Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রশ্নে সৌদি আরবের ভূমিকা ও আমাদের প্রত্যাশা

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো প্রশ্নে সৌদি আরবের ভূমিকা ও আমাদের প্রত্যাশা
মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম
মুফতি এনায়েতুল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

দেনার দায়ে জর্জরিত পাকিস্তানের ডাকে সাড়া দিয়ে গোয়েদার সমুদ্রবন্দরে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে তেল শোধনাগার বানানোর কথা জানিয়েছে সৌদি আরব। এই বিনিয়োগের পরিমাণ দশ বিলিয়ন ডলার। রোববার (১৩ জানুয়ারি) পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের গোয়েদার বন্দরে দাঁড়িয়ে এই আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেন সৌদি আরবের জ্বালানি শক্তি মন্ত্রী খালিদ আল ফালি।

এর আগে ২০১৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার কোনো শরণার্থীকে নিজ দেশে আশ্রয় না দিলেও জার্মানিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য ২০০টি মসজিদ নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিল সৌদি আরব।

প্রতি হজে বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার মুসলমানকে বিনাখরচে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে হজ পালনের সুযোগ করে দেয় সৌদি সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে মসজিদ নির্মাণ, কোরআন বিতরণ ও অসহায় মানুষের পাশে তাদের প্রায়ই দাঁড়াতে দেখা যায়। এমনকি ফিলিস্তিনের পাশে সৌদি আরব অকাতরে অর্থ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়।

কিন্তু এই সৌদি আরবই আঞ্চলিকভাবে নেতৃত্বের আসনে বসতে দরিদ্র ইয়েমেনে আগ্রাসন চালিয়েছে, বিনা কারণে কাতারে অবরোধ জারি করে রেখেছে। ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে আপন চাচাতো ভাইদের বন্দী করে অর্থ আদায়, পথের কাঁটা ভেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পদচ্যুত করা তো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এসবকে দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা হলেও ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগির খুনের বিষয়টি কোন পর্যায়ে ধরতে হবে- সেটা নিয়ে বিস্তারিত না বললেও চলে।

সেই সৌদি আরব এবার তার দেশে আশ্রয় নেওয়া কিছু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থানরত, ভিসা জটিলতার কারণে জেলে আটক এমন অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গাকে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। আরও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি শেষ করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো রোহিঙ্গাদের এই সংখ্যা যদিও খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আরব, তাতেই আপত্তি।

কারণ বিশ্ববাসী জানে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা বিশ্বের চরমতম জাতিগত নির্মূলের শিকার। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তারা মিয়ানমার বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে রোহিঙ্গা আশ্রিতদের সংখ্যা ১১লক্ষাধিক। সম্প্রতি সেখানকার রাষ্ট্রীয় বাহিনী নতুন করে আবার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে। এতে করে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে শরণার্থীদের সংখ্যা আরো বাড়বে। প্রতিবেশী অন্যান্য দেশেও রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে আছে। এদের জাতিগত পরিচয় না থাকায় অবৈধপন্থায় বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নানান দেশে যাতায়াত ও কর্মসংস্থান করছে।

ইউরোপের কয়েকটি দেশ মুসলমান অভিবাসীদের প্রশ্নে আইনগতভাবে নমনীয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য জার্মান সরকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক শরণার্থী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রশংসা লাভ করেছে। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ, দরিদ্র দেশও মানবিক কারণে এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের আহবানে সাড়া দিয়ে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয়নি।

অথচ অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের প্রতি সৌদি আরবের মতো দেশের অমানবিক আচরণ দু:খজনক। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত-নিপীড়িত এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সৌদি আরবের এই আচরণ মুসলিম বিশ্বকে ব্যথিত করে। মুসলিম জাহানের পীঠস্থান, মুসলমানদের প্রধান দুই মসজিদের জিম্মাদার হিসেবে সৌদি আরবের কাছে বিশ্বের নিপীড়িত মুসলমানরা সদয় ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করে।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক মানবিক এজেন্ডা। মায়ানমার সরকার তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, ভিটেমাটি ছাড়া করেছে, দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত জনগোষ্ঠী গণহত্যার শিকার হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান বহু বছর ধরে সৌদি আরবে আছে। যে সব রোহিঙ্গাকে ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারাও কমপক্ষে ৬ বছর ধরে সেখানকার বন্দী শিবিরে অবস্থান করছিল বলে জানা যায়।

এসব রোহিঙ্গাকে বৈধ কাগজপত্র দিয়ে সৌদি আরবে থাকা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সৌদি কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। শুধুমাত্র পাসপোর্ট জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে কারারুদ্ধ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির পাশাপাশি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা নাগরিকরা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের দ্বারা যে নৃশংস নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তার বিপরীতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ভূমিকা খুবই অপ্রতুল। অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এখনও কার্যত আশ্বাসের মাঝেই সীমাবদ্ধ। রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ সৌদি আরবের কাছে আরও ঘনিষ্ঠ, উদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করে। সে ভূমিকা পালনের বদলে আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের সৌদি কারাগার থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর হঠকারী সিদ্ধান্ত অনাকাঙ্খিত ও দু:খজনক।

রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে জাতিসংঘসহ বিশ্বসম্প্রদায়ের উদ্যোগগুলো মিয়ানমারের সহযোগিতার অভাবে একের পর এক ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সৌদি আরবসহ ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে আরও দৃঢ়, জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। এটা একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই জরুরি।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির নাটক করছে, অন্যদিকে প্রত্যাবাসন ঠেকাতে নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। সব আন্তর্জাতিক আহবান ও কনভেনশন উপেক্ষা করে মিয়ানমার সরকার আবারও রাখাইনে সেনা অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। এ থেকেই রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের অবস্থান বোঝা যায়।

এগারো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অভিবাসীর বোঝা স্থায়ীভাবে বহনের শক্তি বাংলাদেশের নেই। এই সংকটের ভূ-রাজনৈতিক আশু সমাধান প্রয়োজন। নাগরিকত্বের প্রশ্ন, মানবিক মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের ব্যয় মেটাতে পশ্চিমাবিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর কাছে আরও উদারদৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশিত।

বছরের পর বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ কীভাবে নিল তা আমাদের বোধগম্য নয়। যেকোনো বিচারে এটি বাংলাদেশের জন্য অসম্মানজনক ও বিব্রতকর। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সৌদি-বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক দিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

একজন মুসলমান হিসেবে আমরা জানি, ইসলামের শিক্ষা হলো- ঐক্যবদ্ধ থাকা, এতিমদের যত্ন নেওয়া, গৃহহারাদের আশ্রয় দেওয়া, দরিদ্রদের খাবার দেওয়া। সেখানে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ যেখানে নিজেকে পবিত্র দুই মসজিদের সেবক বলে দাবি করে, তাদের থেকে এমন অমানবিক ভূমিকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নিকট অতীতকালে অনেক মুসলিম দেশের সংকটে সৌদি আরবকে সেভাবে কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। অথচ সারাবিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে রয়েছে সৌদি আরবের নাম। সৌদি আরবকে আমরা সম্মানের চোখে দেখি, হৃদয়ে স্থান দেই, মর্যাদার আসনে বসাই। কিন্তু সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ কি কখনও সেভাবে দেখেছে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে, বিশ্ববাসীকে?

তাই সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশ্ব মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক সৌদি কর্তৃপক্ষ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবে, তাদের আশ্রয় দেবে তথা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটাই প্রত্যাশা।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় সম্পাদক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম।

আপনার মতামত লিখুন :

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র