যে দেশে রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই!

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

যে কেউ ইচ্ছা করলেই ফরমালিন কিনে মাছে, ফলে মেশাতে পারে। কার্বাইড কিনে কলা, টমেটো পাকাতে পারে। এসিড কিনে কারো মুখে নিক্ষেপ করতে পারে। বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের বিচিত্র এক দেশ, যে দেশে রাসায়নিক নিরাপত্তা নেই!

বিশ্বের কোথাও রাসায়নিক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ, বিপজ্জনক কেমিক্যাল খোলা বাজারে পাওয়া যায় না এবং যে কেউ ইচ্ছা করলেই কিনতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঔষধের মতো প্রাণ রক্ষাকারী বস্তুও রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় না। বাংলাদেশে এসবের বালাই নেই।

পুরনো ঢাকার চকবাজারে যে ভয়াবহ রাসায়নিক অগ্নিকাণ্ড হলো, সেটা সম্ভব হয়েছে রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায়। ‘লেবার ল’ বা শ্রম আইনে কারখানা খুলে সেখানে কাজ করা হয়েছে। কি কাজ, সেটা তলিয়ে দেখার কেউ নেই। কারণ রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ দেওয়ার কেউ নেই।

এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইন হওয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা ও এসিড নিক্ষেপের ঘটনা কমেছে বটে। কিন্তু এসিড কেনা বা পাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয় নি। ফরমালিন, কার্বাইডের বিষয়ে কোনো আইন না হওয়ায় অবাধে ও মারাত্মক গতিতে এসবের ব্যবহার চলছে। খাদ্য নিরাপত্তা একেবারেই ভেঙে গেছে এসব রাসায়নিক বস্তুর অপব্যবহারের কারণে। পাশাপাশি এসিডি-নির্ভর নানা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানা চলতে পারছে অবাধে। যার ফলে ঢাকার চকবাজারের মারাত্মক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহায়তায় কদিন আগেই ঢাকার শেরাটনে দেশের রসায়নবিদরা একটি ওয়ার্কশপে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে ‘কেমিক্যাল কমিশন’ করার কথা বলা হয়েছে। দাবি উঠেছে ‘কেমিক্যাল পলিসি’ বা ‘রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার নীতি’ প্রণয়নেরও। যে নীতির আলোকে কোন রাসায়নিক দ্রব্য কে কতটুকু কিনতে পারবে বা পারবে না, সেসব বিধান থাকবে। একটি জাতীয় ভিত্তিক মনিটরিং ও কন্ট্রোলিং-এর আওতায় আসবে রাসায়নিক দ্রব্য বা কেমিক্যালের ব্যবহার। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে রাসায়নিক দ্রব্যের অপব্যবহার ও সহজলভ্যতা।

ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন রসায়নবিদ। দীর্ঘ বছর তারা রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে এসব প্রসঙ্গে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাসায়নিক দ্রব্য সহজলভ্য হওয়া উচিত নয়। যে কেউ ইচ্ছা করলেই ফরমালিন, কার্বাইড বা মারাত্মক কেমিকেল কিনতে পানে এদেশে। অসচেতন ও মুনাফালোভীরা এসব খাদ্যদ্রব্য ও ভোগ্যপণ্যে মিশিয়ে লাভ হাতিয়ে নিতে পারেন এবং সেই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ধ্বংস করে দিতে পারেন। বাংলাদেশের বাজারগুলোতে এখন তেমনই বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেমিক্যালের অবাধ ব্যবহার ও সহজলভ্যতা থাকায় আবাসিক এলাকায় নানা কারখানা তৈরি করা যাচ্ছে। কেমিক্যাল সেফটি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই এসব চালু থাকায় বার বারই মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড ও নানা দুর্ঘটনায় বিপুল সম্পদ ও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।

সবচেয়ে মারাত্মক যে বিষয়টি সকলের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে, তা হলো দুষ্কৃতিকারী, জঙ্গি ও অপরাপর অপরাধীচক্র সহজলভ্য রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে নাশকতা করার সুযোগ পাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের স্যাবোটাজ ও আক্রমণাত্মক কাজে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের মাধ্যমে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পরেও নীতি নির্ধারকরা এ ব্যাপারে সচেতন ও সজাগ নন।

রাসায়নিক দ্রব্য ও কেমিক্যাল পদার্থ কেনা-বেচায় কোনো নিয়ম না থাকলে এবং এগুলো খোলা বাজারে সহজলভ্য হলে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন, কার্বাইডের অপব্যবহার কেউ রোধ করতে পারবে না। এগুলো না পাওয়া গেলে অসাধু ব্যবসায়ীরা তা ব্যবহার বা প্রয়োগের সুযোগ পাবে না। পাশাপাশি রাসায়নিক কাঁচামাল সহজলভ্য না হলে আবাসিক এলাকায় বা যত্রতত্র বিপদজ্জনক কারখানা তৈরি করাও অসম্ভব হবে। জঙ্গি, সন্ত্রাসী, নাশকতাকারীরাও মারাত্মক কোনো আক্রমণের সুযোগ পাবে না।

এসব ভীতিকর কারণে কেমিক্যাল কমিশন এবং কেমিক্যাল নীতি প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অবাধ ও সহজলভ্য কেমিক্যাল থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা ও আবাসিক এলাকার মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করা যাবে না। সবচেয়ে আগে এসব বিপজ্জনক ও মারাত্মক দ্রব্যের ব্যবহার ও প্রাপ্যতার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

যে দেশে রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, সেখানে বাজারে-বাজারে রাসায়নিক ভেজালযুক্ত খাদ্য আর পাড়ায়-মহল্লায় চকবাজার ট্র্যাজিডির মতো বিপদ কিংবা নাশকতামূলক অপরাধের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মানুষের এসব বহুমুখী ও ভয়াবহ বিপদ কার্যকর নীতি, পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মাধ্যমে দূর করার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।

আপনার মতামত লিখুন :