Barta24

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

English

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র: চল্লিশ বছরের পথচলা

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র: চল্লিশ বছরের পথচলা
ছবি: বার্তা২৪.কম
শুভ কিবরিয়া


  • Font increase
  • Font Decrease

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরীর তখন বেশ খারাপ। তবু পারস্যরাজের অনুরোধে তিনি সেদেশ ভ্রমণে রাজি হলেন। সত্তর বছর বয়সে সেই ভ্রমণই ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ বিদেশ ভ্রমণ। ১৯৩২ সালের এই ইরান-ইরাক ভ্রমণ নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘পারস্যে’ শিরোনামে।

সেই সফরের অভিজ্ঞতার এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মনে পড়ছে ইরাকে একজন সম্মানযোগ্য সম্ভ্রান্ত লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইংরেজ জাত সম্পর্কে আপনার কী বিচার?’ আমি বললেম, ‘তাঁদের মধ্যে যাঁরা নবং: তাঁরা মানবজাতির মধ্যে নবং:।’

তিনি একটু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর যারা হবীঃ নবং:? চুপ করে রইলুম। উত্তর দিতে হলে অসংযত ভাষার আশঙ্কা ছিল। এশিয়ার অধিকাংশ কারবার এই হবীঃ নবং:- এর সঙ্গেই। তাদের সংখ্যা বেশি, তাদের স্মৃতি বহু ব্যাপক লোকের মনের মধ্যে চিরমুদ্রিত হয়ে থাকে।’

রবীন্দ্রনাথের ভাবনাজাত এই নেক্স-বেস্ট লোকরাই আমাদের জীবন দখল করে আছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ এদের হাতেই ন্যস্ত। তাই কাঙ্ক্ষিত মানের দেশ এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

আমাদের রাজনীতিতে যে হতাশা, আমাদের রাষ্ট্রাচারে যে দুর্গতি, আমাদের সমাজজুড়ে যে দুঃখ নিত্যদিন আমাদের বেদনাকে বাড়িয়েই চলেছে, তা হচ্ছে সর্বত্র আমাদের মূল্যবোধ সম্পন্ন, বেদনাজাগ্রত মানুষের অভাব।

জাতির বিদ্যায়তন, শিক্ষায়তন সেই মানসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে সক্ষম হয় নাই। আমাদের শিক্ষাধারায় অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা হয়েছে কিন্তু বড় জাতি তৈরি করতে হলে যে বড় মানুষ দরকার, সেই আকাঙ্ক্ষিত মানুষ তৈরির কোনো পথ এখনো বের করা সম্ভব হয় নি।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাজাত বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে তো সেই বৈভবসম্পন্ন, চিত্তের আলোকায়নঋদ্ধ মানুষ চাই-ই চাই।

সম্ভবত এই বেদনা বাংলাদেশের একজন শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে খুব তাড়া করেছিল। তিনি তাই ‘আলোকিত মানুষ চাই’-এই শ্লোগানমগ্ন এক প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 খুব ছোট আকারে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান আজ বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। দেশে-বিদেশে তার ব্যাপকতর কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজারো শিক্ষার্থি এই প্রতিষ্ঠানের নানারকম মননশীল কর্মসূচির অংশীজন হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা দেখতে দেখতে এই প্রতিষ্ঠান তার প্রতিষ্ঠার ৪০ বছরও পার করে ফেলেছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঘটা করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চল্লিশ বৎসর পূর্তি উৎসব পালিত হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/11/1547205850944.gif

দুই.

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এই দেশে তার চল্লিশ বছর পার করে ফেলেছে এইটা বড় কম কথা নয়। শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনেছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবুসায়ীদ এক অপার বেদনায়। অনেকটা ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়েই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই শিক্ষকতার চাকরিতে ইস্তফা দিয়েই এই প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন।

আমাদের আমজনতার ব্যক্তিজীবনে বা পেশাজীবনে কোনো ক্ষোভ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে এক ধরণের ক্ষুব্ধতা আর অসহায়ত্ব নিয়েই আমাদের দিন কাটে। কিন্তু কেন এই ঘটনা ঘটলো সেই বেদনার কারণ চিহ্নিত করে তা উপশমের চেষ্টা আমরা করি না। সেটা আমজনতার কাজও নয়।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জাত শিক্ষক। তাঁর  শিক্ষাজীবনের বেদনা তাঁকে এই ক্ষত নিরাময়ের কারণ অনুসন্ধান ও সেই দুঃখ জয়ের কাজে ঠেলেছে অন্ধ আবেগ দিয়েই। শিক্ষক জীবনে দেশের সেরা বিদ্যায়তন ঢাকা কলেজেই তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছেন নৈরাজ্যকর ছাত্র রাজনীতির, দেখেছেন বিদ্যায়তন ছেড়ে শিক্ষার্থিরা কিভাবে ছুটে গেছে প্রাইভেট টিউটরের বাসায়।

শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অধোগতি তার ভেতরটাকে কুরে কুরে খেয়েছে। তিনি তাঁর শিক্ষক জীবনের আত্মস্মৃতি ‘নিস্ফলা মাঠের কৃষক’ বইয়ে লিখেছেন, ‘সবাই যখন নিজের স্বার্থের ছোট্ট একান্ত কুঠুরির খোঁজে হন্যে হয়ে ফিরছে তখন আমি কেন একা কষ্টে ছিন্নভিন্ন হচ্ছি। সারা জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একা এই নিস্ফলাপ্রান্তরে আমি কতটুকু কী করতে পারব?’

‘সত্যি যদি তাদের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু করতেই হয় তবে তা এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আর সম্ভব নয়। এই বৈষয়িক প্রাপ্তি-প্রত্যাশা, রুটিরুজির স্বার্থসংশ্লিষ্ট আবিল জগতের মধ্যে তার ভবিষ্যত সম্ভব নয়।  তা যদি করতে হয় তবে তার জন্যে যেতে হবে ‘অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’ শিক্ষাঙ্গনের দেয়াল-ঘেরা এই অবসিত প্রান্তরে এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না।’

তিন.

সেই উত্তর খুঁজতে পথে নেমেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। মানুষের ভেতরের যে উজ্জ্বলতর দিক, যা তার বৈষয়িক স্বার্থান্ধ দিকের চাইতেও শক্তিমান সেই আলোকিতদিকটিকেই ভরসা ভেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কাজে নিরন্তর ছুটে চলেছেন সায়ীদ স্যার।

তিনি হয়তো রবীন্দ্রনাথের কথাতেই আস্থাশীল। রবীন্দ্রনাথ মানুষের কাজ, মানুষের ধর্মকে যেভাবে দেখেছেন সেই আলোকময় দিকটিই হয়তো অধ্যাপক সায়ীদের এই অসম্ভবকে সম্ভব করার কাজে উৎসাহ যুগিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মানুষেরএকটা দিক আছে যেখানে বিষয়বুদ্ধি নিয়ে সে আপন সিদ্ধি খোঁজে। সেইখানে আপন ব্যাক্তিগত জীবনযাত্রানির্বাহে তার জ্ঞান, তার কর্ম, তার রচনাশক্তি একান্ত ব্যাপৃত। সেখানেসে জীবরুপে বাঁচতে চায়। কিন্তু মানুষের আর-একটা দিক আছে যা এই ব্যাক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে।

সেখানে জীবনযাত্রার আদর্শে যাকে বলি ক্ষতি তাই লাভ, যাকে বলি মৃত্যু সেই অমরতা। সেখানে বর্তমান কালের জন্যে বস্তু-সংগ্রহ করার চেয়ে অনিশ্চিত কালের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করার মূল্য বেশি। সেখানে জ্ঞান উপস্থিত-প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়, কর্ম স্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপন স্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে যে বড়োজীবন সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়।

স্বার্থ আমাদের যেসব প্রয়াসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় তার মূল প্রেরণা দেখি জীবপ্রকৃতিতে; যা আমাদের ত্যাগের দিকে, তপস্যার দিকে ঠেলে নিয়ে যায় তাকেই বলি মনুষ্যত্ব, মানুষের ধর্ম।’

চার.

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাই হয়তো ভাবে, বড় মানুষ, সম্পন্ন মানুষেরাই শুধু পারে একটি বড় দেশ আর বড় জাতিকে গড়ে তুলতে। আমাদের সম্মুখে আগামী দিনের যে-মহান বাংলাদেশ অপেক্ষমাণ তার সুযোগ্য নির্মাণের জন্য আজ আমাদের প্রয়োজন অনেক সমৃদ্ধ মানুষের। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মনে করে আগামী দিনের সম্পন্ন বাংলাদেশকে গড়ে-তোলার পূর্বশর্ত হিসেবে আজ ঐসব মানুষের গড়ে তোলা আমাদের জন্য অপরিহার্য; সেই সব মানুষ, যাঁরা উচ্চ মূল্যবোধসম্পন্ন, আলোকিত, শক্তিমান, কার্যকর এবং সংশপ্তক।

পাঁচ.

আমরাও সায়ীদ স্যারের এই আশাবাদের সাথে একমত। জাতির নিজের প্রয়োজনেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে চালিত করা আমাদেরই কাজ।এই প্রতিষ্ঠান শতায়ু হোক। তার যাত্রাপথের সকল বাধা দূর হোক। চল্লিশ বছরপূর্তি উৎসব সাফল্যের সাথে শেষ হোক। সকল দল-মত-পথের মানুষের চিত্তের আলোকায়নের উৎসভূমি হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাক-এই শুভ কামনা নিয়েই লেখাটি শেষ করছি।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

টানা দ্বিতীয়িবারের মত হোঁচট খেল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। গত বছর ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মত প্রত্যাবাসনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রত্যাবাসনের দিন বেঁকে বসেন রোহিঙ্গারা। সে দফায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে গেলে আবার মিয়ানমার সরকারের সম্মতিতে ২২ আগস্ট ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ফলাফল একই, কারণ প্রত্যাবাসনের এই প্রক্রিয়াটি নেওয়া হয় অনেকটা বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারেরে মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন মোতাবেক শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়া কাউকে যে তার সম্মতি ব্যতিরেকে প্রত্যাবাসন করা যায় না সে কথা বোধ হয় আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছি। আরেকটি কথা, শরণার্থী জীবন অভিশাপের শামিল জানা সত্ত্বেও এদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেন নিজ দেশে ফিরতে চান না সেটা রহস্যে ঘেরা। এখানে একটি যৌক্তিক বিষয় হচ্ছে, নিজ দেশে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ফেরত যাবার ব্যাপারে আগ্রহী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর আমরা এটাও জানি যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নাগরিকত্ব বাতিল করলেও বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার বিষয়েই আশ্বস্ত করে এসেছে। কিন্তু এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি, বসতভিটে এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবার বিষয়টি।

তাদের বরাবরের আশ্বাসের পর দুবার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাবার পেছনে আরেকটি বড় কারণ এদেশে কর্মরত বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো। গত ২২ জুন দ্বিতিয়বারের মত এই প্রক্রিয়া ভন্ডুল হবার পর জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সব সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম মনিটর করার সুপারিশ জানানো হয়।

কথিত রয়েছে যে এদেশে কর্মরত এনজিওগুলো বারবার এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এর আগেরবারও যখন এই প্রত্যাবাসন বাঁধাগ্রস্ত হয়েছিল সেদিনও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও এসব এনজিওর কার্যক্রমের যথাযথ মনিটরিং সম্ভব হয়নি। কিছুদিন আগে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, এনজিওগুলো ‘ইল মোটিভ’ নিয়ে কাজ করছে।

পরপর দ্বিতীয়বারের মত এই প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হবার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবারও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আশাবাদ জানানো হলেও পরিস্থিতি এখন কিন্তু আসলে জটিল আকার ধারণ করছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে। আর এই ষড়যন্ত্রের মূল হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এক্ষেত্রে যতটুকু না আন্তর্জাতিক মহল যুক্ত তার চেয়ে বেশি যুক্ত আভ্যন্তরীণ কর্মকগুলো। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এক সমূহ দুর্যোগের সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ।

কিছুদিন আগে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে মিয়ানমার সরকার যদি প্রতিদিন ৩০০ জন করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়, তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে ৭ বছর, আর এই সময়ে খরচ হবে ৪৪৩ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করতে ৬ হাজার একর বনভূমি উজার করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে বনভূমি এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েই চলছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সাময়িকভাবে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশি এবং বিদেশি এনজিওগুলো কর্তৃক রোহিঙ্গাদের এ বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার কারণে। এক কথায় সরকারের বর্তমান তৎপরতায় এক ধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে, যা আমাদেরও দারুণভাবে চিন্তিত করে তুলছে।

অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে তা থেকে মনে হচ্ছে, এই সমস্যা সহজে মেটার নয়। আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ত্রাণ সহায়তা দিলেও এই সহায়তা দীর্ঘকালীন সময় ধরে চলবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতোমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের কাজটি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা করে থাকে এবং এই খাতে তাদের প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার।

এই অবস্থায় আমরা যদি নিকট ভবিষ্যতে এসব দাতাগোষ্ঠীকে পিছু হটে যেতে দেখি তবে অবাক হবার কিছু থাকবে না। তাই দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। এখানে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলেও মনে হচ্ছে না, কারণ মিয়ানমার নামমাত্র সংখ্যক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। দরকার তাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘সেইফ হোম’ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে যৌথ নজরদারী এবং সেই সঙ্গে এনজিওগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে প্রত্যাবাসনের স্বার্থে জাতিসংঘ ব্যতীত অপরাপর এনজিওগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাব বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র