অনিয়মের আগুনে পুড়ে যায় স্বপ্ন

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে নিহত হয়ে যারা চলে গেলেন তাদের জন্য সারাদেশের মানুষ শোকাহত। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র এবং সরকারপ্রধানও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্তে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হল। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে পার করেছেন প্রতিটি মুহূর্ত। তারপরও সরকারি ভাষ্যমত ৬৭ জন মানুষকেa হারাতে হয়েছে আমাদের। সরকার নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষতির মাত্রা কমাতে। প্রতিটি মানুষকে ভীষণ আপন মনে হচ্ছে আমাদের। আর তাই আপনজন হারানোর বেদনায় আমরা ভীষণভাবে শোকাতুর।

এই শোকের মাত্রা আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। মানুষ হিসেবে আমাদের আত্মসমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। এ যেন মৃত্যুর মিছিল, আমাদের লোভাতুর মানসিকতা আমাদের আজ সেই মিছিলে শামিল করেছে। এ এক দুর্বিনীত এবং দুর্বার মিছিল। আমাদের শোকের মহায়োজন কিংবা অপরের সমবেদনা এর কোনকিছুই এই মিছিল থামাতে যথেষ্ট নয়, কারণ আমরা নিজেরাই নাম লিখিয়েছি এই মিছিলে, জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে। আজ থেকে ৯ বছর আগে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২৪ জন পুড়ে মারা যাবার পর তাই ৯ বছর পর আবার একই আঘাত। প্রাণহানীর ঘটনা আগেরবারের তুলনায় এবার একটু কম এই কেবল তফাৎ। তবে ৯ বছর এধরণের ঘটনার জন্য একটু দীর্ঘ বিরতি বলতে হয়, কারণ যেকোন মূহুর্তেই এমন দুর্ভাগ্যকে বরণ করার জন্য সকল আলামতই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।

যে ঘটনা ঘটে গেল তা নিয়ে দায় কার, সরকারের নাকি আমাদের? যে কোনো ঘটনা ঘটে গেলে আমাদের সরকারের ওপর দায় চাপানোর এক সহজাত প্রবণতা থাকে। এবারও তাই। এর সঙ্গত কারণও রয়েছে। তবে শুধুই কি সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে কিংবা সরকারকে চাপ দিয়ে কোনো কিছু করিয়ে নেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে আমরা বাস্তব অবস্থার আলোকে যদি কথা বলি তবে বলতে হবে এটা সম্ভব নয়। আমরা যদি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না করি, বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে পরিত্যাগ না করি তবে বারবার এমন দুঃস্বপ্নের সাথেই বাস করতে থাকব। আর এভাবেই এসব দুঃস্বপ্নগুলো নিমতলী, চকবাজারসহ পুরান ঢাকার অলিগলিতে ঘোরাফেরা করতে থাকবে।

২০১০ সালের জুন মাসে নিমতলির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য যে কমিটি করা হয়েছিল সেই কমিটির সুপারিশ এবং পরবর্তিতে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী ২০১০ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে পুরান ঢাকায় স্থাপিত সকল ঝুকিপূর্ণ কারখানাগুলো অন্যত্র (কেরানীগঞ্জ) সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরবর্তিতে দফায় দফায় কারখানা মালিকদের অনুরোধ এবং নানামুখী চাপে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

এর পর থেকে গত ৯ বছর সময়ের মধ্যে কারখানা সরিয়ে নেবার পরিবর্তে আরও ব্যাপকভাবে এগুলোর বিস্তার ঘটেছে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন না হবার পেছনে সরকারের যে দায়বদ্ধতার জায়গাটি রয়েছে তা হল সরকার কঠোরভাবে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করতে পারেনি। এর বাইরে এধরণের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন না ঘটার পেছনে আরও বিশেষভাবে আমি ব্যক্তিগতভাবে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে এলক্ষ্যে ব্যাপকভাবে এই সময়ের মধ্যে কোনো জনমত গড়ে উঠেনি। পরবর্তি সময়ে এমন শোকের মাতম কেটে যেতে সময় লাগেনি এবং মানুষের নতুন করে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতেও সময় লাগেনি।

নিমতলীর ঘটনার পর চকবাজারের ঘটনা যখন ঘটল তখন আবারও স্বাভাবিকভাবে আমরা ৯ বছর পেছনে ফিরে গেলাম এবং সে সময় যা করা হয়নি তার জন্য আলোচনা এবং সমালোচনামুখর হয়ে উঠলাম।

এখন কথা হচ্ছে সে সময় যদি কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়ত তাহলে আজকের এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটতনা এটি সত্য, আবার এর চাইতে এটাও আরও বড় সত্য যে সরকার যদি আবারও প্রশাসনিক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুরানো সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করতে না পারে তবে যেকোনো সময়ে আবারও এমন অথবা আরও ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি আমাদের হতে হবে।

চকবাজারের ঘটনার পর সরকারের শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্য সঙ্গত কারণেই আমাদের কিছুটা আশাহত করেছে। এই লক্ষ্যে গঠিত তদন্ত কমিটি গঠন এবং কোনো প্রতিবেদন পাবার আগেই তিনি এর জন্য সেখানে রাসায়নিক কারখানাগুলো এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী নয় বলে যেভাবে দায়মুক্তি দিয়ে দিলেন তা আমাদের মধ্যে এই মর্মে যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে যে সরকার কারখানাগুলোকে না সরানোর ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান বা অদৃশ্য চাপের মুখে রয়েছে।

চকবাজারের চুরিহাট্টা নামক স্থানে আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটার পর কয়েকদিন পার হয়ে গেল। এই ঘটনা ব্যাপকভাবে আমাদের নাড়া দেবার মূল কারণ হচ্ছে অনেকগুলো মানুষের প্রাণহানী। অথচ পুরান ঢাকার কারখানা অধ্যুসিত এলাকাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কিন্তু নিয়মিত। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে পুরান ঢাকার লালবাগ এবং চকবাজারের প্লাস্টিকের কারখানাগুলোতে প্রতিমাসে গড়ে একটি করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবেই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়ার কারণে এসব অনেক ঘটনাই সংবাদের শিরোণাম হয়না। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে সেখানে গত এক বছর সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যত আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে তার শতকরা ৭৪ ভাগই প্লাস্টিকের কারখানা এবং সেখানে যত কারখানা রয়েছে তার ৪৮ শতাংশই প্লাস্টিকের কারখানা। কি অবাক কাণ্ড এভাবেই আগুনের সাথে বাস করছে যারা এরা কারা? কেনই বা এমন বাস্তবতাকে মেনে নেয়া, আর কেন প্রতিবাদহীনভাবে এভাবেই জীবন কাটিয়ে দেয়া? দায় কি কেবল সরকারের? আমাদের বিবেক, বুদ্ধি আর বিবেচনাবোধকে কোন চুলায় বসিয়ে দিয়ে বসে আছি আমরা?

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ঘোষণা দিয়েছেন যে এভাবে আর যত্রতত্র কারখানা করতে অনুমতি দেয়া হবে না। তার কথার জবাবে যে বিষয়টি জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে তা হল তাহলে যেগুলো আছে সেগুলো কি অনুমোদনপ্রাপ্ত? কে দিয়েছে এই অনুমোদন এভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারার?

সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ১৪ দলীয় সঙ্গীদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে এমন ঘটনা পুণরাবৃত্তি রোধে তিনি কি করেছিলেন এবং পরবর্তি সময়ে কেন কারখানাগুলো সরিয়ে নেয়া সম্ভব হলোনা সেটা নিয়ে প্রকারান্তরে তার নিজের গুণকীর্তন করেছেন। আমরা এজাতীয় বাকসর্বস্ব রাজনীতিবিদদের আর নিতে পারছিনা।

একদিকে সাবেক শিল্পমন্ত্রী বলেন এককথা আরেকদিকে বর্তমান শিল্পমন্ত্রী যত্রতত্র আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক কারখানাগুলো এই ঘটনার জন্য দায়ী নয় বলে ছাড়পত্র দিয়ে বেড়ানোয় আমাদের তথাকথিত ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া মানুষগুলো মহা আপ্লুত। আপ্লুত হবেনইবা না কেন, ব্যবসার পাশাপাশি তারা যে এখন রাজনীতি তথা আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মূল কারিগর বনে গিয়েছেন। দিনে দিনে আমাদের রাজনীতি এখন ‘সর্বহারা’। বিগত দশম জাতীয় সংসদে সাংসদদের মধ্যে যেখানে ৫৯ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী সেখানে এবার এই সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ৬২ শতাংশে। সুতরাং মনে যথেষ্ট কষ্ট নিয়েই বলতে হচ্ছে আমাদের সাধারণ মানুষের নিয়ে ভাববার মত লোক কোথায়? সর্বগ্রাসীদের সর্বনাশা তাণ্ডবে রাজনীতি যে আজ সত্যিই রাজারনীতি হয়ে গেছে।

এখন সময় কেবল কথা দিয়ে কথার মালা তৈরি না করে সত্যিকারের কজটি করে দেখানোর। আর এই কাজের কাজটি করতে হলে আমাদের সর্বস্তরের মানুষের আজকের যে শোক থেকে উপলব্ধিবোধ ঘটেছে সেটাকে ধরে রাখা। সাধারণ মানুষ মারা পড়ে আর ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থ হাসিল করে যাবে এটা আর একমূহুর্ত চলতে দেয়া যাবে না। পুরান ঢাকাসহ দেশের সকল মানুষকে তাই এধরণের ঘটনাসহ থেকে সকল সামাজিক অনিয়মের শেকড় উচ্ছেদে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :