প্রবাসী নারী শ্রমিক: যে গল্প কেউ শুনতে চায় না

ছবি: বার্তা২৪

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

প্রাচীন দাস সমাজে ‘কৃতদাস-দাসী’ তার প্রভুর ‘জীবন্ত অস্থাবর সম্পত্তি’ হিসেবে পরিগণিত হত। দাসীকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। যৌনদাসীর গর্ভের সন্তানকেও দাস-দাসী হিসেবে গণ্য করা হত। দাস সমাজ কাগজে কলমে না থাকলেও রয়ে গেছে তার অমানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো। মানুষ হিসেবে আমরাও হয়ে উঠেছি কখনও কখনও অমানবিক কিংবা অতি মানবিক।

সংসারে নিদারুণ কষ্ট আর অভাব না থাকলে কোনো মা-বাবা তার আদরের সন্তানকে, স্বামী তার স্ত্রীকে, সন্তান তার মাকে চায় না দেশে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দিতে কিংবা প্রবাসের অচেনা-অজানা স্থানে পাঠাতে। ভাতের কষ্ট, কাপড়ের কষ্ট, সাবানের কষ্ট, টাকার কষ্ট!  সে কষ্টের কি আর শেষ আছে!

ক্ষুদ্র ঋণ মানুষের সুখই শুধু কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার অবলম্বন। সর্বস্বান্ত করে ঘর ছাড়া করে দেশের মা-বোনকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে করেছে ‘গৃহ শ্রমিক’ কিংবা ‘যৌনদাসী’। দেশের নারী গৃহ শ্রমিককে আমরা আজো সুরক্ষা দিতে পারিনি বলে ক্রিকেটার, জজ, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির মানুষের নির্যাতনের শিকার অভাবী নারী ও শিশু শ্রমিক। নোংরা স্থান বা রান্নাঘর তাদের শোবার জায়গা। ডাস্টবিনের নোংরা, পচা, বাসি, পশুর খাবারের মত তাদের খাবার। বাচ্চার নোংরা করা খাবার তারা খায়। মশা, তেলাপোকা, ইঁদুর আর ছারপোকার সাথে তাদের বসবাস। ছেঁড়া আর পুরাতন কাপড়ই তাদের পরিধানের বস্ত্র। গৃহকর্মীর কাজ করতে আসাটা তার জানা, ফিরে যাওয়ার পথ অজানা। অচেনা শহরের বা প্রবাসের দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী ওরা ভুলে যায় মা-বাবার, সন্তানের, স্বামীর মুখের অবয়ব।

দুই.

বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর অসহায়ত্ব, অভাব, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, একটু স্বচ্ছলতা ও ভাগ্য বদলাতে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি এবং কর্মসংস্থানের আশায় নারীরা ঘর ছাড়া হয়।

পত্রিকায় প্রকাশ, চুক্তি ও শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি না পেয়ে উল্টো যৌন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। যারা বেতন যৎ সামান্য দেয় তাও নির্ভর করে মালিকের সন্তুস্টির ওপর। ‘দাসীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া পাপ নয়’ মধ্যযুগীয় এই বিশ্বাস নির্যাতনের মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দেয়, কমে না।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের প্রায় সবারই বিদেশে পৌছানোর সাথে সাথে পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে নেওয়া; চলাফেরায় স্বাধীনতা না থাকায় বন্দী জীবন যাপনে বাধ্য করা; পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতে না দেওয়া; চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে বেতন না দেওয়া; পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রামের সুযোগ এবং উপযুক্ত আবাসন সুবিধা না দেওয়া; দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা; মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা; দেশে ফিরতে চাইলে পরিবারের সদস্যদের নিকট রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের মুক্তিপণ দাবি করা ইত্যাদি অন্তহীন সমস্যা জুটেছে প্রবাসী নারী শ্রমিকের ভাগ্যে।

তিন.

মূলত সন্তানদের ভবিষ্যত, পরিবারের আর্থিক উন্নতি, ঋণমুক্তি ও উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের প্রিয়মুখগুলো ছেড়ে দালাল এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর খপ্পড়ে পড়ে আর্থিক ঋণদায়গ্রস্ত হয়ে প্রবাসের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত হচ্ছে বাংলাদেশের হাজার হাজার মা-বোন।

উন্নত জীবন, আকর্ষণীয় বেতন-ভাতার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হলেও তাদের অধিকাংশই মূলত যৌন দাসীবৃত্তির শৃঙ্খলে পড়ছেন। এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে নেওয়া, এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া-এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক দৃশ্যপট। শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত পেশাগত দক্ষতাহীন প্রবাসী নারী শ্রমিক জানেন না ঐ দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল। জেনে-বুঝে ওঠার আগেই নেমে আসে নিদারুণ দৈহিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন ‘নারী শ্রমিক নীতি’ বিশ্লেষণ না করে, সরকারি প্রচলিত নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, দেশের অসহায় নারীদেরকে ঢালাওভাবে প্রবাসে পাঠানো ঠিক হয়নি।

চার.

ওমান, লেবানন, সিঙ্গাপুর, জর্ডান, মরিশাস, হংকং, সিরিয়া, দুবাই, আবুধাবিসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যান্য এলাকা, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করলেই শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ পাওয়ায় দ্রুতগতিতে প্রবাসী নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যৌন নির্যাতনের প্রকটতা বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সরকার চায় জনগণ ‘সরকারের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে যৌনতা, ভোগ বিলাসে মগ্ন থাক’। এসব দেশের সরকার সস্তায় শ্রম সরবরাহকারী দেশের সাথে, অভাবী মানুষের সাথে শ্রমবাজারের লিখিত চুক্তির নামে যৌনতার অলিখিত চুক্তি করে। ওরা বিশ্বাস করে গরিব দেশগুলো নারী শ্রমিক না পাঠিয়ে পারবে না।

সিরিয়াতে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানি নারীদের সাথে বাংলাদেশি নারীদেরকে জোরপূর্বক যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না নারী শ্রমিকদের। নির্যাতন ও যৌনতা ওদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয় না।

পাঁচ.

নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূলতা সহ্য করতে না পেরে যারা পালাতে সক্ষম হচ্ছেন, তাদের কাছে আবার নেই বিমান ভাড়া। পালিয়ে তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। তারা জানেন না বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা, না পারেন ইংরেজি, আরবী বা ঐ সকল দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় লেখা রাস্তার সাইন বোর্ড পড়তে।

নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকরা দেশে ফিরেও শান্তিতে নেই। পরিবার তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে ফেরত নিতে চায় না। অনেকের ঘটেছে বিবাহ বিচ্ছেদ। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে। সমাজের মানুষগুলো অন্য চোখে দেখছে তাদের। কোথায় যাবে এই অসহায় মানুষগুলো! দেশের মা-বোনের অত্যাচার, হাহাকারে অর্জিত রেমিট্যান্স বর্তমানে উন্নয়ন বান্ধব সরকারের আমলে দেশে লাগবে বলে মনে হয় না। আমরা তো আর গরিব দেশ নই।

অত্যন্ত গভীরভাবে ভাবনার বিষয় হল আমরা আমাদের মা-বোনকে গণধর্ষণ বা নির্যাতনের জন্য আর কখনো শ্রমবাজার না বুঝে প্রবাসে পাঠাবো কিনা! ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল প্রতিবাদ জানিয়েছে। শ্রম বাজার হারানোর ভয় করেনি তারা। প্রবাসে নারী শ্রমিক প্রেরণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও লোভী, অসৎ ও অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি এবং তাদের দালালদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখানো প্রলোভনের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব নীতিমালা না মেনে ঢালাওভাবে নারী শ্রমিকদের প্রবাসে পাচার করাই আজকের এই পরিণতি। তারপরও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এরা।

প্রবাসে নারী শ্রমিকদের পাশে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ শেখ হাসিনার নতুন সরকারকে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীর আর কোথাও এমন নারী বান্ধব দেশ, সরকার আর দ্বিতীয়টি নেই বলে আমরা প্রত্যাশা করতে চাই। নারী শ্রমিকদের জন্য বিকল্প, সভ্য ও সম্মানজনক বাজার খুঁজে বের করতে হবে। পুরুষ শ্রমিকের শ্রমবাজার পেতে নারী শ্রমিককে যেন আমরা ব্যবহার না করি।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে দেশের সংবেদনশীল সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড; সৌদি আরবের রিয়াদের সেফহোম; জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাস; আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম); বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিওএমএসএ) সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত ভালো কিছু একটা করা দরকার।

সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান হতে পারে বলে আমরা সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যদি সত্যিকার অর্থে আমরা কিছু করতে না পারি, তাহলে ধরে নিতে হবে, আমরা ভেবেই নিয়েছি ওরা আমাদের ‘আপন মা-বোন' নয় বলে তাদের কান্না, কষ্ট, দৈহিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হাহাকার, আর্তচিৎকারে আমাদের মন কাঁদে না। কিছুই আসে যায় না।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’

সাধারণত কোনো মানুষের মাতৃভাষাকেই ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ‘প্রথম বা প্রধান ভাষা’ বলা হয়। বিশেষত, যারা একাধিক ভা...

মাতৃভাষা

প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃভাষা ও মনের ভাব প্রকাশের মধ্যে রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। মনের ভাব সবচেয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে প্...