শিক্ষায় নৈরাজ্য বন্ধ হোক

ফরিদুল আলম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

 

  • শিক্ষকদের জীবনমানের পরিবর্তন আসেনি। তাই বিকল্প আয়ের পথে শিক্ষকরা।

  • সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাথমিক শিক্ষা ক্রমেই মানহীন হয়ে পড়ছে।

  • আর্থিক খরচ, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের বেতনে অভিন্ন নীতিমালা নেই বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাখাতে।

  • জবাবদিহিতা ছাড়াই বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ।

  • স্কুলভেদে ভিন্ন পাঠ্যপুস্তক নোটবই গাইড বইয়ে বাজার সয়লাব

  • কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষাখাতে ব্যয় বাড়ছে, মান বাড়ছে না।


আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণের মধ্যে অনেকদিন ধরেই অনেক বিষয়ে অনেক অসন্তোষ বিরাজ করছে। বাংলাদেশ ক্রমেই উন্নয়নের মানদণ্ডসমূহের আলোকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রশংসিত হলেও আমাদের সার্বিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা এবং মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশের সুযোগ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার যেভাবে বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে চলছে এমন ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণের জন্য শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ ভীষণ কঠিন হয়ে পড়বে।

বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ কার্যক্রম, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়কে জাতীয়করণসহ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার – এই সব কিছুই ইতিবাচক দিক হলেও কোথাও যেন গভীর সংকট রয়ে গেছে, যা থেকে উত্তরণ ঘটা সম্ভব হচ্ছে না এবং এক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের উদ্যোগের ঘাটতিও যে রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমার আজকের আলোচনায় আমি সেইসব বিষয়ের আলোকপাত করার চেষ্টা করব, যা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ নিত্য ভাবেন বলে আমি মনে করি। বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের শিক্ষা প্রশাসনে পরিবর্তন এসেছে এবং আমি মনে করি নতুন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মহোদয়ের সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত এবং উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দুঃসময় থেকে অতিক্রম ঘটা সম্ভব হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক অনিয়মের দিকটি আলোচনা করা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমি আজকের আলোচনায় মূলতঃ আমাদের বিদ্যালয়তকেন্দ্রিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করব।

১.

আমরা জানি আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সার্বজনীনতা পেয়েছে অনেক আগেই এবং এক্ষেত্রে দেশের সর্বত্র এক ধরণের প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এমপিওভুক্ত এবং ননএমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নানা দাবীতে আন্দোলন করেছেন। এটাও ঠিক যে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আগের মত শিক্ষকতা পেশা মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে না এবং এর মূল কারণ অবশ্যই আর্থিক দৈন্যতা।

সরকার ইতোমধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতনগ্রেড উন্নয়নের মাধ্যমে বিষয়টির দিকে নজর দিলেও সার্বিকভাবে শিক্ষকদের জীবনমানের পরিবর্তন আসেনি। আর এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পরছে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের উপর। বাধ্য হয়েই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত মফস্বলের অনেক শিক্ষকদের বিকল্প আয়ের অন্বেষণ করতে হয়। ফলতঃ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রাথমিক শিক্ষা ক্রমেই মানহীন হয়ে পড়ছে।

২.

সরকারি পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষার এই দুরবস্থার কালে সন্তানদের অভিভাবকরা অতি ভয়াবহমাত্রায় ঝুঁকে পড়ছেন বেসরকারি বিদ্যালয় তথা কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি, তা হল এই অভিভাবকদের অনেকের বেসরকারি ব্যবস্থাপনার এমন ধারার শিক্ষার খরচ নির্বাহের সামর্থ্য না থাকলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় তাদের কষ্টার্জিত আয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে যদি নজর দিই তাহলে দেখতে পাব যে এখানে আর্থিক খরচ, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের বেতনসহ কোনো কিছুতেই কোনো প্রকার অভিন্ন নীতিমালা নেই। উপরন্তু বছর বছর টিউশন ফি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে বড় অংকের অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে অভিভাবকদের। এটি এখন এমনভাবে ভাইরাল হয়েছে যে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পড়াতে চান না এই কারণে যে এতে করে তাদের সামাজিক মর্যাদাহানি ঘটবে। আর এর মধ্য দিয়ে বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ, যার কোনো জবাবদিহিতা নেই।

৩.

সরকার ২০১০ সালে অভিন্ন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ঘটেনি যথাযথভাবে। আর একারণে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের সরকারি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আরও অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২টি পুস্তক কিনতে বাধ্য করছে। আরও মজার বিষয় হচ্ছে এই অতিরিক্ত পুস্তকগুলো আবার স্কুল ভেদে ভিন্ন রকম হয় এবং এগুলোর লেখা, ছাপা এবং বিপণন স্তর পর্যন্ত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা সক্রিয় থাকে।

আইনতঃ নোটবই এবং গাইডবই নিষিদ্ধ হলেও প্রথম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের পর্যন্ত এগুলো কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। বইয়ের বাজারগুলো ঘুরলে দেখা যাবে সর্বত্র সয়লাব হয়ে গেছে বিভিন্ন কোম্পনীর গাইড এবং নোট বইয়ে।

৪.

মাধ্যমিক পর্যায়ের দুই ধরণের বিদ্যালয় রয়েছে, সরকারি এবং বেসরকারি। এক্ষেত্রে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তির ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ব্যাপক অনিহা থাকলেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এর কারণ অবশ্যই মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় এইসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল ভাল হওয়া।

ব্যাপক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। এক্ষেত্রে একবার ছাত্রছাত্রী ভর্তি করতে পারলে অভিভাবকরা হাফ ছেড়ে বাঁচলেও এই ভাল ফলাফলের মূল কারণ আবার শিক্ষকদের ক্লাশে পাঠদানের ক্যারিশমা নয়, প্রাইভেট টিউশনি। সন্তানের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ক্লাশের ব্ল্যাকবোর্ডে নিজেদের মোবাইল ফোনের নম্বর লিখে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের জানিয়ে দেয়া হয় তাদের প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন হলে যেন শিক্ষকদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। অনেক শিক্ষকদের প্রতিনিয়তই দেখা যায় বিদ্যালয়ের ক্লাশ শেষ হওয়ামাত্রই স্কুলের নিকটবর্তী কোনো নির্ধারিত স্থানে র্প্রাইভেট টিউশনির দোকান খুলে বসে থাকতে।  বিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণে স্বাভাবিকভাবেই সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা দলে দলে ছুটে যাচ্ছে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছেই প্রাইভেট পড়তে। এখানে আবার একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অনেকে রীতিমত অনেক চেষ্টা তদবির করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রাইভেট ক্লাশে প্রবেশের সুযোগ পায়।

৫.

কোচিং বাণিজ্য নিয়ে কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা অনেকবারই এই বাণিজ্য বন্ধ করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে দেখলেও এর বাস্তব প্রতিফলণ ঘটেনি রহস্যজনক কারণে। অবশেষে বাধ্য হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বছর পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে কোচিং সেন্টারসমূহ বন্ধ রাখার চেষ্টা করেও পুরোপুরি সফলতা আসেনি। কিছুদিন আগেও আমাদের নবনিযুক্ত মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কোচিং বাণিজ্য বন্ধে তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ আশাবাদী হতে পারছেন না। সারাদেশে যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মত কোচিং সেন্টারগুলো গড়ে উঠেছে এসব এক কথায় সর্বগ্রাসী। একটা সময় ছিল যখন কোচিং সেন্টার বলতে বুঝানো হতো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে ভর্তিচ্ছুদের কোচিং এবং সেই সময় এসব নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ ছিল সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিসরে। ক্রমান্বয়ে তা বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের পর্যন্ত। বিষয়টি এখন এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে অভিভাবকদের মধ্যে কার সন্তান কয়টি কোচিং সেন্টারে পাঠ নিচ্ছে তা নিয়ে সামাজিক মর্যাদাজনিত প্রতিযোগিতা চলছে।

বর্তমান অবস্থার আলোকে উপরোক্ত বিষয়গুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি এই কারণে যে সরকার দেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক ধরণের নিরব হাহাকার এবং চাপা ক্ষোভ আমাদের অর্জনকে বিলম্বিত এবং বাধাগ্রস্থ করতে পারে।

শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার নিয়ে যেভাবে বাণিজ্য এবং নৈরাজ্য চলছে সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের জাতীয় বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যয়ের ৫টি খাতের একটি শিক্ষা হলেও এই ব্যাপক অর্থ ব্যয়ের সুফল আমাদের সাধারণের হাতে পৌছুচ্ছেনা, উপরন্তু সাধারণ মানুষের জীবন নির্বাহের অর্থের একট বড় অংশ খরচ করতে হচ্ছে সন্তানদের শিক্ষার ঘাটতি পূরণের জন্য। বিষয়টি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধই করে যথাযথা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এই কারণে যে যদি এমন ধারার অব্যবস্থা চলতে থাকে তবে সরকারের অনেক ইতিবাচক অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :