Barta24

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

৩০২৫ পত্রিকার দেশে অনলাইন কেন মাথাব্যথা!

৩০২৫ পত্রিকার দেশে অনলাইন কেন মাথাব্যথা!
ছবি: বার্তা২৪
মাজেদুল নয়ন


  • Font increase
  • Font Decrease

গত ১৫ বছরে অনলাইন সংবাদপত্র দেশে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমও আবির্ভূত হয়েছে এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে। ফলে দৈনিক সংবাদপত্রগুলো যেমন তাদের অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন, তেমনি টেলিভিশনগুলোও সার্বক্ষণিক আপডেট থাকছে অনলাইনে। প্রতি মুহূর্তে ঘটে যাওয়া যে সংবাদ আপনি এখন পড়ছেন তা পরদিন থাকছে প্রিন্টে। বাড়তি অর্থ ব্যয় করে সকালে আপনাকে পড়তে হচ্ছে একদিন আগের বাসি খবর। পাঠক হিসেবে আমি তাৎক্ষণিকভাবে প্রিন্টের অনলাইন ভার্সন পড়ব, নাকি অপেক্ষা করব পরদিন সকালে বাসি হিসেবে পড়তে?

অনলাইন গণমাধ্যমের এই প্রসার মেনে নিতে পারছেন না সনাতনধর্মী চিন্তার প্রশাসন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো বা সাংবাদিকেরা। আমরা জানি, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার কনটেন্ট এবং বস্তুনিষ্ঠতার ওপর। সেটি অনলাইন বা কাগজের দৈনিক অথবা টেলিভিশন বা রেডিওর মাধ্যমে প্রচারের ওপর নির্ভর করে না।

এখন দেশে অসংখ্য অনলাইন গণমাধ্যম রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে সবগুলোই দুই-একজনের প্রয়াস। কোনো ভিত্তি না থাকলেও লোকমুখে একটি গুঞ্জন রয়েছে দেশে অনলাইনের সংখ্যা ১০ হাজার। তবে যখন নিবন্ধনের জন্যে আবেদন চাওয়া হলে জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত সরকারের নিবন্ধনের জন্যে ২ হাজার ১৮টি অনলাইন গণমাধ্যম আবেদন করেছে। এর মধ্যে সরকার যে দিকগুলো বিবেচনা করে নিবন্ধন দেয়ার কথা বলেছে, সেগুলোকে অনেকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন না। কারণ ট্রেড লাইসেন্স বা চারিত্রিক সনদপত্রের সঙ্গে একটি গণমাধ্যমের কাঠামোগত দিকটিরও গুরুত্ব রয়েছে। একটি গণমাধ্যমে কতজন সাংবাদিক রয়েছেন, কতটুকু জায়গা নিয়ে কর্মস্থল বা পাঠক সংখ্যা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করেই নিবন্ধন দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে সর্বোপরি পাঠকের ওপর ছেড়ে দেয়াকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা।

অনেকেই হয়তো ২ হাজার ১৮টি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের নিবন্ধনের আবেদনের কথা শুনে চমকে উঠেছেন। আবার অনলাইন গণমাধ্যমের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে প্রস্তুত হচ্ছেন। তাদের জন্যে বলি, দেশে কাগজের সংবাদপত্রের সংখ্যা কি জানেন?

২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর জাতীয় সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে এখন নিবন্ধিত পত্রিকার (প্রিন্ট মিডিয়া) সংখ্যা ৩ হাজার ২৫টি। এর মধ্যে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যাই ১ হাজার ১৯১টি। দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ৪৭০টি। অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা তিনটি, সাপ্তাহিক পত্রিকা ১ হাজার ১৭৫টি, পাক্ষিক ২১২টি, মাসিক ৪০৪টি, দ্বিমাসিক ৭টি, ত্রৈমাসিক ২৮টি, চতুর্মাসিক ১টি, ষাণ্মাসিক ২টি এবং বার্ষিক পত্রিকা ২টি। প্রিন্টের সার্কুলেশনের খবর কি একজন পাঠক রাখছেন? সার্কুলেশন সংখ্যা যে ‘শুভংকরের ফাঁকি’-এটাও ‌অনেকের জানা নেই। সরকারি বিজ্ঞাপন রেট বাড়ানোর জন্য বিরাট কারচুপির আশ্রয় নিচ্ছে কিছু কিছু দৈনিক। এ তথ্যগুলো অবশ্য গণমাধ্যমকর্মী বা সাংবাদিকদের জানা। বৃহত্তর পরিসরে সুষ্ঠু তদন্ত হলে বেরিয়ে আনতে পারে সঠিক তথ্য। এতে সাশ্রয় হতে পারে বিজ্ঞাপনের নামে সরকারে ব্যয় হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থও। বেতন বোর্ড রোয়েদাদ বাস্তবায়ন নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের সামান্য আভাষ দিয়েছে। সবিস্তারে পরে লেখার ইচ্ছে পোষণ করি।

সব মিলিয়ে দেশে কাগজের পত্রিকা রয়েছে ৬ হাজার ৫২০টি। কথা হলো এই সংখ্যার কাগজের দৈনিক কি আদৌ বের হয়, এই পত্রিকার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিকে বাদ দিলে আসলেই কি সংবাদপত্রের গুনগত মান সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে! অবশ্যই নেই। শুধু যে হাজার হাজার দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধন রয়েছে তাই নয়, গত ২ ডিসেম্বর ২০১৮ এর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে ৬৬৭টি সংবাদপত্র সরকারি বিজ্ঞাপনের তালিকাভুক্তও রয়েছে।

অথচ এই দৈনিকগুলো নিয়ে কারো যেন চিন্তা নেই। সরকারের সর্বশেষ মজুরি রোয়েদাদ অনুযায়ী দৈনিক, দেশকাল, তৃতীয় মাত্রা, সোনালি খবর, সবুজ সংবাদ, অগ্রসর, মাতৃছায়া, শতকণ্ঠ, মতবাদ, নবযাত্রা, দৈনিক যুগের কথা, দৈনিক সিনসা, দৈনিক চাঁদনীবাজারের মতো ১০২ টি প্রতিষ্ঠান ৮ম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করছে বলে জানানো হয়েছে। আসলে কি তা হচ্ছে! অথচ সাংবাদিকদের এই কাঠামোয় বেতন দেয়া হচ্ছে জানিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন নিচ্ছে সর্বোচ্চ মূল্যে। যারা পত্রিকাকে এখনো সর্বোচ্চ গুরুত্ব বিবেচনা করে থাকেন এবং অনলাইনে নাক সিটকান, তারা কি এই পত্রিকাগুলোর খবর রাখেন!

তবে অনলাইন নিয়ে এই দ্বিধা দ্বন্দ্ব কেন! বরং পাঠকের ওপরই ছেড়ে দেয়া হোক না, তারা কি পড়তে চান।

এতো গেলো কাগজের দৈনিকের হিসাব। এখন আসি টেলিভিশনের হিসেবে। দেশে এখন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে ৪৫টি। এর মধ্যে কয়টি চ্যানেল মানুষ দেখছেন! কিছু চ্যানেল বিদেশি অনুষ্ঠানের বাংলা ডাবিং করে বা সিনেমা দেখিয়েই সময় কাটিয়ে যাচ্ছে।

টেলিভিশনগুলোর দর্শকও কমছে ভাটার পানির মতো। বাধ্যহয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ইউটিউবে চলে যাচ্ছে তারাও। কারণ টিভি স্ক্রিনের সামনে বসে সময় পার করার অবস্থায় নেই মানুষ। বরং হাতের মোবাইলের স্ক্রিনেই খবর দেখতে বা পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন! আর যা প্রচারে এগিয়েই রয়েছে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো।

তাই বলা হয় শত ফুল ফুটতে দাও। পুরো দুনিয়া জুড়েই অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের একটি বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। অনেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার জন্যে নিজেদের ব্লগ তৈরি করছেন। এসবের সঙ্গে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে মিশিয়ে ফেললে হবে না। বরং পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিতে হবে, তিনি সংবাদ মাধ্যম হিসেবে কোনটিকে বাছাই করবেন, কোনটিকে ব্লগ হিসেবে নেবেন বা কোন ধরনের অনলাইনকে বর্জন করবেন।

মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান
মুত্তাকিন হাসান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে ব্যক্তির গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দেওয়া। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education; যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum যার অর্থ হলো to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাহিরে বের করে আনা বা বিকশিত করা।

শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, উম্মোচিত করে নতুন নতুন জানালা। আর তাই শিক্ষার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা শুরুর পথটা শিশুশিক্ষা দিয়েই, আর তাই বলা হয় আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষৎকে শুরু থেকেই সঠিকভাবে লালন-পালন না করলে কোনো কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না।

শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিকভাবে পিতামাতার মাধ্যমে হলেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের যে পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিশুদের বেলায় বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের জন্য দরকার শিশুবান্ধব মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিশুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুর মনোজগত বোঝা। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। শিশুর মন না বুঝে ভয়ভীতি দিয়ে শিক্ষাদান করা শুধু তোতা পাখি বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের অবশ্যই শিক্ষকদের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের বর্তমান বেশিরভাগ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক না হয়ে, নিজেরা শিক্ষা বাণিজ্যে মত্ত থাকেন। ক্ষণে ক্ষণে শিক্ষার্থীর বাবা-মার সাথে শিক্ষকদের পরম আলাপচারিতা মানেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। শিশুশিক্ষায় শিশুদের মনের বিকাশে মনোবিজ্ঞানের ক্ষীণ প্রভাবের কারণেই শিশুরা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

বিদ্যমান শিক্ষার পরিবেশ তাদের মেধা বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষক আর অভিভাবকের কড়া নিয়মশাসনে ভালো পড়তে বা লিখতে পারছে ঠিকই তবে চিন্তাশীল বা উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে তাদের এ শিক্ষা মানব বিকাশে সহায়ক নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো- পরিপূর্ণ মানবিক গুণে মানুষ হয়ে উঠা। পিতামাতা তার সন্তানকে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠছে না। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশের যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে করে টালমাটাল হচ্ছে পুরো সমাজ।

বিখ্যাত কবি মিল্টন বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul…শিক্ষকরা যেহেতু প্রকৃত অভিভাবক এবং শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন, তাই শিক্ষকদের হতে হবে প্রকৃত মানুষ। শিক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যদি মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে কখনোই মানবিক গুণাবলী জাগ্রত হবে না।

শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যালয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও যত উপকরণই ব্যবহার করা হোক না কেন শিক্ষকরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। শিক্ষাকে পেশার পাশাপাশি সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড়, সৌহার্দ ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। কোমলমতি শিশুদের বকাঝকা না করে সকল শিক্ষকদের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রথম স্থান অর্জন করবে। শিশুদের পাশাপাশি যেন পিতামাতারাও এমন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান বিকাশের প্রথম স্তর মাত্র। তাদের জন্য আরও বহু পথ বাকি।

শিক্ষক আর পিতামাতার চাপে শিশুরা যেন দিশেহারা। ভোরবেলায় চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠা, বিদ্যালয় থেকে ফিরে যতটুকু সময় তাতে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় শ্রেণীতে দেওয়া পড়ালেখা নিয়ে। শিশুরা তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করার কোন সুযোগই পাচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেলায় এ অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কারণ শহরের বিদ্যালয়ে নেই খেলার উন্মুক্ত মাঠ। অথচ খোলামেলা মাঠ শিশুদের মনোবিকাশের অন্যতম উপাদান। শিশুরা দুরন্ত হরিণের মতো খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতির প্রাণশক্তি তৈরির কারখানা আর রাষ্ট্র ও সমাজ সব চাহিদার সরবরাহ কেন্দ্র। এখানে ত্রুটি ঘটলে দুর্বল আর পঙ্গু না করে ছাড়বে না।’ যে স্থানেই হোক না কেন আমাদের উচিত শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞার প্রতি খেয়াল রাখা। নচেৎ পুরো সমাজকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। শিশুশিক্ষার বর্তমান ধারা সংশোধন করে মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক পড়ালেখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য শিশু-মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ভালো পড়ালেখার আশায় পিতামাতারা তাদের শিশু সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক বেশি, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ উচ্চ-মাধ্যমিকের বেশি পড়ালেখা করেননি এবং তাদের বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যাদের প্রশিক্ষণ আছে তা আবার স্বল্পকালীন। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকদের মনেও নেই কোনো আনন্দ, তারা যেন কোনোমতে নিজেদেরকে ঠেলা দিয়ে চালাচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মনোবিকাশে ব্যর্থ। শিশু শিক্ষার্থীর মনোবিকাশ এখানে বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পুরনো ছবি

৮৯ বছরের এক বিশাল কর্মজীবন পেছনে ফেলে সব আলোচনা-সমালোচনার ওপারে চলে গেছেন এরশাদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদ একাই একটি অধ্যায়। এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) হয়তো আরও বহুদিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে, তবে এরশাদবিহীন জাপা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে বলেই মনে হয়।

তার দীর্ঘ পেশাগত ও রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য তিনি দলকেও ছাড়িয়ে গেছেন বহুমাত্রায়। তার অনুপস্থিতিতে জাপা হয়তো এখন সেটিই অনুভব করবে। ক্ষমতার সিঁড়ির কাছাকাছি যেতে এরশাদের বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিপরীতে একটি শক্ত প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবেও তার জুড়ি নেই। তাই জাপার মতো একটি সমর্থক শক্তি রাজনীতিতে প্রয়োজন ছিল বৈকি। অপর দলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এরশাদবিহীন জাপা আগামীতে কতটা শক্তি জোগাতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে পার্টির গুরুত্ব থাকা না থাকা নির্ভর করে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর। দলের ভেতরে সামরিক বেসামরিক ক্যারিয়ারিস্ট নির্বিশেষে এরশাদের মতো হাই-প্রোফাইল রাজনীতিক আর নেই। এক সময় জাপা করেছেন দেশের অনেক হাই প্রোফাইল রাজনীতিক। মিজানুর রহমান চৌধুরী, কাজী জাফর, শাহ মোয়াজ্জেম, মওদুদ আহমেদসহ দেশের প্রথিতযশা অনেক রাজনীতিকরা এরশাদের জাপাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা বামপন্থী রাজনীতি থেকে এসেছেন। ডিগবাজীর এই রাজনীতি শুরু হয় জিয়ার আমলে। সামরিক, বেসামরিক আমলা ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন জিয়া।

এরশাদও একই কায়দায় সামরিক-বেসামরিক আমলা, পেশাজীবীদের দলে ভেড়ান। কিন্তু ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাদের বেশির ভাগই আজ আর জাপায় নেই। যেমন নেই বিএনপিতে। সময় বুঝে আজ জিয়ার উপদেষ্টা, কাল এরশাদের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হয়েছেন অনেকে। নগদ ইনামের আশায় এরকম রাজপন্ডিতের (উপদেষ্টা) নজির আজও বিরল নয়। ক্ষমতার লোভে যারা ডিগবাজী দিয়ে জাপায় এসেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তারাই সবার আগে উল্টো ডিগবাজী দিয়েছেন। কেউ বা মৃত্যৃ বরণ করেছেন, অবসর নিয়েছেন। ফলে জাপায় আজ ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান যাকে বলে সে রকম কেউ নেই বললেই চলে। ক্যারিশম্যার কথা বাদই দিলাম। ফলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই জাপার জন্য আজ বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতিতে একইভাবে দলের গুরুত্ব বহাল রাখা।

Ershad
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এরশাদকে নিয়ে আলোচনা আছে, আছে সমালোচনা। কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বিদ্যমান দলগুলোর অদূরদর্শীতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে নিজেই ৯ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছেন। সব সামরিক শাসক যা করেন এরশাদও তাই করেছেন। জিয়াউর রহমান বিএনপি করেছেন, এরশাদ করেছেন জাতীয় পার্টি। নয় বছর ক্ষমতায় থেকে বিদায় নিয়েছেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে এরশাদের গুরুত্ব কমেনি মোটেও। বরং ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের পাল্লা ভারি করতে এরশাদের বিকল্প শুধুই এরশাদ। আগামী দিনের ক্ষমতার রাজনীতিতে জাপা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারবে কিনা জাপা’র জন্য আপাতত এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অন্তত আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে ‘ক্ষমতা’, ‘রাজনীতি’ ও ‘কৌশলের’ সঙ্গে ভোটের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে। এ সম্পর্ক যেভাবে শিথীলতার দিকে যাচ্ছে তাতে তৃতীয় কোনো সহায়ক শক্তির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো ফুরিয়ে যাবে। তবে সে রাজনীতি আমাদের হিসাবের বাইরে। আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি, এরশাদ জাপায় যেমন অপরিহার্য ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতেও ছিলেন একই রকম অপরিহার্য।

Ershad
একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। এই উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলই বেশি বিকাশ লাভ করেছে। ভারতে যেমন কংগ্রেস, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ, পিপলস পার্টি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা। ভারতের বিজেপি অথবা বাংলাদেশের জামায়াত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করে। কাজেই প্রচলিত রাজনীতি থেকে তাদের রাজনীতি ভিন্ন, নেতৃত্বের বিষয়টিও ব্যক্তি বা পরিবার নির্ভর নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যদিও ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বিকাশ লাভ করেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই দলের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রায় চার দশক আওয়ামী লীগও ব্যক্তি কেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

দলের ভবিষ্যৎ পারিবারিক সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর বিএনপি ও জাপার শুরুই হয়েছে একজন ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক খায়েস মেটানোর জন্য। জিয়া ও এরশাদ যদি ধরেও নিই যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন (ডকট্রিন অব নেসিসিটি), না হলে দেশ গোল্লায় যেতো ইত্যাদি, ইত্যাদি... তারপরও বাস্তবতা হলো তারা কেউ দেশের সেই কথিত ক্রান্তিলগ্ন পার হওয়ার পর ব্যারাকে ফিরে যাননি। গদি আঁকড়ে ধরে থেকেছেন। জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার ও পরে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। সেই থেকে আজও ব্যক্তি ও পারিবারিক দখলমুক্ত হতে পারেনি বিএনপি।

একই কায়দায় এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি এরশাদ থেকে জাতীয় পার্টি মুক্ত হতে পারেনি চার দশকেও। পতিত সামরিক ও স্বৈরশাসকরা ‘মরিবার পূর্বে মরিতে চান না’। তাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতেই তারা দলের সভাপতি বা উপদেষ্টার পদ আজীবন আঁকড়ে থাকেন। এরশাদের হয়তো এক্সিটওয়ে ছিল, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রয়োজন ছিল এবং তিনিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা উপভোগ করে গেছেন। ক্ষমতার প্রতিটি কোনায়ই তিনি বিচরণ করেছেন।

সেনাপ্রধান, সিএমএলএ, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিরোধী দলের নেতা সব ক্ষেত্রেই তার সরব উপস্থিতি আমরা দেখি। সবকিছু যে তার প্রয়োজন ও ইচ্ছায় হয়েছে হয়তো সেরকমটি নয়। অনেকটা রাজনীতি ও ‘ক্ষমতা’র প্রয়োজনেই তার এই এদিক ওদিক, কখনো নিজের কখনো অপরের প্রয়োজনে। এখানেই এরশাদের অপরিহার্যতা। আর এজন্যই আমরা তাকে বলি ‘রাজনীতির দুষ্টু বালক’।

Ershad

সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংসদ টিভি 

 

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের তিনটি বড় দলের মধ্যে জাপা আপাত একজন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হলো বটে। কিন্তু ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে নতুন করে পরিবারভূক্ত হলো বলেই মনে হচ্ছে। এতে আপতত হয়তো জাপা প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পার্টির নিয়তি নির্ধারণে তা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে তা সময়ই বলবে।

এরশাদের সমালোচনা আছে অনেক। কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে বললে এ সমালোচনা থেকে সবাই-ই কি মুক্ত? রাজনীতিতে এরশাদ একটি সিনড্রোম। এ সিনড্রোমে সব রাজনৈতিক দলই আক্রান্ত। এমনকি নাগরিক হিসেবে আমরাও কি সুবিধাবাদী নই? এরশাদ আমাদের সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী, ভোগবিলাসী ও ডিগবাজীর রাজনীতির আইকন। কিন্তু এরশাদ সিনড্রোম কি আমাদের মাঝেও নেই? এরশাদকে গালি দেওয়া সহজ, কারণ তিনি ক্ষমতাহীন এক ‘দুষ্টু বালক’। এরশাদের বিদায়ের পর রাজনীতিতে হয়তো সহসা সমালোচনা করার মতো লোকটি বিদায় নিলেন। কিন্তু তাতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে কি? এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাড়ামি হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু রাজনৈতিক দুষ্টামি বন্ধ হবে কি?

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র