Alexa

শিশুদের পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা করবেন না

শিশুদের পরীক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা করবেন না

ছবি: বার্তা২৪

রোববার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে আমার টক শো ছিল। লাইভ অনুষ্ঠানে বারবার বাসা থেকে ফোন আসছিল। জরুরি কিছু ভেবে বিরতিতে গিয়েই ফোন দিলাম। ছেলে প্রসূনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠের জিজ্ঞাসা, বাবা পরীক্ষা নাকি পিছিয়েছে? আমি তখনও কিছু জানি না। খোঁজ নিয়ে জানলাম এবং প্রসূনকে জানালাম, তিনদিনের পরীক্ষা পিছিয়েছে। মনোযোগ দিয়ে পরের দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়ে আমি আবার টক শো'তে ঢুকে গেলাম এবং রুটিনের কথা ভুলে গেলাম।

রাতে বাসায় ফিরে দেখি প্রসূনের মুখ থমথমে। ভাবলাম, মায়ের সাথে লেগেছে (ঝগড়া) বুঝি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কিরে বেটা, শরীর খারাপ?’’

মাথা নিচু করে জবাব দিলো, না।
: তাহলে মন খারাপ?
: না।

আমি বললাম, মাথা উঁচু কর, আমার দিকে তাকা এবং বল, কী হয়েছে।

এবার প্রসূন বললো, মন ও শরীর ভালো। কিন্তু মেজাজ খারাপ, প্রচণ্ড খারাপ। তার কণ্ঠে তীব্র ঝাঁঝ, চোখ ছলছল। ‘‘এটা কোনো কথা হলো। ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই প্র্যাকটিক্যালসহ পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে এখন ১০ মার্চ পর্যন্ত চলবে। এটা স্রেফ ফাজলামো।’’ প্রসূন এতই ক্ষুব্ধ, ঠিকমত বলতে পারছিল না। আমি জানি, এটা প্রসূনের একার ক্ষোভ না, এটা প্রসূনদের ক্ষোভ। ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৩ জন পরীক্ষার্থীর ক্ষোভ।

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ১৬, ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারির এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পেছানো হয়েছে। পিছিয়ে দেয়া পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৭ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি এবং ১৮ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষাটি হবে ২ মার্চ।

পরীক্ষা পেছানোর কারণ হিসেবে 'অনিবার্য' কারণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সবাই জানে সেই অনিবার্য কারণটা হলো বিশ্ব ইজতেমা। গত কয়েকবছর দুই পর্বে ইজতেমা হলেও, এবার এক পর্বেই হবে টানা চারদিন। আগামী ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বসবে বিশ্বের মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্মিলন- বিশ্ব ইজতেমা। এক পর্বে হলেও দুই ভাগে হবে দ্বিধাবিভক্ত তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের ইজতেমা। প্রথম দু’দিন একপক্ষ, দ্বিতীয় দু’দিন আরেকপক্ষ।

সাধারণত বিশ্ব ইজতেমা জানুয়ারিতে হয়। কিন্তু এবার দুই পক্ষের ঝগড়ার কারণে ইজতেমা হওয়া নিয়েই সংশয় ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের সমঝোতায় হচ্ছে ইজতেমা। হজের পর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ বাংলাদেশে হচ্ছে, এটা অবশ্যই আমাদের জন্য গর্বের। কিন্তু তাবলিগের দুই পক্ষের ঝামেলা মেটাতে গিয়ে আমরা ২১ লাখ বাচ্চার মনের ওপর কত বড় চাপ দিয়েছি, সেটা কি কেউ ভেবেছি?

অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে পরীক্ষার রুটিন, ফলাফল প্রকাশ, বই বিতরণের তারিখ নির্ধারিত। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায় নতুন বই। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয় ১ ফেব্রুয়ারি। এবার ১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার থাকায় ২ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঠিক করার সময় কি নীতি নির্ধারকদের মাথায় ছিল না? পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষার সময় কেন বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দিতে হবে। এটা কি সমন্বয়হীনতা নয়?

এসএসসি পরীক্ষার সময় শিশুরা কী ভয়ঙ্কর চাপে থাকে, সেটা কি নীতি নির্ধারকরা জানেন না? তারা কি কেউ এসএসসি পরীক্ষা দেননি? আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ৩৪ বছর আগে। কিন্তু এখনও সেই টেনশনের কথা মনে হলে তলপেটে মোচড় দেয়। পরীক্ষার্থীরা রুটিন দেখে মনে মনে অনেক পরিকল্পনা করে। রুটিনে একটু ওলটপালট হলে, সেই পরিকল্পনা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। আর এবার তো রুটিনই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। পরিকল্পনার পরিটা উড়ে গেছে, আছে শুধু কল্পনা। অথচ আমাদের নীতি নির্ধারকরা একটা ছোট্ট বিজ্ঞপ্তি দিয়েই খালাস। পত্রিকার ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলাম নিউজ হয়, পরীক্ষা পিছিয়েছে। এই ছোট্ট নিউজটা যে শিশুদের মনোজগতে কী তোলপাড় তোলে, সেটা যদি আমরা একবার বুঝতাম!

শুধু এবার নয়, শিশুদের পরীক্ষাটা বরাবরই আমাদের প্রায়োরিটির পেছনে থাকে। ২০১৪-১৫ সালে আন্দোলনের নামে বিএনপির আগুন সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় শিকার ছিল বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা। দিনের পর দিন পরীক্ষা পিছিয়েছে। গত বছর নভেম্বরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের শোকরানা মাহফিলের কারণে একদিনের জেএসসি পরীক্ষা পেছানো হয়েছিল।

তবে এবারের এসএসসি পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁসের বিষমুক্ত ছিল। এর জন্য শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী অবশ্যই বিশাল ধন্যবাদ পাবেন পান। এটা এত বড় সাফল্য, অনেক ছোটখাটো ত্রুটি উপেক্ষা করা যায়। তবে ত্রুটিগুলো মাথায় রাখা ভালো, যাতে ভবিষ্যতে সব পাবলিক পরীক্ষা ত্রুটিমুক্ত করা যায়। এবার পরীক্ষার প্রথম দিনেই বেশ কয়েক জায়গায় গত বছরের প্রশ্ন বিলি করা হয়েছে। প্রসূন যে কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেই লালমাটিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে অংক পরীক্ষার দিন ইংলিশ ভার্সনের প্রশ্নের এক পৃষ্ঠা সাদা ছিল! তাদের সেই পৃষ্ঠার পরীক্ষা বাংলা প্রশ্ন দেখে দিতে হয়েছে। ফেসবুকে দেখলাম, ইংলিশ ভার্সনের প্রশ্ন কম পড়ায় অনেককে বাংলা প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সারাবছর ইংলিশ ভার্সনে পড়ে এখন বাংলা প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়াটা সত্যিই কঠিন।

রোববার রাতভর রুটিন নিয়ে টেনশন করে সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারি) অনেকেরই ধর্ম পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে পেলাম আরো মজার চিত্র। বিভিন্ন বিষয়ে এমসিকিউর চারটি উত্তরের মধ্যে অন্তত দু’টি সঠিক বলা যায়। কিন্তু এমসিকিউর খাতা তো যন্ত্র দেখে। সেখানে যেটা সঠিক দেয়া থাকে, সেটাতেই নম্বর পাবে। তাই সঠিক উত্তর দিয়েও শূন্য নম্বর পাওয়ার ঝুঁকি আছে। এ তো গেল এমসিকিউ।

সমস্যা আছে বর্ণনামূলক প্রশ্নেও। যেমন ধর্ম পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন আছে, একটি ছেলে এক বয়ষ্ক মহিলাকে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে লোকাল বাসে লম্বা পথ দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু একটু পর বাসে একটা মোটা মহিলা উঠলে সেই ছেলেটিই তাকে বললেন, কোন দোকানের চাল খান। বয়স্ক মহিলাকে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে ছেলেটি যেমন ভালো মনের পরিচয় দিয়েছে, তেমনি আবার সে ইভটিজিংও করেছে! এখন আপনি তাকে খারাপ বলবেন না ভালো? এখন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা কোন উত্তরটি দিলে নম্বর পাবে?

যেমন আরেকটি প্রশ্ন, এক লোক সুদের কারবার করে, আবার গরীব মানুষকে সাহায্যও করে। এখন সে ভালো না খারাপ? যিনি খাতা দেখবেন, তিনি যদি কট্টর মুসলমান হন, তাহলে লোকটি খুব খারাপ। কারণ ইসলামে সুদ হারাম। কিন্তু একটু লিবারেল হলে তিনি ভাবতে পারেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই তো কোনো না কোনোভাবে সুদ দেয়া-নেয়ার সাথে জড়িত। কারণ বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদ নিষিদ্ধ নয়। তাই লিবারেল শিক্ষক, তার গরীবকে সাহায্য করার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে তাকে ভালোও বলতে পারেন। মানে এসব ক্ষেত্রে ভালোমন্দের বিবোচনাটা আপেক্ষিক। সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজের নীতি-নৈতিকতার মান যেখানে তলানিতে, সেখানে শিশুদের কাছ থেকে নৈতিকতার এ সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ চাওয়াটা অন্যায় নয় কি?

নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের খালি একটাই চাওয়া- প্লিজ, শিশুদের পরীক্ষা, রুটিন, প্রশ্ন নিয়ে কোনো নিরীক্ষা করবেন না। আমাদের সন্তানদের গিনিপিগ বানাবেন না। আপনাদের যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তা আপনাদের অফিসরুমে করুন, বাচ্চাদের ক্লাসরুম বা পরীক্ষার হলে নয়। শিশুরাই থাকুক আপনাদের প্রায়োরিটি লিস্টের টপে। কারণ তারাই জাতির সত্যিকারের ভবিষ্যৎ।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

 

আপনার মতামত লিখুন :