Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

বিএনপি এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে...

বিএনপি এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে...
মোকাম্মেল হোসেন, ছবি: বার্তা২৪
মোকাম্মেল হোসেন


  • Font increase
  • Font Decrease

তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা। অনেক দায়িত্ব তার। এ দায়িত্ববোধ থেকেই বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার জন্য তিনি জোর চেষ্টা-তদবির চালালেন এবং সফল হলেন। তবে সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিট অবশ্যই খুব বেশি সময় নয়; কিন্তু যিনি সময় দিলেন তিনি যদি হন বিশ্বপতি আর সময় যিনি পেলেন তিনি যদি হন দারিদ্র্য নিপীড়িত ছোট্ট একটা দেশের অধিবাসী, তাহলে মিনিটকে ঘণ্টার ফ্রেমে বন্দি করা ঠিক হবে না। দুই নেতার মধ্যে কথা শুরু হল। সালাম নিবেদনের পর বিশ্বনেতার উদ্দেশে বঙ্গনেতা বললেন-

: সুন্দর সকাল স্যার; আছেন কেমন!

: বেশি ভালা না; সব মিলাইয়া ছেড়াবেড়া অবস্থার মধ্যে আছি। বলেন, আপনের বক্তব্য বলেন।

: আপনে আমার জন্য পাঁচ মিনিট সময় বরাদ্দ করায় আমি নিজে এবং সেইসঙ্গে আমার দেশের জনগণ ধন্য হইয়া গেছি। পাঁচ মিনিট আমার কাছে পাঁচশ’ মিনিটের সমান মনে হইতেছে।

: দুঃখিত! আপনে এইরকমভাবে কথা বলতেছেন কেন! আপনের মুখে কি চুইংগাম?

: না-না স্যার! মুখের মধ্যে কিছু নাই; মুখ ফকফকা। এইটা হইল আমার নিজস্ব বাচনভঙ্গি। এই বাচনভঙ্গি আমি কই পাইছি জানেন? ইশকুলে পড়ার সময় আমাদের পাঠ্যবইয়ে একটা কবিতা ছিল-নাম ‘সফদার ডাক্তার’; সফদার ডাক্তার মাথা ভরা টাক তার, খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে। এই কবিতা মুখস্ত করার পর আমিও স্যার পানি চিবাইয়া খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত কইরা ফেললাম। এরপর একদিন দেখলাম আচানক কারবার-পানি চিবাইয়া খাইতে খাইতে আমি চিবাইয়া চিবাইয়া কথা বলার শিল্পটাও আয়ত্ত্ব কইরা ফেলছি। বিষয়টা অতি চমৎকার না স্যার?

: হ, চমৎকার। এইবার বলেন...

জোরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বঙ্গনেতা বললেন:

: বলার বিষয় তো একটাই। আপনে যদি আমাদের গরীবখানায় একবার ঠ্যাং ছোঁয়াইতেন! আপনের জুতার ধূলি পড়লে আমাদের ইজ্জত যে কী পরিমাণ বাড়ত, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। আমি জানি, আপনে সময়ের পেছনে ছুটেন না; সময়ই আপনের পেছনে ছোটে। তারপরও বলতেছি স্যার, বাংলাদেশে আইসা এক কাপ কফি যদি খাইতেন; আল্লারে আল্লা! কী যে খুশি হইতাম! স্যার, অনুমতি না লইয়াই আপনেরে একটা কথা স্মরণ করাইয়া দিতে চাই-আপনের পূর্বসূরী ক্লিনটন সাব কিন্ত গরীব বইলা আমাদের অবহেলা করেন নাই। তিনি ঠিকই আমাদের দরিদ্রনিবাসে তশরিফ রাখছিলেন।

বঙ্গনেতার কথা শুনে বিশ্বনেতা হাসলেন। তারপর বললেন-

: আপনে কী এই কথার বলার জন্যই ফোন করছেন?

জিহ্বায় কামড় দিয়ে বঙ্গনেতা বললেন

: না, না; শুধু এই কথা না। অনেক কথা আছে। তার আগে বলেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার ব্যাপারে কতদূর অগ্রসর হইলেন?

: এইটা লইয়াই তো বিসকাউস লাগছে!

: যতই বিসকাউস লাগুক স্যার; পিছু হটবেন না। ব্যাটারা কোনোমতেই যেন সীমানা পার হইতে না পারে। বলা তো যায় না, বাংলাদেশ যে গতিতে উন্নয়ন করতেছে-শেষে এরা কাঁথা-বালিশ লইয়া গোষ্ঠীশুদ্ধা বাংলাদেশে আইসা হুমড়ি খাইয়া না পড়ে!

বঙ্গনেতার কথা শুনে বিশ্বনেতা অবাক হয়ে বললেন-

: এতদূর থেইকা বাংলাদেশে যাবে কীভাবে!

: এইটা আপনে কী বললেন স্যার! সূদুর সাইবেরিয়া থেইকা আণ্ডা-বাচ্চা লইয়া বাংলাদেশের মাটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আইসা হাজির হইয়া যায়; আর তো মানুষ। ঘটিবাটি বেইচ্যা মেক্সিকানরা যদি কোনোমতে একবার টিকিট কাইট্যা বিমানে উইঠ্যা বসে, তাইলে সাড়ে-সর্বনাশ। গরীব হইলে কী হবে, এইসব ব্যাপারে আমরা খুবই মানবিক স্যার। যে কারণে দশ লাখ রোহিঙ্গারে ফেরত দিতে পারি নাই; সেই একই কারণে তো মেক্সিকানদেরও ফেরত পাঠাইতে পারব না, তাই না?

: হু।

: স্যার, অনেকদিন আগে একটা জরিপ ফলাফলে দেখছিলাম, আমেরিকানরা অংক ভালো পারে না। ঘটনা সত্য নাকি?

: জরিপে যখন জানা গেছে, তখন সত্য হইলেও হইতে পারে।

: আপনেরা অংকে কি জন্য দুর্বল, তার একটা কারণ আমি বলি?

: বলেন।

: কারণ হইল আপনাদের সাহসের অভাব।

: সাহসের অভাব!

: হ। একাত্তর সালে আপনেরা ভয় না পাইয়া যদি সপ্তম নৌবহর লইয়া বাপের বেটার মতো বাংলাদেশে ঢুকতেন; তাহলে বাঙালির ছেঁচা খাইয়া অংকটা ঠিকই শিইখ্যা ফেলতেন। কিন্তু আপনেরা তো ভয় পাইয়া আর কাছেই ভিড়লেন না।

যাক, বেশি কথা বলবার চাই না...

: বেশি কথা বলবার চান না মানে? আপনে তো অনেক কথা বলেন!

উচ্চস্বরে হেসে বঙ্গনেতা বললেন-

: বেশি কথা বলি, না? কী করব বলুন! সারাক্ষণ কথার উপরেই থাকতে হয়।

: আপনের দলে আর লোকজন নাই?

: আছে। কিন্তু তারা কী বলতে যাইয়া কী বইলা ফেলে-সেইজন্য কোনো ঝুঁকির মধ্যে না যাইয়া কথা যা বলার আমিই বলি।

নির্ধারিত সময় সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বিশ্বনেতা এবার বললেন-

: আপনের সময় কিন্তু আর বেশি নাই।

: হায় আল্লাহ! এত তাড়াতাড়ি সময় যায় কেমনে? যাক, যে কারণে আপনারে ফোন করছি- বিএনপি তো এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে! তারা এখন উপজেলা, সিটি কর্পোরেশনসহ সব ধরনের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিছে!

: আমি কী করব?

: কী করবেন মানে! আপনে তাদের বোঝান। বুঝ না মানলে ধমক দেন।

: আমার ধমকে কি তারা তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাইয়া ফেলবে?

: একশ’বার পাল্টাবে। আপনে মুরুব্বি না?

: ঠিক আছে, বলব।

: শুধু বলা না; উদাহরণ সহযোগে বলবেন- নির্বাচন হইল গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। একটা নির্বাচন কইরাই যদি তারা এইভাবে বইট মারে; তাইলে বাংলাদেশে কি গণতন্ত্র টিকবে? কিছুতেই টিকবে না; হাঁটু ভাঙ্গা ‘দ’ হইয়া কাতরাইতে থাকবে।

সবচাইতে বড় কথা স্যার, যে দেশের গণতন্ত্রই হোক, তা উষ্টা খাওয়া মানে আমেরিকার উষ্টা খাওয়া। এইটা আমেরিকার জন্য কতবড় অপমানের বিষয়, একবার ভাইবা দেখেন।

হঠাৎ এসময় টেলিফোন পুঁউ, পুঁউ শব্দ করে উঠল। বঙ্গনেতা কী হইল-কী হইল বলে চেঁচিয়ে উঠতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো

: টাইম ইজ ওভার।

মোকাম্মেল হোসেন: রম্য লেখক ও সাংবাদিক।

আপনার মতামত লিখুন :

ভয় ভয়ংকর!

ভয় ভয়ংকর!
তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত যখন রামদা’র কোপের নিচে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তখন আমি কচা নদীর বুকে। মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরছি। মসহুদ এর ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে একটি ছোট দেড়তলা লঞ্চ। সকাল দশটার আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। সহযাত্রীদের কাছে বলছিলাম বলেশ্বরের বুকে লঞ্চ ডুবির রিপোর্ট করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রে যাওয়া। মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয়ে কেমন আতঙ্কিত ছিলাম।

আমার সেই গাল-গপ্প শুনে এম.ভি. মসহুদের মাস্টার বললেন-এখন কি ভেসে আছেন নাকি, ডুবে যাওয়ার বাকি আছে? তিনি এই নৌরুটে নিয়মিত রকেট নিয়ে আসা যাওয়া করেন। দেখে চলছেন দুই কূলের মানুষের জোয়ার ভাটা। এখন আর চোখ সইয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির গর্জনতো কম শোনেননি তিনি। ঘাটের কতো সামান্য যাত্রীকে এক সময় ভিআইপি কেবিনে নিয়ে বসাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা শ্যাওলা পড়েছিল ঠিক, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা দেখিয়েছেন কমই।

কিন্তু এখন? নদীর চেয়ে উত্তাল তারা। এই উত্তালের উর্মি হচ্ছে উঠতি তরুণরা। কৈশোর পার হবার আগেই কোনো না কোনো নেতার ঘূর্ণির বিষাক্ত ধূলি হয়ে উঠছে। গ্রামের সাধারণ এক কিশোরও যেন ক্ষমতার তন্দুরে সারাক্ষণ তেঁতে আছে। নেমে পড়েছে সব ধ্বংস করে দেবার জন্য ঢাল তলোয়ার নিয়ে। পেছনে তাদের ‘ভগবান’দের প্রশ্রয়। রকেটের মাস্টারের দেখার চোখের সঙ্গে নিজের চোখও কেমন যেন মিলে গেল। তিনি দেখছেন দুই তীরের বদলে যাওয়া। সেই দেখার সঙ্গে আমার মহল্লা-শহরের বদলে যাওয়ার কত মিল!

কত সহজে বন্ধুর বুকে গুলি ছুঁড়তে পারে, বুকে গেঁথে দিতে পারছে রামদা। প্রিয়তমার ‘অসুন্দর’ ছবি তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে। বিষয়গুলো অপ্রকাশ্য থাকছে। তারা শক্তির প্রশ্রয়ে পরোয়া করছে না কিছুই। কারণ তাদের মস্তিষ্কে একটি বিশ্বাসের বালুচর তৈরি হয়েছে, যেখানে বোনা আছে সামাজিক, রাজনৈতিক মহিরুহ, যা সকল অপরাধ থেকে রক্ষা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজিৎ থেকে রিফাত শরিফ। মাঝে আরও কত নাম হারিয়ে গেছে। মনে রাখিনি আমরা। আমাদের এই ভুলে যাওয়ার মুদ্রাদোষে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীরা দানব হয়ে উঠছে। শুধু বরগুনাতে নয়, রাজধানীতেও চলছে এই দানবদের ভয়ংকর তাণ্ডব।

বরগুনার ঘটনার নারকীয়তা দেখার চোখে ভিন্ন রঙ দিতে রিফাত শরীফের স্ত্রীর সঙ্গে রতন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার আড়ালে প্রেম-পরকীয়া যাই থাকুক, সেটির সামাজিক ও আইনগত সমাধান আছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারায় কোনো বীরত্ব নেই। নেই সমাধান। এ কথা অপরাধীও জানে। কিন্তু ঐ যে সমাজ ও রাজনীতিক শক্তি এদের সকল বোধকে ধবংস করে দিয়েছে। এখন প্রকাশ্য হত্যাকে তারা উদযাপন করে। এই উদযাপনের আরেকটি দিক হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতিকে আরও জোড়ালো করা। তাদের সমাজ ভয় পাবে। সমাজ, জনপদে এই দানবদের দাপট বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে।

আমরা বলছি যে, হত্যা-হামলার সময় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকছি। ভিডিও করছি মুঠোফোনে। ছবি তুলে রাখছি। যদি আমরা এগিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো মানুষটি হামলা থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত জীবনটা। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু ভিডিও এবং ছবির বদৌলতে আমরা আসামিদের ধরতে পারছি। মামলা বেগবান হচ্ছে। ঠিক এমন অংসখ্য অপরাধ আড়ালে রয়ে যাচ্ছে প্রমাণের অভাবে।

মানুষ জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ কথাও সত্য। দুর্ঘটনায় রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। তাকে হাসপাতালে না নিয়ে আমরা ছবি তুলছি। কোথাও কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেও এগিয়ে যাচ্ছি না। হত্যার ঘটনাতো আরও ভয়ের বিষয়। কেন যাচ্ছি না? আমরা কি মানবিকতা শূন্য হয়ে পড়েছি? অন্যের বিপদে বুক হু হু করে উঠে না, আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে শক্তি মরে গেছে? না আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলির কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। আমরা শুধু জড়িয়ে পড়েছি ভয়ের জালে।

ছিনতাইকারীর কবল থেকে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোপের মুখে পড়ছি। হত্যার মতো ঘটনায় মামলা ও কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে স্থানীয় রাজনীতির শোষণ।

অপরাধীকে মোকাবিলা করার প্রাণশক্তি আমাদের আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার শক্তি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তাই গণমানুষকে দায়ী না করে, আসুন যেমন করে যেখান থেকে পাল্টে গেলাম আমরা, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া যায় কিনা। তাহলে অন্তত একজন বিশ্বজিৎ, রিফাতের পাশে দাঁড়ানো শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুরুটাই দরকার। তারপর দেখবেন অপরাধীরা আবারো আঁধারে গা ঢাকা দেবে। দেবেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র