Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

সুদিনের পথে অনলাইন মিডিয়া...

সুদিনের পথে অনলাইন মিডিয়া...
ছবি: সংগৃহীত
সাব্বিন হাসান


  • Font increase
  • Font Decrease

অনেকটা নীরবেই এগোচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অনলাইন ঘরানার বিপ্লব। এখন দেশের সব ঘরানার সংবাদমাধ্যমেই এ ডিজিটাল গণমাধ্যমের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছে। গুছিয়ে অনলাইনে সংবাদ পরিবেশন করছে এমন অনলাইনের সংখ্যা ২০টিরও বেশি।

দেশের অনলাইন বিজ্ঞাপনের বাজার ১০ কোটি টাকার অঙ্ক ছাড়িয়েছে বহু আগেই। সংযুক্ত সেবা (বাই প্রডাক্ট) হিসেবে দেশের ১৫টি শীর্ষ কাগুজে পত্রিকা এখন অনলাইনে বাড়তি বিনোয়োগ এবং আগ্রহ প্রকাশ করছে। এতে কাজের দক্ষতা প্রমাণ করছে তরুণেরাই বেশি। কাজেই বৈশ্বিক সমীকরণে নব্য ঘরানার একটি কাজের আবহ তৈরি হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের শীর্ষ ব্যবসা গ্রুপগুলো অনলাইন মিডিয়ায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। আসছে ২০২০ সালের দেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতেই এমন আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে এগিয়ে থাকা দূরদর্শী বিনিয়োগকারীরা।

সামাজিক জনমাধ্যম ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার আর গুগল ইউনিকোড সার্চ ইঞ্জিনের কারণে ইন্টারনেট দুনিয়ায় বাঙলা ভাষার প্রসার ও জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। বর্হিবিশ্বের হাওয়া বদলের চেহারা দেশের উন্নয়নশীল মিডিয়া অঙ্গনেও প্রভাব ছড়াচ্ছে। নতুন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, ‘এখন দেশে প্রায় ৯ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে ৮ কোটি (প্রায়) মানুষ।’

এ ছাড়া বাংলাদেশে ১০ কোটিরও বেশি মোবাইল গ্রাহকের সরব উপস্থিতি অনলাইন মিডিয়া জোয়ারের কথাই বলছে। গবেষণা সূত্রেও এমন ভাবনার সত্যতা স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিনই।

অবস্থা যখন এমন তখন একে একে বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো অনলাইনে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরিতে মনযোগী। এ তালিকায় বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন, ওমাহা ওয়ার্ল্ড-হেরার্ল্ড, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্ট-এর মতো পত্রিকাও আছে।

শুধু স্থবির কম্পিউটার নয়, তারহীন ইন্টারনেট এবং স্মার্ট পণ্যের কল্যাণে বিশ্ব এখন তথ্য ও যোগাযোগের অপ্রতিরোধ্য কর্মক্ষেত্র। ইন্টারনেট সংযুক্ত আছে এমন কম্পিউটারের সংখ্যা এখন ৫৭ কোটি ৫০ লাখ। সিআইএ ফ্যাটবুক সূত্র এ তথ্য দিয়েছে।

বিশ্বের ইন্টারনেটের গতিপ্রকৃতি চৌম্বক আবহের নেটওয়ার্কের পেছনে ছুটবে । এ নেটওয়ার্কে সংশ্লিষ্ট কারো দূরে সরে থাকা সত্যিই কঠিন হবে।

এদিকে ১৭ (প্রায়) কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে এখন ফেসবুকের সক্রিয় ভোক্তা ৩৩ লাখ ছাড়িয়েছে। তুলনাচিত্রে ২০০০ সালে বাংলাদেশের সক্রিয় ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল মাত্র ১ লাখ। কিন্তু ২০১৪ সালে এসে তা ১ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছে। সমীকরণের প্রবৃদ্ধি সূত্রে এটি শতকরা ৫৫ ভাগ।

প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা আর প্রকাশনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় হোঁচট খেয়ে বৈরী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় ছাপানো সংবাদমাধ্যমকে। একে সংবাদপত্রের ইতিহাসে ধসের বছর বলেও অভিহিত করেছেন অর্থনীতি গবেষক এবং বিশ্লেষকেরা।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম আর ডিজিটাল সিস্টেমের নানামুখী অভূতপূর্ব কৌশলের কারণে ক্রমেই এ সংস্কৃতির সফল বির্বতন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার এমন তথ্য দিয়েছে।

শুধু গণমাধ্যম নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক চর্চা আর প্রয়োগিক পদ্ধতিও রাতারাতি বদলে যায়। শুরু হয় অনলাইন বিশ্বের দিবারাত্রীর অগ্রযাত্রা। ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয় এ মাধ্যম। বিপরীতে কোণঠাসা হয়ে ব্যবসা হারাতে থাকে কাগুজে সংবাদপত্র।

বিশ্বব্যাপী সার্কুলেশন আর ছাপানো পণ্যের দাম অপ্রত্যাশিত হারে বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ের তাল সামলে টিকে থাকাই কঠিন হয় ছাপানো সংবাদমাধ্যমের। একে একে এ কাতারে এসে দাঁড়াতে থাকে বিশ্বের শীর্ষ আর ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমগুলো।

ইন্টারনেট বাক্সবন্দি চারকোণা ডেস্কটপ পিসির আঙ্গিনা ছেড়ে পাড়ি জমায় মোবাইল, স্মার্টফোন আর ট্যাবের খুদে আঙ্গিনায়। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আর জনপ্রিয়তার আভাস দিতে থাকে অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো। পিউ প্রকল্পের অধীনে ‘এক্সিলেন্স ইন জার্নালিজম’ গবেষণাপত্রে এসব তথ্যের খোঁজ মিলল।

যুক্তরাষ্ট্রের ১,৩৮০টি ছাপানো সংবাদমাধ্যম থেকে ৪৫০টি এখন পুরোপুরি অনলাইন গণমাধ্যমের কাতারে এসেছে। এ তালিকায় শুধু নিউ ইয়ক টাইমস নয়, বরং ছোট ও মাঝারি ঘরানার সংবাদমাধ্যমও আছে।

এসবের মধ্যে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম ছাপানো সংস্করণ অব্যাহত রাখলেও এদের সার্কুলেশন দারুণভাবে কমানো হয়েছে। এ চিত্রের বিপরীতে ‘পেওয়্যাল’ পেমেন্ট অর্থাৎ সামান্য বিনিময় অর্থে পূর্ণ অনলাইন সংবাদ পাঠকের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সুতরাং একদিকে বিশ্বব্যাপী ছাপানো সংবাদমাধ্যমের কাটতি কমতে থাকে। অন্যদিকে দেরিতে সংবাদ প্রকাশের কারণে পাঠত প্রিয়তাও ক্রমেই কমে যায়। বিশ্বের মিডিয়া বিনিয়োগ মুঘল খ্যাত ওয়ারেন্ট বাফেটও এ সত্য সহজেই অনুধাবন করে ধীরে ধীরে তার মালিকানাধীন প্রকাশনা মাধ্যমগুলোকে গুটিয়ে অনলাইনমুখী করার উদ্যোগ নেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সালে ৬৩টি দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং পাক্ষিক পত্রিকা অনলাইনে চলে যায়। এমন সিদ্ধান্ত টিকে থাকার স্বার্থেই বলে মিডিয়া বিশ্লেষকেরা অভিমত দিয়েছেন।

নিউজউইক। ভুবনখ্যাত এ প্রকাশনার নাম খুব কম সচেতন পাঠকেরই অজানা। সুদীর্ঘ ৮০ বছরের ছাপানো ইতিহাসের ইতি টেনেছে নিউজউইক প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ। ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ সালেই নিউজউইক প্রকাশনার ইতি হয়।

ইন্টারঅ্যাকটিভ করপোরেশনের (আইএসিআই) মালিকানাধীন এ প্রকাশনা মাধ্যমটি নিয়ে কর্তৃপক্ষ আরও সফল ব্যবসা করতেই ছাপানো থেকে অনলাইন সংস্করণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এ প্রসঙ্গে নিউজউইকের এডিটর-ইন-চিফ টিনা ব্রাউন বলেন, সময় এখন ডিজিটাল প্রকাশনার। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। প্রকাশনা শিল্পে ব্যয়ভার আর সার্কুলেশন ব্যবস্থাপনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় খরচের সঙ্গে তাল মেলানো এখন কঠিন কাজ।

বিশ্বের সব দেশের পাঠক এবং বিজ্ঞাপন দাতাদের কাছ থেকে নিউজউইকের অনলাইন সংস্করণের জন্য ব্যাপক চাপ আসতে থাকে। ফলে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রকাশনা আর অনলাইন এ দু’সংস্করণকে একসঙ্গে না টেনে অনলাইনেই প্রধান করে নিউজউইক।

পুরোনো সংস্কৃতির এ আমূল পরিবর্তন এনেছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের বয়স ৪ দশকের অঙ্ক পেরিয়েছে। স্যোশাল মিডিয়া, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট এবং নতুন মোবাইল অ্যাপলিকেশনের হাত ধরে বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম এখন অনলাইন মিডিয়ার দখলে।

আসছে ২০২০ সালে এটি হবে অনিবার্য সত্য। অর্থাৎ বিশ্বের অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই পৌঁছে যাবে ইন্টারনেটের সুফল। গুগল চেয়ারম্যান এরিক স্মিডও এমন ইঙ্গিত করেছেন।

ব্যবসা, বিপণন আর স্যোশাল মিডিয়া এ ত্রিমুখী পথই দখলে নিয়েছে ইন্টারনেট। অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের পুরো কার্যক্রমের শাসন ও নিয়ন্ত্রক হবে ইন্টারনেট।

এ মুহূর্তে বিশ্বের ২৪৬ কোটি মানুষ স্মার্টফোন আর ৪৯২ কোটি মানুষ মুঠোফোন ব্যবহার করছে। বিপরীতে বিশ্বের জনসংখ্যা এখন ৭০০ কোটি পেরিয়েছে। ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট জনসংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ২০২০ সালের বিশ্বের মূল জনসংখ্যার কাছাকাছি অঙ্কে পৌঁছবে। তখন মিডিয়াসহ সবকিছুই সম্পাদন হবে অনলাইনে।

এহেন ভবিষ্যৎ ভাবনায় ২০২০ সালে ইন্টারনেট জনসংখ্যা ৫০০ কোটির অঙ্ক ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং অনলাইন কারিগরি শৈলীতে এটি বিশ্বের সামনে নব যুগের সূচনা করবে। দ্য ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এ কথা বলেছে।

অনলাইনে গবেষকেরা বলছেন, ২০১০ সালের পরের ১০ বছরে ইন্টারনেট বিশ্বে বিপ্লব সূচিত হবে। বিশ্বের উন্নত আর উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ক্রমেই ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারের গাণিতিক প্রবৃদ্ধিতে মধ্যপ্রাচ্যে ২৮.৩, এশিয়া ১৯.৪ এবং আফ্রিকা ৬.৮ ভাগ এগিয়েছে।

২০২০ সালে বিশ্বের বহু দেশের দুর্গম অঞ্চলেও ইন্টারনেট সেবা সুনিশ্চিত হবে। এ জন্য স্মার্টফোন হবে সবচেয়ে সক্রিয় মাধ্যম। আর ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে বহু ভাষার অবাধ চর্চা হওয়ায় গ্রাহক সংখ্যাও বাড়বে হু হু করে।

এ ইন্টারনেট প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও ২০২১ সালে সফলভাবেই এগোবে। এ লক্ষ্যের পথ ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের স্বপ্নও সুগম হবে। নিশ্চিতভাবেই এ অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যম আয়ের দেশে জায়গা করে নেবে।

আরেকটি উদাহরণে গল্পে বলা যায়, ২০০৫ সালে সাধারণ লেখকদের প্লাটফর্ম তৈরিতে আত্মপ্রকাশ করে হাফিংটন পোস্ট। মাত্র এক বছরের মধ্যে এটি সাধারণ পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়। এরপর নিত্যনতুন ভাবনার সংযোজন করেন হাফিংটন পোস্টের এডিটর ইন চিফ আরিয়ানা। জনসাধারণের কাছে আরও জনপ্রিয় হতে বিশ্বব্যাপী প্রদায়ক নিয়োগ করতে থাকেন আরিয়ানা।

এর ঠিক পরেই ২৪ ঘণ্টার অনলাইন পোর্টাল করার কথাও ভাবেন আরিয়ানা। কাছের বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় হাফিংটন পোস্টে যুক্ত হয় ২৪ ঘণ্টার সংবাদ, ভিডিও রিপোর্টিং আর ভিডিও ব্লগিং। ক্রমশ বাড়তে থাকে পাঠক, লেখক আর বিজ্ঞাপন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে আরিয়ানার ‘হাফিংটন পোস্ট’ পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হয়।

হাফিংটন পোস্টকে কেন্দ্র করে আরিয়ানার জনপ্রিয়তা আজ বিশ্বব্যাপী। আরিয়ানা হাফিংটন নিজের লেখনি শক্তিতে তৈরি করেছেন হাজারো লেখক। এ কাজে আরিয়ানাকে উৎসাহ দিচ্ছেন অসংখ্য পাঠক।

আরিয়ানা বিশ্বাস করেন, অনলাইন কনটেন্ট দিয়ে বিশ্বের কাছে নিজের যৌক্তিক আর শক্তিশালী কথা উপস্থাপনযোগ্য। আর এ বিশ্বাসকেই বাস্তব করে তুলেছে হাফিংটন পোস্ট। যাকে ঘুরিয়ে বললে এভাবে বলা যায়, আগামীর সব কিছুরই নিয়ন্ত্রক হবে অনলাইন মিডিয়া। আর সব ধরনের আর্থিক লেনেদেনই হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। গণমাধ্যমেও আধিপত্য আর একচ্ছত্র প্রকাশ করবে অনলাইন মিডিয়া।

লেখক: সাব্বিন হাসান

[email protected]

আপনার মতামত লিখুন :

ভয় ভয়ংকর!

ভয় ভয়ংকর!
তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত যখন রামদা’র কোপের নিচে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তখন আমি কচা নদীর বুকে। মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরছি। মসহুদ এর ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে একটি ছোট দেড়তলা লঞ্চ। সকাল দশটার আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। সহযাত্রীদের কাছে বলছিলাম বলেশ্বরের বুকে লঞ্চ ডুবির রিপোর্ট করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রে যাওয়া। মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয়ে কেমন আতঙ্কিত ছিলাম।

আমার সেই গাল-গপ্প শুনে এম.ভি. মসহুদের মাস্টার বললেন-এখন কি ভেসে আছেন নাকি, ডুবে যাওয়ার বাকি আছে? তিনি এই নৌরুটে নিয়মিত রকেট নিয়ে আসা যাওয়া করেন। দেখে চলছেন দুই কূলের মানুষের জোয়ার ভাটা। এখন আর চোখ সইয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির গর্জনতো কম শোনেননি তিনি। ঘাটের কতো সামান্য যাত্রীকে এক সময় ভিআইপি কেবিনে নিয়ে বসাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা শ্যাওলা পড়েছিল ঠিক, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা দেখিয়েছেন কমই।

কিন্তু এখন? নদীর চেয়ে উত্তাল তারা। এই উত্তালের উর্মি হচ্ছে উঠতি তরুণরা। কৈশোর পার হবার আগেই কোনো না কোনো নেতার ঘূর্ণির বিষাক্ত ধূলি হয়ে উঠছে। গ্রামের সাধারণ এক কিশোরও যেন ক্ষমতার তন্দুরে সারাক্ষণ তেঁতে আছে। নেমে পড়েছে সব ধ্বংস করে দেবার জন্য ঢাল তলোয়ার নিয়ে। পেছনে তাদের ‘ভগবান’দের প্রশ্রয়। রকেটের মাস্টারের দেখার চোখের সঙ্গে নিজের চোখও কেমন যেন মিলে গেল। তিনি দেখছেন দুই তীরের বদলে যাওয়া। সেই দেখার সঙ্গে আমার মহল্লা-শহরের বদলে যাওয়ার কত মিল!

কত সহজে বন্ধুর বুকে গুলি ছুঁড়তে পারে, বুকে গেঁথে দিতে পারছে রামদা। প্রিয়তমার ‘অসুন্দর’ ছবি তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে। বিষয়গুলো অপ্রকাশ্য থাকছে। তারা শক্তির প্রশ্রয়ে পরোয়া করছে না কিছুই। কারণ তাদের মস্তিষ্কে একটি বিশ্বাসের বালুচর তৈরি হয়েছে, যেখানে বোনা আছে সামাজিক, রাজনৈতিক মহিরুহ, যা সকল অপরাধ থেকে রক্ষা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজিৎ থেকে রিফাত শরিফ। মাঝে আরও কত নাম হারিয়ে গেছে। মনে রাখিনি আমরা। আমাদের এই ভুলে যাওয়ার মুদ্রাদোষে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীরা দানব হয়ে উঠছে। শুধু বরগুনাতে নয়, রাজধানীতেও চলছে এই দানবদের ভয়ংকর তাণ্ডব।

বরগুনার ঘটনার নারকীয়তা দেখার চোখে ভিন্ন রঙ দিতে রিফাত শরীফের স্ত্রীর সঙ্গে রতন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার আড়ালে প্রেম-পরকীয়া যাই থাকুক, সেটির সামাজিক ও আইনগত সমাধান আছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারায় কোনো বীরত্ব নেই। নেই সমাধান। এ কথা অপরাধীও জানে। কিন্তু ঐ যে সমাজ ও রাজনীতিক শক্তি এদের সকল বোধকে ধবংস করে দিয়েছে। এখন প্রকাশ্য হত্যাকে তারা উদযাপন করে। এই উদযাপনের আরেকটি দিক হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতিকে আরও জোড়ালো করা। তাদের সমাজ ভয় পাবে। সমাজ, জনপদে এই দানবদের দাপট বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে।

আমরা বলছি যে, হত্যা-হামলার সময় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকছি। ভিডিও করছি মুঠোফোনে। ছবি তুলে রাখছি। যদি আমরা এগিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো মানুষটি হামলা থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত জীবনটা। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু ভিডিও এবং ছবির বদৌলতে আমরা আসামিদের ধরতে পারছি। মামলা বেগবান হচ্ছে। ঠিক এমন অংসখ্য অপরাধ আড়ালে রয়ে যাচ্ছে প্রমাণের অভাবে।

মানুষ জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ কথাও সত্য। দুর্ঘটনায় রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। তাকে হাসপাতালে না নিয়ে আমরা ছবি তুলছি। কোথাও কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেও এগিয়ে যাচ্ছি না। হত্যার ঘটনাতো আরও ভয়ের বিষয়। কেন যাচ্ছি না? আমরা কি মানবিকতা শূন্য হয়ে পড়েছি? অন্যের বিপদে বুক হু হু করে উঠে না, আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে শক্তি মরে গেছে? না আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলির কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। আমরা শুধু জড়িয়ে পড়েছি ভয়ের জালে।

ছিনতাইকারীর কবল থেকে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোপের মুখে পড়ছি। হত্যার মতো ঘটনায় মামলা ও কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে স্থানীয় রাজনীতির শোষণ।

অপরাধীকে মোকাবিলা করার প্রাণশক্তি আমাদের আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার শক্তি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তাই গণমানুষকে দায়ী না করে, আসুন যেমন করে যেখান থেকে পাল্টে গেলাম আমরা, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া যায় কিনা। তাহলে অন্তত একজন বিশ্বজিৎ, রিফাতের পাশে দাঁড়ানো শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুরুটাই দরকার। তারপর দেখবেন অপরাধীরা আবারো আঁধারে গা ঢাকা দেবে। দেবেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র