রাজনীতির দুর্দিন

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম / ছবিঃ বার্তা২৪

ফরিদুল আলম / ছবিঃ বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

আমার ধারণা ছিল একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিপর্যয়কে সামনে নিয়ে পরাজিত শক্তি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট তাদের সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমে তাদের ভাষায় নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে যাবে। শুরুতে তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করলেও এটা গিয়ে থেমেছে এদেশে অবস্থানরত কিছু বিদেশী কূটনীতিকদের দরজা পর্যন্ত। হতাশ হলাম।

আমাদের দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন বলতে আসলে আমরা হয়ত এখনও বুঝে থাকি হরতাল, অবরোধ কিংবা জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদিকে। সম্ভবত সরকারবিরোধী পক্ষগুলোর, বিশেষত বিএনপি এধরণের আন্দোলন পরিচালনার সমস্ত রসদ ফুরিয়ে বিদেশীদের কাছে নালিশ করাকেই শ্রেয় মনে করছে। এতে বিদেশীরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবছে অথবা তারা আদৌ এধরণের নালিশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সরকারের ওপর কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করার সামর্থ্য রাখে কি না সেটা ভেবে দেখা হচ্ছে না।

একথা ঠিক, একটা সময় ছিল যখন আমাদের সরকার পরিচালনায় বিদেশীদের ইচ্ছা অনিচ্ছা অনেক গুরুত্ব পেত। সেইসব দিন আমরা অনেক আগেই পিছনে ফেলে এসেছি। এসব বোঝার জন্য আসলে খুব একটা বিদ্যার প্রয়োজন হয় না। তাহলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে আমাদের বর্তমান সরকারবিরোধী পক্ষগুলো আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তা তারা নিজেই জানে না। আর তাদের এই অজ্ঞানতা এবং অক্ষমতা আসলে সরকারের জন্য তাদের ইচ্ছামাফিক রাষ্ট্রপরিচালনার একটা ব্ল্যাংক চেক দেয়ার সামিল। আমার বিশ্বাস সরকার আগামী দিনগুলোতে বিরোধীদের দেয়া ব্ল্যাংক চেকের ওপর ভিত্তি করেই তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এটা আসলে আমাদের দেশের রাজনীতির এক ভয়াবহ দুর্দিনের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বর্তমানে যেভাবে পরিচলিত হচ্ছে এবং ক্রমেই যেভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নয়নের প্রতিটি সূচকেই এগিয়ে যাচ্ছে এমনটা পরীবীক্ষণ করলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে এখানে রাজনীতির মাতামাতি বা বাড়াবাড়ি উন্নয়নের ধারায় ছন্দপতন ঘটাতে পারে। মানুষ এখন ভাল আছে, সন্তুষ্ট আছে একথা যেমন সত্য, আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে আমরা অনেক দৈন্যদশার মধ্যে পতিত হয়ে যাচ্ছি।

রাজনৈতিক দলগুলোর বহুমাত্রিকতাতো উন্নয়নেরই আরেক প্রতিচ্ছবি। অনেকে হয়তো যুক্তি দিয়ে বলতে পারেন এশিয়ার জাপান এবং সিঙ্গাপুরের মত দেশে বিরোধী দলের অবস্থা যাচ্ছেতাই।

এইতো কয়েকবছর আগে জাপানের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপান (ডিপিজে) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মত রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হবার সুযোগ পেলেও তাদের সরকারের এক বছরের কম সময়ের মধ্যে পতন ঘটে এবং আবারও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়।

আবার মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে, আমরা যদি পশ্চিমা গণতন্ত্রের উদাহরণ বাদও দিই তাহলে দেখতে পাব যে এশিয়ার অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই সরকারের বিপরীতে শক্তিশালী বিরোধী দল রয়েছে। আমাদের দেশেওতো ছিল। আজকের যে দল সরকারে রয়েছে তারাওতো ৭৫ পরবর্তী ২১ বছর বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতির অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। অনেকে হয়তো এটা বলার চেষ্টা করবেন যে সরকার এদেশের বিরোধী দলগুলোকে মাঠে নামতে দেয় না, নেতা কর্মীদের গ্রেফতার করে জেলে রেখেছে এবং অনেককে গায়েবী মামলার আসামী বানিয়েছে। যারা এমনটা বলেন তারা কি একটিবারের জন্য একটু পেছনে ফিরে দেখার চেষ্টা করেন যে আজকের আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় কি নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছে? একটিবার যদি শুধু এটি ভাবেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে যে ১৭ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তার প্রতিটিতেই তিনি রক্ষা পেয়েছেন ঐশ্বরিক কৃপায়। আজকের শেখ হাসিনা এমন একজন বলিষ্ট নেতৃত্বের অধিকারী হতে পেরেছেন কেবল বারবার নতুন জীবন পেয়ে।

৯৬ পরবর্তি সময়ে ১৫ বছর পার করে ১৬তম বর্ষে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বে এমন কোনো উদাহারণ দেয়া যাবে না যা থেকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাফাই গেয়ে কেউ বলতে পারেন যে বেগম জিয়া বা তার পরিবারকে এভাবে নিঃশেষ করার একটিবারের জন্যও চেষ্টা করা হয়েছে।

তাহলে অবস্থাদৃষ্টে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে একদা আমাদের দেশের মানুষ ৫ বছর অন্তর নতুন সরকার দেখার যে পণ করতেন সেখানে ব্যাত্যয় ঘটায় বিরোধী রাজনীতি আজ মরতে বসেছে।

আমি এখানে নিছক আওয়ামী লীগ বা বিএনপি রাজনীতির সমর্থক হিসেবে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। যে বিষয়টিকে একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৈন্যতা। এখানে আমি সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে দেশের যে উন্নয়ন হচ্ছে সেটি খাট করে দেখতে চাই না। তবে কেবল নির্দ্বিধায় এটা বলতে চাই আজকের এই অর্জনের মূলে রয়েছে একজন শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা, সততা এবং নিষ্ঠা। আর সেজন্য দেশে অপরাপর রাজনৈতিক চর্চার অনুপস্থিতি থাকবে সেটার কোনো মানে নেই, বরং উন্নয়নের যে মিছিলে আজ আমরা সামিল হয়েছি তা অব্যাহত রাখতে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির ভীষণ প্রয়োজন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে আজকের আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি বলা হয়ে থাকে মহাথির মুহাম্মদকে। প্রথম দফায় তিনি প্রায় দুই দশক সরকার পরিচালনার পর পরবর্তি সরকারগুলো তারই উন্নয়নের দর্শনের আলোকে মালয়েশিয়ার শাসনকাজ অব্যাহত রেখেছিল। গত বছর আবার পাকাতান হারপান নামক রাজনৈতিক দলের ব্যানারে তিনি সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণ আবার নতুন আশায় বুক বেধেছে। এখানে যে বিষয়টি বলা যেতে পারে তা হচ্ছে উন্নয়ন একটি চলমান পদক্ষেপ, আর সেটা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করতে হবে সকল রাজনৈতিক দলকে।

আমরা কোনভাবেই এটা প্রত্যাশা করতে পারি না যে একজন শেখ হাসিনাকেই সবসময় আমরা এভাবে ধরে রাখতে পারব, সেটা সম্ভব নয় এবং উচিৎ নয়, বরং তার সরকারের সকল ইতিবাচক কাজগুলোকে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেজন্য দরকার একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

আমি চাই এবং আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমরা সকলে চাই দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারা চালু থাকুক। আর এই সুস্থ রাজনীতি বলতে আমি বুঝাতে চাইছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে রাজনীতি। মৌলবাদ, উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গীবাদের বিপরীতে দেশ গঠনের জন্য সত্যিকার অর্থে জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার রাজনীতি। সে সাথে আমি এটাও উল্লেখ করতে চাই আমাদের দেশের শান্তিকামী জনগণ আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এমন রাজনীতি দেখতে চান এবং এখানে চাওয়া পাওয়ার বিপরীতে ব্যাপক ফারাক থাকায় আজ বিরোধী রাজনীতি প্রতি পদে মার খাচ্ছে।

গেল নির্বাচনে আমরা দেখলাম এই একই ধরণের রাজনৈতিক ভুলের কারণে অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করার কারণে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলকে চরম মূল্য দিতে হল। যেখানে দলের বেশীরভাগ নেতা কর্মীর চাওয়া দলকে মৌলবাদী এবং যুদ্ধাপরাধীদের কাছ থেকে মুক্ত করে সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের আলোকে একটি প্রগতিশীল ধারায় পরিচালিত করতে সেখানে কেবল ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছার কারণে চরম এই রাজনৈতিক মূল্য দিতে দিতে দল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আজ যদি বিএনপি এমন সিদ্ধান্তে আসে যে এখন থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে কোনো আপোষ করবে না তবে তারা রাতারাতি ব্যাপক জনসমর্থন পাবে। তবে এটাও জানি তারা কোনভাবেই এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। এ এক রহস্য। আর এই রহস্য ভেদ করতে গেলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিকল্প নেই। আজ দল যেভাবে ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে তা থেকে উদ্ধারে সংস্কারের প্রয়োজনে দলের নেতৃত্বের একটা অংশ নিশ্চয়ই সামনে এগিয়ে আসবেন। তবে সেটা যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল।

গেল নির্বাচনে দলের ৬ জন এবং গণফোরামের ২ জনসহ সর্বমোট ঐকফ্রন্টের ৮ জন সাংসদ শপথ নেবেন না বলে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটা তাদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে, কেননা গণফোরামের সাংসদরা শপথ নিতে আগ্রহী, তাছাড়া শপথ না নিয়ে তারা যদি এটাকে ফলপ্রসু কোনো ইস্যুতে পরিণত করতে না পারে তবে এটা হবে আরেক ভুল।

তাদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, একটু জেগে উঠুন, দেশের রাজনীতিতে ভীষণ দুর্দিন চলছে। কেবল উন্নয়ন নয়, আমরা চাই একই সাথে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :