আগুনের আসল কারণ লোভ

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে চকবাজারে ভয়াবহ আগুন কীভাবে লেগেছিল, তা নিয়ে নানান জনের নানান মত। সঠিক কারণটি জানতে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তদন্ত কমিটিই জানাতে পারবে আসল কারণ। তবে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বিবরণ আর বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে আগুন লাগার মোটামুটি একটা চিত্র দাঁড় করানো যায়- অনড় যানজটে একটি পিকআপ ভ্যানের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের সূত্রপাত। সেখান থেকে পাশের হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। পাশের ওয়াহিদ ম্যানশনে থাকা কেমিক্যাল সে আগুন দ্রত ছড়াতে সহায়তা করে।

৩০ সেকেন্ডের মধ্যে চকবাজারের চুড়িহাট্টা পরিণত হয় আগুনের নদীতে। দোজখের যে ছবি কল্পনায় আঁকা, তা যেন সবার চোখের সামনে চলে আসে। খোলা আকাশের নিচে যানজটে আটকে পড়া মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছে, এটা অবিশ্বাস্য। আগুন এতই দ্রুত ছড়িয়েছে, আর যানজট এতটাই অনড় ছিল যে মানুষ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগও পায়নি। আগুন লাগার আসল কারণ তদন্তে বের হবে।

তবে আমার বিবেচনায় এ আগুন লাগা এবং ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ লোভ। আমাদের লোভের আগুনেই পুড়েছে ৭০টি প্রাণ। প্রথম লোভ সিএনজিতে গাড়ি চালানো। দ্বিতীয় লোভ বাসার নিচে কেমিক্যালের কারখানা বা গোডাউনের জন্য ভাড়া দেওয়া। প্রথম কথা হলো- আমরা কম পয়সায় গাড়ি চালানোর লোভে সব গাড়ি সিএনজি কনভার্ট করে ফেলেছি। কিন্তু গাড়ি সিএনজিতে চালালে মেইনটেনেন্সে খরচ বেশি হয়। আখেরে গিয়ে পোষায় না। অকটেনে চালালে গাড়ির ইঞ্জিন ভালো থাকে। কিন্তু তবুও নগদ লাভের ফাঁদে পা দিয়ে আমরা সিএনজিতেই গাড়ি চালাই। দুই কোটি টাকায় গাড়ি কিনতে পারি, কিন্তু ১০০ টাকায় অকটেন গা জ্বলে। কারণ কম পয়সায় চালানো যায় বলে অনেক মধ্যবিত্ত লোন-টোন নিয়ে একটা গাড়ি কিনে ফেলেন। ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ সিএনজিতে গাড়ি চালানোর সুযোগ। কাল থেকে সিএনজি বন্ধ করে দিলে ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কমে যাবে। সুযোগ থাকলে আমি সিএনজিতে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করে দিতাম। নিদেনপক্ষে ব্যক্তিগত গাড়িতে সিএনজি বন্ধ করার ব্যবস্থা করতাম।

কিন্তু বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যেভাবে সিএনজির ব্যবহার হচ্ছে, তাতে বন্ধ করার বিষয়টি ভাবারও সুযোগ নেই। আমরা সবাই একেকটি বোমা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। রাস্তায় গাড়ি চললে দুর্ঘটনা ঘটবে, ধাক্কা লাগবে। কিন্তু সিএনজিচালিত গাড়ির দুর্ঘটনা মানে কিন্তু বোমা বিস্ফোরণও। এরইমধ্যে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ভাগ্য ভালো বড় কোনো বিপর্যয় হয়নি। কিন্তু হয়নি বলে যে হবে না, তার যে কোনো গ্যারান্টি নেই, সেটা তো চুড়িহাট্টার আগুন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েই দিল। সিএনজি বন্ধ করার উপায় নেই। কিন্তু নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা আছে।

বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনার গাড়িতে লাগানো বোমাটি, মানে সিলিন্ডারটি শেষ কবে টেস্ট করিয়েছেন? সিএনজি নেওয়ার সময় নিরাপত্তার কারণে গাড়ি থেকে নামার নিয়ম, আপনি কি সেই নিয়মটি মানেন? এই নিয়মগুলো কিন্তু আপনার নিরাপত্তার জন্যই করা, সরকারের কোনো লাভ নেই। তবুও আপনি যাতে নিয়মটা মানেন, সরকারকেই সে ব্যবস্থা করতে হবে। গাড়ি চালাতে যেমন ফিটনেস লাগে, তেমনি সিএনজি সিলিন্ডার নিরাপদ কিনা তারও একটা কাগজ থাকতেই হবে। পাইপ লাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বেড়েছে সিলিন্ডারের ব্যবহার। বাসায় সিলিন্ডার রাখা মানে কিন্তু বোমা পোষা। তাই বাসায় সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।

বুধবার যে আগুনটা লেগেছে, তা চুড়িহাট্টায় না হয়ে গুলশানে হলে তেমন ক্ষতি হতো না। কারণ আগুন ছড়ানোর সুযোগ পেতো না। দ্রুত নিভিয়ে ফেলা যেতো। দু’দিন আগে সোবহানবাগ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু কেউ টের পাওয়ার আগেই সে আগুন নিভে গেছে। কিন্তু পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার, অনেকক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকার উপাদান ছড়িয়ে আছে। নিচতলাটা মুদি দোকানিকে ভাড়া দিলে পাব পাঁচ হাজার টাকা, কেমিক্যালের কারখানাকে দিলে পাব ২০ হাজার টাকা।

এই লোভের ফাঁদে পা দিয়ে আমরা আমাদের বাস করার জায়গাটাকে মাইনফিল্ড বানিয়ে রেখেছি। আগুন লাগার পরদিন বিকালেও ওয়াহিদ ম্যানশনের ভেতর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। বডি স্প্রের গোডাইন ছিল। সেখানেই একটু পরপর ক্যানগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছিল।

এখন আমরা কম পয়সায় চালানোর জন্য গাড়িতে সিলিন্ডারের নামে বোমা বসিয়ে ঘুরে বেড়াব, বেশি ভাড়া পাওয়ার লোভে নিজের বাড়িকে বোমা বানিয়ে ফেলব; আর আশা করব- কখনোই দুর্ঘটনা ঘটবে না; ঘটলে হাহাকার করব আর সরকারকে কষে গাল দেব; তাতে লাভ কী? নিমতলীর ১২৪ জন আর চুড়িহাট্টার ৭০ জন তো আর ফিরে আসবে না।

আমরা সবাই জানি, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। বাঁচতে হলে আমাদের লোভের ফাঁদ থেকে বেরুতে হবে। সরকারের দিকে চেয়ে না থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :