Alexa

উপজেলা নির্বাচন এবং বিএনপির রণেভঙ্গ

উপজেলা নির্বাচন এবং বিএনপির রণেভঙ্গ

ছবি: সংগৃহীত

আগামী মাস থেকে কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। একই সাথে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়েও ঢাকা মহানগরী নতুন করে নির্বাচনী আমেজে মেতেছে। গত ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের প্রেক্ষিতে বিএনপি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা আর কোনো নির্বাচনে যাচ্ছে না এবং তাদের ৬ জন নির্বাচিত সাংসদও শপথ নিচ্ছেন না।

এধরণের ঘোষণায় নির্বাচন নিয়ে যে উৎসাহ উদ্দীপনা থাকার কথা সেটায় স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়েছে। এর ফলে অপরাপর দলসমূহ নির্বাচনে গেলেও যেহেতু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ভেতর তাই ক্ষমতাসীন দলকে মূলত সেরকম কোনো প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে না এবং এক কথায় তাদের মনোনীত প্রার্থীরা একতরফাভাবে বিজয়ী হয়ে স্থানীয় সরকারের নানা স্তরগুলোতে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।

বিএনপির নেতাদের ঘোষণা অনুযায়ী এই নির্বাচনে না আশার সিদ্ধান্তকে নিয়ে দুটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে; প্রথমত, তাদের এই সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের আলোকে কি না, এবং দ্বিতীয়ত, যদি এমন সিদ্ধান্তেই তারা অটল থাকেন তবে নিশ্চয়ই তারা সরকারকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে চান না এবং এক্ষেত্রে তারা নতুন কর্মকৌশল নিয়ে কাজ করবেন – এমনটাই ধারণা হওয়া স্বাভাবিক।

প্রথমেই আসি তাদের নির্বাচনে না আশার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায়। যতটুকু জানা যায় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত দলের সর্বস্তরে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। দলের হাইকমান্ড উদারপন্থী এবং কট্টরপন্থী এই দুইভাগে বিভক্ত। এখানে উদারপন্থী গ্রুপের অনেক সদস্য কট্টরপন্থীদের দ্বারা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রিত, কারণ এই গ্রুপের অনুসারীরা লন্ডন প্রবাসী দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুসারী বিধায় সেখানকার (লন্ডন) সিদ্ধান্তই তাদের কাছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত এবং এক্ষেত্রে উদারপন্থীদের কোনো মতই দলীয় ফোরামে গুরুত্ব পায় না, যদিনা সেগুলো তারেক রহমানের মতের সাথে মিলে যায়। এই অবস্থায় কিছুদিন আগে দলের উদারপন্থী হিসেবে বিবেচিত স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। 

সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাংসদদের শপথ না নেয়ার বিষয় নিয়ে দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত হতাশ হয়েছেন দল থেকে নির্বাচিত সাংসদগণ। তাদের বিবেচনায় বিগত নির্বাচনে একটি বিরুপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অনেক কষ্ট করে তারা নিজেদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এই অবস্থায় সংসদে না গেলে জনগণের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে এবং ভবিষ্যতে তারা আবারও ভোট চাইতে গিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। এই বিবেচনায় তারা তাদের নির্বাচনী এলাকার জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চান না। বিষয়টি দলের উদারপন্থী গ্রুপের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক সমর্থিত হলেও লন্ডনের সমর্থন না থাকায় এ নিয়ে একধরণের চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। ধারণা করা যায় নীতি নির্ধারনী মহল এক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে এটি যে কোনো সময় নেতিবাচক রূপ ধারণ করতে পারে।

একই অবস্থা বিরাজ করছে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন নিয়েও। দলের অনেক স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা নানাভাবেই নিজ এলাকায় তাদের প্রভাব রাখেন। বিগত নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদের অনেকেই বিজয় অর্জন করেছেন। দলের এমন সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমান অনেক চেয়্যারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণে ব্যক্তিগতভাবে ইচ্ছুক হলেও দলের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছেন অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার মাধ্যমে। ইতোমধ্যে অনেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এক্ষেত্রে দলের কেন্দ্রীয় ফোরামের মধ্যকার সিদ্ধান্তহীনতার ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছেন দলের তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। ফলে নানা উপায়ে দলের সিদ্ধান্ত না মানার একধরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, দল থেকে এধরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার নেপথ্য কারণ থাকলেও তাদের সিদ্ধান্তের স্বপক্ষ্যে তারা কোনো প্রকার দৃশ্যমান কর্মকৌশল এখন পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের উপহার দিতে পারেননি এবং অন্য কথায় দলের অবস্থান নিয়ে তৃনমূলে চরম হতাশা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় নেতাকরর্মীদের মধ্যে এখন দলীয় শৃংখলার চাইতে ব্যক্তিগত লাভালভ এবং বিচ্ছিন্নভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার একধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দল কর্তৃক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন দলের সর্বস্তরের নেতাকরর্মীদের ভবিষ্যতের জন্য ভাল হলেও এই সমন্বয়হীনতার ফলে তৃনমূল পর্যায়ে শৃংখলাহীনতা দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে।

ঐক্যফ্র্রন্টের ব্যানারে থেকে তারা বিগত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও ফ্রন্টের বর্তমান কর্মকাণ্ড বিএনপির রাজনীতির জন্য সহায়ক বলে মনে হচ্ছে না এবং তারা ফ্রন্টের ভেতর এবং বাইরে নিজেদের সিদ্ধান্তেই মূলত অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যে ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুজন সাংসদ দল এবং ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শপথ গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং ধারণা করা যায় তারা যেকোন সময় (গ্যাজেট প্রকাশের ৯০ দিন অতিক্রান্ত হবার আগে) শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগদান করতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রেও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাংসদদের মত একই উপলব্ধি কাজ করছে। তারাও তাদের নির্বাচনী এলাকার জনগণকে প্রতিনিধিত্বহীন রাখতে চান না।

বিদ্যমান অবস্থার আলোকে যে বিষয়টি বর্তমানে স্পষ্ট হয়ে গেছে তা হচ্ছে আবারও ঢাকার দুটি সিটি নির্বাচন এবং কয়েকশ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের মত আরেকটি বিশাল কর্মযজ্ঞ নির্বাচন কমিশন শুরু করেছে, যেখানে দেশের সরকারবিরোধী প্রধান দল মাঠ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। এর বিপরীতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারের দিক থেকে কোন তাড়না না থাকার বিষয় থেকে এটুকু কারও আন্দাজ করতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে সরকারের দিক থেকে বিএনপি’র অংশগ্রহণবিহীন এই নির্বাচন অনুষ্ঠানে তেমন কোনো বড় ধরণের রাজনৈতিক বাঁধার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে কয়েকদফায় সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন যে বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে তাদের কিছুই করার নেই।

নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি যে যখন দেশের বড় কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের মত সিদ্ধান্তে অটল থাকত তখন তা সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়াত এবং তারা যেকোন উপায়ে বিরোধী দলকে নির্বাচনমুখী করার জন্য চেষ্টা করত। অবস্থা দিনকে দিন এতটাই বেগতিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে নির্বাচনের আমেজ এবং গুরুত্ব ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এমন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আসলে কতটুকু গণতান্ত্রিক এবং টেকসই? আমরা যখন দেশের জন্য একটি টেকসই গণতন্ত্রের ভিত্তির স্বপ্ন দেখছি তখন প্রতিনিয়তই আমরা গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি বলে উপলব্ধি করছি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থা থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারি? আমার মনে যে সহজ উত্তরটি কাজ করে তা হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ দিনে দিনে অনেকটা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই সংকোচন থেকে উদ্ধার করে রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা ব্যতীত অন্যকোন পথ নেই। আর রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড প্রসারণের মূল দায়িত্ব বর্তায় দেশের ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর উপর। দলগুলো যখন যথেষ্ট রকমের ক্রিয়াশীল থাকে না তখন তাদের নির্বাচনে যাবার মত সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

সুতরাং যা দাঁড়াল তা হচ্ছে বর্তমানে বিএনপি যদি নির্বাচন বর্জন করার মত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে তবে এখান থেকে দুটি বিষয় অনুমান করে নেয়া যেতে পারে; প্রথমত, তাদের ক্রিয়াশীলতার ধারাবাহিকতায় তারা নির্বাচন করার মত যথেষ্ট উপযোগীতা হারিয়ে অন্ধকারে পতিত হয়েছে, দ্বিতিয়ত, তারা এই নির্বাচন বর্জন করে আরও বৃহত্তর উপায়ে সংগঠিত হয়ে সরকার পতনের কার্যকর ক্ষেত্র প্রস্তুতের উপায় অন্বেষণ করছে। এখন কোন বিষয়টি কার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হতে পারে সেটা পাঠকের বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলাম। আপাততঃ আমাদের মধ্যে যে শঙ্কার বোধটুকু রয়েই গেল তা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বিএনপি’র দলীয় অংশগ্রহণ ব্যতীত অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে – এটাই এই মুহূর্তের বাস্তবতা, এবং এই বাস্তবতায় এটাও আমার এই মূহুর্তের উপলব্ধি যে বিএনপি তাদের রণেভঙ্গ দিল।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :