Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

প্রবাসী নারী শ্রমিক: যে গল্প কেউ শুনতে চায় না

প্রবাসী নারী শ্রমিক: যে গল্প কেউ শুনতে চায় না
ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন দাস সমাজে ‘কৃতদাস-দাসী’ তার প্রভুর ‘জীবন্ত অস্থাবর সম্পত্তি’ হিসেবে পরিগণিত হত। দাসীকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। যৌনদাসীর গর্ভের সন্তানকেও দাস-দাসী হিসেবে গণ্য করা হত। দাস সমাজ কাগজে কলমে না থাকলেও রয়ে গেছে তার অমানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো। মানুষ হিসেবে আমরাও হয়ে উঠেছি কখনও কখনও অমানবিক কিংবা অতি মানবিক।

সংসারে নিদারুণ কষ্ট আর অভাব না থাকলে কোনো মা-বাবা তার আদরের সন্তানকে, স্বামী তার স্ত্রীকে, সন্তান তার মাকে চায় না দেশে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দিতে কিংবা প্রবাসের অচেনা-অজানা স্থানে পাঠাতে। ভাতের কষ্ট, কাপড়ের কষ্ট, সাবানের কষ্ট, টাকার কষ্ট!  সে কষ্টের কি আর শেষ আছে!

ক্ষুদ্র ঋণ মানুষের সুখই শুধু কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার অবলম্বন। সর্বস্বান্ত করে ঘর ছাড়া করে দেশের মা-বোনকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে করেছে ‘গৃহ শ্রমিক’ কিংবা ‘যৌনদাসী’। দেশের নারী গৃহ শ্রমিককে আমরা আজো সুরক্ষা দিতে পারিনি বলে ক্রিকেটার, জজ, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির মানুষের নির্যাতনের শিকার অভাবী নারী ও শিশু শ্রমিক। নোংরা স্থান বা রান্নাঘর তাদের শোবার জায়গা। ডাস্টবিনের নোংরা, পচা, বাসি, পশুর খাবারের মত তাদের খাবার। বাচ্চার নোংরা করা খাবার তারা খায়। মশা, তেলাপোকা, ইঁদুর আর ছারপোকার সাথে তাদের বসবাস। ছেঁড়া আর পুরাতন কাপড়ই তাদের পরিধানের বস্ত্র। গৃহকর্মীর কাজ করতে আসাটা তার জানা, ফিরে যাওয়ার পথ অজানা। অচেনা শহরের বা প্রবাসের দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী ওরা ভুলে যায় মা-বাবার, সন্তানের, স্বামীর মুখের অবয়ব।

দুই.

বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর অসহায়ত্ব, অভাব, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, একটু স্বচ্ছলতা ও ভাগ্য বদলাতে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি এবং কর্মসংস্থানের আশায় নারীরা ঘর ছাড়া হয়।

পত্রিকায় প্রকাশ, চুক্তি ও শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি না পেয়ে উল্টো যৌন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। যারা বেতন যৎ সামান্য দেয় তাও নির্ভর করে মালিকের সন্তুস্টির ওপর। ‘দাসীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া পাপ নয়’ মধ্যযুগীয় এই বিশ্বাস নির্যাতনের মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দেয়, কমে না।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের প্রায় সবারই বিদেশে পৌছানোর সাথে সাথে পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে নেওয়া; চলাফেরায় স্বাধীনতা না থাকায় বন্দী জীবন যাপনে বাধ্য করা; পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতে না দেওয়া; চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে বেতন না দেওয়া; পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রামের সুযোগ এবং উপযুক্ত আবাসন সুবিধা না দেওয়া; দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা; মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা; দেশে ফিরতে চাইলে পরিবারের সদস্যদের নিকট রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের মুক্তিপণ দাবি করা ইত্যাদি অন্তহীন সমস্যা জুটেছে প্রবাসী নারী শ্রমিকের ভাগ্যে।

তিন.

মূলত সন্তানদের ভবিষ্যত, পরিবারের আর্থিক উন্নতি, ঋণমুক্তি ও উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের প্রিয়মুখগুলো ছেড়ে দালাল এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর খপ্পড়ে পড়ে আর্থিক ঋণদায়গ্রস্ত হয়ে প্রবাসের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হচ্ছে বাংলাদেশের হাজার হাজার মা-বোন।

উন্নত জীবন, আকর্ষণীয় বেতন-ভাতার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হলেও তাদের অধিকাংশই মূলত যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে পড়ছেন। এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে নেওয়া, এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া-এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক দৃশ্যপট। শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত পেশাগত দক্ষতাহীন প্রবাসী নারী শ্রমিক জানেন না ঐ দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল। জেনে-বুঝে ওঠার আগেই নেমে আসে নিদারুণ দৈহিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন ‘নারী শ্রমিক নীতি’ বিশ্লেষণ না করে, সরকারি প্রচলিত নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, দেশের অসহায় নারীদেরকে ঢালাওভাবে প্রবাসে পাঠানো ঠিক হয়নি।

চার.

ওমান, লেবানন, সিঙ্গাপুর, জর্ডান, মরিশাস, হংকং, সিরিয়া, দুবাই, আবুধাবিসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যান্য এলাকা, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করলেই শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ পাওয়ায় দ্রুতগতিতে প্রবাসী নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যৌন নির্যাতনের প্রকটতা বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সরকার চায় জনগণ ‘সরকারের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে যৌনতা, ভোগ বিলাসে মগ্ন থাক’। এসব দেশের সরকার সস্তায় শ্রম সরবরাহকারী দেশের সাথে, অভাবী মানুষের সাথে শ্রমবাজারের লিখিত চুক্তির নামে যৌনতার অলিখিত চুক্তি করে। ওরা বিশ্বাস করে গরিব দেশগুলো নারী শ্রমিক না পাঠিয়ে পারবে না।

সিরিয়াতে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানি নারীদের সাথে বাংলাদেশি নারীদেরকে জোরপূর্বক যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না নারী শ্রমিকদের। নির্যাতন ও যৌনতা ওদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয় না।

পাঁচ.

নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূলতা সহ্য করতে না পেরে যারা পালাতে সক্ষম হচ্ছেন, তাদের কাছে আবার নেই বিমান ভাড়া। পালিয়ে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। তারা জানেন না বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা, না পারেন ইংরেজি, আরবী বা ঐ সকল দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় লেখা রাস্তার সাইন বোর্ড পড়তে।

নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকরা দেশে ফিরেও শান্তিতে নেই। পরিবার তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে ফেরত নিতে চায় না। অনেকের ঘটেছে বিবাহ বিচ্ছেদ। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। সমাজের মানুষগুলো অন্য চোখে দেখছে তাদের। কোথায় যাবে এই অসহায় মানুষগুলো! দেশের মা-বোনের অত্যাচার, হাহাকারে অর্জিত রেমিট্যান্স বর্তমানে উন্নয়ন বান্ধব সরকারের আমলে দেশে লাগবে বলে মনে হয় না। আমরা তো আর গরিব দেশ নই।

অত্যন্ত গভীরভাবে ভাবনার বিষয় হল আমরা আমাদের মা-বোনকে গণধর্ষণ বা নির্যাতনের জন্য আর কখনো শ্রমবাজার না বুঝে প্রবাসে পাঠাবো কিনা! ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল প্রতিবাদ জানিয়েছে। শ্রম বাজার হারানোর ভয় করেনি তারা। প্রবাসে নারী শ্রমিক প্রেরণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও লোভী, অসৎ ও অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি এবং তাদের দালালদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখানো প্রলোভনের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব নীতিমালা না মেনে ঢালাওভাবে নারী শ্রমিকদের প্রবাসে পাচার করাই আজকের এই পরিণতি। তারপরও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এরা।

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের পাশে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ শেখ হাসিনার নতুন সরকারকে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীর আর কোথাও এমন নারী বান্ধব দেশ, সরকার আর দ্বিতীয়টি নেই বলে আমরা প্রত্যাশা করতে চাই। নারী শ্রমিকদের জন্য বিকল্প, সভ্য ও সম্মানজনক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। পুরুষ শ্রমিকের শ্রমবাজার পেতে নারী শ্রমিককে যেন আমরা ব্যবহার না করি।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে দেশের সংবেদনশীল সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড; সৌদি আরবের রিয়াদের সেফহোম; জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাস; আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম); বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিওএমএসএ) সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত ভালো কিছু একটা করা দরকার।

সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান হতে পারে বলে আমরা সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যদি সত্যিকার অর্থে আমরা কিছু করতে না পারি, তাহলে ধরে নিতে হবে, আমরা ভেবেই নিয়েছি ওরা আমাদের ‘আপন মা-বোন' নয় বলে তাদের কান্না, কষ্ট, দৈহিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হাহাকার, আর্তচিৎকারে আমাদের মন কাঁদে না। কিছুই আসে যায় না।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

ভয় ভয়ংকর!

ভয় ভয়ংকর!
তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত যখন রামদা’র কোপের নিচে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তখন আমি কচা নদীর বুকে। মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরছি। মসহুদ এর ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে একটি ছোট দেড়তলা লঞ্চ। সকাল দশটার আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। সহযাত্রীদের কাছে বলছিলাম বলেশ্বরের বুকে লঞ্চ ডুবির রিপোর্ট করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রে যাওয়া। মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয়ে কেমন আতঙ্কিত ছিলাম।

আমার সেই গাল-গপ্প শুনে এম.ভি. মসহুদের মাস্টার বললেন-এখন কি ভেসে আছেন নাকি, ডুবে যাওয়ার বাকি আছে? তিনি এই নৌরুটে নিয়মিত রকেট নিয়ে আসা যাওয়া করেন। দেখে চলছেন দুই কূলের মানুষের জোয়ার ভাটা। এখন আর চোখ সইয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির গর্জনতো কম শোনেননি তিনি। ঘাটের কতো সামান্য যাত্রীকে এক সময় ভিআইপি কেবিনে নিয়ে বসাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা শ্যাওলা পড়েছিল ঠিক, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা দেখিয়েছেন কমই।

কিন্তু এখন? নদীর চেয়ে উত্তাল তারা। এই উত্তালের উর্মি হচ্ছে উঠতি তরুণরা। কৈশোর পার হবার আগেই কোনো না কোনো নেতার ঘূর্ণির বিষাক্ত ধূলি হয়ে উঠছে। গ্রামের সাধারণ এক কিশোরও যেন ক্ষমতার তন্দুরে সারাক্ষণ তেঁতে আছে। নেমে পড়েছে সব ধ্বংস করে দেবার জন্য ঢাল তলোয়ার নিয়ে। পেছনে তাদের ‘ভগবান’দের প্রশ্রয়। রকেটের মাস্টারের দেখার চোখের সঙ্গে নিজের চোখও কেমন যেন মিলে গেল। তিনি দেখছেন দুই তীরের বদলে যাওয়া। সেই দেখার সঙ্গে আমার মহল্লা-শহরের বদলে যাওয়ার কত মিল!

কত সহজে বন্ধুর বুকে গুলি ছুঁড়তে পারে, বুকে গেঁথে দিতে পারছে রামদা। প্রিয়তমার ‘অসুন্দর’ ছবি তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে। বিষয়গুলো অপ্রকাশ্য থাকছে। তারা শক্তির প্রশ্রয়ে পরোয়া করছে না কিছুই। কারণ তাদের মস্তিষ্কে একটি বিশ্বাসের বালুচর তৈরি হয়েছে, যেখানে বোনা আছে সামাজিক, রাজনৈতিক মহিরুহ, যা সকল অপরাধ থেকে রক্ষা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজিৎ থেকে রিফাত শরিফ। মাঝে আরও কত নাম হারিয়ে গেছে। মনে রাখিনি আমরা। আমাদের এই ভুলে যাওয়ার মুদ্রাদোষে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীরা দানব হয়ে উঠছে। শুধু বরগুনাতে নয়, রাজধানীতেও চলছে এই দানবদের ভয়ংকর তাণ্ডব।

বরগুনার ঘটনার নারকীয়তা দেখার চোখে ভিন্ন রঙ দিতে রিফাত শরীফের স্ত্রীর সঙ্গে রতন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার আড়ালে প্রেম-পরকীয়া যাই থাকুক, সেটির সামাজিক ও আইনগত সমাধান আছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারায় কোনো বীরত্ব নেই। নেই সমাধান। এ কথা অপরাধীও জানে। কিন্তু ঐ যে সমাজ ও রাজনীতিক শক্তি এদের সকল বোধকে ধবংস করে দিয়েছে। এখন প্রকাশ্য হত্যাকে তারা উদযাপন করে। এই উদযাপনের আরেকটি দিক হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতিকে আরও জোড়ালো করা। তাদের সমাজ ভয় পাবে। সমাজ, জনপদে এই দানবদের দাপট বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে।

আমরা বলছি যে, হত্যা-হামলার সময় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকছি। ভিডিও করছি মুঠোফোনে। ছবি তুলে রাখছি। যদি আমরা এগিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো মানুষটি হামলা থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত জীবনটা। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু ভিডিও এবং ছবির বদৌলতে আমরা আসামিদের ধরতে পারছি। মামলা বেগবান হচ্ছে। ঠিক এমন অংসখ্য অপরাধ আড়ালে রয়ে যাচ্ছে প্রমাণের অভাবে।

মানুষ জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ কথাও সত্য। দুর্ঘটনায় রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। তাকে হাসপাতালে না নিয়ে আমরা ছবি তুলছি। কোথাও কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেও এগিয়ে যাচ্ছি না। হত্যার ঘটনাতো আরও ভয়ের বিষয়। কেন যাচ্ছি না? আমরা কি মানবিকতা শূন্য হয়ে পড়েছি? অন্যের বিপদে বুক হু হু করে উঠে না, আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে শক্তি মরে গেছে? না আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলির কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। আমরা শুধু জড়িয়ে পড়েছি ভয়ের জালে।

ছিনতাইকারীর কবল থেকে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোপের মুখে পড়ছি। হত্যার মতো ঘটনায় মামলা ও কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে স্থানীয় রাজনীতির শোষণ।

অপরাধীকে মোকাবিলা করার প্রাণশক্তি আমাদের আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার শক্তি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তাই গণমানুষকে দায়ী না করে, আসুন যেমন করে যেখান থেকে পাল্টে গেলাম আমরা, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া যায় কিনা। তাহলে অন্তত একজন বিশ্বজিৎ, রিফাতের পাশে দাঁড়ানো শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুরুটাই দরকার। তারপর দেখবেন অপরাধীরা আবারো আঁধারে গা ঢাকা দেবে। দেবেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র