Alexa

পুরান ঢাকা ঐতিহ্যের মরণফাঁদ!

পুরান ঢাকা ঐতিহ্যের মরণফাঁদ!

ছবি: বার্তা২৪

অত্যাধুনিক যুগে সব কিছুতেই আধুনিকতার একাকার। এখানে ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলেও আধুনিকভাবে চিন্তা করতে হবে। অতীতে অনেক কিছু ছিল না, মানুষ সাধারণভাবে জীবন যাপন করত। আর এখন দিন বদলের সাথে সাথে নানা প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে, এই প্রযুক্তিগুলো যেমন বিশাল সুফল নিয়ে আসে আবার যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে তখন বড় ধরণের কুফল এসেও আমাদের মাঝে এসে ধরা দেয়। ফলে আমাদের জীবন যাপন হয় বিপর্যয়।

নানা রকম দেশি বিদেশি গবেষণায় এবং বাংলাদেশে পরিবেশবিদগণদের ভাষ্য মতে উঠে এসেছে বাংলাদেশে তথা ঢাকা শহরে কখনো যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় আঘাত আনে তাহলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজধানী ঢাকা শহর-এর পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকার খাবার-দাবার, বাড়ি-ঘর, আচার-আচরণ, চলাফেরা সবকিছুতে একটা ঐতিহ্যের ছোঁয়া লেগে আছে যেটি ওখানকার স্থানীয়দের মনে সাময়িক প্রশান্তি এনে দিলেও দীর্ঘকালের জন্য তাঁরা পিছনে পড়ে যাচ্ছে। পুরান ঢাকায় অনেক সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়, যে খাবারগুলো অতিরিক্ত তৈলাক্তভাব,অতিরিক্ত ভাজা পুরা, অতিরিক্ত সুস্বাদু তবে আমরা কখনো ভেবেছি খাবারগুলো কতটকু সুস্বাস্থ্যকর আমাদের শরীরের জন্য সহনীয়।

বিশেষ করে পুরান ঢাকার রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি এইসবের অচলাবস্থা। ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ঘর বাড়ি নতুনভাবে নির্মাণ প্রয়োজন মনে করছে না স্থানীয়রা। রাস্তা ঘাটের বেহাল অবস্থা। ছোট ছোট রাস্তার গুলি যেখান দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করছে। রাস্তাগুলো এতোই সরু যে দুইটা রিক্সা ঢুকলে আর একজন পথচারী ঔ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কোন পথ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে এক একটা জায়গা মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাই এইসব এলাকায় কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটলে নিমিষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

অতীতকে মাথায় রেখে এখন জীবন যাপন করলে চলবে না, এখন তো আর ঘোড়ার গাড়ি আর গরু এর গাড়ির দিন নয়। হারিকেন লাগিয়ে প্রদীপ জ্বালানোর দিন নয় কিংবা শুকনো পাতা বা শুকনো কাঠ দিয়ে রান্না করার সময় নয়। এখন হল আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির যোগ। বিদ্যুৎ এর বাতি আর খনিজ গ্যাস আর সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার, এইগুলো দ্বারা যেমন সহজে প্রয়োজন মিটে যায় ঠিক তেমনি এইগুলো যখন খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে তখন বিপদ হয়ে ধরা দেয়।

আজকের চকবাজার ট্র্যাজেডি আর নিমতলী ট্র্যাজেডির কথাই বলেন। আজকের চকবাজার ট্র্যাজেডির কথা যদি বলি প্রথমে রাস্তায় পার্কিং করা একটি পিকআপের গ্যাসে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে পাশে থাকা বিদ্যুৎ এর ট্রান্সফরমার পরে ছড়িয়ে পড়ে পাশের হোটেলে রান্না করা আরেকটি গ্যাসের সিলিন্ডারের বোতলের উপর, আবার হোটেল থেকে আগুনটি খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে ওয়াহিদ ম্যানশনে যেখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কেমিক্যাল গোডাউনে লেগে পাশের চারটি বিল্ডিংয়ে এভাবে আগুনটি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আর এমনটি সম্ভব হয়েছে গাদাগাদি বিন্ডিং, ছোট ছোট রাস্তা আর অপরিকল্পিত কেমিক্যাল গোডাউন এর জন্য।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/23/1550904898312.jpg

বিশেষ করে পুরান ঢাকায় বাংলাদেশে অনেক পণ্যদ্রব্যের পাইকারি বাজার হিসাবে বিবেচিত। বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা পণ্যদ্রব্য ক্রয় করতে পুরান ঢাকায় আসতে হয়। আর প্রায় দোকানগুলোই ছোট ছোট সংকীর্ণ মার্কেট গাদাগাদি করে বসে আছে, যেকোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি গুলোতে এমনভাবে বিদ্যুতের তারগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে চোখ পড়লেই ভয় লাগে একই সাথে অনেক গুলো বিভিন্নরকম তাড় গিয়েছে যেগুলো যেকোন সময় দুর্ঘটনা সৃষ্টি করতে পারে।

ঢাকা শহর-এর প্রত্যেকটি জায়গায় অপরিকল্পিত আবাসন রাস্তা ঘাট ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। বড় বড় রাস্তা, উড়ালসেতু ছেয়ে গেছে পুরো ঢাকা শহর তবে পুরান ঢাকার রাস্তা ঘাট কি আদৌও নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।। পুরান ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দা ঝুঁকিপূর্ণ আবাসনে বসবাস করছে। পুরান ঢাকার প্রতিটি অলিতে-গলিতে অর্ধ শত বা শত বছরের পুরোনো ঘর বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো যেকোন সময় অল্পতেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ার আশংকা রয়েছে। পুরান ঢাকাবাসী তাদের পূর্বপুরুষদের নির্মাণ করা ভিটা মাটি, ঘর বাড়ি কিছু নতুনত্ব নিয়ে আসতে রাজি নয়। তবে এখন এই প্রযুক্তির যোগে সুপরিকল্পিতভাবে না সাজানো হলে প্রযুক্তিই দুর্ভোগ ডেকে নিয়ে আসে।

আর আমাদের ভুলের জন্যই আজকে আমাদের অনেক বেদনাদায়ক গল্প শুনতে হচ্ছে, শুনতে হচ্ছে গর্ভবতী স্ত্রী আর তার স্বামীর এক সাথে মৃত্যুর গল্প, শুনতে হচ্ছে মমতাময়ী মায়ের আর্তনাদ ছেলের লাশ খুঁজে না পেয়ে এক টুকরো মাংস পাওয়ার আহাজারি। দেখতে হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রের দুই যমজ ছেলের এতিম হওয়ার দৃশ্য। আরও কতগুলো মৃত্যুর মিছিল দেখলে এর অবসান ঘটবে। তবে আদৌও কি আমাদের টনক নড়েছে। আমারা তখন কিছু করার জন্য নড়েচড়ে বসি যখন একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর, এখন হয়তো আমারা অনেক পরিকল্পনা করব, অনেক নিয়ম কানুন আরোপ করব। আগে হয়তো নিয়ম কানুন আরোপ ছিল শুধু অভাব ছিল তদারকি করার সময়ের অভাব।

পুরান ঢাকার সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে আরও পরিকল্পিতভাবে সব কিছু নির্মাণ করার পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে।ঢাকা শহরের অন্য সকল রাস্তা ঘাটের মত পুরান ঢাকার প্রত্যেকটি জায়গা ঠিক একইভাবে সাজাতে হবে। অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণগুলোকে পুনঃনির্মাণ করতে হবে। গাদাগাদি মার্কেট, দোকানপাট সরিয়ে নিয়ে আধুনিকভাবে টেকসই সুপরিকল্পিতভাবে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। স্থানীয় নাগরিকগণকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করার পরামর্শ দিতে হবে।

শেষে আর দুই একটি কথা বলে পরিসমাপ্তি টানতে চাই অতিলোভী পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীদের কারণই এইসকল বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই এইসকল দুষ্টু লোকদের বিরুদ্ধে আমাদের সকলের রুখে দাঁড়ানোর এখনোই সময়। যাদের অর্থের লোভের লালসায় আবাসিক এলাকাগুলোতে বিষাক্ত কেমিক্যাল গোডাউন অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করে রেখেছে এইসকল ব্যবসায়ী মুনাফা লোভীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রশাসন সহ সর্বস্তর থেকে তাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে হবে। তবেই আর আমাদের মাঝে এমন শোকাবহ একুশে আরেটি শোকাহত মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কখনো সৃষ্টি হওয়ার কোন অবকাশ থাকবে না।

কবির হোসেন: লেখক ও শিক্ষানবিশ সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন :