ওয়েডিং ফটোগ্রাফি

আহসান হাবীব
আহসান হাবীব, ছবি: বার্তা২৪

আহসান হাবীব, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বেশ কয়েকটা টানা বিয়ে খেতে হয়েছে এই দুয়েক মাসে! মনে হয় বিয়ের সিজন চলছে! তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই বিয়েগুলোতে গিয়ে জামাই বউয়ের মুখই দেখতে পারলাম না। ইদানিং এটা হচ্ছে, বিয়েতে জামাই বউ দেখার উপায় নেই। এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে ‘ওয়েডিং ফটোগ্রাফি।’ এটা একটা স্ট্যাটাসের ব্যাপারও হয়ে উঠেছে। কে কত বেশি টাকায় ফটোগ্রাফার এনেছে। একটা সময় ছিল মানে আমাদের সময়। বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে বিয়ের মত করে আর কেউ একজন একটা ক্যমেরা নিয়ে আড়াল থেকে কাউকে বিরক্ত না করে ছবি তুলে চলেছে। ক্যাজুয়াল সব আন্তরিক ছবি কোনো সাজানো ন্যাকামো কিছু নেই। আর এখন? বরং কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যাক। 

ঘটনা ১

বিয়েতে খেয়ে দেয়ে বিদায় নিব। কিন্তু বর বউ কই? বলা হল ওরা বাইরে রাস্তায়। ‘রাস্তায় কেন?’ ফটোগ্রাফাররা ওদের ছবি তুলছে। বাইরে এসে দেখি সত্যি তাই, সাদা কালো লাল নীল বেগুনী নানান সব ছাতা টানিয়ে বর বউয়ের ছবি তোলা হচ্ছে । কখনো বর বউয়ের থুতনীতে ধরে আছে কখনো বউ বরের থুতনী ধরে আছে কখনোবা বউ বরের কাঁধে মাথা রেখে আধো ঘুম। একটায় দেখলাম বউ নাচের মুদ্রায় দু হাত ছড়িয়ে এক পা তুলে পোজ দিয়েছে পাশে বর হাটু গেড়ে বসে আছে । এদিকে স্যুটিং মনে করে রাস্তায় আম-জনতার ভিড় জমে উঠেছে।

ঘটনা ২

এই বিয়েতে অবশ্য বর বউ রাস্তায় না, তারা ভেতরেই। মঞ্চে রীতিমত নাটক চলছে। যথারীতি সাদা কালো ছাতার কারণে এপাশ থেকে বোঝার কোনো বুদ্ধি নেই কি ঠিক কি হচ্ছে। ফটোগ্রাফার ছবি তুলছে দ্বিতীয় একজন ডিরেকশনে। দেখলাম ফটো ডিরেক্টরের নির্দেশে বউ চলে গেল এক মাথায়, জামাই আরেক মাথায়। তারপর দুজনে দু পাশ থেকে হেঁটে এসে কপাল কপালে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এটা দেখে আমার ছেলে বেলায় গ্রামের হাটে দেখা একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল সেটাকে বলে ‘ফাডার টাক্কর। দু পাশ থেকে দুই পাঠা ছুটে এসে টাক্কর দেয়!

ঘটনা ৩

এই বিয়েতেও জামাই বউকে দেখার উপায় নেই। সাদা ছাতা কালা ছাতায় তাদের আড়াল করে রাখা হয়েছে। অথচ তাদের দেখার জন্য কিন্তু মঞ্চের সামনেই সারি সারি চেয়ার সোফা পাতা। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি দর্শকরা সবাই মুখ কালো করে বসে আছে। তো আমি চেষ্টা করে উকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম সত্যিই কি হচ্ছে। দেখি নতুন জামাই বউ একজন আরেকজনের কোমড় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ফটোডিরেক্টর বার বার বলে দিচ্ছে কোথায় কোথায় তারা হাত রাখবে। তারাও যন্ত্রের মত নাকি রোবটের মত নির্দেশ পালন করে যাচ্ছে মানে একজনের গায়ে আরেকজনের হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি বোকা হয়ে যায়। বোকাটা হয় কিন্তু প্রেমিক, প্রেমিকা নয়। কিন্তু বিয়ে করলে বর বউ দুজনেই এক সঙ্গে বোকা হয়ে যায়। নইলে এমন হাস্যকর ফটোগ্রাফি কেন?

আমি একজনকে চিনি দেড় দুই লাখ টাকা খরচ করে বিয়ের ফটোগ্রাফি করেছে, এ নিয়ে সেই পরিবারে বেশ গর্বও ছিল। কিন্তু বিয়ের দু সপ্তাহের মাথায় ডিভোর্স! এখন এই শত শত (নাকি হাজারে হাজার?) রোমান্টিক ছবির গতি কি হবে?

যাহোক একটা রিয়েল লাইফ জোক দিয়ে শেষ করি। এরকম এক বিয়েতে যথারীতি সাদা-কালো ছাতার ছড়াছড়ি চারিদিকে। ক্যামেরা ফ্লাস গান নানান রকম লাইট। কিন্তু কোনটাই বর বউয়ের উপরে না। সব কিছু টেবিলের খাবার-দাবারের উপরে। মানে কি? কেউ একজন জিজ্ঞেসই করে বসল - এমনটা কেন? বর বউয়ের ছবি না তুলে ফ্লাস গান লাইট সব খাবারের উপর ধরে রেখেছে কেন!?

হবে না? ফিস ফিস করে বরের বাবা। ‘ খাবার সব বরফের মত ঠাণ্ডা মেরে গেছে, ফ্লাস লাইট এসব দিয়ে খাবার গরম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শেষ আরেকটা। এখানে যথারীতি চার পাঁচটা সাদা ছাতা লাইট দিয়ে কনের ছবি তোলা হচ্ছে । হঠাৎ একজন ছুটে এসে একটা সাদা ছাতা খুলে ছুট দিল।‘ একি করছেন?’ ‘ একি করছেন? ’ বলে আৎকে উঠল ফটোগ্রাফাররা।

-আরে রাখেন মিয়া.. ওদিকে বর এসে গেছে, বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, আগে ওকে ভিতরে আনি পরে আপনার ছাতা!

আহসান হাবীব: কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক

আপনার মতামত লিখুন :