Alexa

নতুন মন্ত্রিসভা কি ভুল-ত্রুটি শোধরাতে পারবে?

নতুন মন্ত্রিসভা কি ভুল-ত্রুটি শোধরাতে পারবে?

ছবি: বার্তা২৪

নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এখন সবার মনে একটিই প্রশ্ন, নতুন মন্ত্রিসভা কি জনগণের আকাঙ্ক্ষার মেটাতে পারবে? কারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষার তো শেষ নেই। তবে এক নজরে মন্ত্রিসভার ধরন দেখেই বলা যায়, অভিজ্ঞ, দক্ষ, সৎ এবং তরুণ রাজনীতিবিদদের সমন্বয়েই এবারের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটি চতুর্থবারের সরকার গঠন এবং টানা তৃতীয়বারের মতো। বিগত এক দশকের উন্নয়নের ধারায় পুনরায় জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বিগত দশ বছরের সরকারের আমলে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যোগফলেই আরো একটি সরকারের যাত্রায় দেশের আপামর জনসাধারণের আলোকিত হওয়ার প্রশ্নের পাল্লাটিই ভারি হওয়ার পথে অগ্রসরমান। কারণ, বিগত দশ বছরের সরকারের উন্নয়নের মাত্রার দিকে লক্ষ্য করলে এর সফলতার দিকটিই বেশি চোখে পড়ে। ব্যর্থতা যে থাকবে না, তা নয়। সফলতা থাকলে, ব্যর্থতা থাকবে এটিই ন্যায্য। তবে সুখের বিষয় হলো এই, বিগত সময়ের ভুল-ত্রুটিকে শোধরে দেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী গতবারের ভুল শোধরানোর যথেষ্ট দৃষ্টান্ত মন্ত্রিসভায় রেখেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বারবার ভুল শোধরানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। নানা কারণেই জনগণের প্রত্যাশাটিও অনেক বেড়ে যায়।

বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এই স্বপ্নগুলোকেই পুঁজি করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে নির্মাণ করেছিল জনগণ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি চেতনার পরিপন্থী ঘাতকচক্র ও তাদের দেশি-বিদেশি দোসররা জাতির সে স্বপ্ন ভেঙে দেয়। বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যাশার বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মীয় লেবাসে একটি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে লুটেরা, ধনিক ও বণিক শ্রেণির স্বার্থকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সাধারণ জনগণ এই অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতে নির্যাতিত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যাশায় তিন জোটের রূপরেখোর ভিত্তিতে জনগণের ব্যাপক আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। কিন্তু জনগণের যথাযথ পত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ১৯৯০ সালের সম্পাদিত তিনজোটের রূপরেখো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু সে যাত্রাতেও অপূর্ণতা থেকে যায়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে (২০০১-২০০৬) সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারী, জঙ্গিবাদ ও দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতিসহ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়নের নজির সৃষ্টি হয়। ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, সন্ত্রাসী হামলা ও মৌলবাদকে মদদদান, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা-মামলা, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন-নিপীড়ন প্রভৃতি অপসংস্কৃতির রাজনীতি চারদলীয় জোটকে চরমভাবে ব্যর্থ করে তোলে। জনগণ বিশ্বাসভঙ্গকারীদের ক্ষমা করে না, তা বিগত সময়ের চারদলীয় জোট সরকারের সময়ের কর্মকাণ্ডেই প্রমাণিত হয়।

ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকার জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। কারণ মানুষের প্রত্যাশার কোনো সীমা নেই। তবে সেক্ষেত্রে নিচ্ছিদ্রভাবে সরকারের যাত্রাকে অক্ষুন্ন রাখতে নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তৎপর থাকার বিকল্প নেই। ক্ষমতার পালা বদলের বাস্তবতাকে স্মরণ করে সরকারকে দেশে অপরাধ ও লুটপাটের সংস্কৃতির পরিবর্তে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী থাকতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় আনুগত্যের বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা ও দক্ষতার দিকে নজর রাখার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশের সকল নাগরিকের সরকারে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সদ্য শপথগ্রহণকারী মন্ত্রিসভা মানুষের জন্য কাজ করবেন, দেশের সেবা করবেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল রাজনীতিকেও শক্তিশালী না করলে চলবে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে অবশ্যই দল নিরপেক্ষ ও পেশাদারী মানসিকতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সবকিছু যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে, দলীয় কোনো অনুগত্যের ভিত্তিতে নয়। সংসদীয় ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র ‘জাতীয় সংসদ’কে কার্যকর করতে হবে। শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দিতে হবে। সব বিষয়েই বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদকে আলোচনা ও সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্পিকারকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংসদ কার্যকর না হলে জনপ্রত্যাশা পূরণের মূল জায়গাটিও ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংসদ কার্যকর রাখতে বিরোধী দলের উপস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি। এতে আসন যতই কম হোক না কেন, সেটি কোনো বিষয় না। সংসদে বিরোধী দলের নিয়মিত উপস্থিতি সংসদ কার্যকর হওয়ার মূল চাবি। বিগত পাঁচ বছরের মতো অকার্যকর বিরোধী দল জনগণ আশা করে না। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ না উল্লেখ করলেই নয় যে, ১৯৫৬ সালের গণপরিষদে মাত্র ১৩ জন সাংসদ পরিষদকে অচল করে দিয়েছিল। কাজেই সংখ্যা বিচারে নয়, বিরোধী দলকে সংসদীয় কাঠামো অনুযায়ী যথাযথ সাংবিধানিক মর্যাদার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা সরকারের কর্তব্য। জনগণ গতানুগতিক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায়। গঠনমূলক রাজনীতি, দেশগড়ার রাজনীতি, ঐক্য আর সহযোগিতার রাজনীতিই সকলের কাম্য।

১৯৭১ সালে এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাঙালিরা রক্তস্নাত পথে স্বাধীনতা এনেছে। এখন জনগণের মুক্তিও নিশ্চিত করার ধারাবাহিকতাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারকেই ধরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আগামী দিনগুলোতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, জনতার আদালতে সরকারকে আবারও দাঁড়াতে হবে।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আপনার মতামত লিখুন :