Alexa

উচ্চশিক্ষা, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা' ও দায়বদ্ধতা

উচ্চশিক্ষা, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা' ও দায়বদ্ধতা

ছবি: বার্তা২৪.কম

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ অনুষদ কিংবা বিভাগের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো মৌলিক বই বাংলায় নেই বললেই চলে। সঙ্গত কারণে শিক্ষকরাও ইংরেজি বই শিক্ষার্থীদেরকে পড়ার জন্য বলে থাকেন। বাংলা ভাষায় লিখিত মৌলিক বইয়ের অভাব এবং বিকল্প না থাকায় এক প্রকার বাধ্য হয়ে বুঝে কিংবা না বুঝে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়। যৎ সামান্য যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ালেখা করেন, তাদেরকে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে ‘নোট’ তৈরি করে পড়তে হয়। নি:সন্দেহে অন্য যে কোনো ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা গৌরবের বিষয়। তবে, একটি সনদপত্রের প্রত্যাশায় আমরা অন্য ভাষায় যা শিখে থাকি, তার দৌড় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরীক্ষার খাতা পর্যন্তই। আমাদের মনে রাখা দরকার, ‘অসম্পূর্ণ জ্ঞান অজ্ঞতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক’ হয়।

দুই.

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পেশাগত জীবনে শিক্ষকদের তেমন কোনো জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা না থাকায় মাতৃভাষায় মৌলিক বই কিংবা গবেষণাপত্র প্রকাশে কোনো বাদ্ধবাধকতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এমনকি রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা ও প্রশাসনের তোষামদ করে পদোন্নয়ন অতিসহজ বলে গবেষণাপত্রকে এখনো কেউ তেমন গুরুত্ব দেন না। চাকরি করছেন কিংবা ৩৫-৪০ বছর চাকরি করে অবসর নিয়েছেন এমন অনেক অধ্যাপক আছেন যারা অধ্যাপনাকালীন সময়ে কোনো মৌলিক বই প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ বই বাংলায় অনুবাদ কিংবা আর্ন্তজাতিক জার্নালে মানসম্মত কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি। অবস্থাদৃষ্টে বয়োকনিষ্ঠ শিক্ষকরাও বয়োজেষ্ঠ্যদের দেখানো পথেই হাঁটছেন।

তিন.

অন্যদিকে, দু:খজনক বিষয় হল, দেশে অনুমোদিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্তৃভাষায় মৌলিক জ্ঞানচর্চার পর্যাপ্ত কোনো সুযোগই নেই। পাঠদানের মাধ্যম ইংরেজি হওয়ায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা এক প্রকার উপেক্ষিত। তাই, মাতৃভাষা চর্চার জন্য স্বল্প ক্রেডিটের ‘নন-মেজর কোর্স’ হিসেবে ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা’ এবং ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ আবশ্যক অর্ন্তভুক্তি, পঠন ও অনুশীলন যৌক্তিক দাবি রাখে। যদিও ‘বাংলাদেশ স্ট্যাডিজ’ নামে একটি কোর্স পড়ানো হয়, যার মাধ্যমও ইংরেজি। মাতৃভাষা চর্চার অবারিত সুযোগ প্রতিষ্ঠায় আমাদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

চার.

অনেক পণ্ডিত আছেন যারা অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলে থাকেন জীবনের প্রথম ১২ বছর (শিশু শ্রেণি-দ্বাদশ) পড়ার পর একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা প্রযুক্তিবিদ ‘বাংলা’ কিংবা ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ দিয়ে কি করবেন? তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জাতি হিসেবে ‘আত্মপরিচয়’, ‘প্রমিত মার্তৃভাষার চর্চা’ এবং দেশের ‘সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা’ জানা ও তার সংস্পর্শে থাকা একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

১.৪২ বিলিয়ন (২০১৮) চীনা জনগোষ্ঠী তাদের মার্তৃভাষা ‘মান্দারিন’ চর্চার বিকল্প আজো ভাবতে পারেন না। এমনকি তারা সুযোগ পেলে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে রাষ্ট্রীয় বৃত্তি দিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীকে ‘মান্দারিন’ শিক্ষা দেন । চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের সকল স্তরের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা চর্চার বিকল্প তাদের কাছে অদ্যাবধি নেই। অথচ গোটা পৃথিবীর সকল শাখায় আজ তারা নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিস্ময়ের সাথে দেখলাম, আমার পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক ‘পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন’ এর একটি ইংরেজি বই মান্দারিন ভাষায় অনুবাদ করার জন্য চীন সরকার তাকে ৮০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ১০ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা) বরাদ্দ দিয়েছে। টাকার পরিমাণ যাই হোক, কী অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাদের মাতৃভাষার প্রতি ভাবতেই বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ অনুভূত হয়।

পাঁচ.

মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা শুধু ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ আছে বলেই বাংলা সাহিত্যের প্রতিথযশা কবি-সাহিত্যিককে চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ চেনেন না। কারণ সেই দায়বদ্ধতা আমাদের মধ্যে কাজ করেনি। অথচ ১৯১৩ সালে বাংলা সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মত গৌরবময় ইতিহাস আছে বাংলা সাহিত্যের। যে সকল ভাষায় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে সেই সকল ভাষায় কিংবদন্তিতুল্য বাংলা সাহিত্যগুলোকে অনুবাদ করে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব নিতে পারে বাংলা একাডেমি। দেশের খ্যাতনামা অধ্যাপক-সাহিত্যিক, অনুবাদে পারদর্শী এমন বরেণ্য ব্যক্তিবর্গকে তাদের পছন্দসই সাহিত্যকর্মের শাখাভিত্তিক অনুবাদের দায়ভার দেওয়া যেতে পারে।

ছয়.

উচ্চশিক্ষার প্রতিটি শাখার জন্য (চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রকৌশলবিদ্যাসহ) প্রথম ধাপে কমপক্ষে ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি মৌলিক বই বাংলায় অনুবাদ শুরু করার গৌরবময় দায়িত্ব নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক যাদের ইতোমধ্যে বেশ কিছু মৌলিক বই রচনা ও সম্পাদনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদেরকে এই গুরু দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অধ্যাপকদের অফুরন্ত সময়কে সম্মানজনকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা হবে ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি মাইলফলক। একই শাখায় পারদর্শী ব্যক্তিবর্গকে ৪/৫ জনের একটি দলভিত্তিক ভাগ করে দিতে পারলে অনুবাদের মান প্রাঞ্জল ও ভাবগাম্ভীর্যময় হতে পারে। যদিও প্রতিবছর ইউজিসি অনুবাদমূলক পুস্তকের জন্য গবেষণামঞ্জুরী বরাদ্দসহ ‘ইউজিসি স্বর্ণপদক’ প্রদান করে থাকে। তবে এই ব্যবস্থা প্রচলনের পাশাপাশি শুধুমাত্র মৌলিক বই অনুবাদের জন্য স্বতন্ত্র প্রকল্প গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে।

যে কোনো ভাষায় পড়ালেখার অধিকার শিক্ষার্থীর রয়েছে। তবে মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাতে শিক্ষার্থী যা পড়ছেন তা পরিপূর্ণভাবে বুঝে পড়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সমৃদ্ধ হবে রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

বাঙালি জীবনের বিকাশ ও সৃষ্টিশীলতায় মার্তৃভাষা বাংলা চর্চার বিকল্প নেই। কেননা শিকড়চ্যুত জাতি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না। প্রতি বছর প্রাণের বই মেলাকে ফেব্রুয়ারি মাসের পর দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্মীয় উপাসনালয়ের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ‘ইমাম-পুরোহিত’ নির্বাচনে আমরা যতটা আন্তরিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই অনুদার ও উদাসীন। তাই, বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নমস্য শিক্ষক তৈরির দিকে রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে যারা ‘মার্তৃভাষা ও শিক্ষা’ নিয়ে খেলতে পারেন, খেলাতে পারেন এবং মন্ত্রমুগ্ধের মত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদেরকে মোহনীয় করে রাখতে পারেন। রাষ্ট্রের এখন এমন শিক্ষাগুরু প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখাবেন ‘শিক্ষায়’ আর বাস্তবায়ন ঘটাবেন ‘গবেষণায়’।

আপনার মতামত লিখুন :