Alexa

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’

ছবি: বার্তা২৪.কম

সাধারণত কোনো মানুষের মাতৃভাষাকেই ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ‘প্রথম বা প্রধান ভাষা’ বলা হয়। বিশেষত, যারা একাধিক ভাষা জানেন, তাদের সামনে ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামক একটি প্রসঙ্গ চলে আসে। উন্নত বিশ্বে, যেমন ইউরোপ ও আমেরিকায় একাধিক ভাষা জানার দরকার পড়ে। কারণ, সেসব সমাজ বহুভাষী। সেখানে বহু ভাষা চলে। মানুষকেও তাই নানা ভাষা জানতে হয় সমাজ-সংসারের নানা কাজ-কর্মের সুবিধার্থে। তথাপি একটি ভাষাকে তার ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা তার জন্মগত মাতৃভাষা।

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে। একজন ব্যক্তির প্রথম ভাষা বা ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ হবে কোনটি? যে দেশে জন্মেছে, সে দেশের ভাষা? নাকি মাতৃভাষা? প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট করলে বলতে হয়, ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ কি মাতৃভাষা হবে? নাকি মাতৃভূমিতে যে ভাষা প্রচলিত রয়েছে, সেটি হবে? এমন বিতর্ক সচরাচর শোনা যায়।

সমস্যাটি আজকাল অনেক প্রবাসী বাংলাভাষী পরিবারকেই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কারণ, তাদের সন্তান জন্মগতভাবে বাংলাভাষী। আবার যে দেশটিতে সে জন্ম নিচ্ছে, সে দেশে প্রচলিত ভাষাটিকেও সে শিশুকাল থেকেই চমৎকারভাবে শিখে ফেলে। অর্থাৎ মায়ের মুখের ভাষা এবং জন্মস্থানের ভাষা, উভয়ই সে অনর্গল বলতে পারে। উভয়ই তার কাছে সাবলীলতা পায়। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, তার ‘ফাস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ কোনটি?
 
লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব-পুরুষের ভাষা নয়, ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে প্রবাসের ভাষাকেই স্বাভাবিকভাবে আয়ত্ত করে নিচ্ছে মাইগ্রেটেড অভিবাসীদের উত্তর-পুরুষরা। প্রবাসী পরিবারের পরের জেনারেশনের একটা অংশ হয়তো তাদের পূর্ব পুরুষদের মাতৃভাষা পিতা-মাতার অসচেতনতার কারণে একেবারেই শিখছে না, নয়তো নিজ আগ্রহ ও গৃহের অনুকূল পরিবেশে আংশিকভাবে রপ্ত করতে চাইছে। এতেই তৈরি হচ্ছে সমস্যা। জন্মগত ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হারিয়ে সে দেশের ভাষাটিকেই প্রথম বা প্রধান ভাষা রূপে গ্রহণ করছে। সে হয়ে যাচ্ছে ইংরেজি বা ফরাসি বা স্পেনিশ ভাষী একজন মানুষ। জাতিগত অর্থে সে যে একজন বাংলা ভাষী, সে তথ্যটিই হারিয়ে যাচ্ছে।

‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ বিবেচনার সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ভাষা শুধু বলার বিষয়ই নয়, ভাষা এক ধরনের উত্তরাধিকারও বটে। ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মতো জগতের প্রত্যেকটি ভাষারই নিজস্ব ভাণ্ডার আছে। আছে বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির একটি অন্তর্নিহিত স্বকীয়তা। যার মাধ্যমে মানুষের আবেগ, অতীত, অনুভূতি ইত্যাদি পরম্পরাগত সূত্রে গ্রন্থিত থাকে। ভাষার ভিত্তিতেই ব্যক্তি বা পরিবার বা সমাজের মূল্যবোধ, অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস (জীবনদর্শন) আর ঐতিহ্যসূত্র বিকশিত হয়। সামাজিক মূল্যবোধগুলো সক্রিয়ভাবে চিন্তাধারায় কিংবা কথপোকথনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বাস্তবতা পায় ভাষার হাত ধরেই।

ফলে একজন বাংলা ভাষী যদি প্রজন্মান্তরে ইংরেজ ভাষী বা ফরাসি ভাষী হয়ে যায়, তাহলে তার জাতিগত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও মনোজগতের কাঠামোটিই ভেঙে যেতে পারে। তার চিন্তা ও চেতনায় হাজার বছরের বাংলা ভাষা ও বাঙালি সত্তাটিও আর তখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। নতুন শেখা ভাষা জগতের একজন নবীন সদস্য হিসেবে সে হয়তো কথা-বার্তা বলতে পারবে, কিন্তু সে ভাষার ইতিহাস-ঐতিহ্য-পরম্পরার সঙ্গে মোটেও একাত্ম হতে পারবে না। কারণ, নতুন ভাষাটি অনাদীকাল ধরে তার নয়। ভাষাটির ঐতিহ্য ও অতীতে তার পূর্ব-পুরুষের কোনো অবদান নেই। নিজেকে সে গভীরতম অর্থে সে ভাষার অংশ করতে পারবে না।

সম্ভবত এ কারণেই ইহুদিরা কখনোই নিজের ভাষা ভুলে যায়নি। ইহুদিরা শত শত বছর বিশ্বের নানা দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে চড়ে বেড়িয়েছে। এক দেশ থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আরেক দেশে। ইসরায়েল রাষ্ট্রটি হওয়ার আগে শত শত বছর ইহুদিরা এমনিভাবে নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বহিরাগত হয়ে জীবন-ধারণ করেছে। প্রয়োজনে সে সব দেশের ভাষা শিখেছে, সংস্কৃতিকে বুঝেছে, সাহিত্যচর্চা ও কাজকর্ম করেছে। কিন্তু নিজেদের আদি ভাষা হিব্রুকে বিস্মৃত হতে দেয়নি। ঘরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিব্রু চর্চা করেছে। প্রাচীন হিব্রু সাহিত্যের ইতিহাসকে নিজেদের চর্চায় সংরক্ষণ করেছে।

ইহুদিদের ভাষাপ্রেম ও ভাষা-সংরক্ষণের কারণে দেখা গেল, যেদিন ইসরায়েল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ঠিক সেদিন থেকেই সেখানকার রাষ্ট্রভাষা হিব্রু। আরব, ইউরোপ, রাশিয়া, আমেরিকা, জার্মানি ইত্যাদি যে দেশ থেকেই ইহুদিরা এসে ইসরায়েলে বসতি স্থাপন করুক না কেন, হিব্রু বলতে তাদের মোটেও অসুবিধা হচ্ছে না। বরং হিব্রু ভাষা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদেরকে নতুন রাষ্ট্র ইসরায়েলে নৈকট্য লাভ করতে ও একাত্ম হতে সাহায্য করেছে।

হিব্রু ছাড়াও আরেকটি ভাষাকে তারা রক্ষা ও সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট হয়েছে। যদিও ভাষাটি হিব্রুর মতো প্রাণ পায়নি। ভাষাটি হলো ইডিড, যা ছিল পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে বসবাসকারী ইহুদিরে ভাষা। বহু বিখ্যাত লেখক ছিলেন ইহুদি এবং ইডিড ভাষী।

অতএব, নতুন দেশে গেলেই এবং জন্ম থেকে সেদেশের ভাষাটি সম্পূর্ণভাবে রপ্ত করলেও জাতিগত-সংস্কৃতিগত-ঐতিহ্যগত পরম্পরায় প্রাপ্ত ভাষাটিই মানুষের ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হওয়ার দাবি রাখে না। জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রাপ্ত ভাষাটিই ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হওয়ার দাবিদার। নাগরিকত্ব বদলের মতো যারা ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ বদলের চেষ্টা করেছেন বা করছেন, তারা নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছেন। নিজের অস্তিত্ব ও জাতিগত পরিচিতিকে নস্যাৎ করছেন। জীবনের জন্য সকল ভাষাই শেখা যাবে এবং শেখা উচিতও। কিন্তু সেটা নিজের জন্মগত ভাষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে নয়।

আপনার মতামত লিখুন :