ডাকসুর আদৌ কোনো দরকার আছে কি?

চিররঞ্জন সরকার
চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও পুরনো প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে, তা হলো ডাকসু বা ছাত্র রাজনীতির আদৌ কোনও দরকার আছে কি না? ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কত জন ছাত্রছাত্রী জড়িত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি প্রসঙ্গে তাদের সত্যিকারের ভূমিকা কী অথবা তারা কি আদৌ কোনও সদর্থক ভূমিকা নেওয়ার অধিকারী? 

প্রশ্নটির তাত্ত্বিক উত্তর হয়তো হবে এমনই যে, গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক চেতনা তৈরি ও অধিকার রক্ষার জন্যই ছাত্ররাজনীতির যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যেটা বুঝতে পেরেছি, সেটা হল অধিকাংশ শিক্ষার্থী রাজনীতি পছন্দ করেন না এবং তাদের অভিভাবকরা নিজ সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান রাজনীতি করার জন্য নয়, পঠন-পাঠনে মনোনিবেশ করার জন্য।

ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রী আছে। সেখানে বড় জোর ১০০০ জন ছাত্রছাত্রী রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে। সুতরাং বলা যেতে পারে শতকরা ৫ জন ছাত্র বা ছাত্রী রাজনীতি করে।

আর ডাকসু বা ছাত্র সংসদের কাজ কী? বছরে একবার নবীনবরণ উৎসব, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্রীড়া-সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা, পত্রিকা প্রকাশ করা অথবা ভর্তির সময় কর্তৃপক্ষের উপর খবরদারি করা। যার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন ও গবেষণা সংক্রান্ত কোনও কাজের যোগ থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা কম এবং এই কারণে পঠন-পাঠনে ব্যাঘাত ঘটছে ছাত্র সংসদের এ ব্যাপারে করার কিছুই থাকে না। শ্রেণিকক্ষ ও আবাসন অপ্রতুল, এই ব্যাপারেই বা ছাত্র সংসদ কী করবে? এ কথা সত্যি যে, এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তারা পারেন, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়।

সুতরাং যে প্রশ্নটা উঠে আসছে তা হল, মাত্র ৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার মূল্য দিতে হচ্ছে বাকি ৯৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী, উপাচার্য, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা ও কর্মচারীদের। এখানে ভোট আসা মানেই একটা দুঃস্বপ্ন বয়ে নিয়ে আসা। নির্বাচনের প্রস্তুতি, প্রচার-প্রচারণায় লেখাপড়ার বারোটা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এলাকা দখলের সুবর্ণ সুযোগ আসে। এই নির্বাচনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের অনুপ্রবেশ ঘটায়। আর এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন কখনও নিরপেক্ষ নয়। প্রায়শই, রাজনৈতিক নেতাদের কথায় পুলিশকে চলতে হয়। তাই পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের দেশে প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কখনই ‘রাজধর্ম’ পালন করতে পারে না।

তবে এই যুক্তি গ্রহণ করলে সমাজে কূপমণ্ডুকতাই বাড়বে। ছাত্ররা সমাজ ও পরিপার্শ্ব নিয়ে মাথা ঘামাবে না, সোচ্চার ও সক্রিয় হবে না, এমনটা ভাবা অবাস্তব ও অবাঞ্ছনীয়। কিছু উচ্চাভিলাষী ছাত্র স্বেচ্ছায় ও পিতামাতার তাগিদে যেভাবে কেরিয়ারের কারাগারে বন্দী হয়, সেটা তাদের পক্ষেও চরম ক্ষতিকারক, সমাজের পক্ষেও।

ছাত্র রাজনীতির পক্ষে বললে প্রথমেই বলতে হয় যে, চার পাশের জগৎ সম্বন্ধে স্বাধীন চেতনা লাভ, সমাজবোধের উন্মেষ, প্রতিবাদের প্রত্যয় ইত্যাদি যে-সব লক্ষণ ছাত্র বয়সে দেখা দেয় তার বহির্প্রকাশ ঘটে ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে। যে সময়ে ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকে, সুকান্তের কবিতার সেই দুঃসহ দুর্বার বয়সে, পরিপার্শ্বের সঙ্গে প্রথম স্বাধীন সম্পর্ক ও আদানপ্রদান ঘটতে থাকে, সমাজবোধের উন্মেষ ঘটে, শৈশবের বোবা অন্যায়বোধ পরিস্ফুট হয়, প্রতিবাদের প্রত্যয় জন্মায়।

সমাজের সঙ্গে নিজের সত্তার বোঝাপড়ার ভিত গড়তে সময়টা তাই এত গুরুত্বপূর্ণ। এই বহিঃচেতনা ও সমাজবোধকে রাজনীতি বললে ভাবের ঘরে পুকুর চুরি হয়। তবে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বিপথে চালিত করে। তরুণতরুণীদের অভীষ্ট রাজনৈতিক চেতনা, মিলিয়ে যায় দলীয় হানাহানির হিংসা-ধ্বংস-কুৎসা-আগ্রাসনে। তারা স্লোগানের বর্ম এঁটে বিদ্বেষ ও হিংসার চর্চা করতে শেখে। যৌবনের স্বাভাবিক মানবিকতা ও সমাজচেতনা মাঠে শুকিয়ে যায়। সেই সঙ্গে পাঠ্যবস্তুর মধ্যে সমাজের উপকারী যে উপাদান, তাও হারিয়ে যায় অবহেলার গহ্বরে।

এজন্য দায়ী আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। ছেলেমেয়েরা যে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অন্য রকম চেতনা লাভ করতে পারত, এই ছেলেমেয়েদেরই হাতিয়ার করে সেই শিক্ষাব্যবস্থা পঙ্গু করে রাখে দলবাজ বয়স্কেরা। এদের মধ্যে শিক্ষকদের একাংশ অবশ্যই আছেন: সরাসরি দল করেন অপেক্ষাকৃত কম, দলের স্নেহচ্ছায়ায় প্রকৃত শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকেন অনেক বেশি।

সত্যি বলতে কী, ও-সব দেশের শিক্ষাপ্রাঙ্গণে অনেক বেশি, কখনও-বা ভয়াবহ মাত্রায় ঘটে অরাজনৈতিক অপরাধ: উদ্দেশ্যহীন খুন-জখম-আক্রমণ, লুটপাট ও ‘মাগিং’, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অশান্তি ও অরাজকতার বৃহত্তম (প্রায় একমাত্র) কারণ দলীয় রাজনীতি।

এই ছেলেমেয়েরা দেখে, দাবি মেটাবার বা অন্যায়ের প্রতিকারের নির্দিষ্ট পথগুলো রুদ্ধপ্রায়। আরও দেখে, সাধারণ মানুষের নাগরিক সত্তার মর্যাদা নেই, ন্যূনতম অধিকার পেতেও দল বেঁধে হামলা করতে হয়। সুতরাং তারাও যে একটা দলে ভিড়বে, আশ্চর্য কী? দলীয় গোষ্ঠীগুলোই যে এ অবস্থার জন্য দায়ী, দলের খাতায় নতুনদের নাম লিখিয়ে তারাই এটা চিরস্থায়ী করছে। ছেলেমেয়েরা বুঝে যায়, জীবনে করে খেতে গেলে দলের পরিচয় ভাঙিয়েই তা করতে হবে। সুযোগ বুঝে দল বদলানো চলে, দলীয় ব্যবস্থাটা পাল্টানো যায় না।

আসলে ছাত্র-রাজনীতির দলায়ত্ত বিকার নিয়ে আমরা চিন্তিত। মুশকিল হল, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা সেই বিকার বেমালুম অস্বীকার করছেন, করেই যাবেন। সেটা আন্তরিক বিশ্বাস না ভণ্ড আস্ফালন, সে বিচারে যাব না, মোদ্দা ফল একই। যেহেতু তাদের ঘোষণা মতো তারা আদর্শ রাজনীতি করছেন। ‘উপায় বনাম উদ্দেশ্য’ নিয়ে দার্শনিক কচকচির শেষ নেই, কিন্তু আদর্শের ইচ্ছাবিলাস চরিতার্থ করার জন্য চরম ও প্রকট ভাবে আদর্শহীন একটা ব্যবস্থা সমর্থন করা যায় না। যুবসমাজের সামাজিক বোধ ও কর্মোদ্যম ফলপ্রসূ করার ঠিক রাস্তা বার করতে সময় লাগবে। কিন্তু যে চোরা গলিতে দাঁড়িয়ে আছি, তা থেকে বেরিয়ে এলেই মঙ্গল।

সেই বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে ভালো কথা। কিন্তু রাজনীতির বিপদ ও অবক্ষয় নিয়েও ভাবতে হবে। যেহেতু এই দখলের রাজনীতির দৌলতে ছাত্র-রাজনীতি মূলত অনৈতিকতা ও হিংসার পরিসর হয়ে উঠেছে, ফলে যেখানে প্রত্যক্ষ ভাবে দখলের প্রশ্ন নাই, সেখানেও হিংসা আছে। ছাত্ররাজনীতির নামে হানাহানি, মারামারি-কাটকাটি, চাঁদাবাজি, খুন-গুম, সার্বিক ভাবে শৃঙ্খলাহীনতাকে ‘স্বাভাবিক’-এর স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে এই আচরণগুলি স্বাভাবিক, বস্তুত অনিবার্য, হয়ে উঠেছে।

সমাধানের একটিমাত্র পথ আছে। ছাত্র-রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক রংকে সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করা। ছাত্র সংগঠনগুলিকে শুধু খাতায়-কলমে রাজনৈতিক দল থেকে বিচ্ছিন্ন করলেই হবে না। সত্যই যেন কোনও সংযোগসূত্র না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। গত কয়েক বছরে ক্রমে সেই পথে যাত্রাও আরম্ভ হয়েছে। ধীর লয়ে, কিন্তু অভিমুখটি অনস্বীকার্য। ছাত্র সংসদের পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষায় নম্বর ইত্যাদি শর্ত থাকা উচিত। বছরের পর বছর বিভিন্ন বিষয়ের কোর্সে ভর্তি হয়ে ছাত্র থেকে যাবার সুযোগ বন্ধ করা দরকার। কিন্তু, রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে ছাত্র-রাজনীতির সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ না হলে এই পরিবর্তনগুলি অর্থহীন হবে। কারণটি সহজবোধ্য। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্ররা আইন ভাঙছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা বিলক্ষণ জানে, বিপদে পড়লে উদ্ধার করবার লোক আছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ দূরে থাকুক, পুলিশ বা প্রশাসনেরও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করবার সাধ্য হবে না। পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন না থাকলে এই ছাত্ররা প্রশাসনকে সমঝে চলবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দল আর নেতারা যদি স্বেচ্ছায় ছাত্র রাজনীতির চত্বর থেকে সরে যেতে রাজি না হন, তা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে কী উপায়ে?

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :