Alexa

একটি ধর্ষণের গল্প!

একটি ধর্ষণের গল্প!

ছবি: বার্তা২৪

ধর্ষণ সাম্প্রতিক সময়ের একটি অন্যতম উদ্বেগজনক ও আলোচিত বিষয়। এটি এক বিকৃত রুচির সামাজিক ব্যাধি যা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সমাজে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষিত হচ্ছে কোনো নারী বা শিশু। আবার ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যে কিছু খবরে আসে, অনেকগুলো আবার খবরে আসে না। কারণ ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। দু’একটি ঘটনা মিডিয়াতে এলে আমরা দু’চার কথা বলি। কিছুদিন পর চাপা পড়ে যায় নতুন ঘটনার আড়ালে। এভাবে চলতে থাকলে সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধ ধ্বংস হওয়া নিশ্চিত। ধর্ষণ এর ব্যাপারে সচেতন হওয়া ও এর প্রতিকার করা আজ সময়ের দাবি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, চলতি বছর শুধু জানুয়ারি মাসে দেশে ৫২টি ধর্ষণ, ২২টি গণধর্ষণ এবং ৫টি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি আরো জানায় ২০১৮ সালে ৯৪২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সারাদেশে। লিখিত বক্তব্যে মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ১৮২ জন নারী গণধর্ষণ, ৬৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৬৯৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতার কারণে এসব ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। এছাড়া, সস্প্রতি ধর্ষণে অভিযুক্ত কয়েকজন ব্যক্তির গলায় চিরকুট ঝোলানো অবস্থায় মরদেহ পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সংগঠনটির নেতারা বলেন বিচার বহির্ভূত হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অপরাধী যেই হোক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণ ছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচিত ধর্ষণগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গর্ণধর্ষণের পর তরুণী রূপাকে হত্যা, বরগুনার বেতাগী উপজেলার উত্তর করুণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে শিক্ষিকাকে গণধর্ষণ, বগুড়ার তুফান কাণ্ড, বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু ধর্ষণ ও হত্যা উল্লেখযোগ্য। অবাক হলেও সত্যি, পবিত্র ঈদুল আযহার দিনেও ধর্ষকরা নিজেদের নিবৃত্ত রাখেনি। হাসপাতালে মাকে রেখে বাড়ি ফেরার পথে এক তরুণী গণধর্ষণের শিকার হয় পটুয়াখালীর বাউফলে।

আবার এমন অনেক ধর্ষণের ঘটনা আছে, যেগুলো কখনোই প্রকাশিত হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রকাশিত ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত ঘটনার বহু গুণ বেশি। সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এমন ঘটনা এখন আর আমাদের অজানা নয় যে, একবার ধর্ষণ করে তার ভিডিও রেকর্ড করে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণ করা, এমনকি দলবদ্ধ হয়ে পৈশাচিক উৎসবে মত্ত হওয়া।

ধর্ষণের কারণের নিদিষ্টকরণ সম্ভব না। তবে নগ্নতা, অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্ক্ষা, বেহায়াপনা, অবাধ যৌনাচার, রাস্তার পাশে দেয়ালে নগ্ন পোষ্টার, ফুটপাতে অশ্লীল ছবি সম্বলিত উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লুফিল্ম, চলচ্চিত্রে খলনায়ক কর্তৃক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, একাকিত্ব বোধ, অক্ষমতাবোধ, রাগ, অপমানজনক অনুভূতি, হতাশা, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিজীবনে কষ্ট, অপ্রাপ্তি, মাদকাসক্তি, বিচারহীনতা, টুয়েনটি প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন ইত্যাদিকে সমাজে ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকেরাই ধর্ষণ করে।

ধর্ষণের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আইনের প্রতি মানুষের ভয় কম বা আস্থাহীনতা। ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে যে, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন পুরুষ জীবনে অন্তত একবার কোনা নারীকে ধর্ষণ করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ পুরুষকেই কোনো আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ধর্ষণের জন্য মেয়েদের ছোট পোশাককেও দায়ী মনে করেন কেউ কেউ। আমার মতে নারীদের পোশাক মূল সমস্যা নয়। পুরুষের বিকৃত মানসিকতাই মূলত দায়ী। যদি নারীদের পোশাকই মূল সমস্যা হতো, তাইলে ছোট ছোট শিশুরা কেন ধর্ষনের শিকার হচ্ছে? ছোট ছোট শিশুদেরতো পোশাকের কোনো সমস্যা নেই। ধর্ষক এখন আর শুধু দূরের কেউ না। কাছেরও অনেকে এ অপকর্মে যুক্ত। ফলে সহপাঠী, বন্ধু, সহকর্মী, ড্রাইভার ও সহকারী, বিভিন্ন দলের নেতী-কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, দুলাভাই, ধর্মগুরু- এমনকি আরও অনেকে এ তালিকাকে ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করছে। এর মধ্যে আরো এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আরো অমানবিক। যেমন ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, বাবা-মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ, মা-মেয়েকে একসঙ্গে ধর্ষণ অথবা স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ ইত্যাদি।

এদের নিবৃত্ত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত-২০০৩)’, যেখানে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড (বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড) ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

নারীর অধিকার রক্ষায় সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদে বিশেষ ক্ষেত্রে নারীর অগ্রাধিকার প্রদানসহ রাষ্ট্র ও জন-জীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভের বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সংবিধান ও জাতিসংঘের সিডও সনদের আলোকে তৈরি করা হয়েছে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’। এতকিছুর পরও বন্ধ হচ্ছে না ধর্ষণ নামক এই মহামারী সামাজিক ব্যধি।

ধর্ষণের প্রতিকারের বিষয়ে প্রথমে আমাদের পারিবারিক শিক্ষাকে বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবার থেকে আমরা সঠিক শিষ্টাচার ও মূল্যবোধের শিক্ষা পাই। পরিবারের মুরুব্বি ও কর্তাব্যক্তিদের সচেতন হতে হবে, ছোট সদস্যদের সচেতন করতে হবে। ছেলে-মেয়েদেরকে যথাসময়ে বিয়ের ব্যবস্থার বিষয়ে পরিবার থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য এই ধরণের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে অপরাধ গোপন না করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ধর্ষণ রোধে চাই সরকারের কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ। ধর্ষণকারীর বিচার হতে হবে অতি দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক। ধর্ষণসহ যেকোনো অপরাধ করে যেন কেউ পার পেয়ে না যেতে পারে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। ধর্ষণ শুধু একটি ব্যাধি নয়, এটি দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় একটি অভিশাপ। এই অভিশাপের কালো অধ্যায় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। আর সেই গুরুদায়িত্বটি আমার, আপনার ও সবার। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধর্ষণ নামক ব্যাধি ও অভিশাপ থেকে আমাদের সমাজ রক্ষা পেতে পারে বলে মনে করি।

এটিএম মোসলেহ উদ্দিন: কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :