চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি: সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক

এম. এ. মাসুম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের নিশ্চই মনে আছে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ঘটেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আগুন ট্রাজেডি। সেদিন আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১২৬ জন শ্রমিক নিহত হয়। আহতদের মধ্যে অনেকে আজও নিদারুন কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন। জানা যায়, তাজরীন ফ্যাশন পোশাক কারখানাটির নিচতলার তুলার গুদামে আগুন লাগলে কারখানাটির প্রায় সহস্রাধিক শ্রমিক জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে নামার চেষ্টা করে। কিন্তু শ্রমিকদের বাইরে যাওয়া ঠেকাতে গেটে তালা লাগিয়ে দেয় নিরাপত্তা কর্মীরা। অনেকেই কারখানার ভেতরে আটকা পড়ে পুড়ে মারা যান। কিন্তু এ হত্যার বিচার শুরু হলে আজও শেষ হয়নি।

'তাজরীন'র ক্ষত না শুকাতেই ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলে ঘটে গেল দুনিয়া কাঁপানো রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি যা বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ বিপর্যয় কেঁড়ে নিয়েছিল ১১৩৫ জন শ্রমিকের প্রাণ। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল আরো প্রায় হাজার খানেক মানুষ। চোখের পলকে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল বহু পরিবার। সে ঘটনার বিচার এখনও চলছে, কবে শেষ হবে কে জানে।

বড় কোনো দুর্ঘটনা হলেই আমরা লক্ষ্য করি সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন মহল নড়ে চড়ে বসেন। এ নিয়ে তদন্ত কমিঠি গঠিত হয়, আলোচনা-সভা- সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়, লেখকরা পত্রিকার পাতায় ঝড় তুলেন। কিন্তু কিছু দিন পর সবাই যে যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ভুলে যাই সবাই।

ঘনবসতিপূর্ণ পুরাতন ঢাকার অব্যবস্থাপনা নিয়ে বহু বছর থেকেই আলোচনা হচ্ছে। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নবাব কাটারার নিমতলীর কেমিক্যাল গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ১২৪ জন আর গুরুতর আহত হয় কয়েক শত। ক্ষণিকের তাণ্ডবে গোরস্তানে রূপ নেয় ঘনবসতিপূর্ণ নিমতলীর ওই এলাকা।

পুরান ঢাকার সমস্যার শেষ নেই যা বহু দিন ধরেই চলে আসছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পুরান ঢাকার বংশাল থানা এলাকার আরমানিটোলা, বাবু বাজার, মিটফোর্ড, লালবাগ থানা এলাকার শহীদবাগ ও ইসলামবাগ চকবাজার এলাকার  ৪০০ এর বেশি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এ ভবনগুলোয় রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথানল কাইটন, থিনার আইসোপ্রোপাইল, টলুইনের মতো দাহ্য পদার্থ। পুরান ঢাকার নানা স্থানে অগোছালো গলিপথের সংকীর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত কারখানা। ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা সে সাথে নানা শিল্প কারখানা যে কতটা বিপদজনক তা নিমতলী তাণ্ডবে দেখেছে দেশবাসী।

নিমতলীতে প্রাণহানির ঘটনায় গটিত তদন্ত কমিটি পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেয়াসহ আরও কিছু সুপারিশ করেছিল। সরু গলিঘুপচির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি গটনাস্থলে যেতে না পারায় আগুনের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়-এটিও তদন্তে উঠে আসে। ঝুুঁকিপুর্ণ চিহ্নিত হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে রাসায়নিকের গুদাম কিংবা শিল্প কারখানা অপসারণ করা সম্ভব হযনি। সেখানকার মানুষের জীবন নিরাপদ করার জন্য জরাজীর্ণ পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর সুরারিশ করে তদন্ত কমিটি। সে দুর্ঘটনা ও তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার উদ্যেগ নেয়া হয়েছিল। জানা যায়, পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ২০১১ সালে ’বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ নামে কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে একটি পল্লী গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছিল বিসিক। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্প শুরু কিংবা বাস্তবায়নের কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিমতলীর মতো ঘটনার পরে প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদন করতেই সাত-আট বছর লেগে যাওয়া দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দীর্ঘসূত্রীতার ফল। তিনি বলেন, দু:খজনক হলো কোনো পরিবর্তন আনতে বড় কোনো ট্র্যাজেডির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

আবারও দাউ- দাউ আগুন, আবারও পোড়া মানুষের চিৎকার-আহাজারি, মৃত্যুর মিছিল।

নিমতলীর আগুনের নয় বছরের মাথায় এর এক কিলোমিটারের মধ্যে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আবারো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেলো। ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০ টার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদ সংলগ্ন আসগর লেন, নবকুমার দত্তরোড ও হায়দার বক্স লেনের মিলনস্থলে ঘটে এ অগ্নিকাণ্ড। এবার মারা গেল ৭০ জনের বেশি মানুষ, আহত হয়েছে অনেকে। জানা যায়, ট্রান্সফরমার লাগোয়া পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলা পর্যন্ত প্রশাধনী কেমিক্যাল মজুদ ছিল। ফলে কেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও পাশের দোকানে আগুন লেগে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশে পাশের ভবনে। এভাবেই ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে যায়।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সঠিক হিসাব নিরুপণ না হলেও ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ধারণা মতে, জীবনহানীর পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকার মালামালও পুড়ে গেছে।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ হয়ত পরে জানা যাবে। তবে অনেকে বলছেন, আগুনের সূত্রপাত গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে। এ ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে বাসাবাড়ি, যানবাহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গ্যাসের সিলিন্ডার আসলে কতটা নিরাপদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক, মহাসড়কের জন্য আরও একটি অশনি সঙ্কেত হলো যানবাহনে অনিরাপদ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার। বিভিন্ন যানবাহনে যে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে তার ৭০ ভাগ রি-টেস্টিংয়ের আওতায়র বাইরে থাকছে।

তাছাড়া, মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার হরহামেশাই ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়াও রান্নার কাজে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সিলিন্ডার ঝুঁকিমুক্ত নয়। শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, গ্যাস পাইপলাইনের ত্রুটি থেকে বিস্ফোরণ ঘটেও দুর্ঘটনা ঘটছে এবং প্রতিনিয়ত মানুষ হতাহত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে গ্যাস বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে।

তাজরীন ফ্যাশন, রানা প্লাজা, নিমতলীর দুর্ঘটনায় পুরো জাতি আঁতকে উঠলেও শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া, আরো অনেক দুর্ঘটনাই প্রতিনিয়ত ঘটছে যা হয়ত আমরা জানতে পারছি না। সাময়িক শোকের ছায়া ধীরে ধীরে দীর্ঘায়িত হয়, তারপর সে শোকের ছায়াকে গ্রাস করে নিচ্ছে বড় কোনো শোক। শেষ পর্যন্ত এমন দুর্ঘটনা কিংবা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের শব মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যে কোনো দুর্ঘটনায় বিশেষ করে আগুন দুর্ঘটনায় কোনো রকম বেঁচে গেলেও অনেকে আজীবন মানবেতর জীবন যাপন করেন। এ যেন বেঁচে থেকেও মৃত্যুর যন্ত্রনা। দুর্ঘটনার চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। ফলে, চিকিৎসা করতে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। চকবাজারের দুর্ঘটনার পর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকার কেমিক্যাল গুদাম ও শিল্প কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেয়াসহ অন্যান্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা আশা করছি।

শুধু পুরাতন ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য আবাসিক এলাকার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নিতে হবে। সারা দেশের বাসাবাড়ি ও যানবাহনে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের প্রস্তুত, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত নীতিমালা ও এর কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে। সেই সাথে জনগণকেও দুর্ঘটনার ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। যে কোনো দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিলে ভবিষ্যতে আর একজনও যাতে যোগ না হয় সেটাই সবার প্রত্যাশা।

এম. এ. মাসুম: কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :