Alexa

পোস্ট-ফাগুনের দু’টি দাগকাটা পোস্ট!

পোস্ট-ফাগুনের দু’টি দাগকাটা পোস্ট!

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

নিত্য পঠন-পাঠন ও গবেষণা আমার মূল কাজ হলেও এখন দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় অফিসের কাজে বসতে হয়। তাই প্রতিদিনের মত সকাল সকাল পাঠনের কাজ শেষ করে ফাগুনের প্রথমদিনেও অফিসে বসেছি। কিন্তু এদিন টেবিলের কাজ অনেক কম মনে হলো। তাই ভাবলাম কিছু লিখি। কিন্তু লেখা শুরু করতে যাব এমন সময় ফোন আসা শুরু হলো। মধ্যাহ্ন বিরতিতে পত্রিকার পাতায় মনোনিবেশ করলাম। কিন্তু কয়েকটি সংবাদ পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এগুলোর একটি হলো- ‘ঠাকুরগাঁওয়ে গরু জব্দ করা নিয়ে সংঘর্ষ- ছাত্রসহ নিহত তিন, বিজিবির গুলি’! অপরটি হলো- আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক তরুণী ধর্ষণ। তরুণীকে জোর করে ইয়াবা সেবন করানোর বক্তব্য সম্বলিত ভিডিও টুকরাও সংযোজন করা হয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব সংবাদ পড়ে মনটা বিষিয়ে উঠলো। বাসায় ফিরে রাতে টিভিতে বিস্তারিত দেখে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।

এসব ঘটনার কোনো কোনোটির পেছনে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা! সেটা আজকাল সবার কাছে ওপেন সিক্রেট বৈ কিছু নয়। দেশের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা রক্ষক হিসেবে নিয়োজিত তারা অনেকেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এসবের একটা বড় কারণ হলো, দেশে সেবাখাতে নিয়োগের সময় সাধারণত চাকরি প্রার্থীদের কোনো সাইকোলজিক্যাল টেস্ট নেওয়া হয় না। তারা এসব চাকরির জন্য মানসিকভাবে ‘ফিট’ বা যোগ্য কিনা তা মেপে দেখা হয় না। দেখা গেছে, এ ধরনের সেবাদানকারীর অনেকেই নিজের চাকরি পেতে গিয়ে দুর্নীতির খপ্পরে পড়েছিলেন। কেউ উচ্চশিক্ষিত হয়েও কঠিন বেকারত্বের মুখোমুখি হয়ে হতাশায় ভুগে বাধ্য হয়ে এই চাকরিতে নাম লিখিয়েছেন। এটা তাদের অনেকের পছন্দের চাকরি নয়। তারা বা তিনি বহুদিন চাকরি খুঁজতে খুজতে হন্যে হয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ পাঁচ-ছয় বছর ধরে চল্লিশটির অধিক ভাইভা বোর্ডে প্রত্যাখ্যাত হয়ে চাকরি বয়স যখন প্রায় শেষ, ঘুষ ছাড়া যখন চাকরি মিলবে না এমনটা নিশ্চিত হন, তখন বাধ্য হয়ে বাবার কৃষিজমি কমদামে বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে এই চাকরি যোগাড় করেছেন!


বাবার জমি ফেরত দিতে অথবা চাকরি পাবার পূর্বে যে ধারদেনা করেছিল তা শোধ দিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে এসব যুবক। এ ছাড়া অনেকের নতুন পারিবারিক জীবনের খরচ, ভাই-বোন পোষ্যদের চাহিদা এবং সেগুলোর সংগে চাকরিতে প্রাপ্ত বেতনের সংকুলান না হওয়ায় অবৈধ পথে রোজগারের অনৈতিক ভাবনা জেগে ওঠে। সবার ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি এমন তা নয়। অনেকেই সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।


বেকার সমস্যার কারণ অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় অনেক চমকপ্রদ তথ্য আমরা পেয়ে থাকি। এমন একটি অনুসন্ধানমূলক গবেষণার উপাত্ত দিতে চাকুরীজীবি একদিন উপর্যুক্ত বক্তব্য রেখেছিলেন।

বলতে দ্বিধা নেই এটা আমাদের নিয়োগ প্রশাসনের অনিয়মের চরম ঘৃণিত উদাহরণ। দেশের শিক্ষিত বেকারত্ব নিরসনে ঘুষ-জালিয়াতির এ নিষ্ঠুর বাস্তবতার অলিখিত নিয়ম আশু নি:শেষ হওয়া জরুরি।

আরেকটি জায়গায় দেখলাম, একজন সাংবাদিক একটি বিষয়ে এমন একটি মন্তব্য করেছেন যা সব ধরণের পাঠকের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন। তার লেখা থেকে উদ্বৃতি দিলাম, ‘মিডিয়িার স্টিকার লাগানো গাড়িটি রাস্তার পাশে রেখে টংঘরে একটি চায়ের দোকানে চা পান করার জন্য সবেমাত্র বসছে। এমন সময় গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ (বেশভূষায় মনে হয়েছে) প্রশ্ন করলেন, আপনি কি মিডিয়ায় কাজ করেন? জ্বী বলতেই পাল্টা প্রশ্ন.. মিডিয়া কি সত্য কথা বলে?

প্রশ্ন শুনে বেশ কিছুক্ষণ নির্বাক আমি, কী বলবো উত্তর, কেন এমনটা হলো...!

আমাদের নিয় কী ভাবছেন তারা...!

কোনোমতে বললাম যা ভাবছেন সেটাও হয়তো পুরো সত্য নয়...! আত্ম পলায়নের মত দ্রুত টংঘড় ছেড়ে চলে এলেও প্রশ্নটা কিন্তু মাথাটাকে বিগড়ে দিয়েছে...!!”

এমন একটি পোস্ট শুধু সাংবাদিক ভাইয়ের মাথাটাকেই নয়, আমার ও সমাজের অগণিত মানুষের মাথাকে বিগড়ে দিয়ে নৈতিকতাবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। অনেক ধন্যবাদ পোস্ট দাতাকে!

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবার বদৌলতে দেশের অজপাড়াগাঁয়ের একজন খেটে খাওয়া মানুষের হাতের মুঠোয় আজ ছবিসহ সব ধরনের সংবাদ পৌছে যায়। তাদের কোনো কিছু আর অজানা নেই। দেশের রাজনীতি নিয়েও তাদের কৌতূহল অনেক বেশি। তারা যেটা সত্য হিসেবে মনে করেন, জানেন যখন সেই সত্যটাকে মিডিয়ায় মিথ্যা বা ভিন্ন হিসেবে শুনেন, দেখেন তখন তাদের মনেও এক ধরণের ঘৃণাবোধ তৈরি হয়। শিক্ষিত মানুষেরা অনৈতিকভাবে যে ঘুষ-দুর্নীতিকে স্পিডমানি বলে পাড়াগাঁয়ের একজন সৎ-সরল মানুষ সেটাকে পাপ হিসেবেই মনে করে।

আজকের সংবাদের বাস্তবতা ও সাংবাদিকের অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টি আজ সব পাঠকের মনে নাড়া দেয় বলে মনে করি। দেশের অনেক মানুষ ব্যক্তিগত অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়েও অন্যায় পথে নেমে পড়ে না। কারণ, অভাব থাকলেও তাদের নৈতিকতা অসৎ পথে যেতে বাধা দেয়। অথচ কোনো কিছুর অভাব নেই এমন অনেক বিত্তশালী আছে যাদের শুধু সবসময় জমা করা ও খাই খাই স্বভাব লক্ষ্যণীয়। এসব মানুষের ক্ষেত্রে ছোট-বড় যে কোনো ইস্যুতে কোথাও নৈতিকতাবোধ ও বিবেকের তাড়না জেগে উঠতে দেখা যায় না।


আমরা সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেশের সবার কথা স্মরণ করে নিজের নৈতিক দিককে জাগিয়ে তুলি, বাস্তবক্ষেত্রে সব ভালোকে ভালো বলার ও সব মন্দকে মন্দ ভাবার, বলার অভ্যাস করি তবে সেটাই হবে দুর্নীতি নির্মূলে সবচে’ বড় ও মহৎ সহ্যের শূন্য সীমা (জিরো টলারেন্স)। কারণ, ক্ষেত্রবিশেষ ও পক্ষপাতমূলক সহ্যের শূন্য সীমা টেকসই সমাজ না গড়ে সামাজিক বিভেদ বাড়িয়ে সামাজিক ভাঙ্গন সূচিত করে মাত্র। একই শ্রেণির ভালো শিক্ষার্থীরা যখন উপলব্ধি করে তার চেয়ে কম মেধাবীরা যখন বাঁকা পথে তর তর করে উপরে উঠে গেছে তখন সেটা জাতিকে উপহাস করে মাত্র। উপরের উদাহরণে জানা গেছে চল্লিশটির অধিক ভাইভা বোর্ডে প্রত্যাখ্যাত হবার মত ক্রমাগত সামাজিক বঞ্চনা একজন সুস্থ স্বাভাবিক চাকুরীপ্রার্থীর মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে অসৎ হবার প্রেষণা অথবা ক্রেজ যোগাতে পারে। যা দুর্নীতির মূল উৎপাটন করার পথে বড় অন্তরায়।


তাই এই ফাগুনের অশাজাগানিয়া দিনগুলোর ভাবনা হলো- আমাদের তরুণদের মনে-প্রাণে যে উষ্ণতার ছোঁয়া উচ্চশিক্ষাঙ্গনের প্রান্তরকে বর্ণিল রঙে রাঙ্গিয়ে তুলেছে তা যেন সারা জীবনব্যাপী আলো ছড়ানোর সুযোগ পায়। তারা যেন শুধু রাজনৈতিক বিবেচনার নিষ্ঠুর যাতাকলে না পরে। এসব তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে নির্ভেজালভাবে একাডেমিক ও মনো:দৈহিক মেধার বিচারে একটি উপযুক্ত কর্মসংস্থান লাভ করে এবং সেটা যেন আরো রঙীন হয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় সেজন্য নিয়োগ প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :