Barta24

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

English

প্রবাসী নারী শ্রমিক: যে গল্প কেউ শুনতে চায় না

প্রবাসী নারী শ্রমিক: যে গল্প কেউ শুনতে চায় না
ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন দাস সমাজে ‘কৃতদাস-দাসী’ তার প্রভুর ‘জীবন্ত অস্থাবর সম্পত্তি’ হিসেবে পরিগণিত হত। দাসীকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। যৌনদাসীর গর্ভের সন্তানকেও দাস-দাসী হিসেবে গণ্য করা হত। দাস সমাজ কাগজে কলমে না থাকলেও রয়ে গেছে তার অমানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো। মানুষ হিসেবে আমরাও হয়ে উঠেছি কখনও কখনও অমানবিক কিংবা অতি মানবিক।

সংসারে নিদারুণ কষ্ট আর অভাব না থাকলে কোনো মা-বাবা তার আদরের সন্তানকে, স্বামী তার স্ত্রীকে, সন্তান তার মাকে চায় না দেশে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দিতে কিংবা প্রবাসের অচেনা-অজানা স্থানে পাঠাতে। ভাতের কষ্ট, কাপড়ের কষ্ট, সাবানের কষ্ট, টাকার কষ্ট!  সে কষ্টের কি আর শেষ আছে!

ক্ষুদ্র ঋণ মানুষের সুখই শুধু কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার অবলম্বন। সর্বস্বান্ত করে ঘর ছাড়া করে দেশের মা-বোনকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে করেছে ‘গৃহ শ্রমিক’ কিংবা ‘যৌনদাসী’। দেশের নারী গৃহ শ্রমিককে আমরা আজো সুরক্ষা দিতে পারিনি বলে ক্রিকেটার, জজ, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির মানুষের নির্যাতনের শিকার অভাবী নারী ও শিশু শ্রমিক। নোংরা স্থান বা রান্নাঘর তাদের শোবার জায়গা। ডাস্টবিনের নোংরা, পচা, বাসি, পশুর খাবারের মত তাদের খাবার। বাচ্চার নোংরা করা খাবার তারা খায়। মশা, তেলাপোকা, ইঁদুর আর ছারপোকার সাথে তাদের বসবাস। ছেঁড়া আর পুরাতন কাপড়ই তাদের পরিধানের বস্ত্র। গৃহকর্মীর কাজ করতে আসাটা তার জানা, ফিরে যাওয়ার পথ অজানা। অচেনা শহরের বা প্রবাসের দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী ওরা ভুলে যায় মা-বাবার, সন্তানের, স্বামীর মুখের অবয়ব।

দুই.

বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর অসহায়ত্ব, অভাব, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, একটু স্বচ্ছলতা ও ভাগ্য বদলাতে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি এবং কর্মসংস্থানের আশায় নারীরা ঘর ছাড়া হয়।

পত্রিকায় প্রকাশ, চুক্তি ও শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি না পেয়ে উল্টো যৌন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। যারা বেতন যৎ সামান্য দেয় তাও নির্ভর করে মালিকের সন্তুস্টির ওপর। ‘দাসীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া পাপ নয়’ মধ্যযুগীয় এই বিশ্বাস নির্যাতনের মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দেয়, কমে না।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের প্রায় সবারই বিদেশে পৌছানোর সাথে সাথে পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে নেওয়া; চলাফেরায় স্বাধীনতা না থাকায় বন্দী জীবন যাপনে বাধ্য করা; পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতে না দেওয়া; চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে বেতন না দেওয়া; পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রামের সুযোগ এবং উপযুক্ত আবাসন সুবিধা না দেওয়া; দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা; মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা; দেশে ফিরতে চাইলে পরিবারের সদস্যদের নিকট রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের মুক্তিপণ দাবি করা ইত্যাদি অন্তহীন সমস্যা জুটেছে প্রবাসী নারী শ্রমিকের ভাগ্যে।

তিন.

মূলত সন্তানদের ভবিষ্যত, পরিবারের আর্থিক উন্নতি, ঋণমুক্তি ও উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের প্রিয়মুখগুলো ছেড়ে দালাল এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর খপ্পড়ে পড়ে আর্থিক ঋণদায়গ্রস্ত হয়ে প্রবাসের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হচ্ছে বাংলাদেশের হাজার হাজার মা-বোন।

উন্নত জীবন, আকর্ষণীয় বেতন-ভাতার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হলেও তাদের অধিকাংশই মূলত যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে পড়ছেন। এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে নেওয়া, এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া-এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক দৃশ্যপট। শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত পেশাগত দক্ষতাহীন প্রবাসী নারী শ্রমিক জানেন না ঐ দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল। জেনে-বুঝে ওঠার আগেই নেমে আসে নিদারুণ দৈহিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন ‘নারী শ্রমিক নীতি’ বিশ্লেষণ না করে, সরকারি প্রচলিত নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, দেশের অসহায় নারীদেরকে ঢালাওভাবে প্রবাসে পাঠানো ঠিক হয়নি।

চার.

ওমান, লেবানন, সিঙ্গাপুর, জর্ডান, মরিশাস, হংকং, সিরিয়া, দুবাই, আবুধাবিসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যান্য এলাকা, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করলেই শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ পাওয়ায় দ্রুতগতিতে প্রবাসী নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যৌন নির্যাতনের প্রকটতা বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সরকার চায় জনগণ ‘সরকারের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে যৌনতা, ভোগ বিলাসে মগ্ন থাক’। এসব দেশের সরকার সস্তায় শ্রম সরবরাহকারী দেশের সাথে, অভাবী মানুষের সাথে শ্রমবাজারের লিখিত চুক্তির নামে যৌনতার অলিখিত চুক্তি করে। ওরা বিশ্বাস করে গরিব দেশগুলো নারী শ্রমিক না পাঠিয়ে পারবে না।

সিরিয়াতে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানি নারীদের সাথে বাংলাদেশি নারীদেরকে জোরপূর্বক যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না নারী শ্রমিকদের। নির্যাতন ও যৌনতা ওদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয় না।

পাঁচ.

নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূলতা সহ্য করতে না পেরে যারা পালাতে সক্ষম হচ্ছেন, তাদের কাছে আবার নেই বিমান ভাড়া। পালিয়ে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। তারা জানেন না বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা, না পারেন ইংরেজি, আরবী বা ঐ সকল দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় লেখা রাস্তার সাইন বোর্ড পড়তে।

নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকরা দেশে ফিরেও শান্তিতে নেই। পরিবার তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে ফেরত নিতে চায় না। অনেকের ঘটেছে বিবাহ বিচ্ছেদ। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। সমাজের মানুষগুলো অন্য চোখে দেখছে তাদের। কোথায় যাবে এই অসহায় মানুষগুলো! দেশের মা-বোনের অত্যাচার, হাহাকারে অর্জিত রেমিট্যান্স বর্তমানে উন্নয়ন বান্ধব সরকারের আমলে দেশে লাগবে বলে মনে হয় না। আমরা তো আর গরিব দেশ নই।

অত্যন্ত গভীরভাবে ভাবনার বিষয় হল আমরা আমাদের মা-বোনকে গণধর্ষণ বা নির্যাতনের জন্য আর কখনো শ্রমবাজার না বুঝে প্রবাসে পাঠাবো কিনা! ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল প্রতিবাদ জানিয়েছে। শ্রম বাজার হারানোর ভয় করেনি তারা। প্রবাসে নারী শ্রমিক প্রেরণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও লোভী, অসৎ ও অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি এবং তাদের দালালদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখানো প্রলোভনের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব নীতিমালা না মেনে ঢালাওভাবে নারী শ্রমিকদের প্রবাসে পাচার করাই আজকের এই পরিণতি। তারপরও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এরা।

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের পাশে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ শেখ হাসিনার নতুন সরকারকে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীর আর কোথাও এমন নারী বান্ধব দেশ, সরকার আর দ্বিতীয়টি নেই বলে আমরা প্রত্যাশা করতে চাই। নারী শ্রমিকদের জন্য বিকল্প, সভ্য ও সম্মানজনক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। পুরুষ শ্রমিকের শ্রমবাজার পেতে নারী শ্রমিককে যেন আমরা ব্যবহার না করি।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে দেশের সংবেদনশীল সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড; সৌদি আরবের রিয়াদের সেফহোম; জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাস; আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম); বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিওএমএসএ) সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত ভালো কিছু একটা করা দরকার।

সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান হতে পারে বলে আমরা সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যদি সত্যিকার অর্থে আমরা কিছু করতে না পারি, তাহলে ধরে নিতে হবে, আমরা ভেবেই নিয়েছি ওরা আমাদের ‘আপন মা-বোন' নয় বলে তাদের কান্না, কষ্ট, দৈহিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হাহাকার, আর্তচিৎকারে আমাদের মন কাঁদে না। কিছুই আসে যায় না।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র