Barta24

রোববার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

কলোনি, না বাড়িবর্তী শিল্প?

কলোনি, না বাড়িবর্তী শিল্প?
নাহিদ হাসান, ছবি: বার্তা২৪
নাহিদ হাসান


  • Font increase
  • Font Decrease

১.

গত ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কে এন্ড কো ব্রিক ফিল্ডের একটি ঘরে কয়লা ভর্তি একটি ট্রাক উল্টে ১৩ জন ঘুমন্ত শ্রমিক মারা যান ও বাকি ৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহকর্মী সুজন চন্দ্র বলেন, 'ভোরে যখন কয়লা ভর্তি ট্রাকটি ইটভাটায় ঢোঁকে সে মুহূর্তে একটি ইট আমার গায়ে পড়লে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি দাঁড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকটি উল্টে ঘরের ওপর পড়ে। আমিও পড়ে যাই। তখন অন্য সহকর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে।'

এ প্রসঙ্গে ইট ভাটার মালিক হাজী আব্দুল রেজ্জাক বলেছেন, ইট ভাটায় শ্রমিকের প্রয়োজন হলে আমরা সর্দারের সঙ্গে কথা বলি। সে আমাদের শ্রমিক সংগ্রহ করে দেয়। কিন্তু তারা কোথায় কীভাবে থাকত সে বিষয়ে আমি জানি না।' আর সর্দার সাদ্দাম হোসেন বলেন, 'চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা ইট ভাটার কর্তৃপক্ষ করে থাকে। আমরা শ্রমিক হওয়ায় মালিকরা দায়সাড়াভাবে একটা ব্যবস্থা করে দেন।'

নিহত ১৩ জনের মধ্যে ১০ জনই ছাত্র। জলঢাকা মীরগঞ্জ হাট বহুমুখি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নিহতদের মধ্যে ৫ জন তার বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। আর দুই জন শিমুলবাড়ি এসসি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আর বাকী ৩ জন এই বছর এসএসসি পাশ করেছেন। তারা কেন ইট ভাটায় কাজ করতে গেছেন, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে সরকার বাহাদুর নিহতদের জন্য জনপ্রতি ২০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। বিমান দুর্ঘটনায় মরলে না হয় কথা ছিল! গ্রামের সেই গল্পের ৩ জন মানুষ আর ৫ জন জালুয়া মরার মত।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/09/1549695806343.jpg

তার আগে ২৩ তারিখ সকাল ৬টায় গাজীপুরের হোতাপাড়ায় ফুয়াং মোড়ে আলিফ পরিবহণ ও শ্যামলী পরিবহণের প্রতিযোগিতার বলি হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর হাবিবুর রহমান ফেরদৌস শ্যামলীর ধাক্কায় নিহত হলেন, সে খবর তো কোনও পত্রিকাতেও আসেনি। উল্লেখ্য যে, ফেরদৌস সরকারের ২টি ছেলেও স্কুলে ছাত্র হয়েও মিস্ত্রি কাজ করেন।

মনে আছে লিমনের কথা? র‌্যাবের গুলিতে পা হারিয়েছিল যে। সেও কাজ করত ইট ভাটায়। সে যেমন গুলি না খেলে জানতাম না, তেমনি ১৩ জন শ্রমিক কয়লার ট্রাকে চাপা না পড়লে আমরা জানতামই না-মধ্য আয়ের দেশে কত শিক্ষার্থী শ্রমিকের জীবন যাপন করে!

বিবিসি জানিয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে গত ৫ বছরে অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে শুধু আনজুমান মফিদুল ইসলাম ৬হাজার ৭০০ জনের লাশ দাফন করেছে।

২.

এক সময় স্কুল-কলেজে খাতা-কলমের দাম কমানোর দাবিতে আন্দোলন হত, মধ্য আয়ের দেশে এখন এই আন্দোলনকে ফকিন্নির আন্দোলন মনে করা হয়। ফলে কোচিং-প্রাইভেট বাণিজ্য অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে গিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ক্লাসই হয় না। ফলে মহৎ উদাহরণ (!) এর শিক্ষায় গরীবের বাচ্চারা ইটভাটায়, রিক্সা চালিয়ে টিউশনি-কোচিং এর খরচ যোগাড় করে। শিক্ষা যে সুযোগ নয় অধিকার, অন্যান্য অধিকারের মত এই অধিকারও উধাও হয়ে গেছে। ভিসিগণ এখন ১০ টাকায় চা-সিঙ্গারা পাওয়ার গর্ব করেন।

আমরা এখন বাস করছি সামাজিক ব্যবসার যুগে। আর বেকারির দেশে শিল্পের উচ্চপদগুলো দখল করে আছে। এখন শ্রমিকের সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব শুধুমাত্র শ্রমিকেরই। না রাষ্ট্র, না কারখানা মালিকের। স্বায়ত্বশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খরচের দিক দিয়ে একেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই। নেংটিপরা কৃষকেরা যখন একটি দেশ স্বাধীন করে ফেলে তখন তাদের একটা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার কায়েম হওয়ার মতো একটা দেশ দরকার ছিল হয়ত। আজ আর তার দরকার মনে করা হচ্ছে না।

৩.

কলোনি মানে উপনিবেশ। মানে উপনিবাস। উপ অর্থ নব রূপে উন্নয়ন বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন পালন করে যে, মানে- যে নিবাস নবরূপে উন্নীত। রেল কলোনি, আদমজী কলোনি ছিল এমনি ধরনের নিবাস। ইউরোপে যন্ত্র প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কুটির শিল্প শ্রমিকেরা যে নিরাপত্তা ভোগ করত, তার সব কিছুই বদলে গেল। বাজার দর নির্ধারিত হতে লাগল যন্ত্রের পণ্যের দ্বারা। আর এই দাম কমার সাথে কুটির শিল্পের শ্রমিকদেরও মজুরি কমতে লাগল। হয় শ্রমিকদের এই পরিস্থিতি মেনে নিতে হয়, নয়ত নতুন কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। আর এই নতুন কাজের সন্ধানে বের হতে গেলে তাকে পুরোদস্তুর প্রলেতারিয়েতে পরিণত হতে হয়। আর তা হতে গেলে নিজের হোক বা ধার নেওয়া হোক -নিজের ঘর, উঠোন ও ছোট্ট ক্ষেতটুকু ছাড়তে হয়।

জার্মানিতে কলের তাঁতের বিরুদ্ধে হাতের তাঁতের লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনের কারণ গ্রামীণ তাঁতিদের এই উঠোন ও ছোট্ট ক্ষেত। আর এই লড়াইয়ের মধ্যদিয়েই ইউরোপে এই সত্য জানা গেল- উৎপাদনের উপায়ের ওপর শ্রমিকের নিজের মালিকানা; যা ছিল অতীতের স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তি তাই এখন শেকল।https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/09/1549696012771.jpg

শিল্পক্ষেত্রে কলের তাঁতের কাছে হাতের তাঁত আর কৃষিতে বড় খামাড়ের কাছে ছোট্ট জোত পরাজিত হল। তবুও ভাঙা ঘরটি, উঠোনের বাগান ও হাতের তাঁতটি ব্যক্তিগত উৎপাদন-পদ্ধতিও। কায়িক শ্রমের সঙ্গে জুড়ে থাকছিল। চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতার তুলনায় বাড়ি-বাগানের মালিকানা অধিক অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। তবে বিশ্বজোড়া লুটের মাল প্রাপ্তির মধ্যদিয়ে ইংল্যান্ড ও ফরাসি দেশে যে বিপুল ও অকল্পনীশ পুঁজি ও বাজার চলে আসে, তার জন্যও শ্রমিকদের নিকট থেকে সর্বোচ্চ শ্রম ঘন্টা শোষণ জরুরি হয়ে পড়ে। আর এর ফলে সৃষ্টি হয় শ্রমিক কলোনী। যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় শ্রম বিক্রি শেষে ঘরে উঠোনের সব্জি ক্ষেতেও শ্রম নিয়োগ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর এতে একজন শ্রমিকের আবাসন ও তরকারির জন্য যে মজুরিটুকু শ্রমিককে প্রদান করতে হত, তা থেকে কারখানা মালিক রেহাই পান, তেমনিভাবে তাকে একই কারখানায় বেঁধে রাখা সহজ হয়।

৪.

মহানগর কলকাতার মধ্যে যেমন প্রশাসনিক দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা, বেশ্যালয়, শিল্পকারখানাসহ তাবৎ কিছু ঢু্ঁকিয়ে ফেলা হয়েছিল, তেমনিভাবে ঢাকা-চট্টগ্রামও গড়ে তোলা হয়। ফলে কর্মসংস্থানের জন্য এই শহরগুলিই ঠিকানা হয়ে ওঠে। কিন্তু সুলতানি আমলে বাংলা যে পৃথিবীর তাঁতঘর হয়ে উঠেছিল, আর বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস যে বিশ্ববাজারে উন্নত পণ্যের বদলে শরীর বেঁচে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে পেছনের তরফের হয়ে, সেটাও ভালভাবে করতে গেলে উন্নত জনশক্তি ও আবাসন সমস্যার সমাধান করেই করতে হবে।

ইউরোপে যেখানে কুটির শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একটির পর একটি কৃষক এলাকা আধুনিক শিল্প এলাকার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো কুটির শিল্প বিকাশ নয় ধ্বংসের মধ্যদিয়ে তা হয়েছে। ফলে জ্ঞানের ধারাবাহিকতাও লুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমান শিল্পপতিদের মুনাফার সবটাই হল মজুরি কেটে নেওয়া অংশ আর উদ্বৃত্ত মূল্যের সবটাই ক্রেতাকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর গবেষণা অনুযায়ী রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আমদানী বাবদ দেয় কর অব্যাহতি পায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার, গার্মেন্ট খাতই এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার অব্যাহতি সুবিধা পায়। গত বছর ‘চাহিবামাত্র’ উৎসে কর কমানো হয়েছে যাতে রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযাযী তাঁরা আরও ৩ হাজার কোটি টাকার সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়াও কমানো হয়েছে কর্পোরেট কর। গার্মেন্টসসহ সকল রপ্তানি পণ্যের অসাধারণ সুলভ মূল্যের এই হল গূঢ় কারণ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/09/1549695988418.JPG

ইউরোপে, যেখানে একজন শ্রমিকের শ্রম ছাড়া বেচবার কিছুই নাই, তাদের যখন কারখানা মালিকের পক্ষ থেকে আবাসন ব্যবস্থা করা হয়, তখন তা শ্রমিকের বার্গেনিং ও স্বাধীনতার সামর্থকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে, কারিগর-কৃষকের দেশে ব্যাপারটা উল্টো। এখানে ভূমি থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ইওরোপের ধরনে হয়নি, ফলে শ্রমিকরা যদি বর্তমানের বাড়িটিতে অবস্থান করেই কারখানায় কাজ করতে পান, তাহলে এই বাসস্থানের নিশ্চয়তা তাকে বার্গেনিং ও স্বাধীনতার শক্তিকে বৃদ্ধিই করবে। এর ফলে, শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। কে না জানে, দেশীয় বাজার হচ্ছে শিল্পায়ণের পূর্ব শর্ত।

পরাধীন পূর্ব আমলে জ্ঞান ছিল পরম্পরা ভিত্তিক। তাই বাংলাদেশের শিল্পকেন্দ্রগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে আবদ্ধ না রেখে, সুলতানি আমলের মত একেকটি শহরে একেক ধরনের শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে ওইসব অঞ্চলের অধিবাসীরা বংশ পরাম্পরার সূত্রে দক্ষ হয়ে উঠবেন। কর্মক্ষেত্র নিয়ে, মজুরি নিয়ে বার্গেনিংএ সমাজ মুখ্য ভূমিকায় চলে আসত, স্থানান্তর সীমিত হয়ে আসায় নিরাপত্তা নিশ্চিত হত। তখনই কেবল কর্মক্ষেত্রের মৃত্যুস্রোত রোধ করা সম্ভব হবে। অধিক কথার কি দরকার, উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের মৃত্যুর হারই তো সাবুদ হিসেবে যথেষ্ট। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে শিল্প মালিকরা দানব হয়ে ওঠার বদলে আত্মীয় হয়ে, সমাজের একজন হয়ে ওঠার পরিস্থিতি গড়ে উঠত। এই ভূখণ্ডের শিল্প গড়ে উঠেছে জমির আলের পাশে, এখনও তার ভবিষ্যত বাড়িবর্তী শিল্পের মাঝেই।

নাহিদ হাসান: সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি।

 

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র