পুড়ে যাওয়া খুলির খোঁজে

এরশাদুল আলম প্রিন্স, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
চকবাজারে পুড়ে যাওয়া বাড়ি, ছবি: বার্তা২৪.কম

চকবাজারে পুড়ে যাওয়া বাড়ি, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকা মেডিকেলের মর্গে এখন আর্তনাদ আর কান্নার রোল খুব বেশি কিছু নয়, স্বজনের পুড়ে যাওয়া লাশের শেষ চিহ্নটুকুও যদি পাওয়া যায়। যদি দেখতে পায় সেই প্রিয় মুখটি। হোক পোড়া। ওরা জানে সব পুড়ে গেছে, কিছু্ই আর নেই অবশিষ্ট। শুধু স্মৃতিটুকু ছাড়া। তবু পুড়ে যাওয়া স্বজনের পুড়ে যাওয়া চোখ দু’টোও স্মৃতি হয়ে থাকুক তাদের হৃদয়ে। আসলে পৃথিবীর কঠিনতম অনুভূতিগুলোকে কখনও ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ভাষা সেখানে নির্বাক, নির্বোধ। সে অনুভূতি যার শুধু সে-ই জানে তার আকুতি ও গভীরতা। তাই শোক, ও বেদনাগুলো একান্তই ব্যক্তিগত। চার পাশের চেয়ে থাকা চোখগুলো শুধুই সাক্ষী হয়ে রয়ে যায় চিরদিন।

হ্যাঁ, আমরা শুধুই সাক্ষী, নির্বাক সাক্ষী। বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া আমাদের আর কি ই বা করার আছে। কতো আর সাক্ষী হওয়া যায়, কতোই বা আর মনে রাখা যায়। তাই আগুনের নিচে চাপা পড়ে যায় আগুন, কারখানার নিচে কারখানা, জাহাজের নিচে জাহাজ, সড়কের নিচে সড়ক, বেদনার নিচে বেদনা। আসলে কি তাই? নাকি মূলত চাপা পড়ে যায় মানুষের নিচে মানুষ।

আমাদের সহকর্মী হাসপাতালের খণ্ডচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “ভাই হারানো বোন জানে আগুন তার ভাইয়ের শরীরের কিছুই রাখেনি। তবুও মর্গের প্রধান ফটকের সামনে গড়াগড়ি খাচ্ছেন আর বিলাপ করে বলছেন, আমার ভাইয়ের পোড়া লাশটাই এনে দে, আমি আর কিছু চাই না।”


আগুনের কাছে আর কি-ই বা চাওয়ার আছে? আগুনতো শুধু নিতেই পারে। দিতে পারে না কিছু। দেয় শুধু স্মৃতি, পুড়ে যাওয়া শরীর, হাড় বা খুলি। তার স্বত্বতো শুধুই স্বজনের। আমাদের জন্য সত্য হচ্ছে- ভুলে যাওয়া।


তবুও চুড়িহাট্টায় মনে পড়ে যায় নিমতলীকে। ৯ বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় জ্বলে উঠেছিল নিমতলী। রাসায়নিক আগুনে পুড়েছিল নিমতলী। পুড়েছিল অনেক প্রাণ। আমরা পেয়েছিলাম ১২৪টি খুলি। কিন্তু আমাদের অক্ষত খুলির মাঝে লুকিয়ে থাকা মগজ ও পাজরের মাঝে ঝিমিয়ে থাকা হৃদয় শোকাতুর হয়েছে, আমাদেরকে কর্তব্য পরায়ণ হতে শেখায়নি। আগুনের ক্ষুধা আরো বেড়েছে। আর আমরা আরো বেদনাসহিষ্ণু হতে শিখেছি, ঘাতসহ হয়েছি। কিন্তু সচেতন হইনি। না আমরা, না কর্তৃপক্ষ।

এখানে একটি ঘটনা ঘটার পর আইন, অনিয়ম, নিরাপত্তা, সচেতনতা এসব নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়, তারপর যা তা-ই। কারণ, এটিই আমাদের আসল নিয়ম।

একটি ঘিঞ্জি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কল কারখানা স্থাপন কতোটা বিপজ্জজন নিমতলীতে তা দেখেছি। আজ আবারও দেখলাম। দেখার কি আর শেষ আছে? শেখারও শেষ নাই। কিন্তু আর কতো দেখবো, শিখবো?

নিমতলী ঘটনার পর কথা উঠেছিল ওই সব এলাকার প্রায় ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত যে কাজটি হয়নি তা আজ পরিষ্কার। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, সুগন্ধির ক্যানিস্টারগুলো সশব্দে বিস্ফোরিত হয়েছে। তার মানে রাসায়নিক কারখানা, গুদাম সবই আছে আগের মতোই। শুধু হারিয়ে গেলো কতগুলো প্রাণ। আমরা পেলাম কিছু পোড়া খুলি।

চকবাজারের এই এলাকাটি মূলত প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল বেচাকেনার কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত। ঢাকা তথা দেশের পাইকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা পুরান ঢাকা। জীবন বাঁচাতে ও জীবন সাজাতে যা দরকার তার সবই পাওয়া যায় পুরান ঢাকায়। আসল নকল সবই পাওয়া যায়। নকল প্রসাধনী, খাবার, ওষুধ সবই আছে। বিশ্বের নামি-দামী ব্রান্ডের সব প্রসাধনই পাওয়া যায় পুরান ঢাকায়। লস এঞ্জেলেস আর ঢাকার মধ্যে আজ আর তফাৎ কই?

জানা যায়, বাড়িটির ভূগর্ভস্থ তলাসহ একতলা ও দোতলায় ছিল সুগন্ধির বিশাল মজুত। একটি ভিডিওতে দেখলাম হঠাৎ করেই আগুন লেগে মুহুর্তেই ছড়িয়ে গেলো। আশপাশের মানুষ এগিয়ে এলো ঠিকই কিন্তু সে আগুন নিয়ন্ত্রণের নয়। সব কিছু পুড়িয়ে ফেলার আগে সে আগুনকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

পুরান ঢাকা একটি মিশ্র এলাকা। কল-কারখানা, ভারি শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, আড়ৎ, রাসায়নিক, লোহা-লক্কর কারাখানা, ঘোড়ার গাড়ি থেকে শুধু করে হাইব্রিড একুয়া সবই আছে এই পুরান ঢাকায়। এরই মাঝে মানুষের বসবাস। কিন্তু এর শেষ কোথায়। একদিকে এই অনিয়মের শহর গড়ে ওঠেনি। তাই রাতারাতি এই অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে নিয়মানুযায়ী সব চলবে সে আশা করি না। কিন্তু কাজটি যে এখনও শুরু হয়নি, সেখানেই দু:শ্চিন্তা। সব কিছুর জন্য শুধু সরকারকেই দায়ী করলে আপাতত: একটা স্বস্তি আসে ঠিক। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয় কি? তাই মানুষেরও সচেতনতা লাগবে।


আমাদের সহকর্মীর বয়ান, “বহু দিনের পরিচিত মুখটা আজ অপরিচিত হয়ে গেছে। প্রিয়জনকে চিনতে না পারার বেদনা সহ্য করা সত্যি কঠিন!” এ বেদনা যে হারিয়েছে সেই জানে। আমরা শুধু ভুলে যাওয়ার কৌশলটি রপ্ত করে ফেলেছি! ওরা ওদের পরিচিত স্বজনদের চিনতে পারছে না, কিন্তু আমরা কি আমাদের চিনতে পারছি?


এ পর্যন্ত ৭০ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। মানে ৭০টি জীবন, ৭০টি লাশ। কিন্তু এর পেছনে কত মানুষের গল্প জড়িয়ে আছে তার হিসেব কি আমাদের আছে? কত স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাধনা। আজ বেদনাতুর। তবু পুড়ে যাওয়া ৭০টি খুলির কাছে মস্তক অবনত করে বলতে চাই- যদি কখনো ভুলে যাই, শুধু ক্ষমা করো।

আপনার মতামত লিখুন :