Alexa

একতরফাভাবে কোনো দেশের যুদ্ধে জড়ানোর সুযোগ নেই

একতরফাভাবে কোনো দেশের যুদ্ধে জড়ানোর সুযোগ নেই

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.), ছবি: বার্তা২৪.কম

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)। বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ১৯৫৫ সালের ১৩ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে আইএসসি প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স পড়া অবস্থায় ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ২০০৮ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান এবং অবসরগ্রহণ করেন।

স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২।

ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ সাম্প্রতিক ইস্যুতে বার্তা২৪.কম তার মুখোমুখি হন। বার্তা২৪.কম-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধপরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক নানা দিক। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ



বার্তা২৪.কম: কোন প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে এ সংঘাত?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: সাম্প্রতিক সময়ের যে প্রেক্ষাপট এটা তো সবারই জানা। ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু ও কাশ্মিরের পুলওয়ামায় সংগঠিত এক জঙ্গি হামলায় ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন। এই হামলার পর দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জঈশে মুহাম্মদ। ভারতের দাবি, মাসুদ আজহারের নেতৃত্বাধীন এই জঙ্গি সংগঠনের বিষয়ে পাকিস্তান বরাবরই নিরব, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে বললেও তারা সেমতো ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের এই নিরবতাই প্রমাণ করে এর সঙ্গে পাকিস্তান জড়িত। এতো বড় আক্রমণের পর ভারত চুপ করে বসে থাকবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া সরকারের ওপর জনগণ থেকে শুরু করে নানা পর্যায় থেকে প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়, সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর প্রতিশোধ চায়। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও হামলার পর থেকে বলে আসছিলেন, এর বদলা নেওয়া হবে।

এই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোররাতে পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ করে জঈশে মুহাম্মদের ঘাঁটি ধ্বংস ও ৩শ’ জঈশ সদস্য নিহতের দাবি করে। হামলার পর ভারত স্পষ্ট করে বলেছে, এ হামলা কোনো সামরিক ঘাঁটি ও নিরীহ জনগণের ওপর নয়। এ হামলা শুধু জঙ্গিদের আস্তানায় করা হয়েছে। ভারত বলছে, এমন হামলা করার অধিকার তাদের আছে, এটা আত্মরক্ষার্থে করা হয়েছে।

যদিও এমন দাবি পাকিস্তান প্রত্যাখান করে বলেছে, ভারতের বিমান প্রতিরোধের মুখে পালিয়েছে। তারা ফাঁকা জায়গায় বোমা ফেলেছে, এ ঘটনা একজন আহত হয়েছেন মাত্র। এই হলো বর্তমান প্রেক্ষাপট।

কিন্তু আপনি যদি ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের পেছনে তাকান তাহলে দেখবেন, সেই ১৯৪৮ সাল থেকে তাদের এমন বৈরীতা চলে আসছে। ইদানিং মাসুদ আজহারের জঈশে মুহাম্মদ ও হাফিজ সাঈদের নেতৃতত্বাধীন লস্করই তৈয়্যিবা অনবরত ভারতে বিশেষ করে কাশ্মীরে তারা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করছে। এর আগে ২০০১ সালে ভারতে পার্লামেন্ট ভবনে হামলার প্রেক্ষিতে একটি যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়।

এর পর ২০১৬ সালে উরি সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর কোয়াটারে হামলা চালায়। সেবার ভারত সীমান্ত পেরিয়ে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে জবাব দেয় পাকিস্তানকে।

বার্তা২৪.কম: কারগিল যুদ্ধেওতো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এবার কেন এত উত্তেজনা?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: কারগিল তো ভারতের সীমানাভুক্ত একটি উপত্যকা। সেখানে ১৯৯৯ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কারগিল দখলে নিলে ভারতীয় বিমান বাহিনী বিমান হামলা করে পাকিস্তানি দখলদারদের হটিয়ে দেয়, সেখানে তাই আকাশসীমা লংঘনের বিষয়টি আসে না। এবারের পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। ভারতের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের মদদে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অপতৎপরতা চালাচ্ছে, এটা নতুন কিছু নয়। এর দায়-দায়িত্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার। তাদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। সুতরাং ভারতের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য ভারত পদক্ষেপ নিচ্ছে, এটা তারা নিতেই পারে। আর উত্তেজনার কথা তো বললাম, পাকিস্তান জঙ্গিদের মদদ দেওয়া বন্ধ করলেই তো সব উত্তেজনা থেমে যায়। এটা পাকিস্তানকে বুঝতে হবে। এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এটা খুব জরুরি। না হলে এমন উত্তেজনা চলতেই থাকবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/28/1551344582718.jpg

বার্তা২৪.কম: কাশ্মীরের অবস্থা শুরু থেকেই অশান্ত, তারা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের এ ক্ষোভ ও বঞ্চনা বিষয়ে কি বলবেন?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: কাশ্মীর তো ভারতের একটা রাজ্য। সুতরাং এখানে যেসব অসন্তোষ আছে, বৈষম্য আছে তা ভারতকেই দেখতে হবে। কাশ্মীরের নাগরিকদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এটা ভারতের ভেতর থেকেও অনেকে বলছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। কাশ্মীরের জনগণ যেন বৈষম্যের স্বীকার না হন। এটা ভারত করতে না পারলে এটা তাদের ব্যর্থতা।

দেখুন, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে। আর কোনো রাজ্যের এ মর্যাদা নেই। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়া এখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রভাব বেশি। ভারতকে সেটা দমন করতে হচ্ছে। সুতরাং সবচেয়ে ভালো হয়, কাশ্মীরের জনগণ বুঝাপড়া করুন ভারতের সঙ্গে, এখানে পাকিস্তান নাক না গলালেই চলে।

বার্তা২৪.কম: দুই দেশের উত্তেজনায় বাংলাদেশের ভূমিকা কেমন থাকা উচিৎ?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: বাংলাদেশের ভূমিকা তো অবশ্যই রয়েছে। আমরা চাইব উভয় দেশই সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি দেখাবেন। কোনোভাবেই একটা যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি যাতে না হয়। সেটা উভয় দেশের প্রতিই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। যদি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাংঘাতিক অবস্থা সৃষ্টি হবে। একেবারে নিকবর্তী দেশ হিসেবে যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর ওপর পড়বে। সুতরাং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা কোনোভাবেই চাইব না, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। কোনোভাবেই সেটা কাম্যও নয়।

বার্তা২৪.কম: বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে কি?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: এই মুহূর্তে কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করছি না। কারণ এখানে দু’টি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের বিষয়। আর পাকিস্তান একটি জঙ্গি রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। তারা তো আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করছে। সেখানে বাংলাদেশের বড় কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

বার্তা২৪.কম: বিদ্যমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য কতটা হুমকি?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: আমাদের বড় কোনো ঝুঁকি নেই। ঝুঁকি হলো, ভারতের সঙ্গে আমাদের যে ব্যবসা-বাণিজ্য আছে সেখানে সংকট দেখা দেবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক। সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্য কোনো নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে বলে আমি মনে করি না।

বার্তা২৪.কম: অনেকেই বলছেন আগামী লোকসভা নির্বাচনে পাকিস্তান বিরোধীতা দেখিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পারের চেষ্টা করছেন মোদী, আপনার কি ধারণা?


https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/28/1551344614917.jpg

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: দেখুন এটাকে বলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মূল ঘটনা সেটাই। পুলওয়ামায়ের হামলার দায় সরাসরি জঈশে মুহাম্মদ স্বীকার করেছে। এটা বিশ্ববাসী দেখছে। যেহেতু ভারত পাকিস্তানকে বলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়াতে পারেনি। কাজেই সঙ্গত কারণেই ভারত আত্মরক্ষার্থে সীমান্ত এলাকার সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এটা তারা করতেই পারে। এখন এ কারণে যদি মোদীর জনপ্রিয়তা বাড়ে, তাহলে বলব পরিস্থিতি মোদীকে ফেভার করছে। এখানে অন্য কি আর বলার আছে? পরিস্থিতি তার অনুকূলে যাচ্ছে।

বার্তা২৪.কম: দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিধর, উভয় দেশই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। শেষ পর্যন্ত কী যুদ্ধ হবে?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: আমি এখনও মনে করছি, একটা ফুলস্কেল যুদ্ধ যাকে বলে, সেটা হবে না। তেমন কিছু ঘটবে না। কারণ, বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোরও কিন্তু এখানে ঝুঁকি আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেন, চীন বলেন সবারই ঝুঁকি আছেন। উভয় দেশের কাছে যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্র আছে এমতাবস্থায় ভারত-পাকিস্তানসহ সবাই চেষ্টা করবেন ফুলস্কেলে যুদ্ধে না জড়াতে। কারণ যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে সেটা বিশ্বের জন্য একটা মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। সুতরাং এই জায়গায় আমরা মনে করছি যে, অন্যান্য বিশ্ব শক্তিগুলো নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ভূমিকা রাখবেন, দুই দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করবেন। যাতে পরিস্থিতি কোনোভাবেই যুদ্ধের দিকে না যায়। একতরফাভাবে এখানে কারো কিছু করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কারণ বিশ্ব এখন নানা বলয়ে আবদ্ধ, এগুলো মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে উভয় দেশকে।

বার্তা২৪.কম: আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক জোটের কোনো ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ কি নেই?

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: না, কোনোটারই কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। সার্ক তো মৃত। অন্য আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক জোটগুলোতো অকার্যকর। এসব কিছুর জন্য এককভাবে দায়ি পাকিস্তান। পাকিস্তান তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই সব কিছু সম্ভব। এর আগে কিছুই হবে না।

বার্তা২৪.কম: বার্তা২৪.কম-এর পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার: বার্তা২৪.কমকেও অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন :