্রিসভার সব সদস্যের একসঙ্গে বাসে চড়ে কোথাও যাওয়ার এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। সম্ভবত উপমহাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রেও ঘটনাটি উদাহরণ সৃষ্টিকারী।

ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তার দেশে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীকে বাসে, ট্রেনে বসে বা দাঁড়িয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইন দিয়ে হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক বা সরকারি অফিসের সারতেও দেখা গেছে মন্ত্রী, এমপিদের। এমন খবর ও ছবি দেখে মানুষ অবাক হয়েছে। ভেবেছে, বাংলাদেশে এমন চিত্র কবে দেখা যাবে!

ঠিক সে রকমের না হলেও শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা তেমনই একটি পজিটিভ এবং প্রো-পিপল ইমেজ তৈরি করেছে। উপনিবেশিক শাসনের কু-অভিজ্ঞতায় জর্জরিত দেশে মন্ত্রীদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা ভেঙে জনতার কাতারে দাঁড় করানোর একটি সাহসী-প্রতীকী পদক্ষেপ বলা যায় এই ঘটনাকে। সন্দেহ নেই, জনসেবকদের জনবাহনে চড়ার দৃষ্টান্ত তাদেরকে আরও জনসম্পৃক্ততার বন্ধনে আবদ্ধ করবে। মন্ত্রী বা কর্তাদের আরও অনেক বেশি জনতার কাছাকাছি নিয়ে আসবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী, কুশলী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণেই এমনটি সম্ভব হয়েছে। চতুর্থ বার নির্বাচিত হয়ে তিনি তার মন্ত্রীদের দম্ভ বা অহংকার নয়, মানুষের কাছাকাছি থাকার শিক্ষাই দিলেন। নবনিযুক্ত মন্ত্রীরাও জনতার কাছাকাছি থাকার প্রত্যয় স-প্রমাণিত করলেন।

এই ঘটনাটি সামান্য হলেও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ। শপথের পর পর এমন পদক্ষেপ মন্ত্রীদের আগামী দিনগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দম্ভ ও ক্ষমতার বাগাড়ম্বের বাইরে থাকার প্রণোদনা দেবে। পাশাপাশি কৃচ্ছ্বতার একটি মানসিকতাও মন্ত্রিমণ্ডলীর মধ্যে তৈরি করবে। স্মৃতিসৌধে সকল মন্ত্রী নিজ নিজ গাড়ি ও পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে যাতায়াত করলে শতাধিক গাড়ির যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হতো, কয়েকটি বাসে তা খুব সামান্যই হয়েছে। তদুপরি মন্ত্রিসভার সদস্যদের একাধিক গাড়ির বহর যানজট আকীর্ণ রাস্তায় নামলে জনদুর্ভোগ ও পথকষ্ট বহুলাংশে বৃদ্ধি পেতো। শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা শুধু একটি ভালো ও ইতিবাচক দৃষ্টান্তই নয়, অনেকগুলো সমস্যা কমিয়ে দেওয়ার মতো একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপও বটে।

একটানা তিন বার সহ মোট চার বার বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নতুন কার্যক্রম শুরুর দিকেই সাহসী ও বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার যোগ্যতা দেখিয়েছেন। মন্ত্রিসভাকে বাসে চড়ানোর আগেই তিনি বেছে বেছে এমন এলাকা থেকে মন্ত্রী করেছেন, যেখানে উন্নয়নের আলো যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছায় নি। এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী করেছেন, যিনি জনপ্রিয় জননেতা হয়েও এবারই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হতে পেরেছেন। বাংলাদেশের বহু এলাকা জন্মের পর প্রথম মন্ত্রী পেয়েছে শেখ হাসিনার এই মন্ত্রিসভায়।

হেভিওয়েট-নির্ভর, বিরাট মাথাভারি মন্ত্রীর বদলে অপেক্ষাকৃত অচেনাদের নিয়ে কাজ করার সাহস দেখিয়ে শেখ হাসিনা নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছেন। উন্নয়নের আলো বঞ্চিত এলাকায় মন্ত্রী উপহার দিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে পুরো বাংলাদেশব্যাপী সুষম ও সুসমন্বিত করার ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়ার যে প্রত্যয় শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছিলেন, তিনি তা দ্রুতই বাস্তবায়নের পথে নিয়ে এসেছেন।

মন্ত্রীরা যে জনগণের কাছের মানুষ এবং উন্নয়নের সারথি, এই বার্তা দিয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা বাসযাত্রার মাধ্যমে কৃচ্ছ্বতা ও জটমুক্ততার পথে এগিয়েছে। পেয়েছে জনগণের সমর্থন, ভালোবাসা ও স্বীকৃতি। এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিশন ও মিশন সফলতার শিখরে পৌঁছাবে বলেই আশাবাদী মানুষ।

হতাশ ও পশ্চাৎপদ রাজনীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আশাবাদী রাজনীতির পূর্ণ বিজয় ছিনিয়ে আনতে শুধু মন্ত্রিসভাকেই নয়, পুরো দল ও সরকারকে এ রকম বহু দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কার্যক্রম অব্যাহত গতিতে পরিচালিত করে সাফল্যের স্বর্ণ শিখর স্পর্শ করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও অর্জনের পাশাপাশি আঞ্চলিক সাফল্যও ধরা দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। উন্নত জাতিগত অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে মজবুত আঞ্চলিক উপস্থিতি সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশকে এখন একযোগে এবং দৃষ্টান্তমূলকভাবে কাজ করতে হবে।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

২৫ মার্চের কাল রাত

২৫ মার্চের কাল রাত

দিন শেষে ২৫ মার্চের কালরাত। জঘন্যতম গণহত্যায় কলঙ্কিত অন্ধকার রাতটি এসেছিল ১৯৭১ সালে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী...

সুখে নেই বাংলাদেশ!

সুখে নেই বাংলাদেশ!

সারা পৃথিবী জুড়েই খুশিতে থাকা মানুষের সংখ্যা কমছে। পৃথিবীতে বাড়ছে চিন্তা, উদ্বেগ, রাগ এবং দুঃখ। বাংলাদেশে অবশ্...