Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

অপার সম্ভাবনাময় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম

অপার সম্ভাবনাময় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম
ছবি: প্রতীকী
রায়হানা তসলিম


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিদিনই বিশ্বব্যাপী উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে দুনিয়া। সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত ও প্রথাগত অনেক কিছুই। সর্বত্র কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের হাত ধরে নিত্যদিন ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।

একটি কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট ফোন আর তার সাথে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় বসেই যে কোনো বিষয়ের উপরে দক্ষতা অর্জন করা আজ মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে ই-লার্নিং এখন বহুল আলোচিত বিষয়।

ধরাবাধা শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে হওয়ায় ক্রমশ এবং দ্রুত ই-লার্নিং এখন একটি জনপ্রিয় শিক্ষা ব্যবস্থা। দুনিয়াব্যাপী এর জয়জয়কার।

প্রথাগত বা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস করা কিংবা কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার পদ্ধতিই হলো ইলেকট্রনিক লার্নিং বা ই-লার্নিং। ঘরে বসে সুবিধাজনক সময়ে, পছন্দজনক বিষয়ে ই-লার্নিং এর মাধ্যমে সহজেই নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব। গতানুগতিক ক্লাসের ব্যাপার না থাকায় নিজের সুবিধামত সময়ে ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে শেখার কাজটি সহজেই এখন সুসম্পন্ন করা যায়। বলা চলে আমাদের সনাতন বা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে একেবারেই আলাদা এই ই-শিক্ষা ব্যবস্থা।

সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো একটি বিষয়ের ওপর অধ্যয়ন করেন তখন একই সময়ে অন্য বিষয়ে তার শেখার সুযোগ থাকে খুব কম। অথচ অপরাপর অভ্যাস ও অধ্যয়নের পাশাপাশি কিংবা পেশাগত কাজের ফাঁকেও ই-শিক্ষা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অপার সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থার সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হলো এই যে, নিজের ঘরে বসেই ক্লাস করা, অভীক্ষার মুখোমুখি হওয়া এবং সনদপত্র অর্জন করা খুব সহজেই সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে এখন লিন্ডা, কোর্সেরা, ইউডেমি, ইউডাসিটির মত ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম-এর সুখ্যাতির কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মুক্তপাঠ’ নামক প্রথম জাতীয় ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করে বাংলাদেশে যুগান্তকারী ই-শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অভিযাত্রা শুরু করেন। অল্পকাল পরেই বাংলাদেশ অর্জন করে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘ওয়ালর্ড সামিট অন ইনফরম্যাশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস)’।

মুক্তপাঠে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, বিদেশগামী কর্মী, প্রবাসী কর্মী, গৃহিণী, যুব সমাজ বা নবতিপর বৃদ্ধ তথা সবাই ই-লার্নিং এর সুযোগ পাচ্ছেন। এখানে শিক্ষকদের জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সংশ্লিষ্ট কোর্স, বিদেশগামীদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন কোর্সসহ মোট ১৯টি কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।

মুক্তপাঠ ছাড়াও বাংলাদেশে এখন ই-লানিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে শিক্ষক ডটকম, জাগো অনলাইন স্কুল, ব্র্যাক, ইস্টওয়েস্ট এবং এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠান। এছাড়া বেপটো ডটকম, ইএটিএল’র এডুটিউববিডি ডটকম, স্টাডি ডটকমসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়োজনীয় বিষয়ে ই-লানিং কোর্স চালু করেছে। বলা চলে ওয়েব বেজড লার্নিংও এখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে আমাদের দেশে।

অন্যদিকে ২০০২ সালে ম্যাসচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) প্রথমবারের মতো ৫০টি ই-লার্নিং কোর্স চালু করেছিল। এমআইটি’র উদাহরণ খুব দ্রুতই সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দুনিয়াব্যাপী শুরু হয় (ওপেন কোরসওয়ার কনসরটিউম)। অনলাইন জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম এর নাম ‘খান একাডেমি’। ২০০৬ সালে বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষা পৃথিবীর সকল প্রান্তে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে খান একাডেমির ওয়েবসাইট চালু করা হয়। এখানে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানচর্চামূলক অনুশীলন, নির্দেশনামূলক ভিডিও, ব্যক্তিগত ড্যাশবোর্ড এবং শিক্ষক সহায়িকা। খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমান খান ইতোমধ্যে ভিডিও টিউটোরিয়ালগুলো বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নিয়েছেন।

বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য খুবই জনপ্রিয় ই-লার্নিং ওয়েব সাইটের নাম শিক্ষক ডটকম। প্রায় সকল বিষয়ের কোর্স থাকলেও কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সংশ্লিষ্ট প্রচুর কোর্স রয়েছে এখানে। ফলে ঘরে বসে যেকোনো বয়সের, যে কেউ নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারেন। তবে ‘টেন মিনিটস’ স্কুল বিনামূল্যে সহজে দশ মিনিটের মধ্যেই ই-লার্নিং কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে ।

এখানে দশ মিনিটের ছোট ছোট কুইজের ওপর পরীক্ষা নেওয়া হয়। সাথে সাথে এটির প্রাপ্ত নম্বর প্রদান করে। ফলে একজন শিক্ষার্থীর মুহূর্তের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর কতটুকু দক্ষতা আছে বা কোথায় তার দুর্বলতা আছে তা জানতে পারেন এবং উপযুক্ত নির্দেশনাও এখান থেকে পেতে পারেন। পাশাপাশি অন্য বন্ধুদের সাথে তুলনা ও প্রতিতুলনা করে নিজে কতটুকু ই-শিক্ষার্থী হিসেবে এগিয়ে বা পিছিয়ে আছেন তা জানতে পারেন।

ই-লার্নিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়ধীন টিচিং কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট (TQI-II) ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রজেক্টের মাধ্যমে নবম-দশম শ্রেণির ইংরেজি, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞানসহ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়গুলোর অপেক্ষাকৃত জটিল অধ্যায়গুলোকে ই-লানিং ম্যাটেরিয়ালসে রূপান্তর করা হয়েছে।

উল্লিখিত ম্যাটেরিয়ালসসমূহ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ওয়েব সাইটে সংরক্ষিত রয়েছে যা ব্যবহার করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষার যেকোনো অংশীজন নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। এছাড়াও (TQI-II) প্রকল্পের মাধ্যমে ষষ্ঠ শ্রেণির ১৬টি বইকে ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল টেকস্টবুকে (আইডিটি) রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি সারা বাংলাদেশে ৫১টি ক্লাস্টার সেন্টার স্কুল স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি হচ্ছে ই-লার্নিং সেন্টার।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের সেসিপ প্রকল্পের মাধ্যমেও ই-লানিং কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। সারা বাংলাদেশে ৬৪০টি ই-লার্নিং সেন্টার স্থাপন এবং বিপুল পরিমাণ ই-লানিং ম্যাটেরিয়ালস তৈরি করেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও ই-বুক প্রবর্তিত করেছে।

ই-লার্নিং ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীকে কখনই শিক্ষকের মুখোমুখি না হলেও চলে। তবে শিক্ষার্থী তার কৌতুহল নিবারণের জন্য কখনো ইমেইল-এর মাধ্যমে বা চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে তার জানা বা অজানার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করতে পারেন। এছাড়া আলোচনার মাধ্যমে তার সহপাঠীর সাথে উদ্ভূত সমস্যা শেয়ার করতে পারেন। তবে কখনো কখনো ই-লার্নিং ম্যাটেরিয়ালস পাওয়ার জন্য এবং ই-লার্নিং কোর্স সম্পন্ন করার জন্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়।

ফলত ই-লার্নিং এর মাধ্যমে এখন দুনিয়াব্যাপী সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত সাক্ষরতাকে শাণিত করার অপার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে নিজেকে সমাজের যোগ্য বাসিন্দা হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তবে ই-লার্নিং যেহেতু শতভাগ প্রযুক্তিগত শিক্ষা ব্যবস্থা সে কারণে বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দেশের সামগ্রিক তথ্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া আবশ্যক। পাশাপাশি দেশের সর্বত্র ভাল ব্যান্ডউইথ, সহজলভ্য ও কমমূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা গেলে গ্লোবাল শিক্ষা ব্যবস্থায় ই-লার্নিং নতুন এক সংস্কৃতি ও চর্চার জায়গায় উপনীত হবে।

মূলত বাংলাদেশের ই-লার্নিং ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজলভ্য ও জনবান্ধব করে একে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল অংশে পরিগণিত করতে হবে। আর ই-লার্নিং পদ্ধতির মধ্যে যে বিপুল সোনালি সম্ভাবনার প্রযুক্তিগত সংশ্লেষ রয়েছে তাকে যথাযথ বাস্তবায়ন, রূপায়ন ও রসায়নের আশ্লেষে জারিত করা গেলে লেখাপড়ায়, পড়াশোনায়, জ্ঞান ও দক্ষতায় খুব সহজেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে ২০৪১ সালের উন্নত দেশের রূপকল্পখচিত আগামীর বাংলাদেশ।

রায়হানা তসলিম: উপ-প্রকল্প পরিচালক, টিকিউআই-২ প্রকল্প, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর

 

আপনার মতামত লিখুন :

ভয় ভয়ংকর!

ভয় ভয়ংকর!
তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত যখন রামদা’র কোপের নিচে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তখন আমি কচা নদীর বুকে। মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরছি। মসহুদ এর ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে একটি ছোট দেড়তলা লঞ্চ। সকাল দশটার আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। সহযাত্রীদের কাছে বলছিলাম বলেশ্বরের বুকে লঞ্চ ডুবির রিপোর্ট করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রে যাওয়া। মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয়ে কেমন আতঙ্কিত ছিলাম।

আমার সেই গাল-গপ্প শুনে এম.ভি. মসহুদের মাস্টার বললেন-এখন কি ভেসে আছেন নাকি, ডুবে যাওয়ার বাকি আছে? তিনি এই নৌরুটে নিয়মিত রকেট নিয়ে আসা যাওয়া করেন। দেখে চলছেন দুই কূলের মানুষের জোয়ার ভাটা। এখন আর চোখ সইয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির গর্জনতো কম শোনেননি তিনি। ঘাটের কতো সামান্য যাত্রীকে এক সময় ভিআইপি কেবিনে নিয়ে বসাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা শ্যাওলা পড়েছিল ঠিক, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা দেখিয়েছেন কমই।

কিন্তু এখন? নদীর চেয়ে উত্তাল তারা। এই উত্তালের উর্মি হচ্ছে উঠতি তরুণরা। কৈশোর পার হবার আগেই কোনো না কোনো নেতার ঘূর্ণির বিষাক্ত ধূলি হয়ে উঠছে। গ্রামের সাধারণ এক কিশোরও যেন ক্ষমতার তন্দুরে সারাক্ষণ তেঁতে আছে। নেমে পড়েছে সব ধ্বংস করে দেবার জন্য ঢাল তলোয়ার নিয়ে। পেছনে তাদের ‘ভগবান’দের প্রশ্রয়। রকেটের মাস্টারের দেখার চোখের সঙ্গে নিজের চোখও কেমন যেন মিলে গেল। তিনি দেখছেন দুই তীরের বদলে যাওয়া। সেই দেখার সঙ্গে আমার মহল্লা-শহরের বদলে যাওয়ার কত মিল!

কত সহজে বন্ধুর বুকে গুলি ছুঁড়তে পারে, বুকে গেঁথে দিতে পারছে রামদা। প্রিয়তমার ‘অসুন্দর’ ছবি তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে। বিষয়গুলো অপ্রকাশ্য থাকছে। তারা শক্তির প্রশ্রয়ে পরোয়া করছে না কিছুই। কারণ তাদের মস্তিষ্কে একটি বিশ্বাসের বালুচর তৈরি হয়েছে, যেখানে বোনা আছে সামাজিক, রাজনৈতিক মহিরুহ, যা সকল অপরাধ থেকে রক্ষা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজিৎ থেকে রিফাত শরিফ। মাঝে আরও কত নাম হারিয়ে গেছে। মনে রাখিনি আমরা। আমাদের এই ভুলে যাওয়ার মুদ্রাদোষে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীরা দানব হয়ে উঠছে। শুধু বরগুনাতে নয়, রাজধানীতেও চলছে এই দানবদের ভয়ংকর তাণ্ডব।

বরগুনার ঘটনার নারকীয়তা দেখার চোখে ভিন্ন রঙ দিতে রিফাত শরীফের স্ত্রীর সঙ্গে রতন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার আড়ালে প্রেম-পরকীয়া যাই থাকুক, সেটির সামাজিক ও আইনগত সমাধান আছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারায় কোনো বীরত্ব নেই। নেই সমাধান। এ কথা অপরাধীও জানে। কিন্তু ঐ যে সমাজ ও রাজনীতিক শক্তি এদের সকল বোধকে ধবংস করে দিয়েছে। এখন প্রকাশ্য হত্যাকে তারা উদযাপন করে। এই উদযাপনের আরেকটি দিক হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতিকে আরও জোড়ালো করা। তাদের সমাজ ভয় পাবে। সমাজ, জনপদে এই দানবদের দাপট বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে।

আমরা বলছি যে, হত্যা-হামলার সময় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকছি। ভিডিও করছি মুঠোফোনে। ছবি তুলে রাখছি। যদি আমরা এগিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো মানুষটি হামলা থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত জীবনটা। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু ভিডিও এবং ছবির বদৌলতে আমরা আসামিদের ধরতে পারছি। মামলা বেগবান হচ্ছে। ঠিক এমন অংসখ্য অপরাধ আড়ালে রয়ে যাচ্ছে প্রমাণের অভাবে।

মানুষ জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ কথাও সত্য। দুর্ঘটনায় রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। তাকে হাসপাতালে না নিয়ে আমরা ছবি তুলছি। কোথাও কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেও এগিয়ে যাচ্ছি না। হত্যার ঘটনাতো আরও ভয়ের বিষয়। কেন যাচ্ছি না? আমরা কি মানবিকতা শূন্য হয়ে পড়েছি? অন্যের বিপদে বুক হু হু করে উঠে না, আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে শক্তি মরে গেছে? না আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলির কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। আমরা শুধু জড়িয়ে পড়েছি ভয়ের জালে।

ছিনতাইকারীর কবল থেকে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোপের মুখে পড়ছি। হত্যার মতো ঘটনায় মামলা ও কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে স্থানীয় রাজনীতির শোষণ।

অপরাধীকে মোকাবিলা করার প্রাণশক্তি আমাদের আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার শক্তি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তাই গণমানুষকে দায়ী না করে, আসুন যেমন করে যেখান থেকে পাল্টে গেলাম আমরা, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া যায় কিনা। তাহলে অন্তত একজন বিশ্বজিৎ, রিফাতের পাশে দাঁড়ানো শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুরুটাই দরকার। তারপর দেখবেন অপরাধীরা আবারো আঁধারে গা ঢাকা দেবে। দেবেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র